আতিকুল ইসলামের ভাস্কর্যে সময়ের রাজনীতি

 

_mg_1787।মুজিবুল হক।

প্রদর্শনীর নাম ভাস্কর্যায়ন। ভাস্কর্য ও টেরাকোটা ছিল ছাব্বিশটি। তবে প্রদর্শনীতে প্রবেশ করেই ধাক্কা খেতে হলো খানিকটা। দেয়ালে ঝোলানো অনেকগুলো কাঠের পাটাতন আর ওপরে ছিটকানি, ছিটকানিগুলোতে ছোট-বড় অনেকগুলো তালা ঝুলছে। ফর্মগুলো একেকটা মানুষের মুখের অভিব্যক্তির মতো দেখতে; যা খুব সহজেই দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ভাস্কর্যের সঙ্গে এসব জিনিস উপস্থাপন গ্যালারির প্রথাগত আমেজ ভেঙে দিয়ে চলমান রাজনৈতিক আবহে আমাদের বন্ধ মুখকে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। ফলে ভাস্কর্য উপস্থাপনের ধরনে এসেছে নতুনত্ব। ভাস্কর্যের এই রূপবন্ধকে আমরা বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদী আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। এতক্ষণ ধরে বলছি শিল্পী আতিকুল ইসলামের একক ভাস্কর্য প্রদর্শনীর ‘অবশিষ্ট মুখগুলি’ শিরোনামে স্থাপনাশিল্পের কথা। চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমীর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আর্ট গ্যালারিতে গত ২৪ মার্চ শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী শেষ হয়েছে ২৭ মার্চ।

শিল্পী আতিক প্রদর্শনীতে নির্দিষ্ট কোনো অর্থ উৎপাদন করতে চাননি। প্রকৃতি, পাখি, নারীর বিভিন্ন ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে ভেবেছেন তাঁর কাজে। মানুষের স্বপ্ন ও স্মৃতির অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করেছেন তাঁর ঢেউটিনের ওপর আঁকা গ্রামীণ চলমান দৃশ্যে। ‘ঢেউটিন ড্রিম’ শিরোনামে একটি কাজে দেখা যায় ঢেউটিনের ওপর আঁকা একটি জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে একজন নারী। ঘরের বাইরে মাচায় লাউগাছ, তাতে ঝুলছে অনেকগুলো লাউ। গ্রামীণ মানুষের ভেতরে যে স্বপ্ন ও আকাঙক্ষা কাজ করে, তা এই নিরীক্ষাধর্মী কাজটি দেখলেই স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়, যাতে একটি ছন্দের পতন ঘটছে। তাঁর এই কাজ শিল্পী কামরুল হাসানের উঁকি দেওয়া কাজের অনুরূপে নিজস্ব ভঙ্গিতে উপস্থাপন।

তাঁর আরেকটি কাজ ‘মুভিং অবজেক্ট- দুই’-এ দেখা যায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় কক্ষের মাঝামাঝি অবস্থানে। একটি কাঠের বক্সের ওপরে একটি কলসির অর্ধেক অংশ। আর মেঝেতে পড়ে আছে কলসির অর্ধেক অন্য অংশটি। লুকানো পাখার ব্যবহার করে কলসির অর্ধেক অংশটি গতির সৃষ্টি করছেন শিল্পী। সচেতন আলোর ব্যবহারে মেঝেতে বিভ্রম সৃষ্টি করেছে দর্শকদের সামনে।

শিল্পীর ‘ফেস কনক্রিয়েট’ শিরোনামে ভাস্কর্যগুলোতে নারীকে সুষমার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। ভাস্কর্যগুলো সিমেন্টে নির্মাণ করা হলেও তাতে পুরোনো আয়না ব্যবহার করে বিস্মৃত মনের অবচেতন স্তর থেকে সচেতন স্তরের দৃশ্যকল্প সৃষ্টি করেছেন। একটি নারী ভাস্কর্যের কপাল থেকে বের হয়ে এসেছে পানির কল। নারী ও পানির সম্পর্ক উর্বরতার প্রতীক হিসেবে সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে, তা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে- এটা শিল্পী তাঁর কাজে প্রকাশ করেছেন। তবে ভাস্কর্যগুলোর মুখের বিভিন্ন অবয়ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা নারীর অনুকরণে। গ্যালারির শেষ কক্ষের দেয়ালে খালি রাখা হয়েছে একটি ঢেউটিনের তৈরি সারফেস এবং নিচের মেঝেতে রেখেছেন রঙের খোলা-বন্ধ বিভিন্ন ধরনের কৌটা, ব্রাশ, তুলি ও স্পেচুলা। এতে শিল্পী কিছুটা হলেও স্টুডিও আবহ আনার চেষ্টা করছেন। প্রদর্শনীতে তিনি বিভিন্ন ফর্মের দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক পাখি উপস্থাপন করেছেন নান্দনিকভাবে। তাঁর ভাস্কর্যের উপস্থাপনে সহজ-প্রাণবন্ত আবেগে আমাদের দেখা-অদেখা বিষয়সমূহকে তুলে এনেছেন শিল্পকর্মে। ব্যতিক্রমধর্মী ও সুচিন্তিত উপস্থাপন করলেও গ্যালারির স্পেস ব্যবহারে মনোযোগ দেননি শিল্পী। তবে তাঁর কাজে বৈশিষ্ট্য ও কর্মের চেয়ে নানা নিরীক্ষায় তিনি শিল্পকর্ম উপস্থাপনে নিজের অনুভবকে তুলে ধরেছেন। বহুমাত্রিকতার ভিন্নতা তাঁর প্রদর্শনীকে করেছে বর্ণিল। শিল্পকলায় অনুষ্ঠিত তাঁর ভাস্কর্যায়ন প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন শিল্পী মনসুর-উল-করিম, অতিথি ছিলেন শিল্পী জসিম উদ্দিন।

প্রদর্শনী সম্পর্কে শিল্পী আতিকুল ইসলাম বলেন, শিল্পের যে মাধ্যমগুলো রয়েছে, তার মধ্যে ভাস্কর্য হলো সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশমাধ্যম। আমার এবারের প্রদর্শনীতে শিল্পকর্মগুলো খুবই সহজ ও সরল। বিষয় নির্বাচন ও আঙ্গিকে আমাদের দেশের বরেণ্য অনেক শিল্পীর কাজের প্রচ্ছন্ন প্রভাব রয়েছে আমার শিল্পকর্মে। শিল্পকলার শিক্ষার্থীরা সহজলভ্য মাধ্যমের ব্যবহার করে কীভাবে ভাস্কর্য নির্মাণ করতে পারে, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে এ প্রদর্শনীতে। দর্শক খুব সাবলীলভাবে প্রদর্শনীটি উপভোগ করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »