আকাশ ভরা সূর্য তারা

bengla_music_festival14। সালেহ্ রাব্বী জ্যোতি ।

কল্লোল কিংবা কৃত্তিবাসের কবিদের কথা ভাবুন। ভাবুন হাংরি মলয় অথবা পদ্যকার অমিততেজা শক্তির কথা। রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করে বাংলা কাব্যের নব্যনায়কেরা ছোট কাগজের পাতায় বিপ্লব ঘটিয়ে চলতেন অহর্নিশ; কিন্তু গানের বেলায়! গুরুদেব বাদে নৈব নৈব চ!! অহর্নিশ দেবব্রত বিশ্বাসের গলায় ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ কিংবা সুচিত্রা মিত্রের কিন্নরী কণ্ঠের ‘কৃষ্ণকলি’তে ব্যাকুল। কমলালেবুর সুবাস ছড়ানো সৈয়দ মুজতবা আলী ঠিকই বলেছিলেন, ‘স্রেফ গান দিয়েই বাঙ্গালীর হৃদয়ের দেবতা হয়ে রইলেন গুরুদেব।’

বিংশ শতকের শেষ দশকে বাংলাদেশে নতুন যে প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে তাদের আন্তর্জাতিকতাবাদী চরিত্র অমোচনীয়। আশির দশকের রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র থেকে বেরিয়ে ক্রমান্বয়ে দেশের গণতন্ত্রায়ণের যাত্রা আর টেকনোলজির নিয়ত পরিবর্তনকেই সম্ভবত এ যুগের অনন্য চরিত্রের প্রধান প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করা চলে। নব্বইয়ের শুরুর দিকেও এদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক যে বাস্তবতা প্রবলভাবে আমাদের পুর্ববর্তী প্রজন্মের সাংস্কৃতিক রুচি নির্মানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে তা একবিংশ শতকের প্রথম দশক পেরিয়ে এসে আমাদের ব্যক্তিরুচি সংগঠনে প্রবল হলেও প্রধানতম অনুঘটক হিসেবে আর কার্যকর নয়।

ছায়ানট, জাতীয় কবিতা পরিষদ কিংবা উদীচীর রাষ্ট্রব্যাপী সাংস্কৃতিক যে জনজোয়ার সৃষ্টির ক্ষমতা জলপাইয়ের দিনগুলিতে ইতিহাস চাক্ষুষ করেছে সেটিও বদলের চোরা স্রোতে আজ মৌন। ৩৫ মি.মি. এর চলচ্চিত্র যেভাবে সময়ের প্রয়োজনে বদলে গেছে ডিজিটালে, ঠিক তেমনি নিজস্ব বলে যে অবস্তুগত সম্পদগুলি নিয়ে আমাদের বড় বেশি গর্ব তা নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়েছে, হচ্ছে। ভাষার আন্দোলন আর আইয়ুবজান্তার পাকিস্তানিকরনের বিরোধীতা থেকে রবীন্দ্রনাথের, বাংলার নিজের গান, চিত্রকলা কিংবা গল্প বলবার যে ধারাটি আমাদের পুর্বজরা বেছে নিয়েছিলেন সেটিও এখন বিনির্মিত হচ্ছে যুগের সাথে, রুচির সাথে তাল মিলিয়ে।

বাঙালির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আদপে তার নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের মতই। মিলিয়ে মেলবার।আমাদের মন অনেকখানি বোদলেয়ারের চলিষ্ণু মেঘদল মণ্ডিত আকাশের মতো। যেখানে প্রেমময় মেদুর কবিতা নিয়ে আসন করে নেন ভেরলেইন, ভালো আছি আর ভালো থাকবার আশাবাদী রুদ্র চিরকেলে প্রিয়তম গীতিকার হয়ে ওঠেন (অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের পর)। সেখানে এক ঘরে বসত করেন লালন আর মৌলানা রুমি। আমাদের সংগীতে তাই কয়্যারের উদাত্ততা, সহসওয়ানের খাঁ ঘরানার মিষ্টত্ব আর ওয়াজিদ আলি শাহর বন্দিশের নিত্য চলন। সাথে ভূমিজ, জলজজাত ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল আর হাওঢ়ের মিঠে সুরের ঐতিহ্যতো আছেই। বাঙ্গালীর রক্তে তাই লীন হয়েছে শক-হুনদের নাদ, সেনদের আমদানি দক্ষিণী তানকর্তব, মধ্যযুগের বৈঞব কীর্তন, মাজারের কাওয়ালি, রোমান ক্যাথলিক হিম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কালে বিস্তার পেয়েছে কবির লড়াই, লেটো আর বিভাগপূর্ব সময়ে শ্যামা সংগীত আর হামদ-নাত। আর লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো এর সবটুকু লীলাই হয়েছে ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের বিস্তির্ণ বৃন্দাবনে। এই দীর্ঘ সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যের বলেই বলা যায়, আমাদের জীবনে উচ্চাঙ্গসংগীত বা ভারতীয় ক্লাসিক্যালের সমঝদার হওয়ার বিষয়টি তাই একান্তই ব্যক্তিগত পছন্দের, বিবেচনার।

দেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতচর্চার বেহাল হাল দেখে অবশ্য আমার সমালোচক বন্ধু বলতে পারেন, দীর্ঘ চর্চা আর শিখবার অবকাশ কোথায়! ক’জন শিখছে? আমাদের বর্তমান তরুণ প্রজন্মের ব্যস্ততা তো ভাইবারে, টুইটারে। সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে তার জীবনে সময় কই! কিন্তু বিষয়টা কি আসলে এতটাই সরলরৈখিক? মোটেই না।

বছর কুড়ি আগের মফম্বলের কথাই ধরা যাক, তখনও উদীচী আর খেলাঘরের গান, তবলার মেহনত আর রাশি রাশি নিউজপ্রিন্টের কালো অক্ষরের তরে প্রেম জানাবার সুযোগ পর্যাপ্ত। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা আর প্রার্থিত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নতুন প্রজন্মের মুখ্য অংশের আসক্তি মাঙ্গা আর কম্পিউটারের গেমসে। তবে আশার ব্যাপার হলো এর মাঝেই তরুণদেরই একটা অংশ কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কাছে ফিরছে। এরাই বেঙ্গল কিংবা ছায়ানটের শাস্ত্রীয় সংগীতের কনসার্টে লোকাল বাসে চেপে আজিজ থেকে কেনা সস্তা খাদির চাদর জড়িয়ে সারারাত গান শোনে। সে কেবল লাবড়া-লুচির খোঁজেই শীতের রাতে লেপ-কম্বলের ওম ছাড়েনি। এদের সংখ্যা আসরের প্রথম রাতে যা থাকে পরবর্তী রাতে তার দুনো হচ্ছে। উদ্যোগী হয়েই আনছে নিজের বন্ধুদের। আড্ডায় পিংক ফ্লয়েডের নতুন অ্যালবামের সাথে সাথে আলাপ তুলছে রশীদ খাঁর রবীন্দ্রসংগীত আর শিব কুমার শর্মা- হরি প্রসাদ চৌরাসিয়ার যুগলবন্দী নিয়ে।

স্বচ্ছ ক্ষীণতোয়ার মত জলের একটা ধারা বহমান তবে এখনো সেটি শ্রোতাদের মাঝে প্রবলতম নয়। সংস্কৃতি কিংবা সঙ্গীতের উদার এক আকাশ আমাদের সামনে দৃশ্যমান। প্রয়োজন শুধু নিজেদের জানালা খুলে দেবার সিদ্ধান্ত নেবার, অবশ্যই আলো আসবে, আসবে মিঠে বাতাস। ভুবনের বাগদেবী প্রাণিত করবেন আমাদের। তখনই কেবল তখনই আমরা নিজের ঘরের খোঁজও নেয়া শিখব। নিজের ঘর গোছানোতো হবেই বাড়তি পাওনা হিসেবে গাঁটছড়া বাঁধা হবে কিংস্টন ট্রায়ো, বব মার্লে কিংবা এসি/ডিসি’র সঙ্গে।

এভাবেই সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণেরও পরিচয় হবে রামকানাই দাশ, অজয় চক্রবর্তী, গিরিজা দেবী কিংবা বারীণ মজুমদারের সাথে। সেও অবলীলায় প্রেমে পড়ে যাবে আমির খসরুর উত্তরাধিকারীদের। ঠিক যেভাবে তার বছর পনেরোর অগ্রজেরা পড়ছে। ইউটিউব আর সোশ্যাল মিডিয়ার অভাবনীয় এক উত্থানের প্রসাদাৎ তার হাতে বরং অপশন বেশি। তাকে আর খুঁজে খুঁজে বের করতে হবেনা ক্লাসিক্যাল শোনেন, সংগ্রহ করেন এমন পিতৃস্থানীয়দের। বিলায়েত খাঁ আর রবিশঙ্করের জাদুকরী সেতার বাদন থেকে সে কেবল কয়েক মুহূর্ত দূরত্বে। আর কান তৈরির জন্য যে প্রস্তুতি তা কোক স্টুডিও আর এমটিভি আনপ্লাগডের ফিউশন ফলো করে খানিকটা হয়ে গেছে আর বাকিটা বিলকুল প্র্যাকটিক্যাল। সোনা মহাপাত্র আর রাম সম্পতের ‘ম্যায় তো পিয়া সে নয়না’ শুনে শুনে আমীর খসরুর বন্দিশটাতো তার মুখস্তই, প্রয়োজন ইমদাদখানি ঘরানার সুজাত হোসেন খানের গলায়ও একবার শুনবার। তার পরে সিদ্ধান্ত কেবল তারই, আর জনরুচি কদাচও ভুল করে না!

এই গান শুনতে শুনতেই মাঝে কিছু বছর যাবে। প্রাধান্য পাবেন দরাজ, ভরাট জেমস আর উদাত্ত সঞ্জীব। কুমার প্রসাদ আর মুজতবা আলীদের হটিয়ে সার্ত, ফুকো, দেরিদা। সরল জসীমউদদীন কিংবা আবোল-তাবোল সুকুমার জায়গা হারিয়ে ফেলবেন ঋজু শামসুর রাহমান আর প্রমত্ত শক্তির কাছে। কিন্তু তারপরও মনের গহীনে অম্লান রয়ে যাবেন আব্দুল করিম শাহ আর বড়ে গোলাম আলি। ঠিক যেমনভাবে টি টোয়েন্টির যুগেও রয়ে গেছে টেস্ট আর অবিকল ছবির মতো মাহেলা জয়াবর্ধনের কবজির মোচড়! ঠিক নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাজনার মতোই।

তখন আইটিউনসের প্লেলিস্টে টানা বাজবে ফাইয়াজ হাশমির আজ ‘জানে কি জিদ না কারো’র অনেকগুলো ভার্সন। ফরিদা খানুমের সেই গজল লং প্লে থেকে ক্যাসেটের টেপ ঘুরে এসে গেছে কিক্লের দূরত্বে। থাকবেন এ আর রহমানের সংগীতায়োজনে রামাইয়া আইয়ার আর রূপমতী জলিরা, আর শঙ্কর টাকারও।

আমাদের গানের আকাশ ভরে উঠবে আলোয়। সংগীত উৎকর্ণরা জমায়েত হবেন ছায়ানট মিলনায়তনে আর আর্মি স্টেডিয়ামে। বহুব্রীহি গৃহস্থের মতো তারা গানটুকুর মর্যাদা দেবেন। শুনবেন, তারিফ করবেন। এখনকার সব ধরনের গানের কনসার্টের জমায়েত তরুণ শ্রোতারাই ভালো শ্রোতা হয়ে আনবেন শুদ্ধ সঙ্গীতের নতুন উচ্ছ্বাস।

সামগীতের এই সলোমনিক কাব্যগাথা তাই নতুনদের সঙ্গে জড়িয়ে যাক অনন্য বন্ধনে। ডোভার লেনের কনফারেন্সে ঢুকতে না পেরে ষাটের দশকের যে যুবক বাইরে খবরের কাগজ পেতে সারারাত গান শুনেছে আজ সেই বয়সী এক তরুণ হাতের স্মার্টফোনে ফলো করুক প্রোগ্রামের লাইভ স্ট্রিম। প্রযুক্তি আর প্রাচীনত্বের মাঝে অনন্য এক সেতু গড়ে উঠুক। আরো বড় ভূমিকা রাখুন কলাকাররা মানে পারফরমাররা। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী আর ওস্তাদ রশীদ খানের রবীন্দ্রনাথের গান আর ‘শিরোনামহীন রবীন্দ্রনাথ’ তাই তরুণদের কম্পিউটারের রবীন্দ্রসংগীত কালেকশনে থাকুক পাশাপাশি ফোল্ডারে। আর আমাদের জীবনকে প্রাণিত করে চলুক রাগ-রাগিণীর মায়ার খেলা।

আমাদের শাস্ত্রীয় সংগীতের বড় শক্তির যে জায়গাটি যার মাধুর্যে রোজ আরো আরো তরুণ আগ্রহী হচ্ছে সেটি হলো কলাবিদের স্বকীয়তা, স্বাধীনতার জায়গাটি। কন্টিনেন্টের চেম্বার মিউজিকের মতো আমাদের দরবারি কলা নোটেশনের জালে আবদ্ধ নয়। হাফভলি বল দেশের মরা পিচে যেভাবে সাকিব আল হাসান সামলান, ক্যারিবিয়ানে কিন্তু সেভাবে খেলেন না। এই ইম্প্রোভাইজেশনই কিন্তু তরুণদের উৎসুক করে তোলে।

সুতরাং আমার সমালোচক বন্ধুরা বলুন, টি-টোয়েন্টি কিংবা আইপিএলের চিয়ারলিডারদের ভিড়ে তরুণরা কি টেস্ট উপভোগ করে না? অবশ্যই করে আর যারা দ্বিমত করছেন তারা জিম্বাবুয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের খুলনা টেস্টটা আরেকবার দেখুন কিংবা এবারের সংগীত উৎসবে এক রাত আমজাদ আলী খাঁর সরোদ শুনুন। সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।

 লেখক সংবাদকর্মী, যমুনা টেলিভিশনে কর্মরত

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

One comment on “আকাশ ভরা সূর্য তারা
  1. ‘রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা’ ‘সরকারী পৃষ্টপোষকতা’ যতবারই শুনি আমার শুধু ‘ব্রেখটের অয়েটিং পর গডো’র কথা মনে পড়ে যায়…

    সামন্ত প্রভুদের বেকার ছানারা বানালো ‘কমুনিস্ট ক্লাব’ চীন ও আমাদের চেয়ারম্যান ম্যাও তাতে সরকারী লেবেল লাগালেন, আর আমরা যুগযুগ ধরেই দু’হাত জুড়ে প্রভুর চরনে পুজো দানকেই (অথবা জায়নামাজে দু’হাত তোলা) কর্ম জেনে আসছি…

    আমাদের পরনের পাতলুন আমাদের শিখিয়েছে ‘বিপ্লব’ করতে তাই আমরা বাবার সম্পত্তি শত্রু কাকা জোতদারকে গুলি করে মারি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »