শিল্পী ফ্লোরা আফরোজ ঝিলমিলের শিল্পভাষ্য

ছবি এঁকে আনন্দ লাভের চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর নাই

 

jhilmil2

আমার জীবনে পাওয়া প্রথম পুরস্কার ছিল এক বাক্স রঙ! ভীষণ ছোট ছিলাম আমি। তখনো পর্যন্ত স্কুলে যেতে শুরু করিনি। বাবার অফিসের কোন এক অনুষ্ঠানে কি একটা খেলায় অংশ গ্রহণ করে, কিভাবে যেন প্রথম হয়ে গেলাম! প্রথম হবার আনন্দ  তো আর বুঝি না তখনো। বাক্সভর্তি এত এত রঙ, কত উজ্জ্বল, কত সুন্দর। অথচ সেগুলো দিয়ে কি করব আমি জানিনা। প্রতিদিন বাক্স খুলে আমি রঙগুলোতে হাত বুলিয়ে রেখে দিতাম। মা দেখে হাসতেন; বাবাকে গল্প বলতেন ।

বাবা একদিন আঁকার খাতা–পেন্সিল কিনে এনে বলল, এই কাগজে আঁকতে হয়। বাবা এঁকে দেখালেন। আমার এখনো মনে পরে- একটা গাছ , একটা পতাকা, আর একটা বল! মজার ব্যাপার হল- তিনটি সাবজেক্ট-ই ছিল বাঁকা। আমার বাবা ছবি আঁকতে পারেন না; তবু বাবার কাছেই আমার ছবি আঁকার হাতেখড়ি। সেদিনের পর থেকে আমি ছবি আঁকি। এঁকে বাবাকে দেখাই। কখনো কখনো বাবা আর আমি একসঙ্গেই আঁকি। ছবি আঁকতে আঁকতে বাবার মুখে শুনেছি এস এম সুলতানের নাম, শুনেছি জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের ছবির কথা।

স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরোবার পর জীবনের লক্ষ নিয়ে ভাবার সময় যখন এলো, তখন স্রেফ বিপদে পরে গেলাম । কিছুতে মন স্থির করতে পারলাম না। আনন্দ খুঁজে পেলাম না কিছুতেই। মনে হল দীর্ঘ দিন আমি যে বিষয় নিয়ে পড়বো, নিজেকে যে বিষয়ে দক্ষ করে তুলবো নিজেকে- সে বিষয়ে  আমার আগ্রহ থাকতে হবে। সে বিষয়ে আনন্দ পেতে হবে। ভেবে দেখলাম, ছবি আঁকার মত আনন্দ আমি আর অন্য কিছুতে পাই না। স্থির করলাম, আমি এ  বিষয়ে পড়াশুনা করতে চাই। কাছ থেকে জানতে চাই, হাতে কলমে শিখতে চাই।

শিল্পীরা সারা জীবন ধরে ছবি আঁকেন, কি তাঁদের প্রেরণা, কি তাঁদের প্রাপ্তি। কেমন হয় একজন চিত্র শিল্পীর জীবন! এসব নিয়ে অনেক প্রশ্ন, অনেক কৌতূহল সেই ছোট বেলা থেকে। এখন আমি অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়ছি University Of Development Alternative-এর চারুকলা অনুষদে ।  জলরং মাধ্যমটি আমার খুব প্রিয়। তবে বেশি উপভোগ করি oil sketch . প্রকৃতির ছবি আঁকতে বেশি পছন্দ করি। আউটডোরে ছবি আঁকতে ভাল লাগে বেশ। সবচেয়ে অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয় ল্যান্ডে বসে ল্যান্ডস্ক্যাপ করার সময়। রোদ–বৃষ্টি-তাপে মানিয়ে নিতে হয়। কখনো এমন হয়েছে যে, বসে কাজ করার মত জায়গা মিলছে না, অথচ দারুণ সুন্দর একটি সাবজেক্ট! আসে-পাশে ময়লা– দুর্গন্ধ, এক কথায় প্রতিকূল পরিবেশ তবু কিছু একটা ব্যবস্থা করে নিতে হয় । আসলে, একটা ছবি এঁকে শেষ করার পর মনের মধ্যে যে আনন্দটা হয়, তাই বড় প্রাপ্তি। ছবি এঁকে আনন্দ লাভের চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর নাই।

আমাদের দেশের ফোক ফর্মগুলো আমাকে খুব টানে। স্রদ্ধেয় চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর লোকশিল্প ভিত্তিক যে অসাধারণ সৃষ্টি রয়েছে সেগুলো বার বার আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাঁর পুতুল, পাখা, হাঁড়ি, শীতলপাটি, কাঁথা– এসব লোকজ মোটিফের ব্যবহার আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। শখের হাড়ি ও সরা চিত্রে কাজ করতে ভাললাগে, খুব সহজে অল্প কাজে নানা রঙ ও আলপনাতে এ দেশের ফোক ফর্মগুলো সরা ও সখের হাড়িতে ফুটিয়ে তোলা যায়। ফর্মগুলো যখন পটে ফুটে ওঠে তখন এক অনাবিল প্রশান্তি অনুভব করি। এই প্রশান্তি-আনন্দে অনুপ্রাণিত হই। ছবি আঁকি, এঁকে যাই।

 

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »