বাংলাদেশের চিত্রকলার ক্রমবিকাশ

  • মনপুরা স্ক্রল অাঁকায় ব্যস্ত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

sm_sultan_untitled_landscape_1952অঞ্জন আচার্য

এক.

শিল্পের মূলত সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। তবে আমরা কেউ কেউ বহুমাত্রিক মহৎ শিল্পের স্বল্পমাত্রিক গুণগত বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করতে পারি মাত্র। আমার মতে, যেকোনো মহৎ শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে মানুষ অথবা মানবিক বিষয়বস্তু। মানুষের অস্তিত্বহীন শিল্প হয়তো শৈল্পিক হয়ে ওঠে না। তাই এ মানুষকে স্থান-কাল ও আবহমানকালের পরিপ্র্রেক্ষিতে উপলব্ধ করা যায় বলেই বস্তু তখনই শিল্প হয়ে ওঠে। তবে এর জন্য প্রয়োজন প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি। সত্যিকার অর্থে প্রতিবেশের পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অগণন উপাদান, বিস্তৃত উপকরণ এবং অপার সম্ভাবনা থেকেই উঠে আসে শিল্পত বস্তু। শিল্পীকেই সেই দায় স্বপ্রণোদিত হয়ে গ্রহণ করতে হয়। অবশেষে শিল্পীর সৃষ্টিকে তুলে ধরতে হয় দৃশ্যত অবয়বে। এ কৌশল যার যত বেশি আয়ত্তাধীন, সে তত বড় মাপের শিল্পী হয়ে ওঠেন তার নিজস্ব সমাজবলয়ে অথবা বৈশ্বিক পটভূমিতে। এ ক্ষেত্রে একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় অবলম্বন তাঁর জীবনাভিজ্ঞতা। এ কথা অস্বীকার করার জো নেই, বাস্তবতার নিরিখে একজন শিল্পী তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ অবয়বকে মূর্ত করে তোলেন; দৃষ্টিগোচর করে তোলেন বায়বীয় অস্তিত্বকে। সামাজিক মানুষের অনুভবে করে তুলেন স্পষ্টত। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শিল্পের সঙ্গে মানবিক চৈতন্যের গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। শিল্প কোনো দৈবপ্রাপ্ত বস্তু নয়; বরং তা ক্রমাগত অর্জন করতে হয় ঐকান্তিক নিষ্ঠা ও নিরলস সাধনার মধ্য দিয়ে। তবে এ কথাও অসত্য নয় যে, পারিপার্শ্বিক কোনো কোনো ঘটনা শিল্প-সাধনাকে হঠাৎই বেগবান করে তোলে। শিল্পীর দায়বদ্ধতাকে উসকে দেয় শৈল্পিক সৃষ্টির উন্মাদনায়। যেমন আমাদের মহানতম মুক্তিযুদ্ধ তেমনই একটি মহৎতম ঘটনা। ইতিহাস সাক্ষী, এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পের প্রায়োগিক দিকগুলো আমূল পাল্টে যায় মুক্তির আন্দোলনে। শৈল্পিক চেতনাপ্রসূত ভাবনা দীপ্ত হয়ে ওঠে নতুনত্বের আকাঙ্ক্ষায়।

আসা যাক চিত্রকলা প্রসঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের একটি কথা দিয়ে বিষয়টি ত্বরান্বিত করা যাক। শিল্প প্রসঙ্গে তাঁর অভিব্যক্তি হলো- ‘চিত্রশিল্প দুই প্রকারের আছে। এক- অনুভাবপূর্ণ মুখশ্রী ও প্রকৃতির অনুকৃতি, দ্বিতীয়- যথাযথ রেখা-বিন্যাসের দ্বারা একটা নেত্ররঞ্জক আকৃতি নির্মাণ করা। কেহই অস্বীকার করিবেন না যে, প্রথমটি উচ্চতম শ্রেণীর চিত্রবিদ্যা। আমাদের দেশে শালের উপরে, নানাবিধ কাপড়ের পাড়ে, রেখাবিন্যাস ও বর্ণবিন্যাস দ্বারা বিবিধ নয়নরঞ্জক আকৃতিসকল চিত্রিত হয়, কিন্তু শুদ্ধ তাহাতেই আমরা ইটালীয়দের ন্যায় চিত্র-শিল্পী বলিয়া বিখ্যাত হইব না।’

 

দুই.

শিল্পমাধ্যমের এক নীরব অথচ সুতীব্র মাধ্যম হচ্ছে এ চিত্রকলা। আপাত দৃষ্টিতে চিত্রকলা মূক হলেও তার সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রায়োগিক ভাষা। এর নেই কোনো স্থানিক ভাষিক-ভঙ্গি। ব্যাখ্যান এর সর্বজনীন। যার ফলে একজন বাঙালি চিত্রশিল্পীর চিত্রকর্মও উপলব্ধি করতে পারেন বাংলা-সংস্কৃতির সংস্পর্শে না-থাকা যেকোনো মানুষ। অথবা একজন ইউরোপিয়ান শিল্পীর চিত্রকর্ম দেখে অনায়াসেই বোধগম্য করতে পারেন বাঙালি চিত্রদর্শকরা। আর এর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, এ শিল্পের নেই কোনো সীমান্তরেখা।

এবার না হয় আলোচিত হতে পারে আবহমান বাংলার চিত্রশিল্পের আদিকথা প্রসঙ্গে। বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস সুপ্রাচীন। যথাযথ উপাত্ত সংরক্ষণের অভাবে প্রাচীন বাংলার শিল্পকলার ইতিহাসের সঠিক তথ্য যথার্থ উদ্ধার যায় না। তবে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস পাওয়া যায়। প্রাচীন শহর উত্তরবঙ্গের পুন্ড্রবর্ধনে চিত্রিত একটি চিত্রকর্মই সে সময়ের চিত্রকলার এক অন্যতম নিদর্শন। এ চিত্রকর্মটির তথ্য পাওয়া যায় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ দিব্যাবদান-এর ‘বীতাশোকাবদান’খন্ডের একটি কাহিনি থেকে। এ চিত্রকর্মে পরিলক্ষিত হয়, গৌতম বুদ্ধ নিগ্রন্থকে (গোসাল) শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। তা ছাড়া ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সম্রাট অশোকের শাসনকালেও বাংলায় চিত্রকলার প্রচলন ছিল। যত দূর অনুমান করা হয়, বাংলার চিত্রকলার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে পালযুগে। তৎকালে রাজ-পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পকলার বিস্তৃতি লাভ করে। অপর এক তথ্যমতে, বাংলাদেশের চিত্রকলার সূত্র-সন্ধান পাওয়া যায় ৭২৩ খ্রিস্টাব্দে পর্যটক হিউ-এন-সাংয়ের রচিত বই থেকে। এ ছাড়া দশম শতকের দিকেও চিত্রকলার অস্তিত্ব ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় সে সময় ক্যানভাস ও দেয়ালচিত্রের প্রচলন ছিল। যদিও ক্যানভাস ও দেয়ালচিত্রের ঐতিহ্যগত রীতির প্রচলন সম্পর্কে তেমন কোনো প্রামাণ্য দলিল নেই। তবে অষ্টম শতক থেকে বারো শতকের পাল রাজাদের শাসন আমলের বেশ কিছু চিত্রকলার নিদর্শন পাওয়া যায়, যা ব্যাখ্যামূলক চিত্র বা নকশা হিসেবে আখ্যায়িত হয়। এ সকল চিত্রকর্ম বাঙালি শিল্পীদের নয় বলেও ধারণা করা হয়। কিছু কৌশলগত তফাত ছাড়া বাংলার চিত্রকলার সঙ্গে নেপাল বা বিহারের চিত্রকলার তেমন কোনো পার্থক্য নেই বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে বাংলা, বিহার বা নেপালের চিত্রকলার শৈলী নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিষয়বস্তুর পাঠক্রম অন্তর্ভুক্ত করেছে প্রজ্ঞাপারমিতাকে। আর তা হলো, মহীপালদের পঞ্চম ও ষষ্ঠ বর্ষ (১০৭১ খ্রিস্টাব্দ) থেকে রায় পালের ঊনচল্লিশতম বর্ষ ও হরিভার্মার শাসনকাল। ধারণা করা হয়, ১০১৫ শতকে পাল শাসনামলে গোপালদেব তৃতীয়-এর চতুর্দশ বছরের এবং গোবিন্দ-পালের চতুর্থ বছরের কোনো এক সময়ে উদ্ধারকৃত কাঠের তৈরি শিবলিঙ্গ অঙ্কিত এবং লিখিত হয়েছে। অপর একটি শিবলিঙ্গ আঁকা ও লেখা হয়েছে কাগজে। এ ছাড়া আরও কিছু নিদর্শন পাওয়া যায় ধাতু নির্মিত বস্তুতে, যার অধিকাংশই বৌদ্ধ দেব-দেবীর প্রতিমূর্তি। এসকল চিত্র ছিল লেখাসংবলিত। প্রথাগত অঙ্কন পদ্ধতি অনুসরণ করে এগুলো চিত্রিত হয়নি। মূলত দেয়ালচিত্রের রীতি অনুসৃত হয়েছে এ সকল চিত্রকর্মে।

শিল্পকলার ইতিহাস প্রসঙ্গে চিত্রসমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ তাঁর ‘বাংলাদেশের চিত্রশিল্প’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন- ‘‘…মাটির দেয়ালের চালচিত্র অথবা সরাচিত্র বা পটচিত্রের দিকে তাকিয়ে এখন এশিয়ার এই ব-দ্বীপের মানুষের নন্দনতত্ত্বের ঠিকুজি খোঁজার তাগিদ নতুনভাবে অনুভূত হচ্ছে। নদী অববাহিকায় মৃৎপাত্রে যে চিত্র মানুষ এঁকেছিল অজানা অতীতে অথবা পাহাড়ি ভূমির আদিবাসীরা যে নকশা কেটেছিল তার শিকারের হাতিয়ারে, সেই প্রাগৈতিহাসিক নন্দনভাবনার সঙ্গে এখনকার মানুষের সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে ক্ষীণ, কিন্তু যখন ভাবি একটা নকশাই একটি ভূ-খন্ডের জনগোষ্ঠীর ভাবনার বিমূর্ত প্রতীক আর এ প্রতীক যদি পৃথিবীর অপরাপর প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি তখন সহজেই তার স্বাতন্ত্র্য চোখে পড়ে। কেন তা একান্তভাবে এ ভূখন্ডের, এশীয়, বাংলার ব-দ্বীপীয়; কেন তা আফ্রিকার বা লাতিন আমেরিকার নয়, নয় তা অস্ট্রেলীয় আদিবাসীদের চারুভাবনার অনুসারী, তার গ্রন্থিমোচনের মধ্য দিয়ে আজকের বাঙালির স্বভাব বিশ্লেষিত হতে পারে। আবার শিল্প যখন আধুনিকতার সহজ পথ পাড়ি দিয়ে এখন বিচিত্রভাবে ঋদ্ধ আর ভূমন্ডলায়ন, গ্লোবাল ভিলেজ- এসব শতাব্দী শুরুর ডাকে পৃথিবীর দেশীয় ও এমনকি মহাদেশীয় সীমা যখন উঠে যাচ্ছে তখনও কি আমরা ঠিক ঠিক চিনে নিচ্ছি না শিল্পের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য।’’

প্রাসঙ্গিকক্রমে চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলামের একটি কথা মনে পড়ে গেল। তিনি তাঁর এক লেখায় (উত্তরাধিকার : শিল্পকলার শিকড়-অন্বেষণে আরেক পরিপ্রেক্ষিত) খানিকটা চাপা খেদের সাথেই উল্লেখ করেছিলেন- ‘‘শিল্পকলার শিকড়ের সন্ধান আলোচনায় প্রায় সবাই জাতীয় ইতিহাস থেকে শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্য খোঁজে অথবা সমাজবিজ্ঞানের আলোকে আচার-অনুষ্ঠান, ধর্ম, বিশ্বাস, রাজনীতি ও অর্থনীতির বিচিত্র গতিধারার বিশ্লেষণ করে। এ সমস্তই শিল্পকলা সৃষ্টির বহিরাঙ্গ বা বাহ্যিক দিক, অনেক পরের ঘটনা, শিকড় নয়। তার পূর্বের খোঁজ কেউই করেন না। সত্যিকার অর্থে মানুষের শিল্পকলা বিকাশের শিকড় পাঁচ শত, পাঁচ হাজার, পাঁচ লাখ বছরের পুরনো। শিকড়ের সন্ধান করতে হলে আমাদের যেতে হবে আরো গভীর উৎসমূলে, মানুষের বিবর্তনের পথ ধরে।”

 

তিন.

প্রাচীন ইতিহাসের কথা ব্যতিরেকে আসা যাক অধুনাকালের বাংলাদেশে। ১৯৪৭ সালের পূর্বকালে এ অঞ্চলের চিত্রকলার চার পুরোধা চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান, এস এম সুলতান (শেখ মুহম্মদ সুলতান) মূলত যশস্বী হয়েছিলেন কলকাতাকেন্দ্রিক শিল্পচর্চায়। অতঃপর পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন ঢাকা আর্ট স্কুলের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীরা এ দেশে চারুশিল্পের নতুন দিক উন্মোচন করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে আসে নতুন অভিঘাত। প্রতিকূল অবস্থা শিল্পী-চেতনায় সময়, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা তৈরি করে। তৎকালীন ঢাকার গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস-এর অগ্রগণ্য শিক্ষকেরা স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা প্রত্যক্ষ করে এক কাতারে আসেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুশাসনের মধ্যে অবস্থান করে যেহেতু স্বাধীন চিন্তার বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায় না, তাই চল্লিশের দশকের শেষে গড়ে ওঠে ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’।

মঈনুদ্দিন খালেদের প্রাগুক্ত বইটিতে তিনি এক জায়গায় বলেছেন- ‘সাধারণ মানুষের মননে শিল্পবোধের জাগরণ গভীরতর ও স্পষ্ট করা এবং চিত্রশিল্পের প্রতি যে-সমাজ এতকাল সংস্কারের বিষবৃক্ষ বাঁচিয়ে রেখেছে, তার শেকড় উপড়ে ফেলাই ছিল এ গ্রুপের (ঢাকা আর্ট গ্রুপ) লক্ষ্য। জয়নুল আবেদিনের শিল্পদীক্ষা এবং ভাষা-আন্দোলনের শিল্পিত হাতিয়ার হতে গিয়ে তাই পঞ্চাশ দশকের শুরুতে চিত্রশিল্প বাস্তববাদে অভিষিক্ত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামাজিক সংস্কার, রাষ্ট্রিক কালাকানুন এবং সর্বোপরি অসুস্থ রাজনীতির বিরুদ্ধে শিল্পীরা ব্যক্ত করেছেন অঙ্গীকারবদ্ধ দ্রোহ। আর ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের দেশের শিল্পীরা বরাবরই তারা বাস্তববাদে প্রাণিত থাকতে চেয়েছেন। …কিন্তু একাত্তর পরবর্তীকালের শিল্পীদের যূথচারী হওয়ার পেছনে মতাদর্শগত মিলটাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত না থেকে আমরা আমাদের মতো ছবি আঁকবো- এই তাগিদটা অনেক দীপ্ত হয়ে উঠেছে যুদ্ধোত্তরকালের চিত্রপটে। ফলে বাংলাদেশের অবয়বনির্ভর ও নির্বস্তুক চিত্র, দুটিই আর বিচিত্রগামী হয়ে উঠেছে। আশা-নিরাশা, ঘটনা-দুর্ঘটনার মালায় গাঁথা পুরো সত্তর দশকজুড়ে আবির্ভূত হয়েছে অনেকগুলো শিল্পীসঙ্ঘ। এই শিল্পীসঙ্ঘের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘স্কেচগ্রুপ, ‘সেঁজুতি’, ‘ফাইভ ফিংগারস, ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ, ‘আর্ট গ্রুপ, ‘ঢাকা আর্ট সার্কেল, এবং ‘সময়’।”

 

চার.

তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের চারুশিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউট, যার বর্তমান নাম চারুকলা ইনস্টিটিউট। আধুনিক চিত্রকলা পাঠের প্রথম প্রতিষ্ঠান এটি। কেবল ঢাকাই নয়, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে ইউরোপ, আমেরিকাসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এ প্রতিষ্ঠানে পাঠ নিতে এসেছেন। ১৯৪৮ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষালয়টি আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসের একটি অন্যতম অঙ্গ। জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশের চিত্রকলার পথিকৃৎ শিল্পী। শিল্পাচার্য তাঁর প্রতিষ্ঠানে বপন করেছেন শিল্পকলার বীজ। এ প্রতিষ্ঠান জন্ম দিয়েছে কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমেদ, আনোয়ারুল হক, খাজা শফিউদ্দিন, আমিনুল ইসলাম, বিজন চৌধুরী, মনিরুল ইসলাম, কাইয়ুম চৌধুরী, কামাল মাহমুদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মুর্তজা বশীর, আবদুল বাসেত, রফিকুন নবী প্রমুখ শিল্পীর।

অন্যদিকে স্কেচ গ্রুপের সদস্যরা হলেন কাইয়ুম চৌধুরী, আবদুল বাসেত, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, রফিকুন নবী, হাশেম খান প্রমুখ। এ সঙ্ঘের শিল্পীরা মূলত চেয়েছেন ইতিবাচকতায় শিল্পের বিকাশ ঘটাতে। এদিকে কোনো সঙ্ঘের সদস্য না হয়েও স্বমহিমায় উজ্জ্বল শিল্পী মনিরুল ইসলামের অবদান বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। তিনি নিসর্গ বিশ্লেষণে ও মানুষের প্রতিক্রিয়া ফুটিয়ে তোলার প্রয়াসে সৃষ্টি করেছেন নতুন শিল্পভাষা। অপরদিকে শহীদ কবীরের কাজে উপস্থাপিত হয়েছে অবয়বধর্মী ছবির নতুন ভাবনা। তিনি চেয়েছিলেন লালনের মর্মবাণী শোনাতে। সেই সঙ্গে দারিদ্র্যপীড়িত ক্ষুধার্ত মানুষের ছবি এঁকেছেন ক্যানভাসে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির যে জোরালো শক্তির উন্মেষ ঘটে, সেখানে গেরিলা যোদ্ধা চিত্রায়ণে শিল্পী শাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের অবয়বধর্মী রূপককে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিস্তৃত করেছেন। তাঁর চিত্রকর্মে এমন একটি শিল্পভাষা প্রকাশ পেয়েছে যাকে চিত্রকলার অভূতপূর্ব নিরীক্ষা বলে আখ্যায়িত করা যায়। তাঁর ছবিতে মানবিক অবয়ব দ্রুতিমান থাকে ধূমকেতুর মতো। এ ছাড়া স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের চিত্রকলায় নতুন দিক উন্মোচন করেন চট্টগ্রামের চিত্রশিল্পীরা। এর মধ্যে রশিদ চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি লোকশিল্পের পুনর্বিন্যাসে প্রকৃতির রং ও রূপ নবরূপে সকলের কাছে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাঁরই অনুপ্রেরণায় দীক্ষিত হয়ে পরবর্তী সময়ে হাসি চক্রবর্তী, চন্দ্রশেখর দে, মনসুর-উল-করিম প্রমুখ শিল্পী নিসর্গের রহস্যালোকের অনুসন্ধান করেছেন। এরই অনুগামী শিল্পীরা হলেন কে এম কাইয়ুম, এ কে এম আলমগীর, বনিজুল হক প্রমুখ। তাঁরা আত্মমহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছেন নিসর্গের আশ্রয়ে। অপরদিকে কালিদাস কর্মকার চান সমকালের সঙ্গে তান্ত্রিকতার সম্মিলনে পরমাত্মার শুদ্ধতম সত্তার অনুভব করতে। ঢাকা পেইন্টার্স গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে কাজী রফিব, দীপা হক, উত্তম দে ও তরুণ ঘোষ কাজ করছেন বিমূর্তায় বা লোকপুরাণের বিনির্মাণে নিজের চেতনাকে মূর্ত করতে। সমকালের মধ্যে মোহাম্মদ ইউনুস, জি এস কবীর, রণজিৎ দাস প্রমুখ শিল্পী উল্লেখযোগ্য কাজ করে যাচ্ছেন। আর ‘সময়গ্রুপের শিল্পীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- ঢালী আল মামুন, নিসার হোসেন, দিলারা বেগম জলি, ওয়াকিলুর রহমান, শিশির ভট্টাচার্য্য, সাইদুল হক জুইস প্রমুখ। দুঃসময়ের অনিরুদ্ধ হতে একতানে মিলিত হয়েছিলেন এ শিল্পীরা। বর্তমান সময়ে রোকেয়া সুলতানা কাজ করছেন ফ্যান্টাসি অবলম্বনে। জামাল আহমেদ অ্যাক্রিলিকের মাধ্যমে তুলে ধরছেন নিসর্গের অনাবিল সৌন্দর্য। লোকশিল্পের আধুনিকতার মাত্রা সংযোজন করে সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন আবদুস শাকুর। রেখাচিত্রের শিল্পিত ছাপ ফেলে যাচ্ছেন মাহমুদুল হক। মমিনুল রেজা, ফরিদা জামান প্রমুখের ছবি নান্দনিকতার মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। আবদুস সাত্তার রচনা করছেন প্রতীকী ব্যঞ্জনায় চিত্রিত কারুকাজ। তা ছাড়া আবুল বারক আলভী, শেখ আফজাল, গৌতম চক্রবর্তী, ইকবাল প্রমুখ শিল্পী তাঁদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রদর্শনে প্রতিনিয়ত সচেষ্ট রয়েছে শিল্পাঙ্গনে।

 

পাঁচ.

একজন চিত্রশিল্পী কি কেবলই রং-তুলি নিয়ে ক্যানভাসের পর ক্যানভাস ছবি এঁকে যান? নাকি আর দশজন সচেতন নাগরিকের মতো তাঁরও আছে সমাজে প্রতি, দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা? শিল্পী মাত্রই সংবেদনশীল। তাই সমাজের যা কিছু অমঙ্গল, যা কিছু অশুভ, যা কিছু অন্যায়, তার সবকিছু তাঁদের চেতনায় সুতীব্রভাবে প্রভাব ফেলে। সেই কারণেই হয়তো আমরা দেখতে পাই ১৯৭১ সালে নিরীহ বাঙালিদের ওপর স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শাসকের লেলিয়ে দেওয়া হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার প্রতিবাদে জয়নুল আবেদিনকে পাকিস্তানি শাসকদের দেওয়া ‘হেলালে ইমতিয়াজ’ উপাধি প্রত্যাখ্যান করতে অথবা ১৯৬৯ সালে রংতুলি ফেলে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে ফিলিস্তিনে রণাঙ্গনে অংশ নিতে। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের রেখাচিত্র বা ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর মনপুরা দ্বীপে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় অবলম্বনে চিত্রিত ‘মনপুরা-৭০’বিবেকবান মানুষকে নাড়া দেয়। ইতিহাস সাক্ষী, মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের রক্তপায়ী ও হিংসার মুখমন্ডল সংবলিত পোস্টার ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ চিত্রণ করে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের আন্দোলনে উজ্জীবিত করেছিলেন আবু শরাফ মোহাম্মদ কামরুল হাসান, সকলে কাছে যিনি পটুয়া ‘কামরুল হাসান’ নামে পরিচিত। ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ সালে তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকের (হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ) বিরুদ্ধে তাঁকেই দেখি ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’ স্কেচ করতে। এস এম সুলতানের ‘হত্যাযজ্ঞ’চিত্রকর্মটি মুহূর্তে স্তম্ভিত করে আজও বাঙালির হৃদয়।

খালেদের কয়েকটি কথা এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে- “একটি মানুষ যখন একটি রেখা টানে তুলি বা কাঠির মাথায় রং লাগিয়ে অথবা পুঁইগোটা বা অন্য কোনো বর্ণ উপাদান আঙুলের ডগায় লাগিয়ে মাটিতে বা দেয়ালে টানে রেখা তখনই তাতে বিদ্যুতের মতো প্রবাহিত হয়ে যায় তার চেতনা। মানে সেই মানুষের মন। মনন ভাবনা। নন্দনতত্ত্ব। সেই নন্দনতত্ত্ব একটি মানুষের নয় আর। একটি জাতির। একটি বিশাল ভূখন্ডের জল হাওয়ায় লালন-পালনে সমৃদ্ধ সেই মন। এ মন কথা বললে আমরা বুঝতে পারি কার সঙ্গে সম্পর্ক সিন্ধু সভ্যতার, কে কথা বলছে দূর ক্রিটের সভ্যতার সঙ্গে। কার দেশ বঙ্গোপসাগরের জল ধুয়ে দেয় আর কাকে স্নিগ্ধ করেছে ভূমধ্যসাগরের জল।”

চিত্রশিল্প নিয়ে কথাশিল্পী সুবোধ ঘোষের একটি কথা দিয়ে লেখাটির যবনিকাপাত করা যাকÑ ‘‘ছবিতে রূপ ফুটিয়ে তোলাই শিল্পীর তুলির আসল কাজ নয়, সার্থক কাজও নয়। আসল কাজ হলো, রূপের আবেগ ফুটিয়ে তোলা।” আর সেই আবেগই হয়তো আবহমান কাল ধরে ফুটিয়ে তুলেছেন কিংবা তুলছেন সার্থক শিল্পীরা।

লেখক: কবি ও গবেষক

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »