স্মৃতি উপাখ্যানে মানবিক বন্দনা

sharad।মুজিবুল হক।

চট্টগ্রাম নগরীর চট্টেশ্বরী মোড়ের বাদশা মিয়া সড়কে চারুকলা ইনস্টিটিউটে যেতেই চোখে পড়ল একটি গাছ এবং রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারির কিছু অংশ সাদা কাপড় দিয়ে মোড়ানো। তাতে দুটি প্রজেক্টরের আলো ফেলে রচনা করা হয়েছে দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনের দৃশ্য। ভিডিও আর্টের মাধ্যমে নির্মিত আগুনের দৃশ্য দেখে পথে হেঁটে যাওয়া উৎসাহী কেউ কেউ মুখ বাড়িয়ে দেখছে, কী হচ্ছে এখানে।

গত ২৫ মার্চ সন্ধ্যা সাতটায় ’৭১-এর কালরাতের স্মৃতিকে স্মরণ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিল্পী রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারিতে ‘স্মৃতি উপাখ্যান’ শিরোনামে শুরু হয়েছে শিল্পী শারদ দাশের একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন শিল্পীর মা বেলা দাশ। অতিথি ছিলেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক শিল্পী নাসিমা আখতার, শিল্পী অলক রায় ও শিল্পী ঢালী আল মামুন।

শিল্পী রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারিতে একটি ভিডিও আর্ট, চারটি ভাস্কর্য, পনেরোটি পেইন্টিং, ছয়টি ছাপচিত্র ও একটি স্থাপনার (ইনস্টলেশন) সমন্বয়ে এই প্রদর্শনীকে ব্যবচ্ছেদ করা যায় নানা উপায়ে। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা, চলমান রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, সাম্প্রতিক পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া যুদ্ধ ও মানবতা যেভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছে, তারই চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর কাজে।

গ্যালারিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে ছাপের মাধ্যমে করা গণহত্যা জেনোসাইডের বিবমিষাময় ভাষ্য, যা উৎসারিত হয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক নির্বিচারে গণহত্যাযজ্ঞের সঙ্গে। রায়েরবাজার বধ্যভূমির দৃশ্যগুলোকে প্রতিবিম্বের মতো পুনরাবৃত্তি করেছেন তিনি। ছাপচিত্রের মাঝখানে মাথার খুলি ব্যবহার করে পুঁতি দিয়ে ছাপ দিয়েছেন তাঁর শিল্পকর্মসমূহে।

এ ছাড়া মূল কক্ষে রয়েছে সিমেন্টের তৈরি যুদ্ধ ট্যাংক। ট্যাংকগুলো তর্জনী উঁচু করে উদ্যত হাত দিয়ে নির্দেশ করছে যুদ্ধের। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে চলছে আন্তর্জাতিক গণহত্যা। এই বীভৎসতার অভিজ্ঞতা বিদ্যমান দেশে দেশে তাঁরই নির্দেশনা উদ্যত তর্জনীওয়ালা ট্যাংকসমূহ।

প্রদর্শনীর দ্বিতীয় কক্ষে ঢুকতেই চোখে পড়বে দেয়ালে তেল রঙের করা চিত্রসমূহ। এই চিত্রসমূহ দেখলেই যে কাউকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। মানবতাবিবর্জিত মর্মান্তিক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে চিত্রিত তেলরংগুলো লাল, কালো ও হলুদ রঙের সামগ্রিক বিষয় ও বস্তুর পারস্পরিক সম্পর্কায়ন করেছে গ্যালারির কক্ষজুড়ে।

এখানে every thing you can persive by smell-2 ছবিটি বেশ উল্লেখযোগ্য। ছবিটিকে শিল্পী কয়েক ভাগে ভাগ করেছেন। ছবির ওপরের অংশে একটি সাদা বাস দাউ দাউ করে জ্বলছে। তার পাশে একটি অংশে গর্ত করে একজন মাথা ঢুকিয়ে বসে আছে, আরেকজন মাথা ও দেহের কিছু অংশ গর্তের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে পা উঁচু করে আছে, একজন আতঙ্কিত হয়ে বসে আছে। পাশে একজন গর্ত থেকে একটি হাত উঁচু করে আছে। নিচে আগের একটি ফিগারের পুনরাবৃত্তি সেখানে আতঙ্কিত মানুষের ছোটাছুটি। তারই মাঝে ফুটে আছে একটি শাপলা ফুল। তার এই সিরিজের আঁকা ছবিসমূহ খুবই ইতিবাচক নান্দনিকতা নির্দেশ করেনি। এখানে চলমান সহিংসতায় আমাদের অবস্থান উটপাখির মতো নিজের মাথা গর্তে লুকিয়ে রাখাকে হয়তো শিল্পী বুঝিয়েছেন। কিন্তু ঘটনাসমূহ থেকে আমরা নিজেকে কি আদৌ আড়াল করতে পারছি, না আদৌ আড়াল হচ্ছি! কিন্তু এই ঘটনাসমূহের পুনরাবৃত্তি ঘটছে এবং এর দ্বারা আমরাও কোনো না কোনোভাবে এ সহিংসতার শিকার হচ্ছি প্রতিনিয়ত।

একই কক্ষে তিনি করেছেন বিশ্বজিৎ সিরিজ। ছবিগুলোতে খুবই স্বল্প রঙের সিলুয়েটের (ছায়াচিত্র) মাধ্যমে ব্যবহার করে বিশ্বজিৎকে হামলার বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন দ্বিমাত্রিক অবয়বে। এখানে শিল্পী ছবির মাঝখানে বড় একটি বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আমাদের ভাবনার খোরাক জুগিয়েছেন। তার পাশে তিনি করেছেন মানুষের ক্রমবিবর্তনের ধারায় আবার পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে। একদিকে এসিরীয় দেবতা লামাসু (সিংহের দেহ, মানুষের মুখ আর ঈগলের ডানা) ও বুদ্ধমূর্তির ছিন্ন মাথা, কাটা হাত। কিছু ছবিতে উঠে এসেছে দেবী কালীর ছিন্ন মস্তক। তাঁর আঁকা ছবিগুলো এমনভাবে দেয়ালে সাজানো হয়েছে, সামগ্রিকভাবে কম্পোজিশনে গতি তৈরি হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে নাটকীয় আবহ।

প্রদর্শনীর শেষ কক্ষের মেঝেতে লোহার বৃত্তাকার একটি বলয় তৈরি করে তাতে ছাঁচে ঢালাই করা কিছু মাথার খুলি সাজিয়েছেন। তার সঙ্গে পেট্রলবোমার নৃশংসতা নিয়ে করা বৃত্তাকার ভিডিওচিত্র, সেই সঙ্গে যুক্ত করেছেন কর্কশ ঘণ্টার ধ্বনি। সচেতন আলোকসম্পাতে বীভৎসতার অভিজ্ঞতাকে নির্মাণ করেছেন। বিস্মৃত স্মৃতিরা মনের অবচেতন স্তর থেকে সচেতন স্তরে এসে দৃশ্যকল্প তৈরি করেছে। মেঝে, দেয়াল, গ্যালারির স্পেস ব্যবহারে মনোযোগী ছিলেন শিল্পী।

রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারিতে তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শনী দেশীয় বাস্তবতা ও বিশ্বরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দর্শকদের অবস্থান ও বর্তমান ভাবনাকে হয়তো উসকে দেবে কিছুটা সময়ের জন্য। ২৫ মার্চ শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলে ৩১ মার্চ পর্যন্ত।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »