কাল্পনিক চরিত্রে চেতনার সম্মিলন

 

traitor_sarad।মুজিবুল হক। মুন্ডহীন একটি দেহ, যার সারা দেহে তীর বিদ্ধ। যা দেখলে মনে পড়ে যায় মহাভারতের মহামহিম দেবব্রত বিশ্বর কথা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের হাতে তীর বিদ্ধ হয়ে মহামহিম দেবব্রত বিশ্ব যেভাবে শরশয্যায় ছিলেন তারই প্রতিরূপ ফুটে উঠেছে বিস্তার আর্ট কমপ্লেক্সের পরস্পরা গ্যালারীতে ‘ইনসেন্ট বডি’ শিরোনামে তরুণ শিল্পী শারদ দাশের ভাস্কর্যে।

গত ১৭ এপ্রিল বিস্তার আর্ট কমপ্লেক্সের পরস্পরা গ্যালারিতে শুরু হয়েছে শিল্পী শারদ দাশের তৃতীয় একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ শিরোনামে এবারের প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে প্লাইউডে করা ড্রইং, পোড়ামাটির টেরাকোটা, ভাস্কর্য ও ছাপচিত্রের মাধ্যমে করা ১৩টি শিল্পকর্ম। প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন চট্টগ্রামের ভারতীয় দূতাবাসের সহকারী হাই কমিশনার সোমনাথ হাওলাদার, অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক শিল্পী ঢালী আল মামুন, বিস্তার আর্ট কমপ্লেক্সের পরিচালক আলম খোরশেদ।

প্রদর্শনীতে ঢোকার পর চোখে পড়বে মনুষ্যকৃতির দেহ উপুড় হয়ে বসে আছে যার উপরাংশে ঘোড়ার মাথা, ফিগারটির পিঠের উপরে বসে আছে আরেকটি মানুষ যে দু হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রেখেছে। শিল্পকর্মটির নাম ‘দ্য ট্রেইটর’। যা দেখলেই অসিরীয় সভ্যতার মানুষাকৃতির ঘোড়ার কথা মনে পড়ে যায়।

স্মৃতিই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। শিল্পীর কাজে আমাদের চারপাশের ঘটে যাওয়া প্রতিনিয়ত ঘটনা প্রবাহকে তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে নিজস্ব ঢঙে হাজির করেছেন এবারে প্রদর্শনীতে। তাঁর শিল্পকর্মগুলো লক্ষ করলে বোঝা যায় প্রায় শিল্পকর্মগুলোতে তিনি প্রচলিত কম্পোজিশন ভেঙ্গে ক্যানভাস থেকে ফিগারের মাথা, পা ও হাত বের করে দিয়েছেন। মোটা ব্রাশে কালো কালিতে বিভিন্ন ভঙ্গিতে মানব ফিগার এঁকে তাতে জুড়ে দিয়েছেন পোড়ামাটিতে করা মুখমন্ডল, হাত ও পায়ের টেরাকোটা। মোটা ব্রাশের ব্যবহার ছবির জমিনে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। তাঁর চিত্রপটের বৈশিষ্ট্য হলো প্লাইউডের উপরে কালো কালিতে করা মানব ফিগার তার উপরে পোড়ামাটির টেরাকোটার ব্যবহার। এতে রেখা ও রঙের সংবেদনশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তার কাজে। শারদের চিত্রপটগুলো পুরোপুরি ভরাট করেনি কোন কাজে। আবেগের মাধুর্যের চেয়ে টেকনিক ও এক্সপ্রেরিমেন্টালি মুখ্য সৃষ্টির ফুল হয়ে ফুটেছে। সবগুলো কাজই কালো কালিতে করা। তবে সারফেসের প্রয়োজনে তিনি কিছু অংশ ভরাট করেছেন, তা-ও আবার কালো কালিতেই। কিছু কিছু ছবিতে লাইনের বহুমাত্রিকতার ভিন্নতা বর্ণিল করেছে প্রদর্শনীর কাজগুলোকে। এরকম শিল্প নির্মাণে শিল্পীর চিন্তার অভিনবত্ব প্রকাশ পেয়েছে শিল্পীর শিল্পভাষায়। শিল্পী শারদ দাসের ক্যানভাসে আঁকা রঙের স্ফুরণ, সৃজিত আকার-আকৃতি ও ফর্ম দর্শককে যতটা আনন্দ দিয়েছে তার চেয়ে বরং দর্শককে নিয়ে গেছে কল্পনার জগতে। এবারের প্রদর্শনীতে তিনি মানুষের অন্তর্গত দৃশ্য অবলোকন ও দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নানাবিদ ভাব-ভঙ্গির বিষয়কে কল্পলোকের শিল্পজ্ঞান অন্বেষনে শিল্পের বিষয় হিসাবে খুঁজে নেন। শারদ দাশের সৃষ্ট চরিত্রগুলো স্থির, বিষন্ন, হতাশ, ক্ষুদ্ধ, ভয়ার্থ, কৌতুহূলি, নির্দেশ, আকাঙ্খা ও হাস্যরস হিসাবে ধরা দেয় দর্শকদের সামনে। যা সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, বিশ্বায়ন, অধিকার, মানবিকতা সবকিছুতে আবর্তিত করে চলমান বিভিন্ন ঘটনার ছায়া ও বাস্তবে দেখা বিষয়ের সম্মিলনে তৈরি হয়েছে তাঁর শিল্পকর্ম। এশিরীয় সভ্যতার বিষয়কে বর্তমান সময়ের কাছে উপস্থাপন করেছেন লজ্জায় মুখ ঢাকার মাধ্যমে। চলমান বিভিন্ন ঘটনার ছায়া ও বাস্তবে দেখা বিষয়ের সম্মিলনে তৈরি হয়েছে তাঁর শিল্পকর্ম। শিল্পী শারদ দাশের অন্তলোকের কল্পনা ও বাস্তবিক চলমান ঘটনা আমাদের মুখোমুখি করে এক গভীর সত্যানুসন্ধানের। ভয়, উৎকণ্ঠা, পারিপার্শ্বিক টানাপড়নের ভেতর দিয়ে পার করা জীবনযাপনের গল্প তাই হয়তো এই প্রদর্শনীর নাম ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’। বিস্তার আর্ট কমপ্লেক্সে গত ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া প্রদর্শনী শেষ হয় ২৪ এপ্রিল।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »