শিল্পী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম চিত্র প্রদর্শনী

তপ্ত শ্বাসের আরতি ‘যাতনা যাপন’

krishnaফরিদা ইয়াসমিন রত্না।

বিক্রমপুরের রজতরেখা নদী এবং অকৃত্রিম প্রকৃতির ইমেজের সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন শিল্পী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়। নদী-খাল-পুকুর, সবুজ মাঠ তার শৈশবের সঙ্গী। গ্রামের পাশে রজতরেখা নদী, তার নরম স্রোত এখনো চোখে ভাসে। নদীতে আকাশ বিদীর্ণ করা স্টিমারের হুইসেল এখনো তার কানে বাজে। জল স্পর্শ মাখা এ হুইসেল প্রকৃতি ও সমাজে নতুনের আবাহন বলে শিল্পী কৃষ্ণার মনে হতো।

মধুর সাংস্কৃতিক বাতাবরণে শিল্পী কৃষ্ণার বেড়ে ওঠা। প্রশস্ত-হৃদয় বাবা কৃষ্ণাকে ছবি আঁকার উৎসাহ জুগিয়েছেন। চিত্রশিল্পী বাবার রক্তের তাড়না কৃষ্ণার সৃজনশীলতায় বিশেষ তরঙ্গ তুলেছে। কিন্তু শুধু রক্তবীজের খোঁজ নিয়েই একজন শিল্পী সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায় না। তার স্মৃতির মধ্যে একই সঙ্গে কাজ করে চলে অনেক বোধের ধারা। কিন্তু ১৯৭১ কৃষ্ণার মনোলোককে এমন সংবেদী করে দিয়েছে যে, সেখান থেকে বারবার জন্ম নেয় মানবতার পীড়নের অসহনীয় সব চিত্রল মুদ্রা। শিল্পী তার এ সিরিজের কাজের নাম দিয়েছেন ‘দহন’। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার আর্ট ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) ভর্তি হয়ে কৃষ্ণা আশির দশকের শুরুতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। মানুষের মুখ আর প্রকৃতি ছিল তার ছবির বিষয়। প্রকৃতি চিত্রে যে তার বিশেষ মনোনিবেশ রয়েছে, তার পেছনে হয়তো শুধু একাডেমিক অনুশীলন নয়, বাবা অবনী মোহনের রক্তের ইশারা কাজ করেছে। পিতৃদেব থেকে শুরু করে শিক্ষক, সহপাঠী এবং রবীন্দ্রনাথ এঁকেছেন কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়।

গত ১৪-২৮ মার্চ, ২০১৫ সমকালীন আর্ট গ্যালারি শিল্পাঙ্গনে ১৫ দিনব্যাপী চলছে শিল্পী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের ‘যাতনা যাপন’ শীর্ষক প্রদর্শনী প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ ছাড়া সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এনডিসি-সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস, কবি এবং শিল্পী নির্মলেন্দু গুণ এবং ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, আনুষ্ঠানিকভাবে এটাই প্রথম চিত্র প্রদর্শনী শিল্পী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের।

প্রখ্যাত নাট্যাভিনেতা জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় ‘যাতনা যাপন’ প্রদর্শনী নিয়ে বলেন, ‘কৃষ্ণার ড্রয়িং চমৎকার। রঙের ব্যবহারে সে অত্যন্ত সতর্ক- তার রং স্বপ্লিল। ইমপ্রেশনিস্ট ধারার শিল্পী কৃষ্ণার শিল্পী কৃষ্ণার আরেক গুণ সে পোর্ট্রেেট অত্যন্ত পারদর্শী। আমাদের প্রয়াত বাবা ও মায়ের প্রতিকৃতি তুলির কয়েকটি টানে যা এঁকেছে, তাতে আমরা পিতা-মাতার উপস্থিতি অনুভব করি। বিশেষ করে চারকোলের কয়েকটি রেখায় আমাদের বাবার ছবিটি যে মুনশিয়ানায় এঁকেছে, তাতে আমাকে সত্যজিৎ রায়ের বিনোদবিহারীর প্রতিকৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। কৃষ্ণা পেশাজীবনের মাঝে নিভৃতে এঁকে গেছে অনেক ছবি, তার সংখ্যা নেহাত কম না। বেশ কয়েকটি যৌথ প্রদর্শনী হলেও নানা কারণে তাঁর একক প্রদর্শনী আয়োজন করতে দেরি হলো। এ আয়োজনের জন্য শিল্পাঙ্গনকে ধন্যবাদ জানাই। আমার স্থির বিশ্বাস, এই প্রদর্শনীর সাফল্য তাঁকে চিত্রপ্রেমীদের কাছে আরও প্রিয় করে তুলবে। কামনা করি শিল্পী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় সেই সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে আরও বহুদূর এগিয়ে যাক।’

ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী: রজতরেখা নদীর পারের মেয়ে কৃষ্ণার কাজে রেখার বিন্যাস দেখে আমি আনন্দিত ও উৎসাহিত। রমণীকুলের যে যাতনা, বিষণœতা থাকে তা মূর্ত হয়েছে তাঁর কাজে।

ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস প্রদর্শনী নিয়ে বলেন, চিত্রকলার ভাষা সর্বজনীন। চিত্রকলার ভাষা না বুঝলেও আনন্দ নিয়েই এসেছি প্রদর্শনী দেখতে। শিল্প ভুবনের আলোকিত মানুষগুলোকে দেখে ভালো লাগছে। শিল্পী কৃষ্ণাকে আমার সাহসিকা মনে হয়েছে। তাঁর অকৃত্রিম কিছু ভাবনা মূর্ত হয়েছে এই প্রদর্শনীর কাজগুলোতে। তাঁর উৎকর্ষমন্ডিত আপ্লুত।

শিল্পী মনিরুল ইসলামের কাছে কৃষ্ণার ছবিগুলো আটোবায়োগ্রাফি মনে হয়েছে। শিল্পীর জীবনের নানা কাহিনি মূর্তমান হয়েছে তাঁর কাজে।

প্রখ্যাত চিত্র সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ ‘যাতনা যাপন’ প্রদর্শনী নিয়ে বলেন, কৃষ্ণার চেতনা-দর্পণে বিরামহীন প্রতিফলিত হয়ে চলে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধোত্তর কালের অনেক পীড়নের দাগেও আকীর্ণ তাঁর ‘দহন’ সিরিজের ছবি। এ ছবি দেখতে হলে চোখের পাতায় চেপে ধরে চোখের মণিকে তির্যক করে নিতে হয়। তারপর আকারে ছোট ছবিগুলোতে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় যে ওরই মধ্যে বিশাদ বৃত্তান্ত আছে। মানুষের ভয়ার্ত-বেদনার্ত মুখ, ছিন্ন-ভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ এবং এরই মধ্যে শিয়াল-কুকুরের প্রলুব্ধ দৃষ্টিÑ সব মিলিয়ে পীড়নের এক তামসিক আবহ অনূদিত হয়েছে কৃষ্ণার ছবিতে। এই পর্বে শিল্পী সব চেয়ে বেশি এঁকেছেন ধর্ষিতা নারীদের। বিষটা শিল্পী কখনো এঁকেছেন পরিমিত রেখার পরিমার্জনায়। একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন নারী আনত মুখে বসে আছে। তাদের দেহের গঠন প্রকাশ পেয়েছে ড্রয়িংয়ের জোরে। কিন্তু বৃত্তাকারে বসে থাকা সেই নারীদের দিকে তাকালে একমুহূর্তে আমরা চলে যাই মুক্তিযুদ্ধে। আমাদের মনে পড়ে যায় পাক হানাদারদের নৃশংসার ঘটনা। যুদ্ধে এ দেশের অসংখ্য মা-বোনেরা ধর্ষিতা হয়েছিল। এ মর্মন্তুদ ঘটনা আমাদের মনে স্থায়ী চিহ্ন রোপণ করেছে। তাই ওই আনত মুখের নারীদের দেখা মাত্র আমরা বুঝে ফেলি এই সেই ধর্ষক হায়না পাক-সেনাদের আস্তানা। যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় অনুভূতিকে ঢেলে সাজিয়ে মানুষ নতুন চিহ্ন ও সংকেতে কথা বলে। কৃষ্ণার ছবির জমিনে এই নতুন বর্ণমালা রেখার পরিমার্জনায় স্বকীয় বৈশিষ্ট্য উত্তীর্ণ বলে আমার মনে হয়েছে।

নির্মলেন্দু গুণ বলেন, কৃষ্ণার কাজগুলো আমার ভালো লেগেছে। মনে দোলা দিয়েছে। ‘যাতনা যাপন’ শিরোনামটি খুব ভালো লেগেছে। শব্দবন্ধন অত্যন্ত কাব্যিক।

শিল্পীর আয়নায় শিল্পী: শিল্পী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘যাতনা যাপন’ প্রদর্শনী নিয়ে বলেন, ‘শিশুকাল’ থেকে রংতুলির সঙ্গেই আমার বসবাস। বাবা শিল্পী ছিলেন বলে বাড়িতে ছবি নিয়ে কথাবার্তা হতো। তবে সংসারে নিরাসক্ত বোহেমিয়ান বাবা ছবি এঁকেছেন কম, গান গেয়েছেন আর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে পোস্টার-ফেস্টুন আঁকাআঁকিতে দিন কাটিয়েছেন বেশি। সেটা কি আমার একটা উত্তরাধিকার! ছোটবেলার প্রকৃতি আজ প্রেতমানুষের কবলে পড়ে হারিয়েছে তার শিল্পরূপ। প্রকৃতির মতো সমাজও নতুনত্বের আকাক্সক্ষা ও পরিবর্তনের চাকায় পিষ্ট হতে হতে রূপ বদলে নিয়েছে। মনে হয় উর্ণনাভের জালে জড়িয়ে পড়েছে সে। স্বর্গলোকের আশায় নরলোকের কর্মকান্ডসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা আমার চৈতন্য দগ্ধ করে চলেছে। সে দাহনবিষাদে কাগজ-কলম-পেন্সিলে, রংতুলি-ক্যানভাসে আঁকিবুঁকি করে যাই। আমার চেতনায় মানুষ ও বস্তু দুই-ই বৈচিত্র্যমন্ডিত। তাই কোথাও আমার ছবি মার্জিত, নির্লিপ্ত, আবার কোথাও অন্তরের রূপগুলো রেখায় জড়িয়ে কিম্ভুত হয়ে যায়। কখনো তা স্মৃতির যন্ত্রণায় চন্ড সুর হয়ে ওঠে। সে সুরে যুগ যুগ ধরে বহমান নারী ও বঞ্চিতের আর্তি ও নাদ উপলব্ধ হতে পারে। রেখায় রেখায় কত কথা প্রাণিত করে তুলতে চাই, অথচ আমার ছবি হয়ে ওঠে অসংগতিস্পর্শে উজ্জ্বল। কত যে যাতনা এ যাপিত জীবনে, ইচ্ছে করে রঙের পাত্র উল্টে দিয়ে চিত্রায়িত করি সে ক্ষোভ ও যাতনা, আঁকি রঙিন প্রকৃতি ও জীবনের প্রদাহ। তাই প্রায়শই ঝাপসা হয়ে ওঠে রংতুলি-কাগজ-ক্যানভাস। হয়তো জন্মজন্মান্তর ধরে জগতের এই ঐশ্বর্য দেখেই বিমোহিত হয়ে আছি। পৃথিবীতে এসে দেখি কালক্রমে মানুষ ও রাষ্ট্রের গ্রাসে জলাধার শুল্ক-রুক্ষ, নির্মল প্রকৃতি আক্রান্ত, সমাজ বিভ্রান্ত। আমি যেন চলছি ক্রমে দিশা থেকে বিদিশায়, জমাট রুদ্ধ কষ্টগুলো সঙ্গে বয়ে নিয়ে।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »