শিল্পী মাহবুবুর রহমানের শিল্পভূ্বন

mahbubur_rahman2

শিল্পী মাহবুবুর রহমান

 

বাংলাদেশে নিউ মিডিয়া আর্ট তথা ভিন্ন ধারার শিল্পকলাকে যিনি প্রায় একক প্রচেষ্টায় জনপ্রিয় করে তুলছেন বা তুলেছেন তিনি শিল্পী মাহবুবুর রহমান। নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশি শিল্পকলায় তাঁর গর্বিত পদচারণা। শিল্পকলার প্রচলিত মাধ্যমের পাশাপাশি স্থাপনাশিল্প, ভিডিও আর্ট, সাউন্ড আর্ট, পারফরম্যান্স সহ আরও নানা মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সফলভাবে নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। এশিয়ান বিয়েনাল, জাতীয় শিল্পকলা প্রদর্শনী, তরুণশিল্পী শিল্পকলা প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ পুরস্কারসহ শিল্পকলা বিষয়ে দেশে প্রচলিত প্রায় সকল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছন এরইমধ্যে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের নামকে উজ্জ্বল করেছেন। পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। সম্প্রতি বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টে বাংলাদেশের এই নামী শিল্পীর সঙ্গে এক আড্ডায় বসেছিলেন শিল্পী আমজাদ আকাশ। আলাপচারিতায় ওঠে এসেছে শিল্পী মাহবুবুর রহমানের শিল্প ও জীবনের নানা দিক।

আকাশ : আপনার জন্ম কত সালে?

মাহবুবুর রহমান : রিয়েল সেন্সে জানি না, তবে আমার ধারণা, ’৬৫ হলো আমার জন্ম সাল। স্কুলেরটি ’৬৯।

আকাশ : স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে জন্ম আপনার। একাত্তরের কোনো স্মৃতি কি মনে আছে?

মাহবুবুর রহমান : কয়েকটা ঘটনা আমার মনে আছে। আমাদের পাশের বাসায় লুট হচ্ছিল, আমরা জানালা দিয়ে দেখছিলাম। সেটি কী যুদ্ধের সময়, না আগে তা মনে নেই। আরও কয়েকটা ঘটনা আমার মনে আছে। বোম্বিং হচ্ছিল, প্রতিটি বাড়িতে বাঙ্কার তৈরি হচ্ছিল, আই বাঙ্কার। খাটের ওপর তোশক দিয়ে নিচে ছিলাম আমরা। আরেকটা স্মৃতি হলো- আমরা বাড়িতে থাকতে পারছি না, চলে যাচ্ছি নদী ওপারে। তখন নানুবাড়িতে ছিলাম। এ রকম কিছু স্মৃতি আছে আমার।

আকাশ : আপনার স্কুলে যাওয়া কবে শুরু হলো?

মাহবুবুর রহমান : আমার স্কুলে নিয়মিত যাওয়া শুরু হয়েছে বেশ পরে। রিয়েল সেন্সে স্কুল শুরু হয়েছে- সেভেনটি সিক্সে। থ্রি কিংবা ফোরে ভর্তি হই সম্ভবত। পোগোজ স্কুলে।

আকাশ : ওই সময় আপনার পরিবারে কোনো আর্টিস্ট ছিল?

মাহবুবুর রহমান : আর্টিস্ট ছিল না। তবে সেভেনটি ওয়ানের আগে আমাদের বাড়িতে একটা পরিবার থাকত, যারা কমার্শিয়াল আর্টিস্ট ছিল। সেভেনটি ওয়ানের পর আলী বলে একজন ছিলেন, বাংলাবাজারে বই ইলাস্ট্রেশনের কাজ করতেন। উনি প্রায়ই আসতেন আমাদের বাসায়। আমি প্রথম ড্রয়িং শিখি আমার বড় ভাইয়ের কাছে। আলী, যিনি আমাদের বাসায় আসতেন, উনি দুটি ছবি উপহার দিয়েছিলেন আমাকে। তার মধ্যে একটি ছিল রাজহাঁসের ছবি। ছবি দুটিকে আমি ফলো করে বড় বড় করে এঁকে রং করতাম। আমার বাবার এক বন্ধু ছিলেন। তিনি অভিনয় করতেন। ’৭৭ সালে উনি আমাকে আঁকতে দেখে আমার বাবাকে বললেন, ওকে আর্ট স্কুলে দাও। ও ভালো আঁকতে পারে, ওকে কাজে লাগাও। তখন বাবা বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে আমাকে ভর্তি করিয়ে দেন।

আকাশ : তো ওই সময়ে প্রচলিত ছিল যে, শিল্পীরা অনাহারে মারা যায়- এ রকম কোনো কথা পরিবার থেকে বলা হয়েছিল আপনাকে?

মাহবুবুর রহমান : আমার বাবা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমার মাও আমাকে খুব ভালোবাসতেন, আমার তাই মনে হয়। আমাদের ব্যবসা ছিল। একটা বিষয় তাদের মাথায় ছিল, ব্যবসা আছে, নিজেদের বাড়ি আছে। বাবা-মায়ের হয়তো ভাবনা ছিল- আর যা-ই হোক, ছেলে না খেয়ে মারা যাবে না। তবে আমার ভাবারও সুযোগ হয়নি, তার আগেই বাবা মারা গেছেন। অনিশ্চিত একটা জীবন- এটা ছিলই। তারা ভেবেছিল, আমাদের সময়ের অনেক ছেলে বখে গিয়েছিল, ড্রাগ নিত। সে ক্ষেত্রে আমার মধ্যে এ রকম কিছু ছিল না। ভদ্রই ছিলাম আমি। সে ক্ষেত্রে একটা মেন্টাল সেটিসফেকশন ছিল পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। তবে পরিবার টেনশন করত, চিন্তা করত- ছেলেটা বখে যাবে না তো? তাদের চিন্তা ছিল- ছেলে বেলাইনে না গেলেই হয়। লাইনে থাকাটাই তাদের প্রত্যাশা ছিল।

আকাশ : সে সময় পপ কালচার গ্রো করছিল সমাজে, এ নিয়েও বাবা-মায়েরা সন্তানদের বিষয়ে টেনশনে থাকতেন। বিশেষ করে ছেলেদের নিয়ে…

মাহবুবুর রহমান : তখনকার সামাজিক চ্যালেঞ্জ ছিল। সারভাইভের জন্য প্রয়োজনীয় এডুকেশন ছিল একটা টুলস। আরেকটি এডুকেশন ছিল, টেকনিক্যাল। আমি স্কুলে না গেলে হয়তো মেশিনে কাজ করতো হতো। আমিও রেডি ছিলাম লেদ মেশিনে কাজ করতে। এটা নিয়ে আমি খুব এক্সাইটেড ছিলাম। মেকানিক্যাল বিষয়ের প্রতি আমার ভীষণ ফ্যাসিনেশন ছিল। ছোট ছোট ব্রকলেস দোকান ছিল। মেশিন ছিল। আমাদের পাড়ায় প্রিন্ট মেশিন ছিল, আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। কালারফুল প্রিন্ট বের হতো, বড় বড় ব্যক্তিত্ব- রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলামের জার্সি বের হতো, আমরা স্টিকার লাগাতাম। কনসাস যে পেইন্টগুলো ছিল, তা হাত দিয়ে লাগাতাম। আমাদের এখানে দুর্গাপূজা, কালীপূজা হতো। তখন মূর্তি বানাত, সেই মূর্তি বানানো আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। সেগুলো বাসায় এসে আঁকার চেষ্টা করতাম।

আকাশ: শৈশবের পুরান ঢাকার জীবন কেমন ছিল?

মাহবুবুর রহমান : একটা বিগ শিফটিং হয়েছে সেভেনটি ওয়ানের পর। সেভেনেটি ফাইভের পর আমার ফ্রিডমটা আসে। তখন তাস কালেক্ট করে তাস খেলতাম। স্ট্যাম্প কিনে স্ট্যাম্প খেলা। মার্বেল খেলা। লাটিম কালেক্ট করে লাটিম খেলা- এইগুলা করতাম। বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতাম। নারায়ণগঞ্জ চলে যেতাম। চাষাঢ়ায় একধরনের ভালো লাটিম পাওয়া যেত, খুব হেভি, গাব কাঠের। বাস্তব দেখার যে বিকাশ, জগৎকে দেখার যে বিকাশ, তা আমার ওই সময়ই হয়েছিল। ওই সময়গুলোকে এখন আমি রিয়েলাইজ করি।

মানুষ ট্যুরে যায় না? সাইড ভিজিট? কোনো একটা পুরোনো বাড়িতে গিয়ে লুকোচুরি খেলা, এটা একধরনের সাইড ভিজিট। ওই সময় একটা লুটে পড়া বিল্ডিং থাকত, ভেঙে পড়া থাকত, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে ছিল, কেউ খবর নিত না। আমার ছোটবেলায় ওই ধরনের স্পটে যেতাম। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ খেলতাম। চোর-ডাকাত খেলতাম। গান বানিয়ে বানিয়ে খেলতাম। সেটা আমার লাইফের বেসিক এসেন্স। সেটাকে ধরেই জীবনের পরবর্তী ধাপগুলো এগিয়ে যাওয়া। বিভিন্ন মিডিয়ার প্রতি যে আগ্রহ, বিভিন্ন জিনিস নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার যে আগ্রহ, ছোটবেলায়ই অবচেতন মনে তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ম্যাটেরিয়ালস নিয়ে কথা বলা, ইতিহাস নিয়ে কথা বলা, যেমন ’৪৭-এর দেশ ভাগ…।

আকাশ : তার আগে বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল… একধরনের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল কি তখন?

মাহবুবুর রহমান : সেই সময় দখলের একটি প্রবণতা ছিল। নতুন রাষ্ট্রে কিছু বিজনেসের জায়গাও তৈরি হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পর আমরা অনেক বিষয় নিয়ে ডিসকাস করতাম। তখন একটা বিল্ডিং ছিল, পাঁচতলা বাড়ি। হিন্দুদের কিছু বাড়ি সেভেনটি ওয়ানের পরপর দখল নিয়েছে, আর কিছু বাড়ি আগেও দখল নিয়েছিল। নন বেঙ্গলিদের বাড়ি বেঙ্গলি দখল করেছিল। সেভেনটি ওয়ানের পরপর অনেক বাড়ি সেলও হয়েছে। বাড়ি সেল করে অনেকে চলে গেছেন। ওই সময় ব্যাপক শিফট হয়, পুরো একটা কালচারড শিফটের মতো হয়। সেই সময় একটা ব্যাপক পরিবর্তন হয়।

আকাশ : শৈশবের ওই সব স্মৃতি আপনার কাজকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয়?

মাহবুবুর রহমান : ল্যান্ড মাইগ্রেশনের কাজ, পার্টিশন, আমার কাজে ঐতিহাসিক দিকটা যে স্টার্ট হয়, তা শৈশবের স্মৃতিময়তার কারণেই। প্রথমে আমি সেভেনটি ওয়ান নিয়ে কাজ করি। তার পরের কাজটি হয় ফরটি সেভেন অ্যাগেইনস্ট সেভেনটি ওয়ান। যদিও বিষয়টি বাছাই করে দিয়েছিল ইয়াং আর্ট এক্সিবিশন। এটা হলো নব্বইয়ের ঘটনা। নব্বইয়ের এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন। এর পরেরটা আমার পারসোনাল ইস্যু। আঠারো শ সাতান্ন নিয়েও আমি কাজ করেছি। ওই সময় বাহাদুর শাহ পার্কে খেলতে যেতে পারতাম না। কারণ ওটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তখন যা কিছু হতো, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। আমার বাবা-মাও ওখান দিয়ে আসা-যাওয়া করতে ভয় পেত। সন্ধ্যা হলে কোথাও যেত না। একটা মিথও ছিল, সেগুলো শুনতাম।

আকাশ : আপনি পড়ালেখা করেছেন পেইন্টিংয়ে, কিন্তু স্কাল্পচারে অনেক কাজ করেছেন এবং দুবার অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন।

মাহবুবুর রহমান : বাফায় থাকাকালীন সেখানে আমরা ড্রয়িং করতাম। পেইন্টিং করতাম। পাঁচ বছরের একটা কোর্স। সেখানেই আমার ম্যাচিউরিটি তৈরি হয়েছে। সিনিয়র অনেক ভাইকে স্কাল্পচার করতে দেখতাম। রাশা ভাইয়ের কাজ দেখতাম। লতিফ স্যারের কাছেও এ বিষয়ে অনেক কিছু শুনতাম। সেই ষাট সালে কিছু মাটির পোর্ট্রেট দেখতাম। চমৎকার ছিল ওসব। পুরান ঢাকায় পূজা-পার্বণে মূর্তি বানানো হতো- দুর্গা, সরস্বতী, কালী ইত্যাদি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। এসব আমাদের ব্লাডে। তখন থ্রিডাইমেনশনাল একটা প্র্যাকটিস ছিল। কিন্তু স্কাল্পচারে আগ্রহ থাকলেও আমার একাডেমিক পড়াশোনা পেইন্টিংয়ে। কারণ আমার মনে হয়েছে, আমি একাডেমিক প্রসেসে স্কাল্পচার পড়লে স্বাধীনভাবে স্কাল্পচার করতে পারব না। আমি নিজের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতাটুকু উপভোগ করতে চেয়েছি। আবার আমি পেইন্টিংটাও এনজয় করতাম খুব। দুটো কাজই আমি সিরিয়াসলি করে গিয়েছি।

আকাশ : চারুকলায় পড়তে এসে আপনি একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন। এটা করতে গিয়ে কোনো বাধার সম্মুখীন হননি?

মাহবুবুর রহমান : না, আমি বাধার মুখে পড়িনি। আমি নিজের মতো কাজ করতাম। সবাই বরং উৎসাহিত করেছে। কিবরিয়া স্যার থেকে শুরু করে তরুণ শিক্ষকেরাও আমাকে খুব পছন্দ করতেন। আমার কাজে উৎসাহ জুগিয়েছেন তাঁরা।

আকাশ : বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম শিল্পীদের কাজে কেমন প্রভাব বিস্তার করে?

মাহবুবুর রহমান : শিল্পীরা তো প্রায় সব আন্দোলনেরই অংশ হয়ে ওঠেন তাঁদের কাজের মধ্য দিয়ে। যে কোনো আন্দোলনে প্রায় সব শিল্পীই দেখা যায় নিজ নিজ শিল্পকর্মে প্রতিবাদের ভাষা ফুটিয়ে তুলছেন। নব্বইয়ে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যেসব কার্টুন হয়েছে, যেসব কুশপুত্তলিকা তৈরি হয়েছে; অসাধারণ সব কাজ বিভিন্ন শিল্পীর! উৎসব, আন্দোলন সব ধরনের সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলিতে শিল্পীরাও প্রভাবিত হন। তাদের অনেক শিল্পকর্ম তৈরি হয় এরই ভিত্তিতে।

আকাশ : শিল্পী এস এম সুলতান, শিল্পী কামরুল হাসান আপনাকে কতটা প্রভাবিত করেছেন?

মাহবুবুর রহমান : আমি ভাবতাম, শিল্পী সুলতান এত কম বয়সে এত ভালো ভালো কাজ করেছেন, আমি কেন পারব না। তিনি বেঁচে থাকতে আমি তাঁর বাসায় অনেক গিয়েছি। দেখা যেত অনেক সময় নানা প্রশ্ন, নানা সমালোচনাও করতাম তাঁর কাজের; সরাসরি তাঁর সঙ্গেই। মাইকেল এঞ্জেলোর কাজে যে ধরনের একটা পরিবর্তনের ধারা স্থাপনের প্রবণতা ছিল, সুলতানের কাজে সেই ধরনের একটা পরিবর্তনের চর্চা ছিল। শিল্পী কামরুল হাসানের কাজের যে শার্পনেস, যে ডাইভারসিটি, তা আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করে রাখে।

আকাশ : ১৯৯৪ সালে শিল্পকলা একাডেমীতে ইনস্টলেশন নিয়ে আপনার একক প্রদর্শনী হয়। ইনস্টলেশন তখন তেমন পরিচিত নয় সবার কাছে।

মাহবুবুর রহমান : এটা আমার জীবনের একটা ইনিংস। আমার অনেক দিনের একটা ভাবনা ছিল এ রকম একটি কাজ করব। সেই ভাবনারই ফসল ছিল এটি। এ ব্যাপারে সুবীরদা (সুবীর চৌধুরী) আমাকে যে সহযোগিতা করেছেন, সে জন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি ন্যাশনাল একটা গ্যালারিতে আমার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এই প্রদর্শনীর কিছুদিন পরেই আমার একটি কাজ নিয়ে জাপানের একটা প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করার কথা। আমি চাইছিলাম, এর আগেই বাংলাদেশে একটা প্রদর্শনী করতে। তাই সুবীরদাকে বলেছিলাম। তিনি অনেক সহযোগিতা করেছিলেন আমাকে। আমার এই ইনস্টলেশন সে সময় একটা প্রভাব তৈরি করেছে অনেকের মধ্যে। এরপর ঢাকা চারুকলার জয়নুল উৎসবে একটা ইনস্টলেশনের আয়োজন করা হয়েছিল। তখন বিভিন্নভাবে ইনস্টলেশনের চর্চা শুরু হয়েছিল।

আকাশ : বিবিধ মাধ্যমে কাজ করার কী কী অসুবিধে বলে মনে করেন? এই যেমন পেইন্টিং, ভিডিও, ইনস্টলেশন ইত্যাদি।

মাহবুবুর রহমান : অসুবিধার চেয়ে বড় সমস্যা হলো সহযোগিতার অভাব। কোনো একটা কাজ করার জন্য যথেষ্ট সময় ও স্পেস পাওয়া যায় না।

আকাশ : কনটেম্পরারি আর্ট সমাজে কীভাবে প্রভাব বিস্তার করছে?

মাহবুবুর রহমান : মানুষের মেধার চর্চা করা উচিত মেধাকে উপরে তোলার জন্য, নিচে নামার জন্য নয়। তবে কেউ যদি নিচে থেকেও কাজ করে, তার অর্জনটাও খাটো নয়। গোবরে যদি পদ্মফুল ফোটে, তবে পদ্মফুলটাই তো অর্জন। একজন আর্টিস্টের সঙ্গে অনেক মানুষ কাজ করে। পেইন্টারের সঙ্গে কার্পেন্টারও কাজ করে। পুরো একটা গ্রুপ যৌথভাবে কাজ করে যায়। সবারই একটা সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। যেন আর্টিস্ট নিজেই একটা ইনস্টিটিউট। কনটেম্পরারি আর্টে এটা একটা বড় ব্যাপার।

আকাশ : এ দেশে পারফরম্যান্স আর্টের চর্চাটা কীভাবে দেখেন? এই চর্চা কি ইউরোপ থেকে এলো এ দেশে?

মাহবুবুর রহমান : না, ইউরোপ থেকে নয়। বরং বলতে পারি আমাদের হিন্দু-বৌদ্ধ কালচার থেকে ইউরোপিয়ানরা তাদের পারফরম্যান্স আর্টে অনেক কিছু গ্রহণ করেছে। চীনের কনফুসিয়াসিজম থেকে গ্রহণ করেছে।

আমি বলব, আমি নিজে আসলে যেটুকু কাজ করেছি, নিজে নিজে চর্চা করে তৈরি হয়েছি। আমি যে সময়ে কাজ শুরু করি, তখন তথ্যের আদান-প্রদান অত সহজ ছিল না। ইন্টারনেট ছিল না। সুতরাং নিজের ধারণা নিজে বাস্তবায়ন করে পারফরম্যান্স আর্টের সঙ্গে থেকেছি। তবে কাজ নিয়ে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করার ফলে আমার অভিজ্ঞতা ভারী হয়েছে। অনেক ধরনের কাজের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছি। আমি যেকোনো কিছু খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করি এবং নিজে নিজেই বিভিন্ন পরিকল্পনা তৈরি করি। আর আমি অন্যদের সঙ্গে ধারণা বিনিময় করেও অনেক বিষয়ে নিজেকে ডেভেলপ করার চেষ্টা করি প্রতিনিয়ত। যেহেতু আমি ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট, আমি নিজের মতো করেই কাজ করে যাই। অনেক বিষয়ে আমার অনেক আইডিয়া জমে আছে, এখনো বাস্তবায়ন করতে পারিনি। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে ভাবছি। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কাজ করা হয় আমার। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি নিয়েও আমার একটি ন্যারেটিভ প্রেজেন্টেশন আছে।

আকাশ : আপনি তো ২০০২-এ বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করে কিউরেটর হিসেবেও কাজ শুরু করেছেন।

মাহবুবুর রহমান : কিউরেটাল প্র্যাকটিস আমার অনেক আগে থেকেই ছিল। কিন্তু আমি তেমনভাবে সেটি প্রকাশে আগ্রহী ছিলাম না। ’৯৪-এ আমরা একটা ট্রাভেলিং শো করেছিলাম, যেটির কিউরেটিং আমি করেছিলাম। কিউরেটাল প্র্যাকটিসের ধারাবাহিকতাতেই বৃত্তের কাজ শুরু করেছি।

আকাশ : কোন্ ভাবনা থেকে বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের যাত্রা শুরু হলো?

মাহবুবুর রহমান : দলবদ্ধভাবে আরও ভালো কাজ করার উদ্দেশ্য নিয়ে বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের সূচনা করি। দলবদ্ধভাবে কাজ করার অনেক সুবিধে আর্টিস্টদের জন্য। ছোটবেলায় আমাদের এলাকায় ক্লাব করেছি, সেখান থেকেও গ্রুপ করে কাজ করার অনুপ্রেরণা ছিল, অভিজ্ঞতা ছিল। বিভিন্ন সোশ্যাল ওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেখানেও দেখেছি, যৌথভাবে কাজ করার অনেক সুবিধে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভাবনার আদান-প্রদান হয়। আমি যখন ফার্স্ট ইয়ার-সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি তখনো সহপাঠীদের বলতাম, একসঙ্গে ড্রয়িং করার কথা। এবং এতে অনেক সুফলও পেয়েছি। বিভিন্ন আর্ট প্রজেক্ট নিয়ে মূলত আমি আর লিপি (তায়েবা বেগম লিপি) প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করি। তারপর ধাপে ধাপে সেটা বাস্তবায়নে কাজ করি। বিভিন্ন আর্টিস্টকে সম্পৃক্ত করি।

আকাশ : বৃত্তের সঙ্গে কারা কাজ করতে পারে? আর্টিস্ট নির্বাচন কীভাবে হয়?

মাহবুবুর রহমান : আমরা প্রতিটি ওয়ার্কশপের আগে নিজেরাই একটা সিলেকশন করি, আর্টিস্টদের জানাই। এর মধ্যে যারা আগ্রহী তারা আসেন। এটা যেহেতু একটা টিম ওয়ার্ক, চেষ্টা করি সবাই যেন সহযোগী মনোভাবের হন পরস্পরের প্রতি। আর নিয়মিত যারা বৃত্তের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তারাই বৃত্তের সদস্য হতে পারে। যারা বৃত্তকে নিজের একটি ঘর মনে করে।

আকাশ : বৃত্তের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

মাহবুবুর রহমান : এটিকে প্রশাসনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার ইচ্ছে আছে।

আকাশ : বৃত্তের কাজ করতে গিয়ে কি নিজের কাজ ব্যাহত হয়?

মাহবুবুর রহমান : না, হয় না। আমি প্রতিটি কাজের জন্য সময়ের সমন্বয় করে নিয়েছি।

আকাশ : এই যে এত বছর যাবৎ কাজ করছেন, শিল্পে আপনার প্রধান দর্শন কী?

মাহবুবুর রহমান : মানুষের প্রতি কিংবা যেকোনো প্রাণীর প্রতি যত্নশীল থাকতে চাই।

আকাশ: বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে আপনার যে একক প্রদর্শনী হচ্ছে ডাস্ট টু ডাস্ট শিরোনামে, সে বিষয়ে কিছু বলুন।

মাহবুবুর রহমান : অনেক দিন পর একক প্রদর্শনী করছি। বেশ কিছু কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে এখানে। নতুন কাজ থাকছে, পুরোনো কাজও থাকছে। একটা ভাবনা মনে আসে আজকাল, যেসব শিল্পী বেঁচে নেই, তাদের অনেক কাজ আর প্রদর্শিত হয় না। আমাদের এখানে তো শিল্পবিষয়ক তেমন মিউজিয়ামও নেই, যেখানে এসব কাজ প্রদর্শিত হতে পারে। তাই মনে হয়, এখন ইয়াং আছি, এনার্জি আছে, এখনই কাজ করার সময়। আর এসব শিল্পকর্মের প্রদর্শনেরও প্রয়োজন আছে মনে হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক কাজ করা হয়েছে, সেগুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হলো। ২০১১ সালে ভেনিস বিয়েনালে প্রদর্শিত হয়েছিল ‘আই ওয়াজ টোল্ড টু সে দিজ ওয়ার্ডস’, এটি প্রদর্শিত হচ্ছে এই প্রদর্শনীতে। এখানে চারকোল ড্রয়িং থেকে শুরু করে শব্দ ও আলো ব্যবহার করে নানা শিল্পজাত বস্তু ও স্থাপনা শিল্প থাকছে।

আকাশ : দীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

মাহবুবুর রহমান : তোমাকেও ধন্যবাদ।

 

শ্রুতি লিখন: সুমিমা ইয়াসমিন

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »