উম্মে হাবিবা সূচীর শিল্পভাষ্য

ছবির মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই

suchi4

শিল্পী উম্মে হাবিবা সূচী

 

ছবি আঁকার হাতেখড়ি আমার রংপুর শিশু একাডেমীতে, শ্রদ্ধেয় বিপ্লব স্যারের কাছে। তখন আমি চতুর্থ শ্রেনীতে। প্রথম যেদিন আব্বু আমাকে ছবি আঁকার ক্লাসে নিয়ে গেলেন, দেখি ক্লাসের বোর্ডে মানুষের চোখ, নাক, ঠোট আঁকা। কিন্তু প্রথম দিন হিসেবে স্যার আমাকে কুঁড়ে ঘর আঁকতে দিয়েছিলেন। এরপর আস্তে আস্তে চোখ, নাক, ঠোট আঁকাও শেখা হয়ে গেল। স্যার অনেক মজা করেই শিখিয়েছিলেন। এভাবেই হাতেখড়ি ছবি আঁকার ।

চিত্রাঙকন প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মত অংশগ্রহন করি যখন আমি পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ি। খুবই মন প্রান দিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম এবং জাতীয় শিশু চিত্রাঙকন প্রতিযোগিতায় জলরং এবং পেন্সিল স্কেচে প্রথম স্থান অর্জন করি। এরপর ক্রমান্বয়ে থানা, জেলা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার জন্য ঢাকায় আসি। ঢাকায় আসার সময় রাস্তার জ্যামে ও বসে বসে ছবি এঁকেছি, এতটাই নেশা হয়ে গিয়েছিল। শিশু একাডেমীর কোন প্রতিযোগিতাই বাদ দিতাম না।

আমার দাদী, বাবা, মা, স্যার এবং চাচা-চাচীরা খুবই উৎসাহ দিতেন এমনকি এখনও দিয়ে যাচ্ছেন। আমি যখন অষ্টম শ্রেনীতে পড়ি তখন থেকেই আমার মাথায় চিন্তা ঢুকে যায় যে, আমাকে যে ভাবেই হোক আর্ট নিয়ে পড়তে হবে। আর তাছাড়া অন্য কোন সাবজেক্ট ও আমার ভাল লাগত না। সবাই ডাক্তার ইন্জিনিয়ার হতে চায় আর আমার ইচ্ছা ছিল আর্ট নিয়ে পড়ে থাকার। বাবা আমাকে অনেক বোঝাতো যে, মা তুমি English-এ পড় বা LAW নিয়ে পড় (যদি ও আমার বাবা এডভোকেট, তাই হয়ত LAW নিয়ে পড়ার কথা বলেছিলেন)। কিন্তু কে শোনে কার কথা, খুব জেদী হবার কারনে আর কোন কিছু নয়, আর্ট নিয়েই পড়ে থাকলাম। এমনও হয়েছে, বাসার স্যার পড়াচ্ছেন, আর আমি আপন মনে আঁকিবুকি করে যাচ্ছি.. আর এজন্য আমাকে কম কথাও শুনতে হয়নি। স্যার কত বিচার দিতেন আমার নামে, একবার তো স্যারের ওপর রাগ করে রং, পেন্সিল আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম। মনতো আর বাধা মানে না, দুদিন পরই আবার সব নামিয়ে যেই আমি সেই আমিই আমার মত চলতে থাকলাম। কত মার খেয়েছি মার কাছে!!

অপেক্ষা শুধু এইচএসসি পাস করার। পাস করেও ফেললাম। ঢাকায় এসে চাচার বাসায় থাকা শুরু করলাম আর কোচিং করা শুরু করলাম ঢাকা ভার্সিটির চারুকলা অনুষদে। যেই আমি ঢাকার রাস্তা বন্ধুদের হাত না ধরে পার হতে পারতাম না, রাস্তা ঘাট চেনা তো দূরের কথা ..সেই আমি চারুকলা থেকে বিএফএ, এমএফএ শেষ করে একটি বেসরকারী স্কুলে ড্রইং এ শিক্ষকতা করছি। যদিও ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পাইনি, তার পরেও কোন আফসোস নাই। কারন ইউডা (ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলাপমেন্ট অলটারনেটিভ) আমাকে যা দিয়েছে তাতে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে পারছি না। পেইন্টিংয়ের বিষয়ে বিএফএ এবং গ্রাফিক ডিজাইন বিষয়ে এমএফএ শেষ করেছি ২০১৪ সালে।

মনে পড়ে চারুকলার কোচিং করতে গিয়ে কত কান্না করেছি, ভাইয়াদের দেয়া হরাইযোন্টাল এবং ভার্টিকেল লাইন টানতে গিয়ে যখন দেখি কিছুতেই সোজা হচ্ছে না তখন মাথার চুল দুই পাশে বেনী করে রাতের পর রাত প্র্যাকটিস করতাম আর দুচোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ত এবং অবশ্যই সেটা কান্নার পানি!! মনে পড়লে এখনও হাসি পায়।

এক্সিবিশন দেখা আমার নেশা এবং আমার শখ ও বলা যায়। কারন এ শখটা আমার ভেতর গড়ে দিয়েছে আমারই হাসবেন্ড। যদিও সে নিজে এই লাইন থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন ধারার তারপরও ওর আগ্রহ আমাকে আরও উৎসাহ দেয়। আর তাছাড়া ওর উৎসাহ না থাকলে হয়ত এখনও এভাবে আর্টের সঙ্গে পড়ে থাকতে পারতাম না।

যাইহোক, প্রিয় মানুষের কাজের কথা বলতে গেলে অনেক মানুষের কথাই চলে আসবে যা এ স্বল্প পরিসরে হয়ত বলে শেষ করা যাবে না। প্রত্যেকের কাছেই শেখার মত কিছু না কিছু অবশ্যই আছে এবং আপনাকে সেটা শুধু খুঁজে নিতে হবে। আমি খুঁজে ফিরি এবং শেখার চেষ্টা করি। এক একজন মানুষের কাজ এক এক রকম, একই জিনিস কালিদাস স্যার, তরুন ঘোষ স্যার কিংবা রশীদ আমিন স্যার অথবা আলভী স্যার একেক রকম ভাবে বোঝাবেন। এইযে ভিন্নতা, এখান থেকেই শেখার আছে অনেক কিছু। তাই বলে যে আমার কোন নিজস্বতা নেই তা কিন্তু নয়। আমি এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করতেই বেশী পছন্দ করি। কালি কলম, জলরং,এক্রেলিক, প্যাস্টেল এসব মিডিয়া আমাকে টানে বেশী। ড্রাই পয়েন্ট, মনোপ্রিন্টের কাজ শিখেছি খুব বেশিদিন হয়নি। নতুন নতুন জিনিস শেখার মধ্যেও অন্যরকম একটা নেশা কাজ করে। খুব অল্প কদিন আগেই Serigraphy Water color print এর কাজ করলাম, যা সম্পূর্ন নতুন আমার কাছে।

আশা করি যতদিন পারব এভাবেই লেগে থাকতে পারব এবং নতুন নতুন জিনিস শিখতে পারব। সবশেষে একটাই কথা বলতে চাই, ছবি আঁকছি, আঁকব এবং ছবি এঁকে ছবির মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

3 comments on “ছবির মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই
  1. Abdur Razzaque says:

    I m really proud of u… :)

  2. tasnim sadia says:

    khub valo bolecho…..doa kori onek boro how

  3. Sunny Sharif says:

    Keep up the good works.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »