উদযাপিত সহিংসতা-৩

রিপন সাহার গণনা খেলা

rippon1

রেড হিট ১ / ১০৮X৭৫ সে.মি.

।ফারাহ নাজ মুন। আমাদের দেশে একের পর এক ঘটে যাচ্ছে সহিংস ঘটনা। সহিংস ঘটনাগুলো তৈরী করছে আবার পক্ষ- বিপক্ষে। পক্ষ বিপক্ষের তর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা সরব আবার কখনো এসব ঘটনায় আমরা নির্বিকার। সন্ত্রাস এখন জীবনের অংশ, অনুষঙ্গ। দৈনিক পত্রিকা প্রতিদিন সেই সত্যের মুখোমুখি করে দেয়। প্রতিদিনের অসংখ্য অভিজ্ঞতা, প্রতিবাদহীনতা ধীরে ধীরে সন্ত্রাসকে গ্রহণযোগ্য করে তুলছে সমাজে।

এ নির্বিকার মনোভাব, ঘটনার যোগসূত্র সবকিছুই একইসূত্রে বাধা। বিষয়টা এরকম হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমরা এই ভায়োলেন্সকে একরকম উদযাপন করছি বলেই মনে হচ্ছে।

‘আমরা তখন যারা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করেন তাদের শিল্পকর্ম নিয়ে প্রদর্শণীর আয়োজন করার শুরু করি। এটি আমাদের তৃতীয় কিউরেটেড প্রদর্শনী’- বললেন এ প্রদর্শনীর অন্যতম কিউরেটর কেহকাশা সাবাহ।

কলাকেন্দ্রের প্রথম আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম ‘উদযাপিত সহিংসতা ৩’ নামক তিন সপ্তাহ ব্যাপী এ কিউরেটরিয়াল শিল্পপ্রদর্শনী। ‘উদযাপিত সহিংসতা ৩’ -এর এবাবের উপস্থাপনা চট্টগ্রামের তরুন শিল্পী রিপন সাহার চিত্রকর্ম নিয়ে ‘এ ক্যালকুলেটেড গেম’ নামক একক শিল্প আয়োজন। উল্লেখ্য ‘উদযাপিত সহিংসতা’ -এর ধারণা নিয়ে বিগত ২০১৪ থেকে কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমান ও কেহকাশা সাবাহ কাজ করে আসছেন; ‘উদযাপিত সহিংসতা ১ এবং ২’ বিগত ২০১৪ এর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে যথাক্রমে ঢাকা আর্ট সেন্টার ও ঢাকা আর্ট সামিট-এ প্রদর্শিত হয়েছিল।

প্রদর্শনী কক্ষে ঢুকতেই চোখে পড়ে হামাগুড়ি দেয়া শিশুদের দিকে। নিস্পাপ শিশুদের দিকে তাকালেই মোচড় দিয়ে ওঠে বুকের ভেতরটা। শিশুর সঙ্গে সহিংসতাকে মিলিয়েছেন শিল্পী। সমাজের সবাই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়লেও সবসময় এড়িয়ে যায় শিশুরা। শিশুরা এ সহিংসতায় আক্রান্ত হয় সবচেয়ে বেশী এবং বেশ নীরবেই থাকে এই আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাগুলো। নীরব থাকে রাষ্ট্র, নির্বাক থাকি আমরা যারা সাধারণ তারাও। শিল্পী সাদা-কালোয় করা ক্যানভাসে একটি শিশুকে তুলে ধরেন বটির উপর নিচে শিল্পীর নিজের পোট্রেট, সঙ্গে যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ। ক্যালকুলেশন সিরিজের আরেক ছবিতে দেখা গেল শিশুর সঙ্গে কাচামরিচ । এ প্রসঙ্গে শিল্পী বললেন ,’চট্টগ্রামে বস্তির এক শিশুকে দেখেছিলাম, যার মরিচ খেলে ঝাল লাগত না। ব্যাপারটি যখন সে বুঝে গেল যে তার ঝাল না লাগলেও অন্যদের লাগে, তখন সে অন্য শিশুদের মরিচ খাইয়ে দিতে চাইত। এভাবে তার কাছে মরিচ হয়ে গেল অস্ত্র।’

রিপন সাহা তার ক্যালকুলেশন সিরিজ শুরু করেন যখন তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় তখন। ক্যালকুলেশন সিরিজ আকার সময় তিনি ভীষণভাবে আর এইচ গিগার কে অনুসরণ করতেন সেজন্য তার কিছু কাজের সাথে গিগারের কাজের মিল পাওয়া যায়। রিপন সাহার কাজে একধরনের স্যাটায়ার রয়েছে, রয়েছে খুব সাধারণ গল্প, যে সাধারণ গল্পটিও তার কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এরকমই একটি ভায়োলেন্স নিয়ে করা ছবির পেছনের গল্প হলো, চট্টগ্রামে সেসময় একবার গোলাম আযম এসেছিল। সেবার সবাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল গোলাম আযমের আগমন ঠেকানোর। সেসময় পুলিশের গুলিতে কলেজিয়েট স্কুলের একজন ছাত্র মারা যায়। সে ছেলেটি তার ডায়রিতে জীবন দিয়ে হলেও গোলাম আযমকে ঠেকানোর কথা লিখেছিল।

রিপন সাহার ছবিতে আইনস্টাইন, কার্ল মার্কস, সুলতানের উপস্থিতি পাওয়া যায় ঘুরেফিরে। এ নিয়ে শিল্পী বলেন, মানুষের চিন্তার জগতে কাল মার্কস বিপ্লব ঘটিয়েছিল। একজন ইউরোপীয়ান হয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরোধীতা করতে শিখিয়েছিল মার্কস। বিপ্লব এখন অসম্ভব হলেও মার্কসকে খারিজ করা যায়না। তাই বিপ্লবের মানদন্ড আর বিপ্লব যাই বলেন না কেন- তাকে প্রতীকি হিসেবে উপস্থাপন করি। ..সুলতান হলো আমাদের আর্টের কার্ল মার্কস। আর আইনস্টাইনের কাজের প্রতি পাগলামো আমার ভালো লাগে। সুলতানের প্রথম বীজ বপন আমার কাছে ম্যানিফেস্টোর মতো।’

রিপন সাহা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ড্রইং এ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগ থেকে পড়াশোনা করেছেন। তার প্রথম একক প্রদর্শনী হয় চট্টগ্রামে ২০১৪ সালে। এটি তার দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী। প্রদর্শনী চলবে ২৩ মে পর্যন্ত। প্রদর্শনীর শেষদিন আর্টিস্ট টকে উপস্থিত থাকবেন শিল্পী ঢালী আল মামুন ও শিল্পী নিজে।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

One comment on “রিপন সাহার গণনা খেলা
  1. প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী রিপন সাহার কাজ ব্যাক্তিগত ভাবে আমি খুব পছন্দ করি। ধন্যাবাদ তাকে তার কাজের জন্য। ফারাহ নাজ মুন কে ধন্যবাদ চমৎকার লেখার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »