শিল্পী রা কাজলের সাক্ষাৎকার

‘কোনো শিক্ষক যদি ছাত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি আর শিক্ষক থাকেন না’

ra_kajol

শিল্পী রা কাজল, থাকেন ডেনমার্কে। বাংলাদেশী এই শিল্পী মূলত বিষয় ভিত্তিক কাজ করেন। স্ট্রিট আর্টের সুবাদে নাম ওঠেছে গিনেজ রেকর্ড বুকে। ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে বর্তমান সমাজের নানারকম অসঙ্গতি, অস্থিরতা তাঁর কাজের মূল বিষয়। সমাজের এই অবক্ষয় প্রতিনিয়ত ভাবিত করে তাঁকে। দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তাঁর কাজের ধরণ ও বিষয়ে প্রাচ্যের দর্শন সুস্পষ্ট। কিছুদিন আগে দেশে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। ঢাকায় অবস্থানকালে চিত্রম’র পক্ষ থেকে শিল্পী রা কাজলের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শিবানী কর্মকার শিলু

চিত্রম: ছেলেবেলা কোথায় কেঁটেছে এবং কিভাবে কাটিয়েছেন?

রা কাজল: ঢাকায়, কমলাপুর টি এন্ড টি কলোনি। টি এন্ড টি স্কুলে পড়াশুনা। কলোনিতো, ওখানে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলটা বেশ পোক্ত ছিল। পরাশুনায় খুব একটা রেগুলার ছিলাম না। দুষ্টুমি করেই সময় কাটাতাম। ওই বয়সটা আসলে দুষ্টুমির মধ্য দিয়েই অনেক কিছু শেখা হয়। পাশাপাশি খেলাধূলা, সিনেমা দেখা বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত হওয়া, সংস্কৃতি পরিমন্ডলে প্রবেশ, শুরুটা যদি একটা কমিউনিটির মধ্য দিয়ে হয় তবে অনেক কিছু শেখা যায়।

চিত্রম: ছবি আঁকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা কিভাবে?

রা কাজল: ছবি আঁকার সাথে সম্পৃক্ততা ছোটবেলা থেকেই। এইট নাইনে পড়া সময় থেকেই কিছু কিছু আঁকছি। আঁকার বিষয়ে একটা ঝোঁক তৈরী হচ্ছে বলতে হবে। সব মিলিয়ে সবারই চোখে পড়ছে বিষয়টা। সেই থেকে আমার মায়েরও ইচ্ছা ছিল আমি আর্ট স্কুলে পড়ি।

চিত্রম: চারুকলার শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা যদি কিছু বলেন।

রা কাজল: আচ্ছা, তখন এসএসসি’র পর চারুকলায় ভর্তি হওয়ার নিয়ম ছিল। তো আমার এ ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আমাদের পারিবারিকভাবে পরিচিত জন ছিল রনবী ( শিল্পী রফিকুন নবী)। তখন তাঁর সাথে যোগাযোগ করে ইচ্ছার কথা জানালাম। ততদিনে ফাইন আর্ট ডিপার্মেন্টের ভর্তি শেষ। নবী স্যার তখন পরামর্শ দিলেন, যদি চারুকলাতেই পড়ার ইচ্ছা থাকে তবে এক বছর সময় নষ্ট না করে সিরামিক ডিপার্মেন্টে ভর্তি হওয়ার। এতে ছবি আঁকার চর্চা তৈরি হবে। আমারও চারুকলার পরিবেশ বেশ ভালো লেগে গেল, সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম। সিরামিক ডিপার্টমেন্ট তখন ছিল সার্টিফিকেট কোর্স। যেটা ইন্টারের সমমানও না। সিরামিক ডিপার্মেন্টের হেড যিনি উনিও চাচ্ছেন এ ডিপার্মেন্টে বেশি বেশি ছাত্র ভর্তি হোক। তাতে আন্দোলন করে একটা ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা যাবে। তো পরবর্তীতে যতবারই ফাইন আর্টসে পরীক্ষা দেই দেখা গেল, কোন কারণে আমাদের দুয়েক জনকে নিচ্ছে না। আমাদের ডিপার্মেন্টের হেড যিনি তিনিও ভর্তি বোর্ডের একজন সদস্য। বিষয়টা খুবই কষ্ট দেয় আমাকে। তো ক্লাস পরীক্ষা সব মিলিয়ে সিরামিকেই চার বছর কেটে গেল। পরবর্তীতে এডমিশন টেষ্ট দিয়ে পঞ্চম বছরে ফাইন আর্টসে ভর্তি হই। তো খারাপ লাগে যেটা অনেকগুলো বছর নষ্ট হয়ে যায়। বলা যায় খুব একটা সহজ ভাবে আমার চারুকলায় প্রবেশ হয়নি। এটা আমার জন্য পীড়াদায়ক। আমার মনে হয় যে শিক্ষকদের আরেকটু নমনীয় হওয়া প্রয়োজন। একজন শিক্ষক হবে পিতৃতুল্য। তার অনেক দায়।

চিত্রম: শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না, প্রকৃতপক্ষে পুরো সমাজের দায় একজন শিক্ষকের।

রা কাজল: হ্যা সেখানে একজন শিক্ষক যদি ছাত্রের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পরে অথবা কোনো শিক্ষক যদি ছাত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সে আর শিক্ষক থাকেনা সাধারণ একজন ব্যক্তি হয়ে যায়। একজন শিক্ষকের সমাজ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা থাকতে হবে। শুধু বই পড়েই যদি শিক্ষক হয় ছাত্রের সাইকোলজিটা ধরার দক্ষতা তার নাও থাকতে পারে। এ কারণেই ছাত্র শিক্ষকের দ্বন্দ সৃষ্টি হয়।

তো এই ব্যাপারগুলো আমার বেশ খারাপ লাগতো। সেই থেকে আমার চিন্তা কখনোই শিক্ষকতা করবোনা।  যেহেতু শিক্ষকতা করবোনা, ফার্স্ট ক্লাসও দরকার নেই, বরং সে সময়টা প্রচুর ঘোরাঘুরি করেছি প্রচুর জায়গায় গেছি বিভিন্ন লোকের সাথে পরিচয়, আলাপচারিতা এসবের মধ্য দিয়ে সোশ্যাল সাইকোলজি সম্পর্কে আমার একটা ধারণা তৈরি হয়। সেটা আমার জন্য বিশাল অর্জন। আগে সোশ্যাল সাইকলোজিটা ঠিক বুঝতে পারতাম না। আগে শুধু পারিবারিক সাইকোলোজিটা বুঝতাম। কে রাগী, কে স্নেহশীল এসব। সেই সূত্রে আমারও অনেক নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং যে দৃষ্টিভঙ্গি ছোটবেলা থেকে ছিল সেটাও বেশ প্রসার ঘটেছে। তার মধ্যে নতুন অনেক তথ্য যোগ হয়েছে। পুরানো একটা অভিজ্ঞতার সাথে নতুন একটা তথ্য যোগ হয়ে আলাদা একটা মাত্রা যোগ করে। দেখা যায় সেটার বিশ্লেষণ করতে করতে পাঁচ ছয় বছরও কেটে যায়। তো সহজে একটা বই পড়ে যে তথ্য পেতে পারতাম তার চাইতে নিজের দেখা, উপলব্ধি অনেক বেশি জরুরী। শিল্পী হওয়ায় তো দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটা আরো প্রকট হওয়া প্রয়োজন।

চিত্রম: আপনার কাজ সম্পর্কে কিছু বলুন।

রা কাজল: আমার ছবি মূলত বিষয় ভিত্তিক। সামাজিক পরিবেশ বা বর্তমান সময়কে কেন্দ্র করে যে ঘটনা গুলো ঘটছে, তারই প্রতিফলন ঘটে আমার ছবিতে। এর আগে আমার বিষয় বস্তুগুলো ছিল একটু ভিন্ন ধরণের। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আঁকা। আমার প্রথমটাই শুরু করি ‘কলোনি’ নাম দিয়ে। সত্তুরের শেষ দিকে এবং আশির দশকের শুরুর দিকে আধুনিক ছবি যারা আঁকছিলেন– চন্দ্র শেখর দে, হাসি চক্রবর্তি, মনসুরুল করিম ঠান্ডু, অলক রায়সহ আরও অনেকে মিলে তাঁদের একটা পেইন্টারস গ্রুপ ছিল। এরা একটু ভিন্ন ধরণের কাজ করতেন। অর্থাৎ এর আগের জেনারেশন থেকে আরেকটু আধুনিক ভাবে এ্যাক্সপ্রেশনিজমকে কেন্দ্র করে ছবি আঁকছিলেন। এগুলো দেখছি তাদের প্রদর্শনীতে হেল্প করছি আর এরই মধ্যে মাথার ভেতর ভাবনা তৈরি হচ্ছে আমি কী করবো। এরা কোনো না কোনো শিল্পী বা ইজম দ্বারা প্রভাবিত। যেমন ঢাকা পেইন্টার্স গ্রুপ নামে একটা গ্রুপ ছিল। তারা সুররিয়্যালিজম বেইস্ কাজ করতো। এরূপ বিভিন্ন ইজমকে বেইস্ করে কাজ হতো তখন সাধারণত।

আমার যেটা মনে হলো ঠিক এই ভাবে আমার দ্বারা সম্ভব না। এভাবে কাজ করাটা আমার জন্য ডিফিকাল্ট। ভিন্ন কিছু ভাবনা মাথার ভেতর খেলা করতো সবসময়। মনের ভিতর একটা প্রশ্নই ঘোরপাক খেত, হোয়াট ডু আই ওয়ান্ট। আমি কি চাই এবং কিভাবে সেটা প্রকাশ করবো। আর এই তাড়না থেকেই বিরাশি সালে যখন বিএফএ পরীক্ষা, তখন একাডেমির বাইরে কাজ করার ফ্রিডম চলে আসে।

চিত্রম: প্রথম প্রদর্শনী কবে করলেন?

রা কাজল: ঐ সময়ই শুরু, প্রথম প্রদর্শনি করবো সিদ্ধান্ত হলো। ভাবতে শুরু করলাম। ১৯৮২ তে কাজ শুরু করলাম। ১৯৮৩ পর্যন্ত পুরো এক বছর কাজ নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর প্রদর্শনী।

চিত্রম: প্রদর্শনীর বিষয় কি ছিল?

রা কাজল: বিষয় ভাবতে গিয়ে আমাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বেছে নিলাম। আমাদের ইতিহাসে বা আমাদের এই ভূখন্ডে আমাদের মূল সভ্যতা কোথায় ছিল? কারা ছিল? আর্য সভ্যতা সম্পর্কে আমরা জানি। আধুনিক ভারতবর্ষ আর্যদের দ্বারা প্রভাবিত। তারপর অন্যান্য শ্রেণির আবির্ভাব হয়। মোঘলরা আসে, ব্রিটিসরা আসে- এইভাবে আমাদের ভারতবর্ষে কলোনাইজেশন হয়ে যাওয়াতে আদি সংস্কৃতির সাথে নতুন নতুন সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটে। তারও আগে খুঁজতে গিয়ে, দ্রাবিড়িয়ান সিভিলাইজেশন ছিল। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, সিন্ধু নদীকে কেন্দ্র করে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। এ সভ্যতা আর্যরা আসারও দুই তিন হাজার বছর আগের সভ্যতা। সেটা ধ্বংশ হয়ে ছিল খ্রিষ্ট পূর্ব এক হাজার বছর আগের দিকে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা কোনো কারণে মাটির নিচে চাপা পরে যায়। একশ থেকে দেড়শো বছর আগে সম্ভবত এর নিদর্শন পাওয়া যায়। খুবই আধুনিক সভ্যতা, যৌক্তিক ভাবে করা।

এদের মধ্যে দার্শনিক এবং স্পেচ্যুয়ালিজম ছিল। আর যোগীদের যে উত্থান হয় সেটার একটা নিদর্শন সেসময় থেকেই পাওয়া যায়। একটা সিল্ পাওয়া গিয়েছিল ঐ সময়ের। ফাস্টিং বোদ্ধা বা উপবাসরত বোদ্ধার আদলে। তো কি করে বুদ্ধের এই প্রসার, বুদ্ধেরও দুই তিন হাজার বছর আগে ওখানে আসলো সেটা নিয়ে পর্যালোচনা করে ইতিহাসবিদরা এই সিদ্ধান্তে আসলো যে, যোগীক ব্যাস প্র্যাক্টিসটা তখন থেকেই ছিল। স্কাল্পচার কিছু পাওয়া গিয়েছিল। একটা স্কাল্পপচার ছিল টর্সো। পুরো বডি নেই, ছোট্ট। ওটার অবয়ব সম্বন্ধে বলছে যে এ্যানাটমিক্যালি সম্পূর্ন কারেক্ট না, কিন্তু এর মধ্যে একটা ইন্টার্নাল ডায়নামিজম আছে। ঐটা আমাকে ফার্স্ট ধারণা দেয়, ইন্টার্নাল ডায়নামিজম কি। একচ্যুয়ালি আমাদের নিজস্বতা যদি বলি এটাই। পশ্চিম সভ্যতায় তাদের উত্থান যেভাবে হয়েছে। গ্রিক, হ্যালেনিক বা তারও পর থেকে। যেমন গ্রিকে এক্সটার্নাল ডায়নামিজমের ব্যবহার করেছে বেশি। অর্থাৎ এনাটমিক্যাল একটা পার্ফেকশন তারা রাখতে চেয়েছে। পরবর্তিতে রোমান, রেঁনেসা পুরো পশ্চিম শিল্প সমাজটাই এক্সটার্নাল ডায়নামিজমের চর্চা করতো। যাহোক আমার মূল চিন্তাটা ছিল ইন্টার্নাল ডায়নামিজম। আরেকটা পোর্ট্রেইটের নিদর্শন পাওয়া গেল। বেশ ছোট। বাহু নেই, বুক পর্যন্ত আছে। এই প্রতিকৃতির মধ্যে তিনটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য একই সাথে বিরাজমান। ধর্ম যাজক, রাজা এবং দাস। তার চেহারার ধরণ যেভাবে বানিয়েছে পুরু ঠোঁট। যেটা আফ্রিকান দাসের প্রতিক বলা যায়। হাতে তাবিজের মতো কিছু একটা যেটা দিয়ে তাকে ধর্ম যাজক বলা যেতে পারে। কপালে একটা ব্যান্ডের মতো বাঁধা যা দিয়ে তাকে রাজাও বোঝা যায়। প্রতিটা মানুষের মধ্যেই এই তিনটা চরিত্র বিরাজমান। যখন আমি জিততে চাই তখন একটা রাজা সুলভ ভাব আসে। যখন নিজেকে সর্বশক্তিমান বা এরূপ কিছু ভাবনা ধর্মীও চিন্তা থেকে আসে তখন নিজেকে ধর্ম যাজকের ভুমিকায় দেখি। আবার এই ভাবনা কাজ করে যে আমাকে বাঁচতে হবে। জমি কর্ষণ করে বা যে কোনো কায়িক শ্রম দিয়েই হোক অথবা বর্তমান সময়ে চাকুরী প্রথাই যদি বলি সেটা কিন্তু দাসপ্রথারই অংশ। তো সবগুলো চরিত্রই কিন্তু আমাদের মধ্যে আছে। বলা যায় এই তিনটি চরিত্রই সব মানুষের মধ্যে চক্রাকারে ঘুরছে। এই বিষয়টাকেই আমি সিম্বলিক হিসেবে আমার পেইন্টিঙের মধ্যে আনলাম ‘কলোনি’ সিরিজে। সেটাই ছিল আমার প্রথম সিরিজ পেইন্টিং। এই বিষয়কে কেন্দ্র করে দশটি ছবি আঁকলাম। সেটা ছিল ১৯৮৩ সাল।

‘কলোনি’ দিয়ে শুরু করলাম। তারপর ‘সোসাইটি’। সোসাইটি সিরিজের পেইন্টিংয়ে ১৯৮৪ তে কাজ শুরু। বেশির ভাগ কাজ করি ১৯৮৫ তে। ১৯৮৬ তে শেষ করে ঐ বছরই প্রদর্শনী করি।। কয়েকটা ভাগে করা ‘সোসাইটি ইন ফায়ার’। অর্থাৎ সমাজ অগ্নিকুন্ডে। সমাজে ক্রান্তিকাল চলছে। তখনকার সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করে, এই সময়ে এসে সমাজে যে অস্থিরতা, পেট্রল বোমা, বাস পুড়ছে, ব্যপারটা আগেই জেনে গেছি যে এমনই হবে। বুঝতে পারছিলাম সোসাইটিতে আগুন ধরছে। চারিদিকে জোর যার মুল্লুক তার, এই প্রবনতা সমাজে বিরাজমান। তো এই অবক্ষয় যে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধাবিত হবে তা সে সময়ই স্পষ্ট ছিল। এরপর ‘লাভ’ সিরিজের কাজ করলাম।

১৯৯২ য়ে ঢাকা আসলাম। সে সময়ের সামাজিক অস্থিরতা আমার কাজে বেশ প্রভাব ফেললো। সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে আমি বেশ কিছু কাজ করি নব্বই দশকে। ড্যামোক্রেজি নাম দিয়ে একটা প্রদর্শনী করেছিলাম পঁচানব্বই ছিয়ানব্বই এর দিকে। এর আগে ভায়োল্যান্স নিয়ে কাজ করলাম। তিরানব্বইয়ে জয়নুল গ্যালারিতে প্রদর্শনী হলো। তারও আগে বিরানব্বইতে “ইনব্যালেন্স ওয়ার্ল্ড” শিরোনামে প্রদর্শনী করলাম লা গ্যালারিতে। সে সময় ভায়োল্যান্স এমন প্রকট আকারে শুরু হলো। রায়ট শুরু হয়ে গেল। বাবরী মসজিদ নিয়ে প্রচণ্ড মারামারি খুনাখুনি হচ্ছে। সারা দেশে তখন মৌলবাদীদের উত্থান। এই বিষয়গুলো আমাকে প্রচণ্ড পীড়া দেয় সে সময়।

ইউরোপে থাকাকালীন বেশ কিছু কাজ করি। এর মধ্যে শীতকালীন প্রকৃতি নিয়ে একেছিলাম ‘হিমাগ্নী’ অর্থাৎ ‘কোল্ড ফায়ার’। শীতকালীন প্রকৃতি দেখতে কেমন সেটাই প্রধান। শুকনো ডালে বরফ পড়ে আছে। এই দৃশ্যটায় মানুষের মনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় সেটা হয়তো আঁকছি না, প্রকৃতিটা আঁকছি। তো কোনো বিষয় যখন মনের মধ্য আন্দোলিত হয়, সেটার সাথে নিজস্ব ভাবনার একটা দ্বন্দ তৈরী হয়। সে দ্বন্দ যখন একটা সহজ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় তখনই দেখা যায় স্বতস্ফুর্ত ভাবে একটার পর একটা ছবি আঁকছি। স্বতস্ফুর্ততা না থাকলে আমি আঁকতে পারিনা।

২০১২ তে ‘ফিলোসোফি অব্ লাইফ’ শিরোনামে প্রদর্শনী করলাম বেঙ্গল গ্যালারিতে। ২০১৪ তে কন্সপিরেচ্যুয়াল শিরোনামে শেষ একক প্রদর্শনীটা এ্যাডভান্স চিন্তা থেকে করা। এটা মূলত টেকনিক নির্ভর কাজ। আঙ্গুল দিয়ে ফোল্ড করে পেপারে করা। ২০০৭ থেকে এই টেকনিক শুরু করি। এখানে সব মানুষের মাথা একই ভাবে আঁকা। এর অর্থ সব মানুষ গুলো রোবোটিক হয়ে যাচ্ছে। সবার মাথাটা একরকম দেহটা ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। মাথা আমাদের পরিচালনা করে। টেকনোলজি যেভাবে ছেয়ে যাচ্ছে তাতে সারা পৃথিবীর সব লোক একই ভাবনা ভাবছে। সবার মাথা এক হয়ে যাচ্ছে। আলাদা আলাদা কোনো সংস্কৃতি আর থাকছে না।

চিত্রম: অর্থাৎ প্রযুক্তিগত কারণে মানুষ তার বৈচিত্র্য হারাচ্ছে?

রা কাজল: হ্যাঁ একটা পর্যায়ে যখন জাতিগত বৈষম্য হারাবে তখন টেকনিক্যালি যে বেশি ডেভলপ, সেই এগিয়ে যাবে। সেটা আমেরিকাও হতে পারে বাংলাদেশও হতে পারে। কন্সসেপচ্যুয়াল কন্সপিরেসি অর্থাৎ সভ্যতার সৃষ্টিই কন্সপিরেসির মাধ্যমে। প্রতিটা সভ‍্যতায় সাম্রাজ্যবাদ থাকে। সাম্রাজ্যবাদের একটা কনসেপ্ট থাকে। সেটাকে ফলস্রোত করার জন্য একটা কন্সপিরেন্সির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কন্সেপচুয়াল কন্সপিরেন্সি, দিজ্ ইজ্ দ্যা মেইন সোর্স অব্ সিভিলাইজেশন। তো আমার কাজের ব্যাখ্যা হলো একটা নতুন সিভিলাইজেশন হবে ট্যাকনোলজি কন্সপিরেন্সিতে। মানুষ নিজ থেকে আর কাজ করবেনা। আমাদের প্রোগ্রামগুলোই আমাদের রি প্রোগ্রাম করবে। অর্থাৎ নির্দেশনা পেলে মানুষ কাজ করবে নয়তো নয়।

চিত্রম: বলতে চাচ্ছেন মানুষ তার কর্মক্ষমতা হারাবে

রা কাজল: হ্যাঁ বিষয়টা এমনই দাঁড়াবে। কর্মক্ষমতা কমবে আবার মাথার ক্ষমতা হয়তো বেড়ে যাচ্ছে। যারা কম্পিউটার ব্যবহার করছে, তারা কিন্তু বিশাল একটা সময় দিচ্ছে। সারাটা দিন ব্যায় করছে এর পেছনে।

চিত্রম: কিন্তু গুটি কয়েক মানুষ ট্যাকনোলজির যে ডেভেলপ করছে, সবকিছু অনেক সহজ করে দিচ্ছে, তাতে আপামর জনসাধারণ কি অলস হয়ে যাচ্ছে না?

রা কাজল: না, যারা কম্পিউটারে টেকনোলজি ডেভেলপ করছে তাদের কথা বলছি না। যারা ফেইসবুক ইউজ করছে তারা কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা সময় দিচ্ছে। তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে। সবমিলিয়ে একটা ফেইসবুক সোসাইটি তৈরি হচ্ছে। হয়তো পাশে বসা মানুষটির প্রতি তার নজর নেই। অর্থাৎ ভার্চুয়াল কানেকশন অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বাস্তব যোগাযোগের চেয়ে।

চিত্রম: ব্যাপারটা কি পজিটিভলি দেখছেন?

রা কাজল: না, এখানে দেখার কিছু নাই। যা হওয়ার তা হবেই টুডে টুমোরো। সকলেই আগে থেকে একটা উত্তর পেতে চায়, ভালো কী মন্দ। কেউ আসলে জানেনা কী হবে। প্রযুক্তি শুরু হয়েছে এটা চলতেই থাকবে। যে যতটা পারছে এটা নিয়ে ব্যবসা করছে। এটা এখন টাকা আর্নের একটা সোর্স। তো এর জন্য দশ জনের ক্ষতি করে হলেও নিজেরটা আদায় করে নিচ্ছে। এটা এই সময়ে হচ্ছে। কিছু দিন আগেও মানুষ কিন্তু চিন্তাও করতে পারতো না অন্যের ক্ষতি করে নিজে এগিয়ে যাবে। তো এটা সময়ের দাবী।

চিত্রম: কোন মাধ্যমে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।

রা কাজল: সব মাধ্যমেই। প্রথম দিকে যখন তেল করতাম, ভালো লাগতো কিন্তু ডেনমার্কে বদ্ধ পরিসরে তেলরঙে কাজ করা ডিফিকাল্ট।

চিত্রম: আপনার রাস্তা চিত্রন সম্পর্কে কিছু বলুন।

রা কাজল: ওটা করি পাশাপাশি কিছুতো একটা করতে হবে। আর্নিং সোর্সটা যদি আর্ট রিলেটেড হয় সেটা অনেক বড় সাপোর্ট শিল্পীর জন্য। তো ওরা আমার কাজ বেশ এপ্রিসিয়েট করে। কোন লেআউট ছাড়াই যখন বড় কোন নকশা তৈরি করি ওরা বেশ অবাক হয়েই অভিনন্দিত করে, এই।

চিত্রম: শিল্পী জীবনে কার অনুপ্রেরণা সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে।

রা কাজল: মানুষ, মানুষ আমার মূল অনুপ্রেরণা। এবং সমাজ, প্রকৃতি। হ্যাঁ ব্যক্তিগতভাবে মানসিক বা সার্বিক সহযোগিতার কথা যদি বলো, তবে বলতে হয় আমাকে সব চাইতে বেশি সহযোগিতা করেছে আমার স্ত্রী লিস্। লিসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় একাশি সালের দিকে। তারও আট দশ বছর আগের কথা আর্ট কলেজের শুরুর দিকে, যেহেতু মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা, তো স্বপ্ন ছিল যদি কেউ একজন আমাকে পেট্রোনাইজ করতো, ঘর দিত, খাওয়ার ব্যবস্থা করতো আমি শুধু ছবিই আঁকতাম সারাদিন। লিস ডেনমার্কের একটা এনজিও’র সাথে জড়িত থাকায় বছরে দু’তিন বার আসতো। তখন প্রায়ই ওর সাথে আলাপ হতো। এক পর্যায়ে বন্ধুতা। পরবর্তীতে আড়াই বছরের জব্ নিয়ে আসে এদেশে। ও তখন আমাকে একটা রুম অফার করে। আমিও স্টু্ডিও পেয়ে গেলাম। ওই থেকেই শুরু।

চিত্রম: শিল্পী জীবনে প্রবেশ করার দ্বার খুলে গেল বলতে হয়।

রা কাজল: অনেকটা তাই। তো সব শিল্পীর মতো আমারও স্বপ্ন ছিল দেশের বাইরেটা দেখার বিশেষ করে ইন্ডিয়া, ইউরোপ। তো সব স্বপ্নগুলোই ধীরে ধীরে পূরণ হতে লাগলো।

চিত্রম: পরিশেষে কিছু বলুন।

রা কাজল: আমাদের ঐতিহাসিক প্রক্ষাপটে অনেক উপাদান আছে। অনেকেই এর থেকে নিয়ে বিষয় নির্বাচন করেছে। আমি নিজস্বতা খুঁজতে গিয়ে এর ইন্টার্নাল ডায়নামিজমটা নিলাম। তো আমি যখন দেশের বাইরে এ কাজগুলো দেখালাম, ওরা দেখেই বললো- তুমি যে এশিয়া থেকে এসেছো তোমার কাজ দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু বাংলাদেশেই এই কাজগুলোই হয়তো কোনো মূল্যায়ন করছে না।

এগুলো খুব জরুরী আমার ছবি বুঝতে হলে। আমি কখনই তথাকথিত একাডেমিক ছবি আঁকি না। শুরু থেকেই আমি থিম বেসিস কাজ করি। সেই কাজের ভাবনা বা প্রস্তুতি পর্বে হয়তো ছয় মাস এক বছর দের বছর চলে যায়। যেমন আমি এখন কোনো ছবি আঁকছি না। বিষয়টা নিয়ে ভাবছি। ভাবনার জায়গায় বিভিন্ন টানাপোড়েন চলছে। হ্যাঁ আস্থার জায়গায় পৌঁছুলে হয়তো আঁকতে বসবো।

বিষয়গুলো চিন্তা করে নিজের মধ্যে যখন একটা বিশ্বাস তৈরী হয়, আস্থা আসে, তারপরই আমি কাজ করতে বসি। কনফিউশন থাকলে ঠিক আঁকতে পারিনা। কনফিউশনে থাকতে থাকতে এক পর্যায়ে এসে সাজিয়ে-গুছিয়ে ভাবার যে জায়গাটা তৈরি হয় তখন মনে হয় এটাই আমার দরকার।

শিল্পীকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ঘটনা প্রভাবিত করবে এটাই স্বাভাবিক। প্রতিটি শিল্পীর একটা নিজস্বতা আছে। এই নিজস্বতাই একজন শিল্পীর প্রধান গুণ।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »