বিউটি বোর্ডিংয়ে জংশনের চিত্র প্রদর্শনী

পেন্সিলে আঁকা ‘স্মৃতি আলেখ্য’

Junction pic2

 

 

।সুমিমা ইয়াসমিন। এই মেঘ, এই রোদ্দুর— দিনটি ছিল এমনই। বিউটি বোর্ডিংয়ে সেদিন তরুণ চিত্রকরদের শিল্পকর্ম যেন মেতে উঠেছিল মেঘ-রোদ্দুরের গল্পে, যাপিত জীবনের বিবিধ বোধে, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বিস্ময়ে। শিল্পীর ভাবনা যখন রেখায় মূর্ত, দর্শকের অনুভবে তখন জেগে ওঠে এক ‘স্মৃতি আলেখ্য’। স্মৃতির উঠোনে তখন কোন্ পুরাতনী সুর মনকে ভরিয়ে রাখে জানি না, তবে আবছায়াতেও ঠিক ঠিক চেনা যায়, যা কিছু চিরন্তন সুন্দর।

আর্টিস্ট গ্রুপ জংশনের উদ্যোগে গত ১২ জুন একটি চিত্র প্রদর্শনী ও সম্মিলনীর আয়োজন করা হয় বাংলাবাজারের ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিংয়ে। শিরোণাম ‘স্মৃতির আলেখ্য’। সাতজন শিল্পীর পেন্সিলে আঁকা চিত্রকর্ম নিয়ে এই প্রদর্শনীতে প্রায় শতাধিক চিত্র প্রদর্শিত হয়। অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেন রহিমা আফরোজ, আমজাদ আকাশ, ফাতেমা মুন্নী, আলমগীর হোসেন তানজীব, কামরুজ্জোহা, উম্মে সোহাগ, ইকবাল বাহার চৌধুরী।

প্রদর্শিত চিত্রকর্মগুলোর রেখায়-রেখায় যেন হাজারো কথা। বিবিধ থিমে চিত্রগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে মূর্ত, বিমূর্ত ও অর্ধবিমূর্ত নানা রূপ। যাপিত জীবনের প্রাত্যহিক আনন্দ-বেদনার পাশাপাশি দ্রোহে-বিদ্রোহে জেগে ওঠা বোধের পরিচয় মেলে এতে। কোনো কোনো চিত্রের সামনে একটু থমকে দাঁড়াতেই হয়, চিত্রের আকুতি যেন কিছুক্ষণ আবিষ্ট করে রাখে কোনো এক মোহে। কোনো চিত্র আবার দৈনন্দন গল্পের ঝাঁপি মেলে ধরে। রেখার খেলায় যেন জীবনকে মাতিয়ে তোলেন শিল্পী।

নিখুঁত কাজের পেছনে শিল্পীর নিবিষ্ট মনোযোগ আর শ্রমের অতুলনীয় প্রয়োগ অস্বীকার করার অবকাশ নেই। বেশকিছু চিত্রে সেই মনোযোগ আর শ্রমের পরিচয় মিললো। নির্মাণ ও বিনির্মাণে এক একটি চিত্রপটে নানান ভাবনার খেলা। কখনও মনে হয়, এই তো এখানেই জীবনের সুখের সুরধারা। কখনও মনে হয়, এখানেই বিদ্রোহের রূপ, এখানেই জীবনের নব সূচনা। রাজনীতি ও সমাজের নানা ইস্যু বরাবরই শিল্পীকে আন্দোলিত করে। আর তার রেশ পাওয়া যায় শিল্পকর্মে।

এসব ড্রয়িং যেন শুধু একেকটি শিল্পকর্ম নয়, একেকটি সময়ের সাক্ষি। মাধ্যমটা পেন্সিল হলেও প্রত্যেক শিল্পী কাজ করেছেন স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে। তাই সহজেই আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিল কাজের বিবিধ ধারা। রেখাচিত্রে ফুটে ওঠা ল্যান্ডস্কেপ যেমন মোহিত করে, তেমনি রেখার টানে চিত্রিত মুখাবয়বে ক্ষোভের ভাষা কখনো বা একাত্মবোধের জন্ম দেয়।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘অঙ্কনে পেন্সিল একটি অকৃত্রিম মাধ্যম। আমরা চেয়েছি, এই মাধ্যমটির চর্চা ভিন্নমাত্রা যোগ করুক আমাদের অঙ্কন শৈলীতে। প্রাত্যহিক জীবনের সাথে পেন্সিলের যোগসূত্র প্রাচীন। প্রাত্যহিক জীবনের চিত্রকে তুলে আনতে চেয়েছি পেন্সিলের রেখায়। আর বিউটি বোর্ডিং ঐতিহ্যের দিক থেকে সুপরিচিত। দেড়শ বছরের পুরনো এই ভবনটি এখনও জেগে আছে নবীন-প্রবীণের আড্ডার হুল্লোড়ে। এখানে যাঁরা আড্ডা দিতেন, প্রখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, চিত্রকর, সাংবাদিক, তাঁদের অনেকেই এখন আর নেই। আছে শুধু তাঁদের স্মৃতি।

আমরা আমাদের কাজের সাথে বিউটি বোর্ডিংয়ের ঐতিহ্যের সাদৃশ্য খুঁজতে এখানে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি। কারণ বিউটি বোর্ডিংও যুগে যুগে প্রাত্যহিক জীবনের নানা ঘটনার সাক্ষি। আর এটা প্রথাগত প্রদর্শনী শুধু নয়, এখানে উপস্থিত হওয়া নবীন-প্রবীণের আড্ডা ও আলোচনার মাধ্যমে আমরা আমাদের সৃজিত শিল্পকর্মের ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেছি।’

জংশন মূলত সমসাময়িক শিল্পীদের একটি গ্রুপ। যেখানে তরুণ শিল্পীরা শিল্পের চর্চা করেন সম্মিলিত আলোচনা ও চর্চার ভিত্তিতে। মননে তরুণ যে কোনো শিল্পী এখানে কাজ করতে পারেন গ্রুপের নীতিমালা মেনে। মুক্তচিন্তার মাধ্যমে শিল্পচর্চার একটি প্ল্যাটফর্ম জংশন। এর যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। প্রথম দলীয় প্রদর্শনীর শিরোণাম ছিল ‘জংশন’। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা আর্ট সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় এই প্রদর্শনী। এরপর আরেকটি দলীয় প্রদর্শনী ‘হুইসেল’। এটি ২০১৩ সালের জুনে শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে জেগে ওঠা শাহবাগ আন্দোলনকে সামনে রেখে শাহবাগে ইনস্টলেশন আর্ট উপস্থাপন করে জংশন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও অনেক আর্টপ্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছে জংশন।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »