পারফরমেন্স আর্ট: ইউরোপের পাসপোর্টে বাংলাদেশে প্রবেশ

পারফরমেন্স আর্ট ও বাংলাদেশ

mahbub_e1_7

২০০৪ সালে, সেকেন্ড সাইকেল অব ট্রান্সফর্মেশন শিরোনামে শিল্পী মাহবুবুর রহমানের পারফর্মেন্স

(প্রথম প্রকাশের পর)

(পারফর্মেন্স আর্ট নিয়ে রহমান সিদ্দিকের ধারাবাহিক ‘পারফরমেন্স আর্ট: ইউরোপের পাসপোর্টে বাংলাদেশে প্রবেশ’ লেখার দ্বিতীয় ও শেষ কিস্তি প্রকাশিত হলো আজ)

লেখার শুরুতে মোটা হরফের বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম ‘পারফরমেন্স আর্ট: ইউরোপের পাসপোর্টে বাংলাদেশে প্রবেশ’। এর প্রবেশ প্রক্রিয়াটা কী ধরনের ছিল এবং এখন কোন অবস্থায় আছে তা নিয়ে কিছু আলোচনার দাবি রাখে। এ নিয়ে নানা বিতর্ক হতে পারে, দ্বিমত থাকতে পারে। থাকাটা জরুরি; উচিতও।
শুরুর দিকে পারফরমেন্স আর্ট যে বিপ্লবী চেতনা নিয়ে হাজির হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। পারফরমেন্স আর্টেরও এখন গ্রাহক তৈরি হয়েছে। হয়েছে পণ্যে রূপান্তরিত। গ্রাহক তৈরি হওয়ায় অনুগ্রভাজন বা ইনস্টিটিউট এসে পারফরমেন্স আর্টকে অধিগ্রহণের জন্য নানা মূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে। জন্মপ্রক্রিয়ায় পারফরমেন্স আর্টের যে রূপ ছিল- গত শতকের নব্বই দশকের পর থেকে তার আমূল রূপায়ন ঘটেছে। এখন পারফরমেন্স আর্ট নিছকই আর্ট। নিছকের এ অবস্থান থেকেই পারফরমেন্স আর্ট বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অনুমান করা হয় নব্বই দশকের শেষের দিকে কালিদাশ কর্মকার প্রথম এ দেশে পারফরমেন্স আর্টের সূচনা করেন।

পরবর্তীকালে নিসার হোসেন, সালেহ মাহমুদ, মনিরুজ্জামান শিপলু, আবু জাফর ইমন কালিদাসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পারফরম্যান্স আর্টকে অনেকটা দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তবে বর্তমান সময়ে মাহবুবুর রহমান দেশে-বিদেশে এ শিল্পমাধ্যমে বেশ একটা খ্যাতি অর্জন করেছেন। তরুণদের মধ্যে আবু নাসের রবি, জয়দেব রোয়াজা ও ইয়াসমিন জাহান নূপুর, আফসানা শারমিন ঝুমাসহ আরও অনেকেই তাঁদের কাজের মধ্যে নিষ্ঠার পরিচয় দিচ্ছেন বা দিয়ে যাচ্ছেন।

বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আবু নাসের রবি ও জয়দেব রোয়াজা ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে পারফরম্যান্স আর্টকে একটি শক্তিশালী জায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। এ দুজন ছাড়াও চট্টগ্রামে জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের মধ্যে দিলারা বেগম জলি, নিলুফার জামান ও শায়লা পারভীন মূল ধারার বাইরের এ শিল্পমাধ্যমে কাজ করার মধ্য দিয়ে এ প্রজন্মের শিল্পীদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।

চট্টগ্রামের তরুণ শিল্পীদের মধ্যে কথা হয় জয়দেব রোয়াজার সঙ্গে। তিনি জানালেন, মূলত মাহবুবুর রহমানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই চট্টগ্রামে তাঁরা পারফরম্যান্স আর্টের বিস্তার ঘটাতে পেরেছেন। চট্টগ্রামে নব্বইয়ের দশকের পরপরই পারফরম্যান্স আর্টের চর্চা শুরু হলেও ২০০৪ সালে পারফরম্যান্স আর্ট চট্টগ্রামে একটি শক্তিশালী অবস্থান করে নেয়। সমসাময়িক রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনাবলি এবং গণমানুষের সামগ্রিক বাসনা তাদের পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে তাঁরা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। রোয়াজা জানালেন, পারফরম্যান্স আর্টকে চারদেয়ালে বন্দি না রেখে তাঁরা সরাসরি সাধারণের মাঝে উন্মুক্ত মঞ্চে এ চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। এতে সাধারণের সঙ্গে শিল্পের একটি সরাসরি সম্পর্ক বা যোগসূত্র তৈরি হয়। শিল্পী রোয়াজার কথা বাদ দিলেও আমাদের সার্বিক ভাবনায় ধরা পড়েছে- রাজধানী বা কেন্দ্রকে অনেকটা ছাড়িয়ে গেছে চট্টগ্রামের শিল্পীরা। ‘পোড়াপাড়া আর্ট স্পেস’ এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলেই অনেকে মনে করেন।

তবে কেন্দ্র বা বিকেন্দ্রের সার্বিক তথ্য তুলে ধরা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমরা দেখব পারফরম্যান্স আর্টের বর্তমান অবস্থা এবং এর চর্চার দিক। এ কথা সত্যি যে, এ সময় এ দেশে অনেকেই পারফরম্যান্স আর্টে সিদ্ধি লাভের মধ্য দিয়ে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। তবে প্রসিদ্ধির সঙ্গে তেজারতির একটা যোগসূত্র থেকে যায়। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ তেজারতিটাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন- করপোরেট পুঁজির আশ্রয় যেমন নিয়েছেন; নিয়েছেন রাষ্ট্রের আনুকূল্যও। তাদের এ ক্রিয়াকর্ম বাংলাদেশে পারফরম্যান্স আর্টকে অনেকটা রদ্দি করে ফেলেছে বলেও অনেকের অভিযোগ। অবশ্য অনেকে একটা কলাকৈবল্যবাদী যুক্তি দিয়ে থাকেন- ‘আর্টকে আর্টের মতোই থাকতে দেওয়া উচিত, এর আবার রাজনৈতিক দর্শন কী। এর পাল্টা জবাবও আছে- শিল্পের কোনো মাধ্যমই রাজনীতিনিরপেক্ষ হতে পারে না; থাকা উচিতও নয়। যতই অভিযোগ উঠুক- নব্বই দশকের পর পারফরম্যান্স আর্ট তার যথার্থ অবস্থান থেকে সরে এসেছে; তার পরও কেউ কেউ মূল আদর্শটাকে কেবল ধরেই রাখেনি, নিবর্তনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে এ শিল্পমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে। উদাহারণ হিসেবে বলা যায়- সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার পারফরম্যান্স আর্টিস্ট ৩০ বছর বয়সী পিওতর পাভলেনস্কির কথা। এই জন্মক্ষ্যাপা তরুণ রাশিয়ার বর্তমান পুতিন সরকারের জুলুম-নির্যাতন ও মানবাধিকার হরণের বিরুদ্ধে রীতিমতো লড়াই করে যাচ্ছেন। রাশিয়ার দুর্ধর্ষ পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে পারফরম্যান্স আর্টকে বেছে নিয়েছে তার প্রধান অস্ত্র হিসেবে। ২০১২ সালে সংগীত দল পাঙ্ক ব্যান্ডের পুশি রায়টের গ্রেপ্তার ও কারান্তরের বিরুদ্ধে তিনি প্রথম সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে রাজপথে নামেন। ২০১৩ সালের মে মাসে সে দেশের আইনসভার সামনে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে একই ভঙ্গিকে তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়। ২০১৪ সালের ২৮ অক্টোবর মস্কোর সারস্কি সায়েন্টিফিক সেন্টারের দেয়ালে উঠে উলঙ্গ অবস্থায় লম্বা একটি ছুরি নিয়ে পাভলেনস্কি তাঁর কানের লতি কেটে ফেলেন। দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রচ- ঠান্ডায় কান থেকে তাঁর শরীর বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ওই দৃশ্য বিশ্বের যেকোনো মানুষকে আলোড়িত করবে। পাভলেনস্কি তাঁর এই প্রদর্শনীর নাম দিয়েছেন সেপারেশন বা বিচ্ছেদ। এ বিচ্ছেদ আসলে রাশিয়ার আত্মার বিচ্ছেদ। তাঁর মতে, যেভাবে মানব নিপীড়ন চলছে- রাশিয়া নামক এ রাষ্ট্রটি থেকে তার আত্মা উড়ে যাচ্ছে। নেকেড ম্যান খ্যাত পাভলেনস্কি মৃতপ্রায় পারফরম্যান্স আর্টকে যেন নতুন সঞ্জীবনী দান করলেন। সে তুলনায় আমাদের দেশের শিল্পীদের সে রকম আদর্শ বা লক্ষ্যভেদী ভাবনা রয়েছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এ জিজ্ঞাসা থেকেই কথা বলেছি এ মাধ্যমে কাজ করা বা ভাবনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে দেশে-বিদেশে পারফরম্যান্স আর্টে যিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন, তিনি মাহবুবুর রহমান। কালিদাস কর্মকারের মধ্য দিয়ে শুরু হলেও মাহবুবুর রহমানই পারফরম্যান্স আর্টকে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এর আগে ব্যক্তিগতভাবে অনেকে এ মাধ্যমে কাজ করেছেন; কিন্তু শিল্প আন্দোলন বলতে যা বোঝায়- মাহবুবুর রহমানদের বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে তা পূর্ণতা পায়। সম্ভবত তারাই প্রথম ২০০৩ সালে পারফরম্যান্স আর্ট নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক কর্মশালার আয়োজন করেন। ওই কর্মশালার মধ্য দিয়ে অনেক মূলধারার শিল্পী পারফরম্যান্স আর্ট বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং এ মাধ্যমে কাজ করতে আগ্রহী হন। ঢাকার বাইরে ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে প্রথম পারফরম্যান্স আর্টের প্রদর্শন করেন মাহবুবুর রহমানদের বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট। এই ধারাবাহিকতায় রাজধানীর বাইরে অনেক শিল্পী এ মাধ্যম নিয়ে কাজ করছেন।

এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ‘আমাদের দেশে মূলধারা বা মেইনস্ট্রিম শিল্পীরা শতভাগ সচেতন জায়গা থেকে পারফরম্যান্স আর্টের চর্চা শুরু করেছে বলে মনে হয় না। শুরুতে চেতনার জায়গায় না থেকে আপাতনিরীহ চর্চাটাই বেশি ছিল। তবে আস্তে আস্তে একটা চেতনার জায়গা তৈরি হচ্ছে।’ মাহবুবুর রহমান এও জানালেন, ‘পারফরম্যান্স আর্ট কেবল রাজনৈতিক চেতনা থেকে হতে হবে এমনটা নয়; এর একটা রিচ্যুয়াল দিকও আছে। যার যার পয়েন্ট বা দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোনোটি বেছে নিতে পারেন।’ আর এখন এটি শিল্পের জন্য শিল্প- এজাতীয় কলাকৈবল্যবাদী ভাবনা থেকে কেউ করলেও এর একটা সামাজিক প্রভাব নিশ্চই আছে। যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক সমাজের বাইরে তো কিছু নেই। তা ছাড়া যে মাধ্যমেই শিল্পীরা কাজ করুক না কেন, এর উদ্দেশ্য (ইনটেনশন) ও বোধ (ইনট্যুইশন) এ দুটো বিষয়ও ভাবনার মধ্যে রাখতে হবে। তবে মাহবুবুর রহমান জানাচ্ছেন, ‘এখন যারাই চর্চা করুক- প্রত্যেকের মধ্যে একটা আন্তযোগাযোগ থাকা উচিত। এ বিষয়টি নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা, সেমিনার বা ভাবনা বিনিমিয় হলে সবার মাঝে এর দর্শনটা আরও স্পষ্ট হবে।’

দীর্ঘদিন থেকে আর্ট বিষয়ে লেখালেখি করছেন মোস্তফা জামান মিঠু। বাংলাদেশে কয়েকজন শিল্প-সমালোচকের কথা বললে, তাঁর নামটাও উঠে আসে। তিনি আমাদের দেশে পারফরম্যান্স আর্ট নিয়ে অনেকটা খোলামেলা কথাই বললেন। তাঁর মতে, ‘ইউরোপ যে জায়গা থেকে পারফরম্যান্স আর্টের চর্চা শুরু হয়; আমাদের দেশে তা হচ্ছে না। অনেকে এটাকে মজা পাওয়ার জায়গা থেকে করছেন। কোনো নতুন ফ্যাশন আসলে মানুষ যেমন সেদিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে; আমাদের দেশেও পারফরম্যান্স আর্ট অনেকটা ফ্যাশন হিসেবে দাঁড়িয়েছে। পারফরম্যান্স আর্ট কী- অনেকের কাছে এ ধারণাটিও পরিষ্কার নয়। কনটেম্পরারি আর্ট অনেকটা ঐতিহ্যনির্ভর (ট্র্যাডিশনাল) হতে হয়। আমাদের দেশে পারফরম্যান্স আর্ট না হচ্ছে পলিটিক্যাল, না হচ্ছে ট্র্যাডিশনাল। জ্যাকসন পোলাকরা এস্টাবলিশমেন্ট আর্টের রিরুদ্ধে মিনিমাল বা এলোমেলো আর্টের সূচনা করে যে মশকরা করেছেন- পারফরম্যান্স আর্টের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো ভাবনায় আনতে হবে। এ ছাড়া ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে পারফরম্যান্স আর্ট একটি আন্দোলন। আমাদের দেশের আর্টিস্টদের এ চরিত্রটাও পরিষ্কার করতে হবে। তবে শিল্পের নতুন নতুন মাধ্যমে অনেকে কাজ করছেন, এটা ভালো; উচিতও।’

বাংলাদেশে পারফরম্যান্স আর্টের যিনি গুরু- সেই কালিদাস কর্মকারের সঙ্গেও এ দেশের পারফরম্যান্স আর্ট নিয়ে কথা হলো। তাঁর কসমস স্টুডিওতে বসে এ বিষয়ে যেদিন কথা বলছি- তার আগের দিন অর্থাৎ ২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর বুধবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমীতে স্বনামধন্য জাপানি শিল্পী সুমিয়ে কানোকোর বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বড় একটি ক্যানভাসে ছবি আঁকেন কালিদাস কর্মকার। তাঁর স্টুডিওতে বসে বাংলাদেশে অভিনব এ পারফরম্যান্সের ভিডিও ক্লিপস দেখছিলাম আমরা। মঞ্চের এক পাশে জাপানি স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র কোতো ও সামসে। অন্য পাশে বিশাল একটি ক্যানভাস। সুমিয়ে কানোকো যন্ত্রে সুর তুলছেন, সে সুর নিজের ভেতর ধারণ করছেন শিল্পী কালিদাস কর্মকার। তা রং-রেখায় ভরিয়ে দিচ্ছেন পুরো ক্যানভাস। এ সুর ছন্দ ও রেখার টান দেখতে দেখতে কথা হচ্ছিল শিল্পী কালিদাস কর্মকারের সঙ্গে। জানতে চাইলাম বাংলাদেশে পারফরম্যান্স আর্টের সূচনা হিসেবে সবাই একবাক্যে আপনার নামটি উচ্চারণ করছেন- আপনার অভিমত। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমার আগে কেউ করেছে কি না তা আমার জানা নেই। গত শতকের আশির দশকের শেষের দিকে ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমি ২১টি ছেলেকে কালো পোশাক ও কালো মুখোশ পরিয়ে বড় একটি লোহার মালা বানিয়ে শহীদ মিনারে নিয়ে গেলাম। সম্ভবত সেটাকেই অনেকে পারফরম্যান্স আর্টের সূচনা হিসেবে মনে করতে পারে। তবে কী উদ্দেশ্য নিয়ে এমন একটি কাজ করেছি, এখন তা বলতে পারছি না। আমি যেহেতু লোহা-টোহা নিয়ে কাজ করি- তাই লোহার মালা বানিয়ে একটি নতুন ফর্ম ক্রিয়েট করতে চেয়েছিলাম। এমনও হতে পারে, বাহান্নের ভাষা আন্দোলনের পর অনেক বছর হয়ে গেলেও সর্বস্তরে আমরা বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি- সেই প্রতিবাদ থেকে হয়তো ওই সময় এমন একটি কাজ করেছিলাম। এর পরে সাতাশি সালের দিকে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রচারণার জন্য শিল্পী কামরুল হাসানকে নিয়ে একটি পোস্টার করি। পোস্টারটিতে কামরুল হাসানের হাত-পা বাঁধা, চশমাটা নাক থেকে অনেকটা নিচে ঝুলে আছে, তার পরনের শার্টটিও ছেঁড়া এবং হাত বাঁধা অবস্থায় তিনি একটি বদ্ধ তালা ভাঙার চেষ্টা করছেন। ওইটা পারফরম্যান্স আর্ট কি না জানি না; তবে কেউ মনে করলে করতে পারেন।’

বাংলাদেশের পারফরম্যান্স আর্ট নিয়েও তিনি কিছুটা ধারণা দিলেন। তাঁর মতে, আমাদের দেশে বহু শতাব্দী ধরেই পারফরম্যান্স আর্ট চালু আছে। চড়কপূজায় কিছু মানুষ শরীরে বড়শি বেঁধে ঝুলে চারপাশে চড়কির মতো ঘুরছে। শিবরাত্রির সময় কিছু শারীরিক অঙ্গভঙ্গিও তো পারফরম্যান্স আর্ট। তা ছাড়া পূজার সময় আরতি দেওয়া কিংবা ঢাক পিটিয়ে নৃত্যক্রিয়া করা- এ সবই তো পারফরম্যান্স আর্ট। রিচ্যুয়ালের বাইরেও মানুষ সামাজিক জীবনে নানা পারফরম্যান্স করে যাচ্ছে- যেমন একজন জাল খেও দিয়ে মাছ ধরে। তার জাল ধরা, সাজানো ও ফেলার ভঙ্গিটিও পারফরম্যান্স আর্ট। কিংবা একজন কোঁচ বা টেঁটা দিয়ে মাছ ধরছে- এসবই তো পারফরম্যান্স আর্ট। এখন সামাজিক বা ধর্মীয় জীবনের অঙ্গ বলে এসবকে আমরা পারফরম্যান্স আর্ট বলছি না। এখন কেউ যদি শহরে এসে স্টেজে উঠে একটি টেঁটা নিয়ে মাছ ধরার মতো অঙ্গভঙ্গি করে; সেটাকে আমরা পারফরম্যান্স আর্ট বলি। সুতরাং পারফরম্যান্স আর্ট নিয়ে আলাদা করে ভাবার দরকার নেই; আমাদের সমাজে যা ঘটছে, তাই পারফরম্যান্স আর্ট।

কালিদাস কর্মকার আরও অভিমত দিলেন, পশ্চিমা সমাজ থেকে আমরা পারফরম্যান্স আর্টকে ধার করছি; অথচ এই ধারণাটা ওরা এই পূর্ব থেকে নিয়েছে। এখান থেকে নিয়ে তাদের মতো করে একটা নাম দিয়েছে। ওদের অর্থ আছে, মিডিয়া আছে বলে ওরা যা করে তা দ্রুত প্রচার হয়ে যায়। এখন এ জায়গা থেকে আমাদের দেশের শিল্পীদের মধ্যে একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে- যেহেতু ওরা করছে, আমাদেরও তাই করতে হবে। কিন্তু আমি বলব পশ্চিমাদের কপি করার দরকার নেই; ওদের কাছ থেকে নেওয়ারও কিছু নেই। আমাদের দেশের মাটির মধ্যে গঞ্জের মধ্যে পারফরম্যান্স আর্টের সমস্ত উপাদান আছে; শিল্পীদের উচিত এসব থেকে তাদের কনসেপ্ট খুঁজে ফেরা।

এখনো পারফরম্যান্স আর্টের মধ্যে সম্পৃক্ত আছেন কি। উত্তরে কালিদাস কর্মকারের সহজাত রসিকতা- আছি তো; নদীতে গেলেই শরীরে কাদা-মাটি মাখি। হা হা হা।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »