স্বরূপ অরূপে গোঁসাইয়ের ‘মেটা লু’

Print।মুজিবুল হক। একটি মানব ফিগার আরেক মানবী ফিগারকে জড়িয়ে ধরেছে। যেন সেই আদীকাল থেকে নিরবচ্ছিন্ন সাদা ভূমির উপরে দাঁড়িয়ে আছে একে অপরকে জড়িয়ে। এমন চিত্রই উঠে আসছে লোহার পাত্রে তৈরি করা ভাস্কর্যটি থেকে। ‘আদম পরিবার’ শিরোনামের ভাস্কর্যের এই রূপকে এভাবেই তুলে ধরেছেন ভাস্কর গোঁসাই পাহ্লভী। মৃন্ময় আর্ট গ্যালারিতে গত ২১ এপ্রিল শেষ হলো তাঁর চার দিনব্যাপী একক ভাস্কর্যের প্রদর্শনী। মেটা লু শিরোনামে এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল বৃদ্ধ জাহাজের দেহাবশেষ থেকে খসে পড়া লোহার ধাতব অংশকে মিলন ঘটিয়ে নতুন রূপে ভাস্কর্য হিসাবে উপস্থাপন করা ১৭টি শিল্পকর্ম।

গোঁসাই পাহ্লভীর প্রথম একক প্রদর্শনী এটি। তাঁর দর্শনগত দিক ও নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দর্শন ও প্রকৃতিকে নিজস্ব ভাবনায় রূপায়ন করেছেন তাঁর মেটা লু শিরোনামে ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে। মেটা লু দ্য গ্রান্ড অর্থোডক্স অব ওট সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মেটা শব্দটা দিয়ে অধি বুঝায়। যাকে বিয়ন্ড দ্য মেটার হিসাবে আমরা জানি। কিন্তু এখানকার দর্শন সে রকম মনে করে না। মেটাফিজিক্যাল আর্ট নামে ইউরোপে একটি শিল্প আন্দোলন হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে সব শিল্পই অধিবিদ্যার আওতাভুক্ত। কিন্তু সেই অধিকে মেটারের মধ্যে কনফার্ম করতে হয়। মেটাল হচ্ছে সেই আদী উপাদান। যা আমার ভাস্কর্য সৃষ্টির মাধ্যম করেছি। এবং লু শব্দের অর্থ হচ্ছে গ্রীষ্মের হাওয়া।’ দ্য গ্রান্ড অর্থোডক্স অব ওট আর্ট নিয়ে তিনি বললেন, ‘ইংরেজি ওট শব্দের অর্থ হচ্ছে উচ্ছিষ্ট। এই প্রদর্শনীতে নানা উচ্ছিষ্ট বস্তুগুলোর সমন্বয়ে যে শিল্প সৃষ্টি হয়েছে তাই ওট আর্ট।’

চট্টগ্রামের উপকূলে জাহাজ ভাঙ্গার দেহাংশ নিয়ে ভাস্কর্য সৃষ্টি সাহসী পদক্ষেপ বলতে হয়। কতটা নান্দনিক ফর্মে করা ভাস্কর্য হলো বা উত্তরে গেল কিনা তার চেয়ে বড় কথা তিনি দর্শকদের ভাবতে পেরেছেন। বিভিন্ন খন্ড-বিখন্ড ধাতবকে, অঙ্গ-প্রতঙ্গের রূপ দিয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পেরেছেন দর্শকদের হৃদয়ে। এমনি অস্থির সময়ে স্থিরতার ভাস্কর্য গড়েছেন তিনি। পেইন্টিং আমাদের দ্বিমাত্রিক অনুভূতি দেয় আর ভাস্কর্য অনুভূতি দেয় ত্রি-মাত্রিকতার। তাঁর ভাস্কর্য ত্রি-মাত্রিকতার বাহিরেও সহজ-প্রাণবন্ত আবেগের সাংগীতিক মূর্ছনা দর্শককে আলোড়িত ও স্পন্দিত করেছে। তাঁর ধাতব ফর্মগুলো দেখে নতুন অভিজ্ঞতার কাছে পৌঁছানো যায়। এমন নিরিক্ষা নানা কাজে ছড়িয়ে আছে। শিল্পীর ‘পৌরণিক পাখি’ শিরোনামে ভাস্কর্যটিতে একটি পাখিকে ধ্যানরত সময়ের প্রতীক হিসাবে উপস্থাপন করেছে তিনি। লোহার পাতে তৈরি ভাস্কর্যে পাখির শরীরে হলুদ রঙ, ঠোঁটে লাল ও বেইজে সবুজ রঙের ব্যবহার করেছেন। ব্যতিক্রমধর্মী ও সুচিন্তিত তাৎক্ষণিক রূপ অবলোকনে তাঁর সৃজনশীল দক্ষতা দর্শকদের নজর কাড়ছে। তিনি নিজ বিবেচনায় যা কিছু ভালো বোঝেন, তা প্রতিষ্ঠা করেছেন এই কাজে। তাঁর ভাস্কর্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিরীক্ষাধর্মী ফর্ম ও সংবেদনশীল রঙের ব্যবহার করে সুষমাময় জ্যামিতিক কাঠামোর নির্মাণ। কখনো দুটি লোহার পাত কখনো চারটি পাত জোড়া দিয়ে সেখানে চাহিদা অনুযায়ী স্প্রে রং ছিটিয়ে মেটালকে লোকদর্শন যেমন টেপাপুতুল, ধ্যানরত যোগী, ঘাস ফড়িং, পরিবার, মেডিটেশন ফর্মে রূপ দিয়ে তিনি অগ্রসর হয়েছেন। ব্যতিক্রমধর্মী উপস্থাপন হলে একটা খটকা যেন রয়েই গেল গ্যালারি ডিসপ্লে নিয়ে। গ্যালারি ব্যবহারে শিল্পী কি একটু মনোযোগ দিতে পারতেন? ফ্লোর প্ল্যান, স্পেস ও আলো ব্যবহারে বাস্তবিক প্রয়োজন হয়তো ছিল। তবে অসুবিধা দূরে সরিয়েই দেয়ালের, ফ্লোর ও বেইজের সাদাটে রঙের সঙ্গে ভাস্কর্য সমূহের ব্যাপক শূন্য পরিসর সমতার চমৎকার এক ঐক্যতান তৈরি করেছে। সাদামাটা উপস্থাপনায় দর্শক যেন অনুভব করেছে তাঁর শিল্প রচনার প্রক্রিয়ার পুরো বিষয়। গঠন প্রক্রিয়া একই ধরনের হলেও ফর্ম ব্যবস্থাপনায় বহুমাত্রিকতার ভিন্নতা এই কাজগুলো প্রদর্শনীকে করেছে বর্ণিল। নিরীক্ষার নানা পর্যায় পার করে নিজের অনুভবকে তুলে ধরেছেন শিল্পী। গভীর অভিনিবেশে প্রদর্শনীটি আরোপিত মনে হয় না।

গত ১৭ এপ্রিল শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা ইনস্টিটিউটের ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক শিল্পী অলক রায়, অতিথি ছিলেন বিস্তার আর্ট কমপ্লেক্সের পরিচালক আলম খোরশেদ, শিল্পী নিলুফার চামান, মৃন্ময় আর্ট গ্যালারির কিউরেটর সামিনা এম করিম।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »