সুমনা আকতারের পারফর্মেন্স

লৈঙ্গিক সাম্প্রদায়িকতার চেতনাচিত্র

 

sumona_2।দীপ্তি দত্ত। আধুনিক শিল্পের যাত্রা দেবী শক্তিকে মানবী শক্তিতে রূপান্তর ও প্রযুক্তি বিপ্লবকে উদযাপন করার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এই উদযাপনের প্রবেশদ্বার তৈরি হয়েছে কুর্বে থেকে এডুয়ার্ড মানের মত শিল্পীদের বাস্তবতার খোলস উন্মোচনকারী শিল্পরূপের মাধ্যমে। কিন্তু অতিদ্রুতই তা বিমূর্ত ধারনার পথ ধরে বাস্তবতাকে বর্জন করে। অথবা বলা যেতে পারে এড়িয়ে যাওয়ার মনস্তত্ত্বে অবস্তুগত নতুন এক বাস্তবতা নির্মিত হতে থাকে। প্রযুক্তি কেন্দ্রিক নাগরিক জীবনকে শিল্প গ্রহণ করতে শুরু করে। ফলে একদিকে যেমন পপ শিল্পধারা তৈরি হয়, অন্যদিকে পণ্য বিরোধীতা ও পরিবেশবাদী চেতনা থেকে জন্ম নেয় পারফর্মেন্স ও ল্যান্ড আর্টের মত ধারাগুলোও। এসবের পাশাপাশি তখন আরও একটি বাস্তবতা শিল্পে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে- তা হলো নারীবাদী আন্দোলন, যা মূলত নব্যবস্তুগত জগতে নারীর অস্তিত্ত্বের স্মারক।

ফলে, দেখা যায় ১৯৩৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে জন্ম নেয়া নারীবাদী শিল্পী, লেখক ও শিক্ষাব্রতী জুডি শিকাগো যেমন তার ‘‘দি ডিনার পার্টি”(১৯৭৪-১৯৭৯) কাজটি দিয়ে ইতিহাসের বৃত্ত ভাঙ্গার কথা বলেন, তেমনি বলেন- কাধেঁ কাঁধ মিলিয়ে নারী-পুরুষের শ্রমে সভ্যতার যে নির্মাণ তাকে ইতিহাসে অস্বীকার করা হয়। আর এই কৃতকর্মের পুনরাবৃত্তি করতে গেলে জুডি বলেন- আমরা হই নিন্দিত। ইতিহাসের এই পুন:আবিষ্কারের প্রক্রিয়ায় আমরা বৃত্তবন্দী থাকি। ‘ডিনার পার্টি’র লক্ষ্য এই বৃত্তকে ভাঙ্গা। আবার নারীবাদী শিল্পের লক্ষ্য হিসেবে শিল্পী সুজান লেসি ঘোষনা করেছিলেন, ‘‘সাংস্কৃতিক মনোভাবগুলোকে প্রভাবিত করা এবং ছকের রূপান্তর ঘটানো”।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো এই ভাবনাকে প্রকাশ করার জন্য নারীবাদী শিল্পে সুনির্দিষ্ট কোন শৈলীকে আশ্রয় করা হয়নি। ইতিহাসের পূর্বনির্ধারিত বৃত্ত ভাঙ্গা বা সাংস্কৃতিক মনোভাবের পরিবর্তনের জন্য প্রাসঙ্গিক যে কোন রীতিকেই গ্রহণ করা হয়েছে। রীতি আশ্রয়ী হয়ে বৃত্তভাঙ্গার চেষ্টা নারীবাদী শিল্প আন্দোলনের মূল প্রবনতা নয়। তাই ধারনামূলক শিল্প, কায়া শিল্প ও ভিডিও শিল্পসহ নানা মাধ্যম বা শিল্পান্দোলনের মিশ্রণ ঘটেছে নারীবাদী শিল্পভাবনায়, নারীর অভিজ্ঞতার বার্তাবাহক হিসেবে এবং লৈঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সমতা তৈরির প্রয়োজনে। সাংস্কৃতিক মনোভাবগুলোকে প্রভাবিত করতে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শিল্পমাধ্যম ভাস্কর্য বা চিত্রকলার চেয়ে সেক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে অপ্রথাগত শিল্পমাধ্যম বস্ত্র বা ফ্যাব্রিক, তন্তু, পারফর্মেন্স এবং ভিডিও এর মত উপকরণে। যাদের উপর পুরুষ কর্তৃত্বশীলতার ইতিহাস নেই ভাস্কর্য বা চিত্রকলার মত। নারীবাদী শিল্পীরা অপ্রথাগত মাধ্যমের ব্যবহার ও তার বিস্তৃতির মধ্য দিয়ে চারুকলার সংজ্ঞার ব্যাপকতা দিতে চেয়েছিলেন।

নারীবাদী আন্দোলনের সূত্র ধরে চারুকলার এই ব্যাপকতা মূলত শিল্পের শ্রেণিগত বিন্যাসকেও এলোমেলো করে দেয়। ফলে পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে থেকে যাওয়া নারীর জন্য বস্ত্র (ফ্যাব্রিক), তন্তু বা পারফর্মেন্স আর্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। যা এতদিন নারী-শিল্প হিসেবে ছিল কারুশিল্পের অধীনে।

নারীর শ্রমে নির্মিত তন্তুশিল্প পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুরুষের হাতে চলে আসে। সেখানে গার্মেন্টস শিল্পকারখানার শ্রম নারীর হলেও স্বাগতভাষণ বরাবরের মতোই পুরুষের। এ পর্যায়ে নারীবাদী শিল্পীরা তন্তু বা ফ্যাব্রিককে কারখানা শ্রম বা গৃহ শ্রম থেকে বিযুক্ত করে দৃশ্যশিল্পের ভাষার সঙ্গে যুক্ত করে। আবার দেখা যায় পারফর্মেন্স শিল্পটি যা আদিম মানুষের প্রয়োজনে (শিকারকেন্দ্রিক যাদু বিশ্বাস থেকে যা ছিল শিকারের পূর্বে শিকার প্রক্রিয়ার অনুকরণে শিকারকে সহজ করার একটি উপায়) জন্ম নিয়েছিল, যা বিবর্তিত হয়ে (যেমন বলা যেতে পারে-বহুরূপী বা লেটো দল বা যাত্রা পালা) পুরুষ নিয়ন্ত্রিত বিনোদন শিল্প থিয়েটারে জায়গা করে নিয়েছে। যদিও এর যাদুবিশ্বাসকেন্দ্রিক মূলধারার লক্ষণগুলোও সমসাময়িক সমাজে কোথাও কোথাও টিকে আছে। যেখানে নিষাদ জীবনের ন্যায় অনুকরণমূলক যাদু চেতনা এখনও ক্রিয়াশীল, যা মূলত নারী-ক্রিয়া হিসেবেই টিকে আছে বিভিন্ন সনাতন বা আদিবাসী গোষ্ঠীর ব্রত ধারনায়। যেগুলোকে আদি পারফর্মেন্স শিল্পের একটা পর্যায় হিসেবেই চিহ্নিত করা যেতে পারে। সেই দিক থেকে বিংশ শতকের ষাটের দশক থেকে যে পারফর্মেন্স আর্ট আধুনিক শিল্পের মাঠে উপস্থিত হয় প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করতে তাকে নারীর আদি ব্রত-ক্রিয়ার উত্তরাধিকার হিসেবেই দেখা যেতে পারে। যার সঙ্গে নারীর আত্মীকরণ সহজ হয়, যেমন হয় তন্তুশিল্পে। সেক্ষেত্রে এখানে নারী নিজেরই ক্রিয়ারীতির পরম্পরার উত্তরাধিকার।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন পারফর্মেন্স আর্টকে ষাটের দশকে নারীরা আবার গ্রহণ করে? প্রাচীন ইতিহাস- পরিবার প্রথায় প্রতিষ্ঠিত লৈঙ্গিক ক্ষমতা দ্বন্দ্বের প্রথম ধাপ; যেখানে পুরুষের শারীরিক ক্ষমতার বিজয় হয়েছে, মধ্যযুগের ইতিহাসে তা পিতৃতান্ত্রিকতা রূপে পায় প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিকযুগে হয় তার লালন। হাজার বছরের এই লালিত একমুখী পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীর সক্রিয়তার ভাষা তৈরি করতেই পারফর্মেন্স আর্টকে তারা বেছে নেয়। অথচ এই একমুখীতাকে পরোক্ষভাবে পুরুষই চিহ্নিত করে। তাই দেখা যায় দার্শনিক রুশো মানুষের অধিকারের প্রশ্নটি সামনে আনেন যখন তখন নারীর অধিকারকে অস্বীকার করা সত্ত্বেও, নারী তার ইতিহাসহীনতার সংকটকেও উপলব্ধি করার সুযোগ পায়। যদিও নারী সচেতন হলে পুরুষতন্ত্র লৈঙ্গিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে নানাভাবে পুরুষতান্ত্রিকতার পক্ষের ক্ষমতাকে আরও সংহত করে। সংহত করার একটি প্রক্রিয়া হলো ঐতিহ্য।

আবার ঐতিহ্য চেতনার সাথে বহুমুখী ধারনার কোলাজের জটিলতা তৈরি হয় আধুনিকতা থেকে উত্তরাধুনিকতায় উত্তরণের কালে। ঐতিহ্য একটি শক্তিশালী উপকরণ- যাকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সাফল্য পেয়েছে, পরিবেশবাদী আন্দোলনে ধরনী সুরক্ষার তত্ত্ব নির্মিত হয়েছে। নতুন বা পুরাতন উপনিবেশবিরোধী চেতনায় স্থানিক চরিত্রের অন্বেষণে ঐতিহ্যকে সবসময় সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে ঔপনিবেশিকগণ। সেই ঐতিহ্যকে গ্রহণ করা হয়েছে পুরুষ নির্মিত ইতিহাস থেকে। ফলে আধুনিক কালে উদ্বৃত্ত পুঁজি হাতে শক্তিশালী পুরুষতন্ত্র ঐতিহ্যের ভৈৗগলিক, মানবিক বৈশিষ্ট্যকে পিতৃতান্ত্রিকতার সাথে এমনভাবে জড়িয়ে দিয়েছে, যেন পুরুষতন্ত্রের অমানবিকতাও ঐতিহ্যের বাস্তবতা। ফলে ঐতিহ্য আধুনিক কালের নারীর বাস্তবতাকে অস্বীকার করার একটি হাতিয়ারও বলা যেতে পারে। তাই পিতৃতান্ত্রিক অমানবিকতাও আধুনিক কালে , একমুখী ইতিহাসের পরম্পরায় ঐতিহ্য হিসেবেই গৃহীত হতে থাকে।

নারীবাদী শিল্পান্দোলন সেই পরম্পরাগত স্বাভাবিকতার বিপরীতে অবস্থান নেয়। নিজের অস্তিত্বকে জানান দিয়ে উন্মোচন করতে চায় বাস্তবতা। বাংলাদেশের পারফর্মেন্স শিল্পী সুমনা আকতার তার কাজের মধ্য দিয়েও বাস্তবতা উন্মোচনের এই কাজটি করেন। পিতৃতান্ত্রিক ইতিহাসের স্বাভাবিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, উন্মোচন করেন লৈঙ্গিক সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা এবং এই বাস্তবতা উন্মোচনে কায়া শিল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে পারফর্মেন্স শিল্পের অঙ্গ হিসেবে।

পারফর্মেন্স শিল্পে নারীবাদী শিল্পীরা শরীরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, কেন? এর পেছনের কার্যকারণ হিসেবে আমাদের ইতিহাসের দিকেই তাকাতে হয়। ১৯০৮সালে খুঁজে পাওয়া ত্রিশ হাজার বছর আগের একটি নারী ভাস্কর্যের নামকরণ করা হয় ভেনাস (ভেনাস অব উইলেনডর্ফ)। যে ভেনাস রোমানদের হাতে সুন্দরের দেবী আফ্রোদিতির পুনউপস্থাপন মাত্র। রেঁনেসার মধ্য দিয়ে যার রূপান্তর আধুনিককালের বার্বি ডলে এসে ঠেকে। যার সাথে অষ্ট্রিয়ার উইলেনডর্ফ নামক জায়গায় প্রাপ্ত ত্রিশ হাজার বছর আগের নারী মূর্তির কোন অবয়বগত সাদৃশ্য নেই, যেমন নেই আফ্রিকান নারীর সৌন্দর্য ধারনার সাথে ইতালীয় বা জার্মান সুন্দর নারী ধারনার। স্থূলদেহী উইলেনডর্ফ আর কারাভাজ্জিও বা তিশানের ভেনাস এক নয়। আবার এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো ভেনাস কে, যিনি রোমান ক্ষমতাধারী সম্রাট থেকে আধুনিক ইউরোপীয় পুরুষে পূজ্য হয়ে আসছে? এই সত্য উনবিংশ শতকের শেষ দিকে উন্মোচন করতে চান এডুয়ার্ড মানে তার ‘অলিম্পিয়া’ ছবির মধ্য দিয়ে- দেবীরূপী ভেনাসের অন্তরালে পুরুষের যৌনভোগ সঙ্গী অলিম্পিয়াকে সামনে এনে।

আবার অনুমান করতে দোষ কি, যে ত্রিশ হাজার বছর আগে নির্মিত নারী মূর্তি (যে সময়কালে কোন পুরুষ প্রতিমা নেই) যা হতে পারে মানুষের প্রথম স্রষ্টা বা অন্য কিছু। কিন্তু এসবের বাইরে উইলেনডর্ফ হয়ে উঠে প্রাগৈতিহাসিক থেকে ইতিহাস হয়ে বর্তমানের একরৈখিক পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাস মাত্র আর সেখানে নারীর শরীরই একমাত্র উপকরণ। সেখানে মস্তিষ্ক নেই, যেমন ছিল না ত্রিশহাজার বছর আগের নারী প্রতিমার, ছিল কেবল যৌনাঙ্গ। তাই নারীর ইতিহাস, মিথ ও বর্তমানকালের স্বাভাবিকতা সবই শরীরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। যদিও নিষাদ জীবনের বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়েছে।

শিল্পী সুমনা আকতার তাই এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সেইসব মিথ, ইতিহাস ও নারীকেন্দ্রিক সমাজের স্বাভাবিকতার যে ভাষা তাকে তার পারফর্মেন্স শিল্পের জন্য বেছে নিয়েছেন। এবং কখনও কখনও সেই স্বাভাবিকতার পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়েই যুক্তিবোধের দাবিদার আধুনিক মানুষের চেতনাচিত্রকে আঘাত করেছেন।

যদিও সুমনা নিজেকে নারীবাদী শিল্পী হিসেবে দাবী করেন নি, কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতার শিল্পভাষায় প্রত্যক্ষভাবে নারীবাদী তত্ত্বকে অস্বীকার করেও লৈঙ্গিক সাম্প্রদায়িকতার যে স্বাভাবিক চেতনাচিত্র সমাজে ক্রিয়াশীল তাকেই শিল্পের পরিভাষায় গ্রহণ করেছেন। তাই তার কাজে আরোপের চেয়ে নিজস্বতা, কিছু করার চেষ্টার চেয়ে নিজেকেই বলা বৈশিষ্ট্যগুলো প্রধান হয়ে উঠেছে।

আইডিয়া সেখানে শিল্পী সুমনার উপর প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং স্বকীয় সত্ত্বার অভিজ্ঞতা থেকে আইডিয়ারা আত্মপ্রকাশ করে। ফলে তার শিল্পরূপ, শিল্পীর নতুন একটি মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার দৃশ্যক্রিয়া মাত্র যা প্রত্যক্ষ করি আমরা। সুজান লেসির ঘোষনার সঙ্গে যে কাজগুলি তাল মেলায়, ভূমিকা রাখে সাংস্কৃতিক মনোভাব প্রভাবিত করতে এবং সমাজের চেতনাচিত্রের ছক ভেঙ্গে দিতে।

আধুনিক শিল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অন্যান্য শিল্পধারার মত নব্য পারফর্মেন্স শিল্পও একটি শৈলি হিসেবেই প্রথম গ্রহণযোগ্যতা পায়। এই ধারাবাহিকতায় বর্তমান পারফর্মেন্স শিল্পীরাও একে আয়ত্ত করার চেষ্টা করেন, শৈলীর অংশ হিসেবেই নির্মাণ করতে চান শরীরের যন্ত্রণাকেও। ফলে দেখা যায় পশ্চিমের বাস্তবতার পরিভাষায় নির্মিত সক্রিয় শিল্পসত্ত্বা এখানে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

শরীরের যন্ত্রণা মূলত এখানে আইডিয়ার মূর্তরূপ, যেমনটা পুঁজি বাজারে এখন পণ্য-মোড়কটিও। পণ্যের মানের চেয়ে আইডিয়ার দাম বাজারে বিকোয় বেশি। যা শৈলী বা রূপ বা ধারনা স্বর্বস্ব শিল্পেরও চালিকাশক্তি। ফলে এদেশের বেশিরভাগ পারফর্মেন্স শিল্পে অধীত যন্ত্রনাও যান্ত্রিক হয়ে উঠতে চায়।

সেই দিক থেকে এই সময়ে যে কয়জন পারফর্মেন্স শিল্পী নিজস্ব বাস্তবতার পাঠে স্বকীয় ও সক্রিয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন সুমনা আকতারকে নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে একজন হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে।

সুমনা আক্তার নারায়নগঞ্জ চারুকলা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছেন। সেখানেই শিক্ষক হিসবে কাজ করছেন। এর পাশাপাশি টিউশনের মতো কাজও করেন, যা যতটা জীবন ধারণের জন্য তারচেয়ে অনেক বেশি নিজের শিল্পসত্ত্বাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার কাজগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। নারায়নগঞ্জ শহরে নিজের একটি স্টুডিও স্পেস নিজ খরচায় তৈরি করে নিয়েছেন, যেখানে কাজ করতে ইচ্ছুক শিল্পীদেরও দ্বিধাহীন বিচরণকে উৎসাহিত করেন। যদিও এই বিষয়টি যত সহজে বলা গেল, সুমনা আকতারের বাস্তবে এই জায়গায় পৌছুঁতে ততটাই কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। তার দৃশ্যমান এই শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্খার পেছনে আরেকটি চাওয়া মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তা হলো নারীর জন্য সমাজ নির্ধারিত শ্রেণি থেকে নিজেকে মানুষের শ্রেণিতে অর্ন্তভুক্ত করার আকাঙ্খা।

নারী হিসেবে সমাজ নির্ধারিত সর্বনিম্ন স্তর থেকে সুমনার মনুষ্য শ্রেণিতে অর্ন্তভুক্ত হওয়ার আকাঙ্খা আরো জটিল হয়ে উঠে এদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অর্থনৈতিক ক্ষমতাকাঠামো দ্বারা নির্ধারিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও। তাই সুমনাকে দাঁড়াতে হয়, সমাজ নির্ধারিত লৈঙ্গিক সাম্প্রায়িকতা ও অর্থনৈতিক শ্রেণিবিভেদের বিপরীতে। ফলে নারায়নগঞ্জ চারুকলার ছাত্রী হওয়ার সুবাদেই সুমনা প্রাথমিকভাবে অভিজাত পাড়া থেকে চ্যুত হয়ে বহু দূরে পিছিয়ে পড়েন। সেখান থেকে প্রথম সারির আধুনিকদের পাশে নিজেকে অর্ন্তভুক্ত করতে পারার কাজটি কঠিন। তিনি সেটি করতে পেরেছেন, তবে নন্দিত হওয়ার জায়গাটি এইখানে নয়, যে তিনি যে কোনভাবেই হোক অর্ন্তভুক্ত হয়েছেন। সেইখানে যে তিনি নিজের সমাজ নির্মিত লৈঙ্গিক শ্রেণিগত সংকটকে প্রকাশ করেই তা পেরেছেন। যদিও প্রশ্ন থেকেই যেতে পারে যে, যারা অর্ন্তভুক্ত করেছেন তাদের মৌলিক প্রবনতা নিয়ে।

সুমনা পারফর্মেন্স শিল্পে যাত্রা শুরু করেন ‘দ্রৌপদী’ শিরোণামের কাজটি দিয়ে। তিনি নিজেই দৌপদী, তবে মহাভারতের কালের নয়, নিজের কালের ও সমাজের। তাই ইতিহাস ও মিথ যার শাসক পুরুষ, তাকে বর্তমানের সুমনার মধ্য দিয়েই শিল্পী উন্মোচন করেন। উন্মোচন করেন মহাভারতের কালের বাস্তবতাকে এবং প্রশ্ন করেন নিজের কালকে। নারীর মান-অপমানের যে মানদন্ড রামায়নে তৈরি করা হয়েছিল মহাভারতের দ্রৌপদীর ক্ষেত্রেও তা প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে সেখানে নারীর প্রতিবাদের ভাষাকে বোধহয় সংরক্ষণ করা হয়নি যথাযথভাবে। কেবল তার ধারনা পাই সীতার পাতাল প্রবেশ বা দ্রৌপদীর বিবাহিত জীবনকে অস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। যা হোক- সকল ক্ষেত্রেই নারীর শরীরের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে।

সুমনা শিল্পী হিসেবে ক্রিয়া করতে গিয়েও সবচেয়ে বেশি যে ভাবনা দ্বারা আক্রান্ত হন তা হলো নারীর শরীর। এই ভাবনা মহাভারতের দ্রৌপদী থেকে সঞ্চারিত হয় না, নির্মিত হয় আধুনিক মানুষ হিসেবে নাগরিক পথ চলার অভিজ্ঞতা থেকে। পরে তিনি দ্রৌপদীকে নিজের সঙ্গী করে নেন এবং একরৈখিক ইতিহাসকে কেবল সামনে আনেন। তাই একবিংশ শতকের সুমনা বার হাত কাপড়ের সমার্থক নারী ভাবনা ও স্বাভাবিকতার সংস্কৃতিকে প্রশ্ন করেন একটি লাল পাড় সাদা কাপড় দিয়েই।

আবার কলকাতার একটি পারফর্মেন্স শিল্পের উৎসবে করা ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিস’ কাজটিতে তিনি কতকগুলো প্রচলিত শব্দকে (যেমন -বেশ্যা, ডাইনী, পবিত্র, খানকী, মাগী, বন্ধ্যা ইত্যাদি) বেছে নেন। লক্ষ্যণীয় বিষয় গালি দেয়ার জন্য ব্যবহৃত প্রায় সকল প্রচলিত শব্দই প্রধানত নারীকে কেন্দ্র করে। তাই যখন কোন নারীও গালি ব্যবহার করে তখন সে মূলত নিজেকেই গাল দেয়। এ এমন এক প্রক্রিয়া যার দ্বারা নারী নিজেই নিজের শোষক এবং শাসকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার। এখানেও ঘুরে ফিরে সকল ধরনের কর্মপ্রক্রিয়াকে শরীরিকরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ পোশাকের ইতিহাসের মত ভাষার ইতিহাসও নারীর শরীরকে ঘিরে তৈরি। তাই সুমনার এই কাজটি পবিত্র-অপবিত্র ধারণায় নির্মিত- পিতৃতান্ত্রিক চার্তুযপূর্ণ সমাজের মেীখিক ভাষা দ্বারা আক্রান্ত নারীর নিজস্ব অভিজ্ঞতারই বয়ান।

তিনি এ কাজটিতে উল্লেখিত এইসব শব্দের সিল তৈরি করেন এবং প্রকাশ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষকে আহবান করেন-শব্দ বাছাই করে সুমনার গায়ে তা সেঁটে দেয়ার জন্য। তিনি এই সমাজের মানুষকে সচেতনভাবে নারীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শব্দগুলো ব্যবহারের সুযোগ দেন এবং প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেন। আসলে তিনি এই সমাজের নৈতিক ধারনার ক্রিয়াটিই নির্বিকারভাবে উপস্থাপন করেন যার মধ্য দিয়ে সমাজ তার নিজের চেহারা আয়নায় দেখার সুযোগ পায়। এর ফলস্বরূপ প্রতিক্রিয়াটিই হয়ে উঠে সুমনার ক্রিয়া।

মৌখিক, দৃশ্যগত বাস্তবতা বা পৌরাণিক ও রূপকধর্মীতা যত ফর্ম নারীর ইতিহাস তৈরিতে ক্রিয়াশীল, এইসব কিছুর সাথেই সুমনা নিজের অজান্তেই ধীরে ধীরে তার কাজের সংযুক্তি তৈরি করার পথে অগ্রসর হচ্ছেন। কোন একটি ধারনা ধরে সুমনা একমুখী শিল্পস্বাক্ষর তৈরি করতে চাননি। নিজেকে প্রকাশের পথেই তার ধারনাগুলো নির্মিত হয়েছে। এখানেই পারফর্মেন্স শিল্পী হিসেবে সুমনার সার্থকতা।

সুমনার শিল্পে আমি-ই প্রধান। যে আমি নির্মিত হয় পরম্পরার হাত ধরে নারীর শিকারে পরিণত হওয়ার সবগুলো পথকেই সংশ্লিষ্ট করে। তাই আমির মধ্য দিয়েই আমাদের প্রকাশ ঘটে। এইখানে তার কাজ ব্যক্তিক নয়, সামষ্টিক।

ছবির হাটে ২০১৪ সালে করা ‘নর-নারী সম্পর্ক’ শিরোণামের কাজটির মধ্য দিয়েও তিনি বাংলাদেশের পারফর্মেন্স শিল্পে নিজস্বতার জানান দেন। যা নারীর বহিঃজগতে বিচরণের অভিজ্ঞতার সাহসী বয়ান ও পরিবর্তনের আহবান। রাস্তায়, ফুটপাতে, বাসে সবখানেই পুরুষ কর্তৃক নারীদের শরীরে হাত দেয়া একটি সাধারণ ঘটনা। রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যিনি অনতিক্রম্য দূরত্বের কারণে হাত ব্যবহার করতে পারেন না তিনি শিস দিয়ে যান। যেমন ১৪২২-এর পহেলা বৈশাখে নারীর শরীরকে যখন রাজনীতির উপকরণ করা হয়- তখন পুরুষদঙ্গল দূর থেকে ভোগ করেন তার সৌন্দর্য অর্থাৎ এটাই হয়ে উঠেছে ইতিহাস নির্মিত পুরুষের স্বাভাবিকতা।

সুমনা তার এই কাজের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ নয়, সমাধান খুঁজেছেন। অমুক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বালক কলেজ বা মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্য দিয়ে যে বিচ্ছিন্নতা ও বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অকারণ কৌতূহল জন্ম নেয়- তিনি তা মিলিয়ে দিতে চেয়েছেন। যেমনটা এখন পয়লা বৈশাখে নারীর বাহিরকে অবরুদ্ধ করার রাজনীতির বিপরীতে প্রগতির কর্মীরা নারীর আরো বেশি করে বহিঃমুখীতাকেই নারীর পক্ষের বাস্তবতা নির্মাণের যথাযথ ভাষা হিসেবে দেখছেন।

সুমনা তার কাজে অপরিচিত মানুষকে আহবান করেছেন তার সাথে নানাভাবে ভাব বিনিময়ের জন্য। যেমন কোলাকুলি করেছেন; তেমনি করমর্দন করেছেন অপরিচিত দর্শক সারির মানুষের সঙ্গে। তিনি মনে করেন, অপরিচয়ের পর্দা তুলে কোন মানুষের সাথে হাসিমুখে একবার সম্বোধন করলে, পরিচিত হলে, ভাল-মন্দ জিজ্ঞেস করলে আত্মীয়তার যে বন্ধন তৈরি হতে শুরু করে, সেখান থেকে কেউ সহজে এই আচরণ করতে পারে না। এই কাজটিও তার বাস্তব জীবনের নিরীক্ষায় নির্মিত, যা সকল স্তরের নারীর বাস্তবতা।

এই বাস্তবতাই উদযাপিত হলো ১৪২২-এর পয়লা বৈশাখে। সুমনা এর প্রতিক্রিয়ায় শাহবাগে জাতীয় যাদুঘরের সামনে একটি পারফর্মেন্স করেন। যেখানে তিনি শাহবাগের ফুলের দোকান থেকে কিনে নেয়া পঞ্চাশটি ফুলকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। কিছু ফুল জড়ো হওয়া মানুষের মাঝে বিলি করার পর বাকি ফুলগুলো তিনি প্রাত্যহিক খাবারের মত খেতে শুরু করেন। ফুল পুরুষের নন্দনতত্ত্বে নির্মিত নারীকে উপস্থাপনের পুরুষপ্রিয় উপমা। যেসব উপমা প্রতিবাদহীন নিষ্ক্রিয়তার তত্ত্বে নির্মিত। অথচ একই সঙ্গে ফুল মানুষের মানবিক প্রেমের সৌন্দর্য প্রকাশের একটি হাতিয়ারও, যাকে পুঁজি করে ফুলের ব্যবসাকেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে। পুরুষতান্ত্রিক উপমার সূত্র ধরে বলা যেতে পারে- ফুল মানবিক প্রেমের নিষ্ক্রিয় সৌন্দর্যের প্রতীক। তাই তাকে ভোগ ও দলন চলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের নির্দেশ মত। সুমনা এই ভোগ ও দলনকে নির্বেদ ভঙ্গিতে, ১৪২২-এর ঘটনার সক্রিয় দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করেন। যদিও তা কতটা পুরুষতান্ত্রিক উপমা-ঐতিহ্যকে ভেঙ্গে দিতে সহায়ক হবে তা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যায়।

বর্তমান বাস্তবতা থেকে ইতিহাসের দিকে যাত্রা করলে মনে হয় যেন ইতিহাস মানেই পুরুষবাদের ইতিহাস। এই ইতিহাসের উপর দাঁড়িয়ে তাই যেমন জুডি শিকাগো পুরুষবাদী ইতিহাসের স্বাভাবিকত্বের বিপরীতে অবস্থান করেন এবং বলেন- নারীবাদই হতে পারে মানবিকতাবাদ, তেমনি এসময়ে বাংলাদেশের শিল্পী সুমনা সেই ইতিহাসের একমুখীতাকে ভেঙ্গে হয়ে উঠেন ক্রিয়াশীল। সমাজের সাংস্কৃতিক মনোভঙ্গির বাস্তবতার বিনির্মাণে শিল্পী নিজে এবং তার শিল্প একটি সক্রিয় অভিঘাত। সেই দিক থেকে বলা যেতে পারে সুমনা আকতারের কাজগুলো নিষ্ক্রিয় নয়, সক্রিয়। ঋনাত্মক নয়, বিনির্মাণের সক্রিয় ক্রিয়ায় ধনাত্মক।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন- বাংলাদেশের নারী আন্দোলন এককভাবে পশ্চিমের মত সক্রিয় হয়নি; যতটা হয়েছে জাতীয়তাবাদ প্রশ্নে। জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ধারনা যেহেতু জন্মলাভ করেছিল উপনিবেশের শোষণ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে, তাই এখানে উপনিবেশের সকল অমানবিক ও অগণতান্ত্রিক বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করার প্রবনতা নিয়েই স্বাধীন দেশের ধারনাগুলো সুসংহত হয়েছিল। ফলে এখানে সার্বভৌমত্ব বিষয়টি ভূমি পরিমাপের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ নয়- যতটা ছিল মানুষের সার্বিক অধিকার ভোগ করার চেতনার প্রশ্নে। তাই একাত্তরে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশ যত ধর্ষিত হয়েছে তত সংহত হয়েছে এদেশের মানুষের মধ্যে নারী স্বাধীনতার স্বরূপটিও। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নে সহজাতভাবে নারীর সমনাগরিক অধিকারের প্রশ্ন পাকি-চরিত্রের বিপরীতেই জন্ম নিয়েছে। আলাদাভাবে এখানে নারী অধিকারের লড়াই বাংলার নারীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি, কিন্তু নারী একাত্তরে পুরুষের পাশাপাশি সক্রিয় থেকেছে। এই সক্রিয়তাই বাহাত্তরের সংবিধানে নারীকে মানুষ হিসেবে অর্ন্তভুক্ত করতে সাহায্য করে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের অভয়ারণ্যে বাংলাদেশ পরিণত হলে, সেইসব যুদ্ধাপরাধী ও যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে জাহানারা ইমাম মাঠে যে আন্দোলন গড়ে তোলেন তা পরবর্তী বাংলাদেশের নারীর অধিকারকে সক্রিয় রাখতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। একইভাবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনও নারীকে বাইরের আলো-হাওয়ায় ক্রিয়াশীল রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, নারীর সক্রিয়তাই নারী স্বাধীনতার প্রধান ধর্ম। বাকি নিষ্ক্রিয়তারকালে নারী আন্দোলন বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক স্বৈরাচারী রূপের প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যেই লীন থেকেছে।

সেইসব নিষ্ক্রিয়, ঋনাত্মক দিনের মধ্য থেকেও যারা স্বাধীন বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক উপনিবেশকে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধটা চালিয়ে যান, সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেন সার্বিক জীবনাচরণে-পারফর্মেন্স শিল্পী সুমনা আকতার তাদেরই একজন।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »