সতত সত্যজিৎ

 

satyajit-roy3

সত্যজিৎ রায়

 

।অঞ্জন আচার্য।  বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়। জন্ম তাঁর কলকাতা হলেও আদি পৈত্রিক ভিটা ছিল বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে। পৈত্রিক বাড়িটি এখনও রয়েছে সেখানে। ওখানেই জন্ম তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং বাবা সুকুমার রায়ের। সাতচল্লিশের দেশভাগের অনেক আগেই উপেন্দ্রকিশোর সপরিবারে চলে যান কলকাতায়। বর্তমানে প্রায় ৪ একর আয়তনের ওই বিশাল পৈত্রিক ভিটাটি রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব বিভাগের অধীনে। এ বাড়িকে ঘিরে একটি পর্যটন কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা নিচ্ছেন বাংলাদেশ সরকার। এছাড়া সত্যজিতের পূর্বপুরুষ হরিকিশোর রায়চৌধুরী প্রায় ২০০ বছর আগে মসূয়া গ্রামে শ্রী শ্রী কালভৈরব পূজা উপলক্ষ্যে একটি মেলার আয়োজন করেছিলেন। এখনও প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বুধবার পালিত হয় এ মেলা।

মূলত উপেন্দ্রকিশোরের সময়েই সত্যজিতের পরিবারের ইতিহাস এক নতুন দিকে মোড় নেয়। লেখক, চিত্রকর, দার্শনিক, প্রকাশক ও শখের জ্যোতির্বিদ উপেন্দ্রকিশোরের মূল পরিচিতি ১৯ শতকের বাংলার এক ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন ব্রাহ্ম সমাজের অন্যতম নেতা হিসেবে। উপেন্দ্রকিশোরের ছেলে সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ননসেন্স ও শিশুসাহিত্যের সেরা লেখকদের একজন। দক্ষ চিত্রকর ও সমালোচক হিসেবেও খ্যাতি ছিল সুকুমারের।

১৯২১ সালের ২ মে কলকাতায় জন্ম নেন সুকুমারের একমাত্র সন্তান সত্যজিৎ রায়। ডাক নাম রাখা হয় তাঁর মানিক। সত্যজিতের জন্মের মাত্র তিন বছর বয়সেই মারা যান বাবা সুকুমার। মা সুপ্রভা দেবী বহু কষ্টে বড় করেন তাঁকে। বড় হয়ে সত্যজিৎ কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে যান অর্থনীতি পড়তে। যদিও চারুকলার প্রতি সবসময়েই ছিল তাঁর বিশেষ দুর্বলতা। ১৯৪০ সালে সত্যজিতের মা তাঁকে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য। তবে কলকাতাপ্রেমী সত্যজিৎ শান্তিনিকেতনের শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে খুব একটা উঁচু ধারণা পোষণ করতেন না। কিন্তু শেষে মায়ের প্ররোচনা ও রবিঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধার ফলে রাজি হন তিনি। শান্তিনিকেতনে গিয়ে প্রাচ্যের শিল্পের মর্যাদা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন সত্যজিৎ। পরে তিনি স্বীকার করেন, সেখানকার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু এবং বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন অনেক কিছু। পরবর্তী সময়ে বিনোদবিহারীর ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্রও বানান সত্যজিৎ। অজন্তা, ইলোরা এবং এলিফ্যান্টায় ভ্রমণের পর ভারতীয় শিল্পের ওপর সত্যজিতের গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ জন্মায়।

এদিকে নিয়মানুযায়ী বিশ্বভারতীতে সত্যজিতের পাঁচ বছর পড়াশোনা করার কথা থাকলেও এর আগেই ১৯৪৩ সালে তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানে ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কিমারে ‘জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার’ হিসেবে যোগ দেন মাত্র ৮০ টাকা বেতনে। চিত্রসজ্জা বা ভিজুয়াল ডিজাইন সত্যজিতের ছিল পছন্দের একটি বিষয় এবং সংস্থাটিতে তিনি ছিলেন ভালো সমাদরেই। কিন্তু সংস্থাটির ইংরেজ ও ভারতীয় কর্মচারীদের মধ্যে তখন বিরাজ করছিল চাপা ক্ষোভ। কারণ একই পদে থেকেও ইংরেজ কর্মচারীদেরকে দেয়া হতো অনেক বেশি বেতন। সত্যজিতের মনে হতো, প্রতিষ্ঠানটির ‘ক্লায়েন্টরা ছিলেন মূলত বোকা।’

১৯৪৩ সালের দিকে সত্যজিৎ জড়িয়ে পড়েন ডি কে গুপ্তের প্রকাশনা সংস্থা ‘সিগনেট প্রেস’-এর সাথে। ডি কে গুপ্ত তাঁকে সিগনেট প্রেস থেকে ছাপা বইগুলোর প্রচ্ছদ আঁকার অনুরোধ করেন, একই সঙ্গে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ শৈল্পিক স্বাধীনতা দেন তাঁকে। ওই প্রতিষ্ঠানে থেকে অসংখ্য বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেন সত্যজিৎ। এর মধ্যে জিম করবেটের ম্যান-ইটার্স অব কুমায়ন ও জওহরলাল নেহেরুর দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কালজয়ী বাংলা উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র শিশুতোষ সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপু’র ওপরেও কাজ করেন। বিভূতিভূষণের লেখা এ উপন্যাসটি সত্যজিৎকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে এবং এটিকেই পরবর্তীকালে সত্যজিৎ তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু হিসেবে নির্বাচন করেন। বইটির প্রচ্ছদ আঁকা ছাড়াও এর ভেতরের অলংকরণও করেছেন তিনি। এই ছবিগুলোই পরে দৃশ্য বা শট হিসেবে স্থান পায় তাঁর সাড়া জাগানো চলচ্চিত্রে। এদিকে ১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ চিদানন্দ দাশগুপ্ত ও অন্যান্যদের সাথে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি। সোসাইটির সদস্য হওয়ার সুবাদে তাঁর সুযোগ হয় অনেক বিদেশি চলচ্চিত্র দেখার। এ সময় তিনি প্রচুর ছবি গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন; তাদের কাছ থেকে শহরে আসা নতুন মার্কিন চলচ্চিত্রগুলোর খবর নিতেন তিনি। এ সময় তিনি নরম্যান ক্লেয়ার নামের রয়েল এয়ার ফোর্সের এক কর্মচারীর সান্নিধ্যে আসেন, যিনি সত্যজিতের মতোই চলচ্চিত্র, দাবা ও পাশ্চাত্যের ধ্রুপদী সঙ্গীত পছন্দ করতেন। ১৯৪৯ সালে সত্যজিৎ বিয়ে করেন তাঁর দূরসম্পর্কের বোন ও বহুদিনের বান্ধবী বিজয়া দাশকে। সত্যজিৎ দম্পতির ঘরে ছেলে সন্দ্বীপ রায়ের জন্ম হয়, যিনি নিজেও বর্তমানে একজন প্রথিতযশা চলচ্চিত্র পরিচালক। ওই একই বছরে জ্যাঁ রেনোয়ার তাঁর দ্য রিভার চলচ্চিত্রটির শ্যুটিং করতে আসেন কলকাতায়। রেনোয়ারকে গ্রামাঞ্চলে চিত্রস্থান খুঁজতে সহায়তা করেন সত্যজিৎ। ওই সময়েই রেনোয়ারের সাথে ‘পথের পাঁচালী’-র চলচ্চিত্রায়ণ নিয়ে কথা বলেন তিনি। এ ব্যাপারে তাঁকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেন রেনোয়ার। ১৯৫০ সালে ডি জে কিমার সত্যজিৎকে লন্ডনে তাদের প্রধান কার্যালয়ে কাজ করতে পাঠান। লন্ডনে তিন মাস থাকাকালেই সত্যজিৎ প্রায় ৯৯টি চলচ্চিত্র দেখেন। এদের মধ্যে ইতালীয় নব্য বাস্তবতাবাদী ছবি ‘লাদ্রি ডি বিচিক্লেত্তে’ (‘সাইকেল চোর’) তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীকালে সত্যজিৎ একসময় বলেছেন, ওই ছবিটি দেখে সিনেমা হল থেকে বের হওয়ার সময়েই তিনি ঠিক করেন যে, তিনি একজন চলচ্চিত্রকার হবেন। সত্যজিৎ ঠিক করেন যে, বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী পথের পাঁচালী-ই হবে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রের প্রতিপাদ্য। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা এ প্রায়-আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসটিতে বাংলার এক গ্রামের ছেলে অপু’র বেড়ে ওঠার কাহিনী বিধৃত হয়েছে। এ ছবি বানানোর জন্য সত্যজিৎ কিছু পূর্ব-অভিজ্ঞতাবিহীন কুশলীকে একত্রিত করেন, যদিও তাঁর ক্যামেরাম্যান সুব্রত মিত্র ও শিল্প-নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত দুজনেই পরবর্তীকালে নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতিলাভ করেন। এ ছাড়া ছবির বেশির ভাগ অভিনেতাই ছিলেন শৌখিন। ১৯৫২ সালের শেষ দিকে সত্যজিৎ তাঁর নিজের জমানো পয়সা খরচ করে দৃশ্যগ্রহণ শুরু করেন। তিনি ভেবেছিলেন প্রাথমিক দৃশ্যগুলো দেখার পরে হয়ত কেউ ছবিটিতে অর্থলগ্নি করবেন। কিন্তু সে ধরনের আর্থিক সহায়তা মিলছিল না তাঁর। পথের পাঁচালী-র দৃশ্যগ্রহণ তাই থেমে থেমে অস্বাভাবিকভাবে প্রায় দীর্ঘ তিন বছর ধরে সম্পন্ন হয়। কেবল তখনই দৃশ্যগ্রহণ করা সম্ভব হতো যখন সত্যজিৎ বা নির্মাণ ব্যবস্থাপক অনিল চৌধুরী প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান করতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৫৫ সালে ছবিটি নির্মাণ সম্পন্ন হয় এবং ওই বছরই সেটি মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার পর পরই ছবিটি দর্শক-সমালোচক সবার অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করে এবং সেই সাথে বহু পুরস্কার জিতে নেয়। ছবিটি বহুদিন ধরে ভারতে ও ভারতের বাইরে প্রদর্শিত হয়। ছবিটি নির্মাণের সময় অর্থের বিনিময়ে চিত্রনাট্য বদলের জন্য কোন অনুরোধই সত্যজিৎ রাখেননি। এমনকি ছবিটির একটি সুখী সমাপ্তির (যেখানে ছবির কাহিনীর শেষে অপুর সংসার একটি ‘উন্নয়ন প্রকল্পে’ যোগ দেয়) জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুরোধও তিনি উপেক্ষা করেন। ছবিটি সম্পর্কে দ্য টাইম্স অব ইন্ডিয়া-তে লেখা হয়, ‘একে অন্য যেকোনও ভারতীয় চলচ্চিত্রের সাথে তুলনা করা অবান্তর… পথের পাঁচালী হলো বিশুদ্ধ চলচ্চিত্র’। অন্যদিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর সবচেয়ে প্রভাবশালী সমালোচক বসলি ক্রাউদার ছবিটির একটি কঠোর সমালোচনা লেখেন, যা পড়ে কেউ কেউ মনে করেছিলেন ছবিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পেলেও ভাল করবে না। কিন্তু এর বদলে ছবিটি সেখানে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দিন ধরে প্রদর্শিত হয়। চলচ্চিত্র মাধ্যমে সত্যজিৎ চিত্রনাট্য রচনা, চরিত্রায়ন, সঙ্গীত স্বরলিপি রচনা, চিত্রগ্রহণ, শিল্প-নির্দেশনা, সম্পাদনা, শিল্পী-কুশলীদের নামের তালিকা ও প্রচারণাপত্র নকশা করাসহ নানা কাজ করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরে তিনি ছিলেন একাধারে কল্পকাহিনী লেখক, প্রকাশক, চিত্রকর, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক। সত্যজিতের পরবর্তী ছবি অপরাজিত-এর সাফল্য তাঁকে আন্তর্জাতিক মহলে আরও পরিচিত করে তোলে। ছবিটি ভেনিসে গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার জেতে। অপু ত্রয়ী শেষ করার আগে সত্যজিৎ আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ সমাপ্ত করেন। প্রথমটি ছিল পরশ পাথর নামের একটি হাস্যরসাত্মক ছবি। আর পরেরটি ছিল জমিদারী প্রথার অবক্ষয়ের ওপর নির্মিত জলসাঘর, যেটিকে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রকৃত পক্ষে, সত্যজিৎ অপরাজিত নির্মাণের সময় একটি ত্রয়ী সম্পন্ন করার কথা ভাবেননি, কিন্তু ভেনিসে এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসা শুনে তাঁর মাথায় এটি বাস্তবায়নের ধারণা আসে। অপু সিরিজের শেষ ছবি অপুর সংসার ১৯৫৯ সালে নির্মাণ করা হয়। আগের দুটি ছবির মতো এটিকেও বহু সমালোচক সিরিজের সেরা ছবি হিসেবে আখ্যা দেন। এ ছবির মাধ্যমেই সত্যজিতের দুই প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শর্মিলা ঠাকুরের চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ ঘটে।

ব্যক্তিগত জীবনের ওপর কর্মজীবনের সাফল্যের তেমন কোন প্রভাব পড়েনি সত্যজিতের। তাঁর নিজস্ব কোন বাড়ি ছিল না; তিনি তাঁর মা, মামা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে এক ভাড়া বাড়িতেই সারাজীবন কাটিয়ে দেন। তাঁর স্ত্রী ও ছেলে দুজনেই জড়িয়ে ছিলেন তাঁর কাজের সাথে। বেশির ভাগ চিত্রনাট্য বিজয়াই প্রথমে পড়তেন, এবং ছবির সঙ্গীতের সুর তৈরিতেও তিনি স্বামীকে সাহায্য করতেন। আয়ের পরিমাণ কম হলেও সত্যজিৎ নিজেকে বিত্তশালীই মনে করতেন, কেননা পছন্দের বই বা সঙ্গীতের অ্যালবাম কিনতে কখনোই তাঁর কষ্ট হয়নি। কর্মজীবনের এই পর্বে সত্যজিৎ নির্মাণ করেন রাজ পর্বের ওপর চলচ্চিত্র যেমন দেবী, রবীন্দ্রনাথের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র, একটি হাস্যরসাত্মক ছবি ‘মহাপুরুষ’ এবং মৌলিক চিত্রনাট্যের ওপর ভিত্তি করে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। এছাড়াও তিনি বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, সমালোচকদের মতে যেগুলোর মতো করে ছবির পর্দায় ভারতীয় নারীদের এত অনুভূতি দিয়ে এর আগে কেউ ফুটিয়ে তোলেনি। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক পলিন কেল মন্তব্য করেন যে, ‘তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি সত্যজিৎ নারী নন, পুরুষ।’

অপুর সংসার নির্মাণের পরে সত্যজিৎ দেবী ছবির কাজে হাত দেন। হিন্দু সমাজের বিভিন্ন মজ্জাগত কুসংস্কার ছিল ছবিটির বিষয়। ছবিটিতে শর্মিলা ঠাকুর দয়াময়ী নামের এক তরুণ বধূর চরিত্রে অভিনয় করেন, যাকে তার শ্বশুর কালী বলে পূজা করতেন। শর্মিলা পরে এই ছবিতে তাঁর অভিনয় নিয়ে মন্তব্য করেন যে, দেবীতে তিনি নিজের থেকে কিছু করেননি, বরং এক জিনিয়াস তাঁকে দিয়ে সেটা করিয়ে নিয়েছিলেন। সত্যজিৎ আশঙ্কা করেছিলেন, ভারতীয় সেন্সর বোর্ড হয়ত ছবিটি প্রদর্শনে বাধা দেবে, বা হয়ত তাঁকে ছবিটি পুনরায় সম্পাদনা করতে বলবে, কিন্তু সেরকম কিছুই ঘটেনি। ১৯৬১ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর প্ররোচনায় সত্যজিৎ নির্মাণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে কবিগুরুর ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র। রবীন্দ্রনাথের ভিডিও ফুটেজের অভাবে সত্যজিৎকে মূলত স্থিরচিত্র দিয়েই ছবিটি বানানোর চ্যালেঞ্জ হাতে নিতে হয়। তিনি পরে মন্তব্য করেন, ছবিটি বানাতে তাঁর সাধারণের চেয়ে তিন গুণ বেশি সময় লেগেছিল। একই বছরে সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও অন্যান্যের সাথে মিলে সত্যজিৎ ‘সন্দেশ’ নামের শিশুদের পত্রিকাটি- যেটি তাঁর পিতামহ একসময় প্রকাশ করতেন, তা পুনরায় প্রকাশ করা শুরু করেন। এজন্য বহুদিন ধরে অর্থসঞ্চয় করেছিলেন তিনি। সত্যজিৎ পত্রিকাটির ভেতরের ছবি আঁকতেন ও শিশুদের জন্য গল্প ও প্রবন্ধ লিখতেন। পরবর্তী বছরগুলোতে লেখালেখি করা তাঁর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়।

১৯৬২ সালে সত্যজিৎ পরিচালনা করেন কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিটি। এটি ছিল তাঁর বানানো প্রথম মৌলিক চিত্রনাট্যনির্ভর রঙিন চলচ্চিত্র। ছবিটিতে ইন্দ্রনাথ রায়ের চরিত্রে রূপদানের জন্য সত্যজিৎ ছবি বিশ্বাসকে নির্বাচন করেন। এটিই ছিল ছবি বিশ্বাসের করা শেষ ছবি; এর কিছুদিন পরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ছবি। এসময় সত্যজিৎ একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে বিচারক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। যদিও তিনি অনুযোগ করতেন যে কলকাতার বাইরে তাঁর নিজেকে সৃষ্টিশীল মনে হতো না। ১৯৬৩ সালে মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ষাটের দশকে জাপান সফরের সময় সাক্ষাৎ করেন তাঁর অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়ার সঙ্গে। দেশে অবস্থানকালে কলকাতার ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে তিনি মাঝে মাঝে দার্জিলিং বা পুরিতে চলে যেতেন ও সেখানে নির্জনে চিত্রনাট্য লিখতেন।

সত্যজিৎ তাঁর সমসাময়িক চলচ্চিত্রকারদের চেয়ে সাধারণ জনগণের সাথে অনেক বেশি মিশেছেন। অচেনা লোকদের তিনি প্রায়ই সাক্ষাৎ দিতেন। কিন্তু সাক্ষাৎকারীদের অনেকেই সত্যজিৎ ও তাদের মাঝে একটা দূরত্ব অনুভব করতেন। বাঙালিরা এটাকে ভাবতেন তাঁর ইংরেজ মানসিকতার প্রকাশ, আর পশ্চিমিরা ভাবতেন তাঁর শীতল ও গম্ভীর আচরণ ছিল ব্রাহ্মণদের মতো। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কখনোই তেমন আলোকপাত করা হয়নি, তবে কারও কারও মতে, ষাটের দশকে অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

সত্যজিতের ছেলে সন্দ্বীপের অনুযোগ ছিল তিনি সবসময় বড়দের জন্য গম্ভীর মেজাজের ছবি বানান। এর উত্তরে ও নতুনত্বের সন্ধানে সত্যজিৎ ১৯৬৮ সালে নির্মাণ করেন তাঁর সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। এটি ছিল সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোরের লেখা ছোটদের জন্য একটি গল্পের ওপর ভিত্তি করে বানানো সঙ্গীতধর্মী রূপকথা। ছবিটির নির্মাণকাজ ছিল ব্যয়বহুল, এবং অর্থাভাবে সত্যজিৎ ছবিটি সাদা-কালোয় ধারণ করেন। যদিও তাঁর কাছে বলিউডের এক অভিনেতাকে ছবিতে নেয়ার বিনিময়ে অর্থের প্রস্তাব এসেছিল, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ৭০-এর দশকে সত্যজিৎ তাঁর নিজের লেখা জনপ্রিয় গোয়েন্দা কাহিনীর নায়ক ফেলুদার ওপর ভিত্তি করে সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথ ছবি দুটিও নির্মাণ করেন।

সত্যজিৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে একটি ছবি তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু পরে এ পরিকল্পনা ত্যাগ করেন এই মন্তব্য করে যে একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি শরণার্থীদের বেদনা ও জীবন-অভিযাত্রার প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিলেন, তাদের নিয়ে রাজনীতির প্রতি নয়। ১৯৭৭ সালে সত্যজিৎ শতরঞ্জ কি খিলাড়ি নামের একটি উর্দু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। মুন্সি প্রেমচাঁদ-এর একটি গল্প অবলম্বনে তৈরি করা হয় ছবিটি। এটিই ছিল বাংলা ভাষার বাইরে অন্য ভাষায় বানানো সত্যজিতের প্রথম চলচ্চিত্র। পরবর্তীকালে প্রেমচাঁদের গল্পের ওপর ভিত্তি করে হিন্দি ভাষায় এক-ঘণ্টা দীর্ঘ সদগতি নামের একটি ছবি বানান সত্যজিৎ। ১৯৮০ সালে সত্যজিৎ গুপী গাইন বাঘা বাইন ছবির পরবর্তী পর্ব হীরক রাজার দেশে নির্মাণ করেন, যেটিতে তাঁর রাজনৈতিক মতামতের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ছবিটির চরিত্র হীরক রাজা ছিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা ঘোষণাকালীন সরকারের প্রতিফলন।

সত্যজিৎ রায়ই দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব যাঁকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। প্রথম চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে অক্সফোর্ডের ডিলিট পেয়েছিলেন চার্লি চ্যাপলিন। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সরকার তাঁকে সেদেশের বিশেষ সম্মানসূচক পুরস্কার লেজিওঁ দনরে ভূষিত করে। ১৯৮৫ সালে পান ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে একাডেমি অফ মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সাইন্সেস তাঁকে আজীবন সম্মাননাস্বরূপ একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার প্রদান করে। মৃত্যুর কিছুদিন আগেই ভারত সরকার তাঁকে প্রদান করেন দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন। সেই বছরেই মৃত্যুর পরে তাঁকে মরণোত্তর আকিরা কুরোসাওয়া পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রয়াত পরিচালকের পক্ষে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন শর্মিলা ঠাকুর। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল প্রয়াত হন বহুমাত্রিকা প্রতিভাসম্পন্ন এ মানুষটি।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »