জয়নুল গ্যালারিতে টিটু দেবনাথের ‘শূন্য, এক’

motherhood_titu

মাতৃত্ব

 

।ফরিদা ইয়াসমিন রত্না। জীবনের সঙ্গে শিল্পকর্মের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়, বিচিত্র ও বহুমুখি। সাধারণত যাপিত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, বিশ্বাস ও অনুভবের নির্যাস চিত্রশিল্পীরা নিজস্ব শৈলীতে চিত্রিত করেন তাদের ক্যানভাসে।

শিল্পী টিটু দেবনাথের (যিনি নিজেকে শিল্পী নয়, শিল্পের মাধ্যম বলতে বেশী আগ্রহী) শিল্পকর্ম আপাত দৃষ্টিতে আধা-বিমূর্ত ও অস্পষ্ট বলে মনে হলেও নিবিড় পর্যবেক্ষণে বোঝা যায় তার কাজ সহজ, স্বতঃস্ফুর্ত ও সাবলীল। নিরীক্ষাধর্মী প্রবণতা বেশী লক্ষনীয় তার কাজে। আর তার প্রতিটি চিত্রকর্মে একেকটি ছোটগল্পের আভাস মেলে। এই ছোটগল্পগুলো যেন সম্মিলিতভাবে কোন এক মহাকাব্যের ইঙ্গিত দেয়।

টিটু দেবনাথের প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘শূন্য, এক’। এই শূন্য আর এক – এর পাশাপাশি সহাবস্থানটাই টিটুর জীবন দর্শনের প্রতীক হয়ে ওঠে। ভালো আর মন্দ, আলো আর অন্ধকার, সাদা আর কালোকে টিটু জীবনের পাশাপাশি চলা দুই সত্য হিসেবেই দেখতে চান। গত ৮মে চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে উদ্বোধন হয় সপ্তাহব্যাপি এই প্রদর্শনী। শিল্পীর মা শান্তি দেবনাথ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। উল্লেখ্য, টিটু দেবনাথের শিল্পী জীবনের গুরু- তার মা শান্তি দেবনাথ। মায়ের উৎসাহ উদ্দীপনা অনুপ্রেরণায় টিটুর শিল্পী জীবনের যাত্রা। চারুকলা অনুষদের ডীন শিল্পী নিসার হোসেন টিটু’র প্রথম একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগের প্রভাষক সুমন ওয়াহিদ টিটুর প্রদর্শনী নিয়ে বলেন, এই প্রদর্শনীটি শিল্পীর প্রথম একক প্রদর্শনী, যেখানে তার নিরীক্ষাধর্মী প্রবণতার প্রথম প্রয়াস দেখতে পাওয়া গেছে। কোন শিল্পীর প্রথম প্রয়াসের উপর ভিত্তি করে তাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা বা তিক্ত সমালোচনা কোনটাই করা সম্ভবত সমীচীন নয়। আর দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে টিটু’র সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়। খুব চেনা মানুষকে নিয়ে বা তার কাজ নিয়ে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কিছু লেখাটা বড্ড কঠিন। টিটু যখন প্রথম বর্ষের সমাপনী পরীক্ষা দিচ্ছে তখন থেকে তার সাথে আমার পরিচয়। চারুকলাতে প্রথম বর্ষে পেন্সিলের মাধ্যমে দক্ষতার উপরই জোর দেয়া হয়। কিন্তু সেই সময়ে টিটু অনুধাবন করে পেন্সিলের অনেক করণ কৌশলই তার অজানা। কিন্তু পরবর্তীতে তার দৃঢ় মনোবল ও কঠোর অধ্যবসায় তাকে বার্ষিক প্রদর্শনীতে পেন্সিলে ‘মাধ্যম সেরা’-র পুরস্কার এনে দেয়। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকায়নি সে। অন্যান্য মাধ্যমেও দক্ষতা অর্জন করে পা রাখে নিজস্ব প্রকাশভঙ্গির স্মারক নিরীক্ষামূলক কাজে। নিরীক্ষামূলক শিল্প নির্মাণেও টিটু তার একাডেমিক দক্ষতার উপরই আস্থা রেখেছে। তার ছবি দেখতে গেলে প্রধানত হালের জনপ্রিয় মাধ্যম এ্যাক্রেলিকের ব্যবহারটাই চোখে পড়ে বেশি। এছাড়াও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যম নিয়েও সে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। গেইম ফার্মে (Game Farm) চাকুরীর সুবাদে সিজি আর্টের নানা প্রভাবও এসে পড়েছে তার শিল্পকর্মে। সেই লক্ষণগুলি তার বর্ণে ও আঙ্গিক নির্মাণে দৃশ্যমান। তবে তার ‘আকৃতি’ শিরোনামের কাজটির কথা বলতেই হয়। এখানে সে প্রথাগত মাধ্যমকে অতিক্রম করে যাবার প্রবণতা দেখিয়েছে। কালি দিয়ে ঠোঁটের ছাপের মাধ্যমে ঠোঁট নির্মাণের প্রক্রিয়াটি কৌতুহলোদ্দীপক। ভিডিও আর্টের দিকেও তার ঝোঁক রয়েছে।

চিত্র সমালোচক মোঃ বজলুর রশিদ শাওন টিটুর প্রদর্শনী নিয়ে বলেন, প্রত্যেকটি কাজ আলাদা আলাদা বিষয়বস্তু নিয়ে হলেও পৃথক কোন উপলব্ধির দিকে না নিয়ে বরং একটা ঘটনা প্রবাহের অংশ হিসেবে অনুভূত হচ্ছে। কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে সারল্য এবং বর্ণলেপন পদ্ধতিতে একাডেমিক রীতির প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষনীয়। আবার বর্নলেপনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক রংগুলোই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে কিছু কিছু কাজে মনোক্রমিক রংয়ের ব্যবহারও দেখা যায়। ফলে আভ্যন্তরীন বিষয়বস্তু এবং বাহ্যিক উপস্থাপন রীতি সবমিলিয়ে একধরণের সিদ্ধান্তহীনতা, অনুমানকে প্রশ্রয় দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাথে প্রকাশ মাধ্যমের বৈচিত্র্য এক জটিল দোদুল্যমান মানসিকতাকে নির্দেশ করে যা সময়েরই অবদান। তাই গন্তব্য কোনদিকে তা বলা খুব মুশকিল। শুধু এতটুকু বলা যায় যে ‘এইতো সবে অসীমের পথে যাত্রা শুরু’।

প্রদর্শনীতে শিল্পীর অনেকগুলো শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে, যার মধ্যে আছে একটি ইন্সটলেশন আর্ট ‘thought producer’ বা চিন্তার উদ্ভাবক যা পুরো প্রদর্শনীতে যোগ করছে ভিন্নমাত্রা। ‘thought producer’ ইন্সটলেশন আর্ট নিয়ে টিটু বলেন; বিজ্ঞানের ভাষায় পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ জীবের বেঁচে থাকার অন্যতম কারন হচ্ছে রক্ত সঞ্চালন। তন্মধ্যে মানুষ নিজেকে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে দাবী করে এখন পর্যন্ত। শ্রেষ্ঠত্বের খেতাব অর্জনের সূচক হিসেবে ধরা হয় মানুষের চিন্তাশক্তি বা জীবন দর্শনকে পর্যবেক্ষণ করতে পারার ক্ষমতা, যেখানে মানুষের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার ভূমিকাই মুখ্য। তাহলে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার মধ্যে যদি মানুষই প্রবেশ করে তবে তার অনুভূতি কেমন হবে বা হতে পারে সেটাই পর্যবেক্ষণের প্রয়াস ছিল এই স্থাপনায়। প্রয়াসের প্রথম দিকে ধাতব বস্তুকে কোন রকম অবলম্বন ছাড়াই শূন্যে ভাসিয়ে রাখার প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু কারিগরি জটিলতার কারনে বর্তমান অবস্থায় রূপদান করতে হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে অভীষ্টরূপে উপস্থাপনের প্রত্যাশা রইলো।

‘শূন্য, এক’ প্রদর্শনীতে ’মাতৃত্ব’ (Motherhood) শিরোনামের কাজের মাধ্যমে টিটু বলতে চেয়েছেন- ‘কোথায় ছিলাম জানা নেই। চিকিৎসা বিদ্যার মারফত জেনেছি সহস্র কোটি DNA এর সাথে পাল্লা দিয়ে নাকি আমার বর্তমান অবস্থা। প্রকৃতির প্রকৃত নিয়মকে লঙ্ঘন করার কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু কোনটা যে প্রকৃত তাই বুঝতে কষ্ট হয়ে যায়।

‘সামষ্টিক ছবি’ বা ‘Collective Image’, শিল্পকর্মের ছোট গল্পটা বলা আবশ্যক। শব্দ, গন্ধ দৃশ্যের মত অনুভূতিসমূহ যা কিনা বস্তুগত রূপের প্রতিচ্ছবি তৈরি করে। যা কিনা ভাবগত সত্ত্বাকে বস্তুতে রূপান্তরিত করে আবার কখনো বা বস্তু থেকে ভাব-এ। মূলত মনস্তাত্ত্বিকতার স্ফুরন ঘটে অনিবার। ‘Endless Journey’ কাজের মাধ্যমে টিটুর ব্যাখ্যা এরকম- জীবন অসীম, প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে আজ অবধি চলছে। আগামীতেও চলবে বলে ধারনা করা যাচ্ছে।

‘After Civilization and Revolutions’ শিরোনামের শিল্পকর্মের পেছনের গল্পটা না বললে একটু অপূর্ণতা থেকেই যাবে। টিটু বলেন, নির্দিষ্টকরণ না থাকলেও প্রত্যেকটা সময়ের কিংবা প্রত্যেকটা ঘটনার এক একটা স্মারক ইতিহাসের ঝুলিতে জমা হয়। তাই স্বল্প সময়ের এই জীবনবোধ আমাকে প্রশ্ন করে, এতগুলো সময় তো পেরিয়ে গেলো, তবে শিশুটিকে আজও কেন রাস্তায় ঘুমাতে হচ্ছে?

 

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

2 comments on “জয়নুল গ্যালারিতে টিটু দেবনাথের ‘শূন্য, এক’
  1. Ahsan Babu says:

    Lekhata pore valo lagche.Titu ke all the best. Ratna ke onek onek dhonnobad lekhar jonno.
    Wish all the best all of you.

  2. golam kabir says:

    অসম্ভব সুন্দর হয়েছে লেখা টা। যেন স্রস্টার সৃস্টিতে মিশে উৎঘাটন করা হয়েছে তত্ত্ব।

Leave a Reply to Ahsan Babu Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »