১৫ আগস্ট, বঙ্গবন্ধু ও প্রতিরোধের শিল্পকলা

naima-haq-03_chitram1

শিল্পী নাইমা হক / উত্থিত-২ / ১৯৮৫

।নাজিব তারেক। শোক ও ক্ষোভ এক ভয়াবহ কালো মেঘ। যা ঢেকে রাখে সকল সম্ভাবনা। আর ঢাকার ঘাস সবুজ নয়। বাংলাদেশে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এমন এক তারিখ, যা শোক ও ক্ষোভের উল্লাস। যারা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ বিরোধী তারাও ক্ষোভের আঁধারের বাসিন্দা। বঙ্গবন্ধু ভক্তরা শোক ও ক্ষোভের মিশেলের আঁধারে বন্দী। এ কারনেই ১৫ আগস্ট তাঁর মৃত্যু বা হত্যার শোক ও ক্ষোভের কালো মেঘের নিচেই চাপা পড়ছে বঙ্গবন্ধুর সকল সংগ্রাম ও অর্জন। কিন্তু জগতের আর সকল মহৎ প্রাণের মতো বঙ্গবন্ধু কেন্দ্রীক সকল উদযাপন হওয়া উচিত তাঁর জন্মদিন ১৭ মার্চকে ঘিরে। এ কারণে এই বাংলায় মৃত্যুর আগে কীর্তিমানের স্বীকৃতি নেই…

১৯৭১-এর পরাজয়ের হতাশা ও ক্ষোভ থেকে যারা তাঁর মৃত্যু অনিবার্য করে তুলেছিল তারা তাদের ক্ষোভ ছড়িয়েছে তাঁকে হত্যা করবার আগে থেকেই। বাসন্তির পরনের জালে আটকেছে পুরো দেশ-সমাজ। আর বিপরীতে যারা তাঁর কর্ম ও চেতনার ভক্ত-অনুসারী তারা শোকের কালো চাদরকে আরো কালো করেছে ক্ষোভের অন্ধকারে।

‘আওয়ামী লীগ মনে রাখে না’ এও বাসন্তির জালের আর এক টুকরো। কিন্তু সত্য টুকরো। আজ চারপাশে বঙ্গবন্ধু কেন্দ্রীক কত আয়োজন; তার মধ্যে কেউ কেউ মহানায়ক। না, এটা অস্বাভাবিক নয়। সারা পৃথিবীতেই এটা ঘটে। `out of sight out of mind’। তাই যারা চোখের সামনে নৃত্যরত তারা মহানায়ক। যাদের উঠোন বাঁকা তারা উঠোনের বাইরে। এ অবস্থার সমান্তরালে আর একটি চর্চা যখন সমাজ তৈরী করতে সক্ষম হয় তখনই সে সমাজ এগুতে থাকে। তার নাম ‘গবেষণা’ ‘অনুসন্ধান’ ‘বিচার’ ও তার প্রেক্ষিতে যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান।

এতো কথা বলতে হলো এ জন্য যে, আজ কাল টিভিতে প্রচার করে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে শিল্প রচনা করা হচ্ছে। করছেন দেশের বরেন্য শিল্পীরা। কিন্তু দু’এক জন শিল্পী যারা যথার্থই তাদের শিল্পকে করেছিলেন ১৫ আগস্টের জঘন্য ঘটনার প্রতিবাদের হাতিয়ার, তাদের স্মরণ করবার জন্যই এ লেখা। এটা সে সময়ের কথা- যখন দেশে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয়, নবীন ও এশিয়ান ছাড়া প্রর্দশনীর সুযোগই নেই। একক করা যেতে পারতো কিন্তু সেটাও শিল্পকলা বা জাদুঘরের গ্যালারিতেই। সে সময়ে বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্ট নিয়ে ছবি আঁকা ও তা এইসব প্রর্দশনীতে প্রদর্শন করা কতখানি শৈল্পিক সক্ষমতার প্রকাশ তা ভাবতেই আশ্চর্য হতে হয়। এমন দু’জন শিল্পী হাঁসী চক্রবর্তী ও নাইমা হক।

আর এক শিল্পী সাহবুদ্দিনের মত এঁরা প্রবাসে বাসের সুবিধা পাননি। অপর পক্ষে প্রবাসে বাসের সুবিধা নিতে গিয়ে অনেকই আবার হারিয়ে গেছেন মুরাদুজ্জামান মুরাদ-এর মত। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত যারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ১৫ আগস্টের প্রতিবাদে ছবি এঁকেছেন তারা সকলেই এক এক জন যোদ্ধা। `art is not pleaser, it’s battle’– এটা পিকাসোর কথা। আর আঁকবার সক্ষমতায় যারা সুকুমার রায়ের ‘বাপুরাম সাপুড়ের’ দাঁত, চোখ, ফোঁসফাঁস সাপের ন্যায় না হয়ে লাঠির বাড়ি খাবার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করেছেন তাদেঁর আজ সালাম জানাতেই হয়। আরো অনেকই হয়তো ‘লাঠির বাড়ি’তে হারিয়ে গেছেন তাঁদের খুঁজে বের করা আমাদেরই কাজ, আমাদেরই দায়িত্ব। মাত্র দু’চারজনের কথা এখানে বলা গেল, চারুকলার শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের ছাত্ররা হারিয়ে যাওয়া সেই সব শিল্পী ও শিল্প কর্মের ইতিহাস খুজে বের করবেন, তাদের কর্মের শৈল্পিক চুলচেরা বিশ্লেষন হবে, সে আশাই করছি। বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্ট শুধু বাংলাদেশের নয় বিশ্ব ইতিহাসেরই গুরত্বপূর্ন বিষয়। আর তাঁ নিয়ে সবচেয়ে শক্তিমান শিল্পকর্মগুলো ১৯৭৫-১৯৯০ এর রুদ্ধ সময়েই রচিত হওয়ার কথা। যখন সকল কন্ঠ রুদ্ধ থাকে, শিল্পই তখন একমাত্র ভাষা।

লেখক: চিত্রশিল্পী ও শিল্পতাত্ত্বিক

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »