এথেনা গ্যালারিতে ঢাকা আর্ট সার্কেলের চিত্র প্রদর্শনী

শিল্পীর ক্যানভাসে বাংলাদেশ

sweet_test_liberty

।সুমিমা ইয়াসমিন। দেয়ালে ঝোলানো চিত্রকর্মগুলো যেন এক মনে কথা বলে যায়। প্রেম ও প্রকৃতির কথা। দেশ ও মানুষের কথা। মুক্তিযুদ্ধের কথা। স্বাধীনতার কথা। নানা অনুষঙ্গে, নানা ভাবের উদ্ভাসে, নানা রঙে বাংলাদেশের খণ্ড খণ্ড চিত্ররূপ ভাষা পায় শিল্পীর তুলিতে, কাগজে ও ক্যানভাসে।

‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে’

গুনগুনিয়ে মনের ভেতর সুর জাগানো এইসব অপরূপ রূপের সন্ধান পেলাম এথেনা গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে আয়োজিত চিত্র প্রদর্শনীতে। ঢাকা আর্ট সার্কেলের ১২ স্বনামধন্য শিল্পীর চিত্রকর্ম নিয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনীর শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য সুইট টেস্ট অব লিবার্টি’। প্রত্যেক শিল্পীর চারটি করে অন্যতম সেরা চিত্রকর্ম নিয়ে এই প্রদর্শনী।

এই শিল্পীরা হলেন আবু তাহের, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, মোহাম্মদ মহসিন, সৈয়দ এনায়েত হোসেন, আনোয়ারুল হক, রেজাউল করিম, বীরেন সোম, ইএইচএম মতলুব আলী, স্বপন চৌধুরী, আবদুস শাকুর শাহ, চন্দ্রশেখর দে ও রফি হক। প্রদর্শনীর বেশিরভাগ ছবিরই উপজীব্য মহান মুক্তিযুদ্ধ ও গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবন।

বিমূর্ত ও অর্ধবিমূর্ত ছবিতে জীবন ও বোধের নানা ভাষা ফুটিয়ে তোলেন শিল্পী আবু তাহের। তাঁর ‘দ্য ডার্ক ফর্মস’, ‘মাই কান্ট্রি’, ‘হোয়াইট ট্রি’ শিরোনামের কাজগুলো এই ধারারই অংশ।

বিষয় নির্বাচনে, রং-ব্যবহারে এবং উপস্থাপনার আঙ্গিকে শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরীর স্বকীয়তা বরাবরই আলাদা। এন্ড অব দ্য ডে, আ সিন ফ্রম ওল্ড ঢাকা, লাইফ অব এন ওল্ড সিটি, আ সিন উইথ লিলি শিরোণামে তাঁর এই চারটি চিত্রকর্মে গ্রাম বাংলার জীবন ও প্রকৃতি যেন নিবিষ্ট দৃষ্টি মেলেছে।

শিল্পী মোহাম্মদ মোহসিনের আঁকা ছবি হেরিটেজ, মেমোরি, সাইলেন্ট নেচার বিমূর্তরূপে উজ্জ্বল এক দীপ্তি নিয়ে উদ্ভাসিত। তেলরঙে আঁকা এই ছবিগুলোতে শিল্পীর নিরীক্ষাধর্মী কাজের পরিচয় মেলে।

শিল্পী সৈয়দ এনায়েত হোসেনের লাইফ সিরিজের চিত্রকর্মে গ্রাম বাংলার অকৃত্রিম রূপ জেগে ওঠে। অ্যাক্রেলিক ও তেলরঙে আঁকা ছবিগুলোতে রঙের মাধুর্য লক্ষনীয়।

প্রত্নকাহিনী, গ্রামীণ নিসর্গ, বাউলপ্রেম, কৃষক পরিবার শিরোনামে শিল্পী আনোয়ারুল হকের চারটি চিত্রকর্ম যেন গ্রাম বাংলার প্রতিরূপ বয়ে চলেছে।

রেজাউল করিম প্রধানত বিমূর্ত রীতিতে কাজ করেন। বিমূর্ত ছবি কেবল চোখে দৃষ্টিতে অনুভব করার মতো নয়, বোধের দৃষ্টিতে অনুভব করতে হয়। মানুষের মনের ভেতরে ভাবনার একটি জগৎ আছে। বিমূর্ত ছবি সেই জগতের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। শিল্পী রেজাউল করিমের কাজে নিসর্গ দৃশ্যমান। ১৯৬৭ সালে আঁকা ‘মাই ভিলেজ’ শিরোনামের চিত্রকর্মটি রিয়েলস্টিক, অন্যদিকে ‘সং অব মুনলিট নাইট’ বিমূর্ত রীতিতে, তবে দুটি কাজেই ধরা দেয় প্রকৃতির রূপময় লাবণ্য।

শিল্পী বীরেন সোমের ছবিতে লাল রঙের আধিক্য লক্ষনীয়। তবে বাংলার চিরাচরিত রূপবৈচিত্র্য উপস্থাপনায় নীল, সবুজের সমারোহও আছে তাঁর চিত্রকর্মে। ‘রিফ্লেকশন অন গ্রিন ন্যাচার’ বিমূর্তধারায় আঁকা তাঁর একটি ভিন্নমাত্রার ছবি। তাঁর আরেকটি অনন্য চিত্রকর্ম ‘রিফ্লেকশন অন রেড নেচার’।

ইএইচএম মাতলুব আলীর চিত্রকর্ম গুলোতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রাধন্য পেয়েছে। সেল্ফ এক্সপ্রেসিভ, দ্য গ্রেট ইনস্পারেশন শিরোণামের এই ছবি দুটোতে মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি ফুটে উঠেছে শুধু অবয়বে নয়, তাতে নানা কথা ও এক্সপ্রেশন ভিন্ন মাত্রায় উজ্জ্বল।

স্বপন চৌধুরীর জলরঙে আঁকা ‘প্রতীক্ষা’ শিরোনামের চিত্রকর্মটি আলোড়ন জাগানিয়া। তাঁর আঁকা ‘জীবন ও সময়’ এবং ‘সময় ও প্রকৃতি’ শিরোনামের দুটি চিত্রকর্মেও বিমূর্ত হয়ে ধরা দিয়েছে শৈল্পিক চেতনা।

শিল্পী আব্দুশ শাকুর শাহের চন্দ্রাবতী-১ ও ২, নকশীকাঁথা, ফোর ফেইসেস শিরোনামের চিত্রকর্মে বাংলার ঐতিহ্য স্পষ্ট। ফোর ফেইসেস চিত্রকর্মে তিনি তুলে ধরেছেন নারীর ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

শিল্পী চন্দ্রশেখর দে তাঁর চিত্রকর্মে যেন আলাদা একটি বোধের স্বরূপ অন্বেষণের প্রয়াস তুলে ধরেন। তাঁর ‘দ্য ক্যাপটেন’ শিরোণামের চিত্রকর্মটি নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের।

শিল্পী রফি হকের চিত্রকর্মে যাপিত জীবনের বিবিধ অনুষঙ্গ বিমূর্তধারায় ফুটে ওঠে। প্রদর্শনীতে তাঁর ‘জার্নাল অব এন আর্টিস্ট’ সিরিজের চারটি চিত্রকর্মও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রাত্যহিক দিনলিপি, কবিতা আর চিত্রকর্ম যেন একই সূত্রে গেঁথে চলেন তিনি।

গত ২৮ মার্চ উদ্বোধন হওয়া প্রদর্শনীটি চলে ২০ এপ্রিল ২০১৫ পর্যন্ত।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »