একান্ত সাক্ষাৎকারে শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর

তবু আমি বললাম, আর্টিস্ট হতে চাই

syed_jahangir_chitram2

শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর

বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক চিত্রকলার প্রথম প্রজন্মের শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর। এদেশের চিত্রচর্চাকে আধুনিকতার আবেশে পূর্ন করে দিতে যারা নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন, তাদের অগ্রগন্যদের একজন তিনি। জন্মেছিলেন সাতক্ষীরায় (তৎকালীন খুলনায়) ১৯৩২ সালের নভেম্বরের কোন এক দিনে। আঁকার নেশায় পেয়েছিল একেবারে সেই শৈশব থেকেই। দিন দিন বেড়েছে তৃষ্ণা। পারিবারিক আবহ সেই তৃষ্ণা নিবারনে রেখেছে সহায়ক ভূমিকা। হয়েছেন ঋদ্ধ। সম্প্রতি শিল্পী আমজাদ আকাশ হাজির হয়েছিলেন দেশের এই বর্ষিয়ান মাস্টার পেইন্টারের স্টুডিওতে। আমজাদ আকাশের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর মেলে ধরেছিলেন তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি।

আমজাদ আকাশ: আপনার শৈশব নিয়ে কিছু বলুন। ছবি আঁকা শুরু হয়েছিল কীভাবে?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
আর্টের প্রতি আমার প্রথম আকর্ষণ জন্মে মাকে নকশী কাঁথা সেলাই করতে দেখে। আমি তখন একদম ছোট, মাকে দেখতাম কাঁথা সেলাই করতেন, সুন্দর সুন্দর নকশা করে। কোনো ড্রইং ছাড়াই সরাসরি তিনি সুঁই সুতো দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইন করতে পারতেন। আমি ছিলাম ছোট ছেলে, মা আমাকে পাশে বসিয়ে কাজ করতেন। আমিও মায়ের সঙ্গে সেলাই করতাম। মায়ের কাজ আমাকে অবাক করতো।

এছাড়া আরেকটি ঘটনা মনে পড়ে। গ্রামে তখন সব মাটির ঘর, শনের ছাউনি। মাটি লেপে দেওয়ার পর কেমন সুন্দর ক্যানভাসের মতো মনে হতো। আমি কাঠ কয়লা দিয়ে সেখানে এটা-ওটা আঁকতাম। ঘুড়ি এঁকে লম্বা লেজ বের করে দিতাম। একারণে বাবার অনেক বকা খেয়েছি।

আমজাদ আকাশ: স্কুলে ভর্তি হলেন কবে?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: সম্ভবত ১৯৩৬ সালে আমি প্রথম স্কুলে যাই। আমার জন্ম ১৯৩২ সালের নভেম্বরে। যদিও সার্টিফিকেটে আমার জন্ম তারিখ লেখা আছে ১৯৩৫ সালের পয়লা জানুয়ারি। তখন তো আর জন্ম নিবন্ধনের ব্যাপারটা ছিল না। আমার আব্বা আমার বয়স দুবছর কমিয়ে দিলেন, যাতে চাকরি-বাকরি করতে সুবিধা হয়। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় গণিত শিক্ষক ছিলেন হরেন বাবু। তার এক ছোটভাই গগনবাবু একদিন আমাকে শ্লেটে একটা প্রোফাইল ড্রয়িং করে দেখালো। একেবারে একটানে কপাল-নাক-ঠোঁট এঁকে ফেললো। আমার কাছে খুব অদ্ভুত লাগলো, আরে এভাবে মানুষের ছবি আঁকা যায়! এটা দেখে আমি তার ভক্ত হয়ে গেলাম। আমিও তার মতো শ্লেটে ছবি আঁকতে শুরু করলাম।

এরপর একটা সুযোগ হলো, আমার চাচা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম সুসলিম মেয়র। তারপর ডেপুটি স্পিকার, পরে স্পিকার হয়েছিলেন। তিনি রাজনীতি করতেন। উনার একজন আর্দালি ছিল। ব্রিটিশ আমলে সেই আর্দালীরা বিশেষ ড্রেস পরতো, লাল ব্লেজার। চাচা গ্রামে এলে দেখতাম, সেই আর্দালী কলম দিয়ে প্যাডে সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকতো। তখন একটা কলম ছিল, দু-দিকে দুরকম কালি। ওই কলম দিয়ে সে ছবি আঁকতো। ঘোড়া, পরী ইত্যাদি আঁকতো। ওর কাছেও আমি ছবি আঁকা শিখেছি।

আমাদের বাড়িতে চাচার একটা পোর্ট্রেট ছিল, তেলরঙে আঁকা। চাচা রাজনীতি করতেন। বহুবার জেল খেটেছেন ফজলুল হক, নেহেরু, বিধান চন্দ্র রায়ের সাথে। শুনেছি, এক লোক নাকি চাচাকে গাড়িতে উঠতে দেখেছে একবার আর বাড়িতে গিয়ে পোর্ট্রেটটা এঁকে ফেলেছে। আমি ভাবলাম, এটা তো একটা জাদুর ব্যাপার। মাত্র একবার দেখে কী করে ছবি আঁকা যায়! সুন্দর পোর্ট্রেটটা দেখে আমার মনে হয়েছিল, আমাকেও ছবি আঁকা শিখতে হবে। একবার সেই ভদ্রলোক কলকাতা থেকে আমাদের গ্রামে এলেন আমার চাচার কাছে। তখন তাঁর সাইকেল নষ্ট হয়ে গেল। আমি লেগে গেলাম, তাঁর সাইকেল ঠিক করতে। ভাবলাম, কীভাবে তাঁর সাথে একটু খাতির করা যায়। বললাম, আপনি একটা জাদুর ছবি এঁকেছেন আমার চাচার। আমাকে এরকম শিখতে হবে। তিনি বললেন, জাদুটাদু নয়, তোমাকে শিখতে হবে ছবি আঁকা। সেই ছিল আমার ছোটবেলার ছবি আঁকার কাহিনী।
আমার বড় ভাই কবি সিকান্দার আবু জাফর যিনি কলকাতায় থাকতেন। একবার তার বাসায় গেলে তিনি আমাকে এক জোড়া জুতা কিনে দিয়েছিলেন। সেই জুতার বাক্সে আমি অনেক ছবি এঁকেছিলাম। তা দেখে জাফর ভাই বললেন, তুই তো ভালো আঁকিস! পরে জাফর ভাই ঢাকা চলে এলেন দেশ বিভাগের পর। তার উৎসাহে ম্যাট্রিক পাশ করার পর আমি ঢাকা এসে আর্ট কলেজে ভর্তি হলাম। ১৯৫০ সালে আমি ম্যাট্রিক পাশ করি। তখন তরুণ কবি হিসেবে জাফর ভাইয়ের বেশ নাম হয়েছে। তার বাংলা ছাড়ো কবিতাটি তো বেশ পরিচিতি পেয়েছে তখন।

আমজাদ আকাশ: আর্ট কলেজে আপনি কি থার্ড ব্যাচে ভর্তি হয়েছিলেন? তখন আর কারা ছিলেন আপনাদের সঙ্গে?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
হ্যাঁ, থার্ড ব্যাচে ভর্তি হলাম আমি। ফার্স্ট ব্যাচে ছিল আমিনুল ইসলাম, হামিদুর রহমান। সেকেন্ড ব্যাচে কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশির, আব্দুর রাজ্জাক, রশিদ চৌধুরী ছিল। আমার ব্যাচে মমিনুল, সবুর, কামাল এরা ছিল।

আমজাদ আকাশ: আপনি যখন চিন্তা করলেন আর্ট কলেজে পড়বেন, তখন কি পরিবার থেকে উৎসাহ পেয়েছিলেন?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: না, খুব উৎসাহ যে পেয়েছি, তা নয়। আমার বাবা বললেন, তুমি আর্টিস্ট হয়ে কী করবে? আসলে আমি নিজেও জানতাম না, আর্টিস্ট হয়ে কী করবো। আমার সামনে সেরকম কোনো দৃষ্টান্ত ছিল না, যে আর্টিস্ট হয়ে কী করা যাবে। তবু আমি বললাম, আমি আর্টিস্ট হতে চাই। এরপর আর বাধা দেয়নি। আর জাফর ভাইয়ের উৎসাহ পেয়েছিলাম। ভর্তি হলাম আর্ট কলেজে। জাফর ভাইয়ের সাথে বিভিন্ন পত্রিকার বেশ যোগাযোগ ছিল। ৫৬ বা ৫৭ সালে সাহিত্য পত্রিকা মাসিক সমকাল বের হতো। হাসান হাফিজুর রহমান, দেবদাস চক্রবর্তী একদিন জাফর ভাইকে বললেন, সমকাল পত্রিকাটি বের করতে পারছেনা পয়সার অভাবে। এটি কি সমকাল মুদ্রণ থেকে প্রকাশ করা যায় কিনা। জাফর ভাই রাজি হলেন। সমকাল প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন। আমাকে প্রচ্ছদ করার দায়িত্ব দিলেন। আমি নিজে প্রচ্ছদ করতাম। একবার পরিকল্পনা করলাম বারো জন শিল্পীকে দিয়ে বারোটি প্রচ্ছদ করবো। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশির, কাইয়ুম চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তী, বিজন চৌধুরী… এঁরা প্রচ্ছদ করেছিলেন।
এছাড়া সেইসময় বিভিন্ন বইয়ের প্রচ্ছদ করার কাজ পেয়েছিলাম। জাফর ভাইয়ের পরামর্শে শিল্পী কামরুল হাসানের কাছে ফ্রি হ্যান্ড লেটারিং শিখেছি কিছুদিন। তিনি ছাত্রদের খুব স্নেহ করতেন। তার তত্ত্ববধানে আমরা আউটডোরে ছবি আঁকতে যেতাম।

আমজাদ আকাশ: সেসময় আউটডোরে ছবি আঁকতে গেলে লোকজনের মনোভাব কেমন ছিল?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: লোকজন তেমন ডিস্টার্ব করতো না। বলাবলি করতো, ‘ঐ দেখ, আর্টিস করতাসে’। আর্টিস করতাসে মানে ছবি আঁকছে, এটা বোঝাতো। আমরা এসব নিয়ে কিছু মনে করতাম না। আমরা আমাদের মতো ছবি আঁকতাম।

আমজাদ আকাশ: তখনকার মুসলিস সোসাইটিতে ছবি আঁকাতে আপনাদের কোনো প্রবলেম হতো?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: না, তেমন কোনো প্রবলেম হতো না। তবে একবার একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমি আর দেবদাস যেতাম আউটডোরে স্কেচ করতে। আমরা একবার বাবু বাজারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। একটা জায়গায় আমরা দেখলাম, অনেক মেয়ে পেটিকোট-ব্রা পরে দাঁড়িয়ে আছে। একটা মেয়ে এসে দেবদাসকে ধরলো, দাদা কোথায় যাচ্ছো বলে। তখন আমরা বুঝলাম, ভুল রাস্তায় এসে পড়েছি। দেহ ব্যবসায়ীদের এলাকা ছিল ওটা। আমরা বললাম, আমরা ছবি আঁকতে যাচ্ছি। ওরা বলে, ছবি কী, আমরা ছবি বুঝি না। বললাম, ঠিক আছে, আমরা যখন ফিরবো, দেখাবো, কী ছবি এঁকেছি। সত্যিই ফেরার সময় সেই রাস্তা দিয়ে এলাম এবং ওদেরকে দেখালাম আমাদের আঁকা ছবি। সেই থেকে ওরা আমাদেরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতো। এছাড়া আর কোনো সমস্যায় কখনো পড়িনি। আমি আবার কখনো-কখনো একটা নৌকা ভাড়া করতাম সারাদিনের জন্য। সেই নৌকায় বসে বসে ছবি আঁকতাম। ব্রিটিশ কাউন্সিলের কর্মকর্তা হেডলি একদিন বললো, আমার সাথে নৌকায় যাবে, ছবি আঁকা দেখতে। সে শুয়ে শুয়ে সান বাথ করতো, বই পড়তো আর ছবি আঁকা দেখতো। এরকম দুদিন গেল। তারপর তৃতীয় বার যখন গেল, এরপর থেকে প্রায় মাসখানেক কোনো যোগাযোগ নেই তার। পরে জানলাম, কড়া রোদে তার সারা গায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের কড়া রোদ সম্পর্কে তার ধারনা ছিল না আগে। অসুস্থ হয়ে গেলে সে দার্জেলিং চলে গেল। ফিরলো এক মাস পর। দেখি, তখনও খুব একটা সুস্থ হয়নি সে। হাডলি আমাকে পছন্দ করতো খুব। ইংল্যান্ড থেকে রং, ছবি আঁকার কাগজ ইত্যাদি নিয়ে আসতেন আমার জন্য। তখন তো এসব এখানে ভালো পাওয়া যেত না।

আমজাদ আকাশ: আপনি মেট্রিকুলেশন করলেন কোথা থেকে?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
গ্রাম থেকেই মেট্রিক করেছি। স্কুলের নাম ছিল তালা বিদে ইনস্টিটিউট।

আমজাদ আকাশ: গ্রামের পরিবেশ তখন কেমন ছিল?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
গ্রামের পরিবেশ খুব সুন্দর ছিল তখন। মাটির রাস্তা ছিল। দুই মাইল পায়ে হেটে স্কুলে যেতাম। আবার ফিরতাম দুই মাইল হেটে। এরপর তিন মাইল হেটে আবার ফুটবল খেলতে যেতাম। তখন গ্রামের পরিবেশটা অন্যরকম ছিল। খুব ভালো ছিল সেই পরিবেশ। আমার সেই স্কুলে আমি এখন একটা স্কলারশিপ দেই ।

বার্জার থেকে একটা পুরস্কার পেয়েছিলাম এক লাখ টাকার। সেই টাকাটা আমি আমার স্কুলে দিয়ে দিয়েছি, চারটা ছাত্রকে সেই টাকা থেকে স্কলারশিপ দেয়া হয় প্রতিবছর।

আমজাদ আকাশ: আর্ট কলেজ থেকে যখন পাশ করে বেরুলেন, তখন পেশাগত জীবন শুরু করলেন কীভাবে?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর সহপাঠিরা বিভিন্ন জায়গায় চাকরি নিয়ে নিল। কেউ আর্ট কলেজে ঢুকলো। নওয়াবপুর হাই স্কুলে ঢুকলো কিবরিয়া। বাসেত, দেবদাস সহ আরও অনেকে চাকরি নিয়ে চলে গেল এদিক-ওদিক। আমিনুল ইসলাম ইতালি গেল। মূর্তজা বশিরও ইতালি গেল পরবর্তীতে। আমি ছবিই আঁকা শুরু করলাম। আমি ভাবলাম, আমি পাঁচ বছর কষ্ট করে ছবি আঁকা শিখেছি আর্টিস্ট হওয়ার জন্য। আমি আর্টিস্টই হবো। ছবি আঁকবো। আমি একটানা বাইশ বছর ফ্রি ল্যান্সার ছিলাম। ছবি আঁকতাম। ছবি বিক্রি করতাম।

আমজাদ আকাশ: আপনার কোন একটি লেখায় পড়েছিলাম যে, একজন শিক্ষক ফার্স্ট ক্লাস না পাওয়ার ব্যাপারে আপনাকে বলেছিলেন…
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
হ্যাঁ খাজা শফিক আহমেদ বলেছিল এই কথা। আমি বিএফএ-তে ফার্স্ট ক্লাস পাইনি। ওই বছর কাউকেই ফার্স্ট ক্লাস দেওয়া হয়নি। আমি স্যারকে বলেছিলাম, স্যার আমি তো সার্টিফিকেট নেবার জন্য পড়িনি, আমি আর্টিস্ট হবার জন্য পড়েছি। আর্টিস্ট তো আমি হয়েছি। আমি ছবি আঁকি। আমি অতো কিছু পরোয়া করি না। ইনফ্যাক্ট আমি সার্টফিকেট নিইনি। বহুবছর পর দেশে যখন মার্শাল ল’, আমি শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি করি, তখন কেউ একজন বলেছিল, জাহাঙ্গীর সাহেবের সার্টিফিকেটই নেই, উনি পাশ করেননি আর্ট কলেজ থেকে। আমি ভাবলাম, আরে তাইতো, সার্টিফিকেট তো আমার নেওয়া হয়নি। আমিনুল ইসলাম তখন আর্ট কলেজের প্রিন্সিপাল, আমাকে সার্টিফাই করে দিলো।

আমজাদ আকাশ: আপনাদের সময়ে কি জয়নুল আবেদিন স্যার সরাসরি সার্টিফিকেট দিতেন হাতে লিখে?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
হ্যাঁ, জয়নুল আবেদিন স্যার সার্টিফিকেট দিতেন সেসময়। আবেদিন স্যার আমার উপর একটু রেগে ছিলেন। একবছর স্যার বললেন, এবার কোনো প্রদর্শনী করা যাবে না, সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। আমি ভাবলাম, একটা বছর এমনি চলে যাবে, আমি প্রদর্শনী করলাম। ছবি ভালো বিক্রি হলো। স্যারের অনুমতি না নিয়েই করেছিলাম। আবেদিন স্যার শুনে খুব রাগ করলেন। পরে অবশ্য সেই রাগ ছিলো না আর। বন্ধুর মতো হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। আমার বাড়িতে গিয়ে থাকতেন। রাওলাপিন্ডিতে আমার বাড়িতে তিনি অনেকবার গিয়েছিলেন। যখনই কোনো কাজে রাওয়ালপিন্ডি যেতেন, হোটেলে উঠেই আমাকে ফোন করে বলতেন, জাহাঙ্গীর আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়া যাও তো। গেঞ্জি গায়ে দিয়া তোমার বাড়ির লনে বইসা একটু চা খামু। হোটেলে কী এইসব হবে!

আমজাদ আকাশ: আবেদিন স্যারের সঙ্গে প্রথম দেখা হলো কখন?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
আর্ট কলেজে ভর্তি হবার প্রথম দিনই তাঁর সাথে আমার প্রথম দেখা। আমি ইন্টারভিউ দিতে এসে দেখি, এক কামরায় চার-পাঁচজন শিক্ষক বসে আছেন। প্রধান আসনে তাঁকে দেখে বুঝলাম, তিনিই জয়নুল আবেদিন। আমাকে দেখে বললেন, তুমিই জাফরের ভাই? আসো, আসো। স্যারকে দেখলাম সিগারেট খাচ্ছেন, তাঁর আঙুলগুলো বাদামী হয়ে গেছে। এতো সিগারেট খেতেন তিনি! অবশ্য আঙুলগুলো খুব সুন্দর লাগতো। স্যার একজন শিক্ষককে বললেন, আনোয়ার, ওর ইন্টারভিউ নেন। তখন আমাকে কলসী আঁকতে বলা হয়েছিল। আঁকলাম। সেটা আদৌ কলসী হলো কিনা এখন আর মনে নেই। যদিও তখন ইন্টারভিউটা ছিল নামে মাত্র। ভর্তি তো করতেই হবে। আসলে তখন ছাত্র দরকার ছিল। এখনকার মতো এতো কম্পিটিশন তখন ছিলো না। তো ভর্তি হলাম আর্ট কলেজে। প্রথমে ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউটের দুটো কামরায় ক্লাস হতো। পরে আর্ট কলেজ চলে এলো সেগুনবাগিচায় মেয়েদের একটা পরিত্যক্ত হোস্টেলে। তো ক্লাস করি সবাই একসাথে, দুই-তিন ক্লাস এক সাথে। আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর সবাই একসাথে ক্লাস করতাম একটা বড় হলরুমে। আমি পাশ করলাম ১৯৫৫ সালে। আর ১৯৫৬ সালে নতুন ভবনে স্থানান্তরীত হলো আর্ট কলেজে, বর্তমানে যে জায়গায় আছে আরকি।

আমজাদ আকাশ: আবেদিন স্যার আপনাদের ক্লাস নিতেন?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
হ্যাঁ, মাঝে মাঝে ক্লাস নিতেন আবেদিন স্যার। আমার মনে আছে আমরা একবার মোরগ আঁকছিলাম, উনি আমাদের মোরগের পা এঁকে দেখালেন। এতো ক্ষিপ্রতার সাথে এতো সুন্দর ড্রয়িং, আমার এখনও মনে আছে!

আমজাদ আকাশ: আর্ট কলেজে পড়াকালীন আপনার কোনো বিশেষ স্মৃতি আছে, যা আপনাকে নস্টালজিক করে তোলে?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি আছে। আর্ট কলেজে আমি ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৫০-এ। ভাষা আন্দোলন হলো ৫২-তে। তখন পুরনো ঢাকার জাদুঘরে আমাদের একটা এক্সিবিশন করার কথা। লেডি ভিকারুন্নেসা নুন সেটা উদ্বোধন করবেন। আমরা ঠিক একুশ তারিখেই পাথরের মূর্তিগুলো সরাচ্ছিলাম। কামরুল ভাই লিডার আমাদের। তিনি আমাদেরকে যেভাবে বলছিলেন, সেভাবে আমরা দু-তিনজন মিলে পাথর সরাচ্ছিলাম। সরিয়ে সরিয়ে আমরা স্পেস তৈরি করছিলাম। মূর্তজা বশির বাইরে গেল দেখতে যে, আজকের যে ১৪৪ ধারা চলছে, কী হচ্ছে। ফিরে এলো একটা রক্তাক্ত শার্ট নিয়ে। বললো, ওখানে গুলি চলেছে, ছাত্ররা মারা গেছে। আমি বিকেল বেলা গেলাম মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে। বারান্দায় দেখলাম, একটা লাশ পড়ে আছে। খুলি নেই, কিছু চুল ঝুলছে। মাথায় গুলি লেগেছিল সেই ছাত্রের।

পরে আমি, কাইয়ূম, আমিনুল, সবুর, দেবদাস, বিজন চৌধুরী আমরা সবাই মিলে প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য সারা রাত জেগে ব্যানার ফেস্টুন তৈরী করেছিলাম। বিজন একটি বিশাল ব্যানার করেছিল, হাতে করে একটা লাশ নিয়ে যাচ্ছে, তাতে রক্ত ঝরছে। গুলিস্তানের রাস্তায় আমরা সেই ব্যানার সামনে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। রাস্তার দু-ধারে লোকজন বেশ উৎসাহ নিয়ে দেখছিল।

আমজাদ আকাশ: আর্ট কলেজে তখন কী ধরনের কাজ করাতো আপনাদের।
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
আর্ট কলেজে তখন তো ইন্টারমিডিয়েট করতে হতো। দু-বছর সব ক্লাস একসঙ্গে হতো। সবাইকে একই রকমের ক্লাস করতে হতো। স্টিল লাইফ করতে হতো, পারসপেক্টিভ করতে হতো। ড্রয়িং হতো ফার্স্ট ইয়ারে, সেকেন্ড ইয়ারে জলরং। থার্ড ইয়ারে গিয়ে তেলরংয়ে কাজ হতো। কপি করতে হতো, স্টিল লাইফ ছিলো, মেমোরি থেকে কিছু কাজ করতে হতো। আর লাইন শেখানো হতো।

আমজাদ আকাশ: আপনি কিউবিক ফর্মে যে ধরনের কাজ করেন, সেটা কবে থেকে শুরু করলেন?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পরপরই শুরু করি। ৫৬-তে আমার একটি কাজ আছে ত্রয়ী, আরেকটা মজুর, হাতুড়ি। সুররিয়ালিস্টিক কাজও করলাম। ভাবলাম, এসব বেশিদিন করা যাবে না। বদলানো চাই। বদলাতে গিয়ে অনেক কাজ করলাম।

আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য একটা সময়ের কথা বলি। ১৯৫৫ সালে সবে আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে বের হয়েছি। ব্রিটিশ কাউন্সিলের তৎকালীন ডিরেক্টর জিওফ্রি হেডলি এবং ইউএসআইএস লাইব্রেরির ডিরেক্টর গেইলর্ড হফটাইজার আমাকে বেশ সহযোগিতা করেছিলেন সেসময়। ইউএসআইএস থেকে আমি একটা ফেলোশিপ পেয়ে ১৯৫৮ সালে আমেরিকা যাই। আমিই প্রথম আর্টিস্ট হিসেবে এই ফেলোশিপ পেয়েছিলাম। এটি সাধারণত মন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা পেতেন। আমি গেলাম তিন মাসের জন্য। তিন মাসে ২২টা স্টেট ঘুরে ঘুরে দেখলাম। মাঝে মাঝে লেকচারও দিয়েছি। দুটো প্রদর্শনীও করলাম ওখানে। তিন মাস হয়ে যাওয়ার পর আমি নিজের পয়সায় কিছুদিন ছিলাম। আমি অনেক টাকা পেয়েছিলাম ফেলোশিপ থেকে। তখন পার ডে ২১ ডলার করে দিতো আমাকে। সবমিলিয়ে ছয়মাস ছিলাম ওখানে। আমার অনেক ছবি বিক্রি হয়েছিলো সেখানে। ওয়াশিংটন ডিসি ও ফিলাডেলফিয়ায় এক্সিবিশন করেছিলাম। এরপর ঢাকায় চলে এলাম। ঢাকায় তো ছবি বিক্রি করা মুশকিল। তখন ছবির ক্রেতাদের মধ্যে ৫% বাঙালি ছবি কিনতো। এখন তো ৯৫% বাঙালি ক্রেতা। ছবি বিক্রির আশায় আমি চলে গিয়েছিলাম রাওয়ালপিন্ডি। সেটা ১৯৬০ সাল। দেশে ফিরে এসেছিলাম ১৯৭৩ সালে। ওখানে গিয়ে আমি নিজের ছবির একটা বিরাট মার্কেট তৈরি করে ফেলেছিলাম। চারটা ইন্টারকন্টিনেন্টালের প্রত্যেকটাতে আমি প্রায় দুই-আড়াইশ জল রং এর ছবি বিক্রি করেছিলাম। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় ছবি বিক্রি করেছি।

আমজাদ আকাশ: পাকিস্তানে আপনার একটি আর্ট গ্যালারি ছিল…
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
১৯৬৪ সালে আমি একটা আর্ট গ্যালারি তৈরি করি। আমার স্ত্রী পাকিস্তানের ওপর মহলে বেশ সুপরিচিত ছিলেন। তিনি একটা হ্যান্ডিক্রাফট শপ চালাতেন। সরকারী ছিল ওটা। তিনি সরকারী চাকরি করতেন। সেই সুবাদে বহু লোকের সঙ্গে পরিচয় হলো। অনেকে আমার বাসায় আসে ছবি কিনতে। তারা অনেকেই জানতো না, কোথায় ছবি কিনতে পাওয়া যায়। আমার স্ত্রী কিছু ছবি তার শপে রেখেছিলেন। পরিচিত এক ফরাসী সাংবাদিক ছিল। নাম ভস্কে। তাকে বললাম, একটা আর্ট গ্যালারি করলে কেমন হয়? সে রাজি হলো। আমরা একটা ঘর ভাড়া করে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে গ্যালারি তৈরি করলাম। বেশির ভাগ ছবি বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যেতাম। রফিকুন নবী, আনোয়ার, কাইয়ূম, হাশেমের ছবি নিয়ে যেতাম। হাশেম তখন খুব সুন্দর ওয়াটার কালার করতো। বেশ ভালোই কয়েক বছর চলেছে গ্যালারি।

আমজাদ আকাশ: আপনি সেখানে বাড়িও বানিয়েছিলেন?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
ক্যাপিটেল ডেভেলপমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান ওজিড আলী শেখ একজন আইসিএস। ইন্ডিয়ান। আমার স্ত্রীর পরিচিত ছিলেন তিনি। আমার স্ত্রীর বাড়ি ছিল আলিগড়ে। তিনি একদিন আমাকে অফিসে ডেকে একটা ফরম সই করতে বললেন। আমি বললাম এটা কী? তিনি বললেন, একটা জমি।
-কোথায়?
-ক্যাপিটেলে।

-জমি নিয়ে আমি করবো কী?
-বাড়ি বানাবে। ইস্ট পাকিস্তানিরা দোষ দেয়, ওদের কোটা দেওয়া হয় না…।

শেষ পর্যন্ত আমি সাইন করলাম ১২৫০ টাকা দিয়ে। পাহাড়ের উপর ছিল জায়গাটা। বেশ গরম ছিল ওখানে। ইতালিয়ান এক নামকরা আর্কিটেক্ট আমার স্ত্রীর দোকানে এলেন। নাম জিও পন্টি। তিনি হোটেল, জাদুঘর এসব ডিজাইন করতেন। আমার বাড়িতে একবার এসেছিলেন আমার কাজ দেখতে। আমার কাজ দেখে খুব খুশি হলেন। ইসলামাবাদে আমার এক টুকরো জায়গা আছে শুনে বললেন, আমাকে দেখাও, আমি বাড়ির ডিজাইন করে দেব। আমি অবাক, এই লোক আমার বাড়ির ডিজাইন করে দেবে! যাই হোক, আমি তাকে নিয়ে গেলাম জায়গা দেখাতে। তিনি বললেন, আমরা ইতালিতে এরকম পাহাড়ের স্লোপের মধ্যে বাড়ি করি। আমি ভাবলাম, তিনি ইতালি গিয়ে সব ভুলে যাবেন। কিন্তু তিনি পরের বছর ফিরে এলেন বাড়ির ডিজাইন ও ছোট্ট মডেল নিয়ে। তো সেই বাড়িটা আমি করেছিলাম আরকি। পরে তো ফেলে চলে এলাম।

আমজাদ আকাশ: আপনি যখন একাডেমিক কাজের ধারার বাইরে এসে কাজ শুরু করলেন, তখন কী ধরনের সমস্যায় পড়লেন?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: আমি ঠিক প্ল্যান করে আঁকার ধারা পরিবর্তন করিনি। এটা স্বত:স্ফূর্তভাবে হলো। আমি যখন বাংলাদেশে আসি, বাংলাদেশকে একটা নতুন দেশ মনে হলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ। সবাই কাজ করে নতুনভাবে এগিয়ে নিতে চায় দেশকে। আমার খুব ভালো লাগলো এসব দেখে। তখন আমার বন্ধু নুরুল কাদের খান টুরিজম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ছিল। আমি তার সাথে কাপ্তাই লেকে গিয়েছি। হঠাৎ দেখি পানির নিচে একটা গাছের গুঁড়ি, সেটা থেকে নতুন ডাল বেরুচ্ছে। তখন আমার মনে হলো, বাংলাদেশেও এরকম উজ্জীবন ঘটছে। সেই সময়েই আমি বিমূর্ত ধারায় চলে গেলাম।

আমজাদ আকাশ: ভিন্ন ধারায় কাজ করার বিরোধীতা করেননি আপনার শিক্ষকেরা?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
না বিরোধীতা কেউ করেননি। বরং আবেদিন স্যার উৎসাহ দিয়ে বলতেন আমরা যা পারিনি, তা তোমরা করে দেখাও।

১৯৭০ সালে যখন সাইক্লোন হলো, তার তিনদিন পর আমি ঢাকায় এলাম সাইক্লোনের ওপর কাজ করতে। চট্টগ্রামে ফজলে হাসান আবেদের বাড়িতে একটা ক্যাম্প করা হয়েছিল। আমি সেখানে গেলাম। আবেদ আমার পূর্ব পরিচিত ছিল। আবেদ বললো, তুমি এক্ষুনি এয়ারপোর্টে যাও। ওখানে দেখো মওদুদ যাচ্ছে, তুমি মওদুদের সাথে চলে যাও জার্মান এয়ার ক্রাফটে। দ্রুত এয়ারপোর্টে গেলাম। হেলিকপ্টার মাটি থেকে জাস্ট উপরে উঠেছে, আমরা প্রায় লাফ দিয়ে উঠে গেলাম। প্রথমে গেলাম মনপুরা। সেখানে ছিলাম রাতে। পরদিন গেলাম চর ওসমান। পুরো এলাকা পানিতে ভরা, শুধু মাটির ভিটাটুকু শুকনো। ওখানেই একটা ক্যাম্প করে থাকলাম আমরা। দু-তিনদিন ছিলাম। হেলিকপ্টার থেকে রিলিফ দিয়ে যেত, প্রচুর লোক আসতো রিলিফ নিতে। আমরা লাশ মাটি চাপা দিতাম একের পর এক। পরদিন পানিতে আরও লাশ ভেসে আসতো। কিছু ছবি এঁকেছিলাম লাশের। এতো বিভৎস ছিল! ওসব আর এক্সিবিট করিনি।

আমজাদ আকাশ: আপনার স্ত্রীর সাথে কীভাবে পরিচয় হয়েছিল আপনার?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
আমার স্ত্রী আনিস জাহাঙ্গীরের সাথে আমার পরিচয় ১৯৫৪ সালে ঢাকায়। ঢাকায় এক শিল্পমেলায় পশ্চিম পাকিস্তানের স্টলের ডিজাইন করেছিল মাজহারুল ইসলাম। আর ইন্টেরিয়র ডিজাইন করেছিলাম আমি আর আমিনুল ইসলাম। স্টলের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে এসেছিল আনিস। সেখানেই পরিচয়। পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, পাকিস্তান আসো না কেন তুমি? লাহোরে আমি তোমার একটা এক্সিবিশন অর্গানাইজ করে দেব। ওখানে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ আছেন। তিনি আমার পরিচিত, কোনো অসুবিধা হবে না।
তো হুট করে আমি গেলাম লাহোরে।

আমজাদ আকাশ: প্রথম একক প্রদর্শনী করলেন কবে?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর :
১৯৫৭ সালে ঢাকায়, ব্রিটিশ কাউন্সিলে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ডিরেক্টর জেফরি আমার কাজের ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিল। তিনি সব আয়োজন করে দিয়েছিলেন। অনেক ছবি বিক্রি হয়ছিল সেই এক্সিবিশনে। এরপর চট্টগ্রাম ক্লাবে এক্সিবিশন করেছিলাম।

আমজাদ আকাশ: শুরুতে আপনার ছবির দাম কেমন ছিল?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
আমার প্রথম ছবি বিক্রি হয়েছিল ৫০ টাকায়। তখন আবেদিন স্যারের ছবি বিক্রি হতো ১০০ টাকায়।

আমজাদ আকাশ: রাওয়াল পিন্ডিতে যখন আপনি কাজ করছিলেন, ওখানকার আর্টিস্ট সোসাইটির সাথে কেমন যোগাযোগ ছিল?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: ওখানকার আর্টিস্ট সোসাইটি বেশ আমাদের ঈর্ষাই করতো। পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পীদের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পীদের কাজ অনেক উন্নতমানের ছিল। সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, কাইয়ূম চৌধুরী এঁদের কাজ অনেক উন্নত ছিল। যদিও পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পীদের কাজের অনেক সুযোগ ছিল। তারা প্রায় সবাই ইউরোপে যেত। কাজ শিখে আসতো। তবে বেশিরভাগ এমন বিমূর্ত কাজ করতো, তা ওরা নিজেরাই বুঝতো না। ওখানে শাকির আলী ছিল একমাত্র আর্টিস্ট, যে চেকোশ্লাভাকিয়ায় পড়ালেখা করেছিল। আর ছিল সাদেকাইন, যে সুলতানের ভাবশিষ্য ছিল। নারী আর্টিস্টদের মধ্যে ছিল আন্না, জোবাইদা। জোবাইদার একটি গ্যালারি ছিল।

আমজাদ আকাশ: আপনার কাজে নীল এবং সোনালী রঙের ব্যবহার বেশি। এটা কেন?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
কেন, সেটা জানি না। কাজ করতে করতে হয়ে যায় এমন। এই দুটো কালার আমার খুব আকর্ষণীয় মনে হয়। দুটো বিপরীত ধরনের রঙ, কিন্তু দুটোকে মিলিয়ে কাজ করতে মজা পাই। বাংলাদেশের আকাশ, নদী, সমুদ্র নীল আর ধানক্ষেত সোনালী। তাই গোল্ডেন-ব্লু নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগে।
দীর্ঘদিন বিমূর্ত কাজ করার পর, আমি আবার ফিগারেটিভে ফিরে এলাম। স্বাধীনতার পর দেশ যখন এগিয়ে যাবে, এমন সব অরাজকতা, বেঈমানী শুরু হয়ে গেল! আমি তখন প্রিমনিশন (অশনি সংকেত) নামে একটি সিরিজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু এই অরাজকতার ধারাবাহিকতা যে বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলবে, এটা ভাবিনি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আমি সেই কাজটা আর করিনি। সিরিজটা বন্ধ করে দিলাম। এরপর অনেকগুলো সিরিজ করেছি। যেমন এসটেসি, পরমানন্দ, ভাইব্রেশন। ভাইব্রেশন হলো একটা ইতালিয়াল কমিউনিকেশন। ধরো তুমি এখানে আছ, তোমার বাবা-মা গ্রামে। হঠাৎ তোমার বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো বাব-মায়ের জন্য, অসুখ-বিসুখ হলো না তো, কোনো বিপদ হলো না তো! এটা কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও সত্য। এমন হতে পারে। আরেকটা সিরিজ করলাম, ইনার স্ট্রাকচার (ভেতর গড়ন)। এরপর করলাম, ইনকোয়েস্ট অব আননোন। এটা ছিল ভাইব্রেশন সিরিজের কন্টিনিউশন। এই কাজগুলো এবস্ট্রাক্ট ফর্মে করা।

আমজাদ আকাশ: আপনি বিমূর্ত কাজ কি এই ভেবে করতেন যে, এটা মুসলিম দেশ, ফিগারেটিভ কাজ বিক্রি হবে না, কিন্তু আপনাকে ছবি বিক্রি করতে হবে…

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: না, আমি রিয়েলস্টিক কাজও করেছি অনেক। একবার আমি আর বেলাল চৌধুরী গিয়েছি পার্বত্য চট্টগ্রামে। সেটা ১৯৬২ সালে। শুরু করেছিলাম বান্দরবান থেকে। হাঁটতে হাঁটতে ৩০/৪০টা গ্রাম ঘোরা হলো। একটা লোক ছিল, বাঁশের মাথায় আমার পেইন্টিং এর ব্যাগটা নিতো আর একটা বেড হোল্ডার থাকতো। ওখানে তো তখন মেয়েরা উপরের অংশে কিছু পরতো না, প্রথম দেখে খারাপ লাগতো। তারপর ঠিক হয়ে গেছিল। অনেক ছবি এঁকেছিলাম সেখানে। প্রায় ৫০টা ছবি এঁকেছিলাম। রাওয়াল পিন্ডিতে ফিরে গিয়ে এক সন্ধ্যায় আমার কিছু বিদেশি বন্ধুকে বললাম, আমি বান্দরবানে গিয়েছিলাম ছবি আঁকতে, দেখো, বেশ কিছু ছবি এঁকেছি। তারা এলো আমার বাসায়। সেই এক সন্ধ্যায় সব কাজ বিক্রি হয়ে গেল। এখন আমার যা দুঃখ লাগে, ওর ভেতর এতো ভালো ভালো কাজ ছিল, এখন আমার সংগ্রহে ওসব নেই বলে। কিছু কাজ রেখে দেওয়া উচিত ছিল। তখন ক্যামেরাও ছিল না। ছবিও তুলে রাখা হয়নি।

আমজাদ আকাশ: স্বাধীনতার পর আপনি দেশে ফিরে দেখলেন, দেশের অরাজক অবস্থা। তখন আর্টিস্টরা কীভাবে এ বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছিল? তাদের কাজে এর প্রভাব কেমন পড়ছিল?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
আর্টিস্ট তখন বেশির ভাগ মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই ছবি আঁকছিল।

আমি বিমূর্ত ধারায় কাজ করতে করতে এক সময় রিয়ালাইজ করলাম, এবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং বেশিরভাগ মানুষের কাছে পৌঁছায় না, মানুষ মনে রাখে না। তাই আমি রিয়েলস্টিক আঁকা শুরু করলাম। একটা এবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং এক্সিবিশনে সব ছবি দেখতে প্রায় একই রকম লাগে । আলাদাভাবে কোনো ছবি মনে থাকে না। কিন্তু আমার ছবিগুলোতে থিম পরিস্কার থাকে। প্রিমনিশনের কাজ দেখলে বুঝবে, একটা ওলট-পালট অবস্থা, ভাইব্রেশনের কাজগুলোতে ফিল করবে একটা ভাইব্রেশন…। ইনার স্ট্রাকচাররের কাজ গুলো দেখলে বুঝবে, একটা আলাদা অর্থ। একসময় আমার মনে হলো, লোকে আর এবস্ট্রাক্ট পছন্দ করছে না। একটা ভিন্ন ধারায় চলে এলাম। গত দশ বছর ধরে আমি ফিগারেটিভ ছবি আঁকছি। আমার কিছু পিন পয়েন্ট থাকে, ছবিতে আমি সেটাই ফোকাস করি। যেমন ধরো, একটা বড় ক্যানভাসের শুধু এক কোনায় কিছু মানুষ যাচ্ছে, বাকিটা খালি। আমার যেটুকু দরকার আমি ওইটুকুই ফোকাস করবো। এভাবেই আমি আঁকি।

আমজাদ আকাশ: এখন আপনি প্রতিষ্ঠিত আর্টিস্ট। এখন কে কী পছন্দ করলো সেটা না ভেবে নিজের ইচ্ছে মতো ছবিই আঁকতে পারেন, এটা কীভাবে দেখেন আপনি?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: মানুষ পছন্দ করবে কী করবে না, এটা মাথায় রেখে আমি কাজ করি না। আমি এমনভাবে কাজ করি, যেটা সাধারণ মানুষের বোঝার যোগ্য। মানুষ ভালো বলবে কী খারাপ বলবে, এটা ভেবে কাজ করি না। কাজ করতে করতে যেমন ভালো লাগে আঁকি।

আমজাদ আকাশ: আপনার ছবিতে ফিগারগুলো দেখলে মনে হয়, ঘুমঘোর, ওজনহীন, ভেসে বেড়ানো..। এটা কি সচেতনভাবেই করেন?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: এটা আমি ইচ্ছে করেই করি। আমি চাইলে আরও ডার্ক করতে পারি, কিন্তু আমার এই হালকা ভাবটাই যথার্থ মনে হয়, আমার ছবির পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী।

আমজাদ আকাশ: আপনার ব্যক্তিগত জীবনের ঘোর বা মগ্নতা এখন কী নিয়ে?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
ছবি আঁকাতেই মগ্ন থাকি। এ ছাড়া আর কিছু নেই তেমন। বন্ধুবান্ধবদের অনেকেই নেই। মারা গেছে অনেকে।

আমজাদ আকাশ: এখন কী মনে হয়, একটা প্রেম থাকলে ভালো হতো?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
প্রেম না একটা সঙ্গী হলে ভালো হতো।

আমজাদ আকাশ: আপনি বিয়ে করেছিলেন কত সালে?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
বিয়ে করি ১৯৬৩ সালে। পাকিস্তানে।

আমজাদ আকাশ: আপনার পরিবারের সবাই গিয়েছিল পাকিস্তানে আপনার বিয়েতে?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: না, আমার পরিবারের কেউ যায়নি তখন। তবে বিয়েতে সৈয়দ শামসুল হক ছিল; কোথা থেকে যেন হাজির হয়েছিল। কর্নেল মতিন ছিল, সাঈদ আহমেদ সাঈদ ছিলো।

আমজাদ আকাশ: পাকিস্তান থেকে চলে এলেন সব প্রপার্টি ফেলে, সেইসব দিনের কথা কিছু বলুন।

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: পাকিস্তানে থাকতে আমি টেলিভিশনে খবর পড়তাম। ঢাকায় থাকতে ১৯৬০ সাল থেকেই খবর পড়ি আমি। ১৯৬৪ সালে টেলিভিশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন আসলাম আযহার। পাকিস্তানে তিনি আমাকে খুব উৎসাহিত করেছিলেন খবর পড়তে। তার আগ্রহেই আমি যোগ দিয়েছিলাম ওখানে। সপ্তাহে ছয়দিন খবর পড়তাম। পাঁচ মিনিটের বাংলা খবর হতো তখন। ওটা পড়তাম। খবর পড়ি আর ছবি আঁকি। লাস্ট যেদিন খবর পড়ি… আজ সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান… সেটা ছিল ১৯৭১ এর ২৬ মার্চ। আমরা তখনও জানি না, ঢাকায় কী ঘটে গেছে ২৫ মার্চ রাতে…। পরে যখন ইয়াহিয়ার ভাষণ শুনলাম। আওয়ামী লীগকে ব্যান করেছে, আরও যেসব নির্দেশনা আসলো…। তাতে আমি বললাম, আর খবর পড়বো না, তোমাদের টেলিভিশনে। তখন সবাই বললো, আরে আমরাও তো চাকরি করছি, তুমি কেন করবে না। কিন্তু আমি আর পড়লাম না।

আমার বাড়িতে কিছু আড্ডা হতো সব সিএসপিদের। সিনিয়র বাঙালী আর্মি অফিসাররাও থাকতো আড্ডায়। অবাঙালিরাও আসতো। প্রথম ব্যাচের সিএসপি একেএম আসাদ, সফিউল হক, সানাউল হক খান, একে মুসা, ওবায়দুল হক…। আমার এক বন্ধু ছিল পুলিশে, ইন্টেলিজেন্সে, সে আমাকে একদিন বললো, দুপুরবেলা এখানে একটু আসো।
গেলাম পরে সে আমাকে দেখালো, আমার নামে বিশাল ফাইল রেডি হয়েছে, আমার বাসায় আওয়ামী লীগের মিটিং হয়। আমি টিভিতে খবর পড়া ছেড়ে দিয়েছি ২৬ মার্চ থেকে। এইসব নানা অভিযোগ। আমি বললাম করা যাবে কী, ৯৮ ভাগ বাঙালি ভোট দিয়েছে শেখ মুজিবকে, আওয়ামীলীগকে। তো সেই হিসেবে তো আমিও আওয়ামী লীগ। আর আমার বাড়িতে লোকজন আসে, গল্প করে, সেটাকে যদি মিটিং বলো, বলতে পারো, আমি কী করবো।

সে আমাকে বললো, তুমি আপাতত টেলিভিশনে খবরটা পড়া শুরু করো, আমি বাকিটা দেখছি। আমি খবর পড়া শুরু করলাম। তিনদিন পর আমাকে শফিউল হক নামে এক ছেলে যে ট্রান্সলেট করতো ওখানে, আমাকে বললো, জাহাঙ্গীর ভাই আপনাকে আজ আর আসা লাগবে না। বললাম, কেন? সে বললো, তাতো জানি না, ওপর থেকে অর্ডার এসেছে। নিউজ পড়া লাগবে না। আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। খবর নিতে গেলে আমাকে বলা হলো, তুমি একটা নিউজে আগা শাহীকে জনাব আগা শাহী বলোনি, কিন্তু শেখ মুজিবের নামের আগে জনাব বলেছো। তুমি ইচ্ছে করে এটা করেছো। আমি বললাম, এটা হতে পারে না। কোনো কাগজে লেখা আছে, টেপ আছে সংবাদের? বললো, নেই। একজন ব্রিগেডিয়ার শুনেছেন, তিনি ফোন করে বলেছেন। এই কাহিনীর পর আমার খবর পড়া বন্ধ হলো। আমার জন্য তা শাপেবর হলো।

পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার এক লম্বা কাহিনী আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানে আটকে পড়া অনেকেই দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। দেশ থেকে আমার ভাবী ফোন করে বললেন, সবাই পালিয়ে আসছে, তোমরা আসতে পারছো না। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে ফিরে আসবো। ১৯৭৩ সালে এক দালালের মাধ্যেমে আমরা দেশে ফেরার সব ব্যবস্থা করলাম। আমার দুই ভাইঝি থাকতো আমাদের সাথে। ওদের সাথে নিয়ে আমি লুকিয়ে ট্রাকে উঠে গেলাম দেশের উদ্দেশে।। আমার স্ত্রী অসুস্থ, স্পন্ডিলাইটিসের ব্যথা ছিল। ট্রাকে করে আসা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি পরে সুযোগ মতো আসবেন। ওখানে তার অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে, অসুবিধে হবে না। তাকে রেখে আমরা চলে এলাম।

যাত্রার মাস খানেক আগে দালাল এসে আমাদের সুটকেস নিয়ে গেল। রওনা হওয়ার আগে থেকে গোপনে আলোচনা হচ্ছিল আতাউল হক ও মনিরুল আলমের পরিবারের সঙ্গে। আমরা দালালকে টাকাও পরিশোধ করেছিলাম একসাথে।

এক মধ্যরাতে আমরা রওনা দিলাম। আমরা ত্রিশজনের মতো বাঙালী এক ট্রাকে চললাম। হঠাৎ নির্দেশ এলে শুয়ে পড়ার। জ্যোৎস্না রাত, তাই ট্রাকে করে মালামাল না মানুষ যাচ্ছে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাবে। একটানা চার ঘন্টা জার্নি করে আমরা একটি ট্রাইবাল এরিয়ায় এসে পৌঁছালাম। সীমান্ত এলাকাটির বাড়িগুলোতে ১২-১৪ ফুট উঁচু প্রাচীর ঘেরা। এসব বাড়িতে স্মাগলিং হয়ে আসা পন্যগুলো রাখা হতো। সারারাত আমরা না-খাওয়া। পরদিন রাতে পাহাড়ে ওঠার পালা। পাহাড়ি পথ ধরে চলার এক পর্যায়ে আমাদের একটি গুহার মধ্যে ঢুকানো হলো। এটা ছিল পশুদের বিশ্রামাগার। সেখানে নোংরা তোষক পেতে আমাদের থাকতে দেয়া হলো। সেখানে আটালি নামক পোকা আমাদের আক্রমণ করলো। নীরবে রক্ত চোষে এসব পোকা। সারা গায়ে সেই পোকার কামড়ে দাগ হয়ে গেল। আমাদের খাওয়া নেই, বাথরুম নেই।

দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পেরুলাম পায়ে হেঁটে। জানানো হলো, এবার আর হাঁটতে হবে না, খচ্চরের পিঠে চড়ে পাহাড় ডিঙাতে হবে। পাঠানদের মাথার পাগড়ির কাপড় দিয়ে খচ্চরের সাথে আমাদের বেঁধে দেওয়া হলো, যাতে পড়ে না যাই। এক ভদ্রমহিলা খচ্চর সমেত পড়ে গিয়েছিল পাহাড়ে। একটা পাথরে আটকে তিনি রক্ষা পান। আমরা এভাবে একেকটি পাহাড় পেরিয়েছি।

পরদিন ভোরে আমরা সমতলে পৌঁছালাম। সারা শরীরে প্রচন্ড ব্যথা, জ্বালাপোড়া। সবাই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। খচ্চরের পিঠে গাছের ডালপালা আর বাকল দিয়ে আমাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাতে শরীরের এই অবস্থা হলো। আতাউল হক সাহেবের বড় মেয়ে অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। তার বাবা-মা যন্ত্রণায় এমন কাতর যে, মেয়েকে দেখতে পারছেন না। পাশে একটা চায়ের দোকান থেকে চিনি এনে মেয়ের মুখে ঢুকিয়ে দেওয়া হলে ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ফিরে। দুটো বাসে করে আমরা সেখান থেকে কাবুল পৌঁছালাম। কাবুলে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলো। একেকটা ঘরে ৪০-৫০জন করে থাকার ব্যবস্থা। এরকম একটা ঘরে আমাদের থাকা সম্ভব নয়। আমাদের কাছে টাকা ছিল, দূতাবাসের অনুমতি নিয়ে আমরা একটি হোটেলে গিয়ে উঠলাম। গোসল করে খেয়ে-দেয়ে ঘুমাতে গেলাম। রাতে ছোট মেয়ে মিনার জ্বর এলো। আমার শরীরের অবস্থাও ভালো নয়। পরদিন সকালে ডাক্তারের কাছে গেলাম। নানান পরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন, তোমরা যে বেঁচে আছ, এটাই তো বেশি। তোমাদের যে পোকা কামড়িয়েছে, তার কামড় পশুরাই সহ্য করতে পারে না।
কাবুলে আমাদের দশদিন থাকতে হয়েছিল। তারপর বিমানে করে দিল্লী। দিল্লীতে আমাদেরকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হলো। তিন-চারদিন পর ট্রেনে করে কলকাতা পাঠানো হলো। ট্রেনের পুরো একটা কম্পার্টমেন্ট স্বদেশে যাত্রাকারী বাংলাদেশের মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিলো। ট্রেনের কামড়ার খুব খারাপ অবস্থা। বাতি জ্বলে না। টয়লেটের ফ্ল্যাশ নষ্ট, পানি নাই। দ্বিতীয় শ্রেণির ওই বগীতে কাঠের পাটাতনে ছারপোকা ভর্তি। কলকাতা যেতে আমাদের ছাপ্পান্ন ঘন্টা লাগলো। দুর্বিষহ জার্নি! আমাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, ট্রেন যখন বিহারের মধ্য দিয়ে যাবে আমরা যেন কোনোক্রমেই দরজা-জানালা না খুলি। কারণ মুক্তিযুদ্ধে বিহারিদের ক্ষয়ক্ষতি। মুক্তিবাহিনী বিহারীদের মেরেছে, এমন প্রচারণা ছিল তাদের মধ্যে। বিহারে ট্রেন এসে ভিড়লে বিহারীরা ট্রেনের বগীতে ধাক্কা দিতে শুরু করে। আমরা কেউ দরজা-জানালা খুললাম না। তারা গালিগালাজ করলো। ইট-পাথর ছুঁড়লো। কলকাতায় পৌঁছে শুনলাম, বাংলাদেশেরই একটা ছোট বিমান কলকাতা-ঢাকা যায় প্রতিদিন। আমরা বিমান বন্দর পৌঁছে দেখি, একটু পরেই বিমান উড়বে। আমাদের উঠার সুযোগ হলো না। মেয়ে দুটো খুব অস্থির হয়ে গেল। কিন্তু অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। আমরা পার্ক স্ট্রিটের একটি হোটেলে উঠলাম। বাংলাদেশের অনেক গন্যমান্য ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে এসে থাকতেন। হোটেলটা তাই খুব পরিচিত ছিল সবার কাছে। হোটেলের কাছে একটা সিনেমা হল ছিল। খাওয়া-দাওয়া সেরে দুই মেয়েকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গেলাম একটা রিলাক্সেশনের জন্য। কিন্তু আমরা এতে ক্লান্ত ছিলাম, সিনেমা হলেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সিনেমা শেষ না করেই হোটেলে চলে এলাম। পরদিন বিকালের বিমানে আমরা ঢাকা ফিরে এলাম। দেশে ফেরার সে কী আনন্দ! ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে স্বস্তি ফিরে পেলাম। ট্যাক্সিঅলা ধানমন্ডি যেতে কুড়ি টাকা চাইলো। আমার কাছে শেষ সম্বল কুড়ি টাকাই ছিল। তাকে বুঝিয়ে বললাম, পাঁচ টাকা কম নিলে এয়ারপোর্টের বেয়ারা যারা আমাদের সুটকেস বহন করেছে, তাদের দিতে পারবো। সে রাজি হলো।

আমজাদ আকাশ: আপনার ফিউচার প্ল্যান কী?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
ফিউচার প্ল্যান আর কী, যতদিন বেঁচে থাকবো ছবি আঁকবো…।

আমজাদ আকাশ: অনেকেই বলেন চিত্রশিল্পীদের সঙ্গে সাহিত্যিকদের যোগাযোগ বা বন্ধনটা আগের মতো নেই।
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
হ্যাঁ আগের মতো নেই। আগে আর্টিস্টদের সাথে সব লেখক-সাহিত্যিকদের একটা আড্ডা ছিলো। আমরা বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিতাম, ক্যাপিটেল রেস্তোরাঁয় আড্ডা দিতাম। সব কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-আর্টিস্ট একসাথে আড্ডা দিতো তখন। এখন তেমনটা চোখে পড়ে না। আসলে এখন ক্ষেত্রটাও অনেক বড় হয়ে গেছে। আমি এই সময়ে আমার বন্ধুবান্ধবদের খুব মিস করি। অনেকেই তো মারা গেছে। তাদের খুব মনে পড়ে।

আমজাদ আকাশ: আগে তো আপনি অনেক পোর্ট্রেট করেছেন…
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
হ্যাঁ অনেক পোর্ট্রেট করেছি। একবার আমরা চার বন্ধু মিলে কাফেরাস্তান গিয়েছিলাম। ওরা বেড়াতে গিয়েছিল, আমি ছবি আঁকতে গিয়েছি। ওই এলাকার মানুষ সূর্য পূজা করতো। তাদের ভাষা কিছু বুঝি না। তবে পোশাক-আশাক খুব সুন্দর। মেয়েরা কোমড়ে রোমানদের মতো রৌপ্য পরতো, মাথায় কড়ির পাগরি। দারণ লাগতো। কিন্তু ছেলেদের দেখলেই কী সব বলে পালিয়ে যেত। দুয়েকজনের পোর্ট্রেট করে যখন দেখালাম, তারা অনেক খুশি হলো। অনেক পোর্ট্রেট করা হলো তখন।

আমজাদ আকাশ: প্রথম প্রেমে পড়লেন কবে?
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
অনেক আগে। আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর। সেই মেয়েটা কলেজে পড়তো। তার মামার সাথে আমার আলাপ ছিল। আমিনুল ইসলাম থাকতো আর্ট কলেজের দোতলায়। মাঝে মাঝে মেয়েটিকে নিয়ে যেতাম সেখানে। যদিও তখন একটা মেয়ের সাথে রিকশায় চড়া ভীষণ মুশকিল ছিল। পরে তার অভিভাবকরা বললো, তুমি যদি ওকে বিয়ে করতে চাও, কী খাওয়াবে, কত টাকা উপার্জন করো তুমি? সব শুনে ওরা মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি হলো না। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল আমাদের।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছিল এক মেয়ে, তার সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। জোহরা নাম ছিল তার। একদিন সে আমাকে বললো, চলো চায়নিজ খেতে যাই। আমি বললাম, আমার তো টাকা নেই। সে বললো, টাকা আমি দেব। তো গেলাম তার সাথে। খাবার পর টেবিলের তলা দিয়ে সে আমাকে টাকা দিল। আমি এমন ভাবে বিল দিলাম, যেন আমার টাকা। ওদের বাড়িতে আমি প্রায়ই যেতাম। একদিন দরজা থেকে সে আমাকে বললো, আমি এখন ইউনিভার্সিটি যাবো, ক্লাস আছে। আমি ঘরের কাছে এসেই একটা ছেলের কথা শুনছিলাম। বললাম, ঘরে কে আছে? সে বললো, কেউ নেই। আমি ভেতরে ঢুকে দেখি ড্রয়িং রুমে একটি ছেলে বসে আছে, ছেলেটি আমার পরিচিত। আমি রাগ করে চলে এলাম। আর যোগাযোগ রাখিনি। পরে মেয়েটির বাবার একটি চিঠি পাই, মেয়ের বিয়ে। সেই ছেলেটির সাথেই। কিছুদিন পর গুলিস্তানে এক সিনেমা হলে সেই মেয়েটির সাথে দেখা। আমি আর হাসান হাফিজুর রহমান গিয়েছি সিনেমা দেখতে। মেয়েটি আমাকে দেখে দৌড়ে এলো। বললো, জরুরি কথা আছে। আমি বললাম, তুমি বিয়ে করেছো, এখন আমার সাথে তোমার কিসের জরুরি কথা। সে বললো, আমাকে তুমি বাঁচাও। আমাকে বাড়ি থেকে কোথাও যেতে দেয় না। আমি বন্দী।
আমি বললাম, আমি কী করতে পারি…। চলে এলাম। পরে শুনেছি ওদের তালাক হয়ে যায়। মেয়েটি এক ইংরেজকে বিয়ে করেছিল শেষে। ইসলামাবাদে আমার এক এক্সিবিশনে এসেছিল সেই মেয়েটি। আমার স্ত্রীকে বললো, তুমি কি জানো, তোমার হাজব্যান্ড আমার ওল্ড বয়ফ্রেন্ড। খুব স্মার্ট ছিল সে। ওর স্বামীও ছিল সাথে।

আমজাদ আকাশ: এখন যারা কাজ করছে, তাদের কাজ দেখে আপনার কী মনে হয়? বাংলাদেশের আর্টের সম্ভবনা কেমন?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: আমরা যখন বিমূর্ত ছবি আঁকা শুরু করি, তখন বলা হতো, তোমরা ইউরোপিয়ানদের মতো ছবি আঁকছো। ইন্টারন্যশনাল ট্রেন্ড্রের সাথে মিলতে চাইছো। কিন্তু তখন আমরা বিমূর্ত ছবি আঁকলেও আমরা আগেই থিম চিন্তা করে ছবি আঁকতাম। এখন এমন সব বিমূর্ত ছবি আঁকা হয়, আর্টিস্ট নিজেই বোধহয় বোঝে না। আমি কেন আঁকছি, কী আঁকছি, আমার বোধগম্য হতে হবে।

অনেকে হয়তো বলে, আমি তো পাখির ডাক বুঝি না। কিন্তু আমি জানি, কোনটা চড়ুই, কোকিল আর পায়রার ডাক। ছবিও সেরকম। বোঝার মতো এলিমেন্ট থাকতে হবে। তা না হলে, অনেক এক্সিবিশন দেখলে মনে হয়, পঞ্চাশটা ছবি যেন একটা ছবি কেটে কেটে করা হয়েছে। একটা মনে রাখার মতো নির্দিষ্ট কাজ দেখি না। একই টেক্সচার, একই জিনিস…। ইউরোপিয়ান-আমেরিকান ছবিও তো দেখি। ওদের কাজে নির্দিষ্ট ভাবনা থাকে। যেটা তাদের কাজে ফুটে ওঠে।

আমজাদ আকাশ: আপনি তো শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক ছিলেন, বাংলাদেশের শিল্প ও শিল্পীর জন্য এই একাডেমির কী করা উচিত বলে মনে করেন?

সৈয়দ জাহাঙ্গীর: আসলে একটা পেশার মানুষ দিয়ে শিল্পকলা একাডেমি চালানো উচিত নয়। যেমন এখন যিনি ডিজি, তিনি নাটকের লোক। আর সিভিল সারভেন্ট দিয়ে কোনো চারুকলা বিভাগ চলতে পারে না। যিনি শিল্পকলা একাডেমির মহা পরিচালক হবেন, তার জ্ঞান থাকতে হবে সব বিষয়ে। নাট্যকলা-চারুকলা-সংগীত-নৃত্য সব বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হবে। আমি চারুকলার মানুষ। কিন্তু প্রশাসনিক জ্ঞান আমার ছিল না। আমি চেষ্টা করে গেছি, চারুশিল্পকে এগিয়ে নেবার জন্য যা কিছু করা দরকার করেছি। ১৪ বছর ধরে করেছি। কোনো অসুবিধাই হয়নি।
আমি অনেক পরকল্পনা করেছিলাম। আমার চাকরি শেষে সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর আমাকে কোনো কমিটিতেও রাখা হয়নি।

আমাদের এখানে কোনো চারুশিল্পী সংসদ নেই। এটা দরকার। কোনো একটা দাবি সরকারের কাছে যে উপস্থাপন করবে সেরকম কোনো প্লাটফরম নেই।

আমজাদ আকাশ: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, চিত্রমকে আপনার মূল্যবান সময় দেবার জন্য।
সৈয়দ জাহাঙ্গীর:
তোমাকেও ধন্যবাদ।

 

শ্রুতি লিখন: সুমিমা ইয়াসমিন

 

 

 

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »