শিল্পকর্মগুলো বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে

bangabandhu
।প্রান্ত পলাশ। শিল্পীর সৃজনশীলতায় বার বার মূর্ত হবেন তিনি। হাজার বার, হাজার বছর। বিবিধ মাধ্যমে বিবিধ ভঙ্গিতে তিনি বার বার ফিরে আসবেন আমাদের কাছে। বাঙালির ইতিহাসে চমক এনে দেয়া ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  উজ্জীবিত করেন রাজনৈতিক চেতনা, উদ্দীপ্ত করেন শিল্প-মননও। আর শিল্পী সৃজন করে চলেন একের পর এক শিল্পকর্ম; বঙ্গবন্ধুর কীর্তিকে আশ্রয় করে।

বঙ্গবন্ধুর ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকী ছিল গত ১৫ আগস্ট। এ উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমিতে চলছে দুটি শিল্প কর্ম প্রদর্শনী।

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার প্রথম গ্যালারিতে একটি ভাস্কর্যের ওপর সামান্য আলোর ছটা, তাতে এক উজ্জ্বলতম মুখ। একাত্তরে এই মুখ থেকেই আলোকের ঝর্ণাধারার মতো বেরিয়ে এসেছিল একটি জাতির আগামীর নির্দেশনা, একটি জাতির আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। ভাস্কর্যের এই মানুষটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
গ্যালারির প্রবেশমুখ থেকে যতই এগিয়ে যাওয়া হবে ততই চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অাঁকা সব চিত্র আর ভাস্কর্য। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, চেয়ারে রাখা বঙ্গবন্ধুর সেই কোর্ট আর নিচে পড়ে আছে চিরচেনা চশমা। পুরো ক্যানভাসজুড়ে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। এ দাগ ক্যানভাস থেকে বেরিয়ে দর্শনার্থীদের বুকে ক্ষত সৃষ্টি করছে। যেন পিতাকে হত্যার বীভৎস বেদনা ছড়িয়ে অছে পুরো ক্যানভাসে। গ্যালারি-১-এ রয়েছে দশ দেশবরেণ্য শিল্পীর শিল্পকর্ম, বঙ্গবন্ধুর ১০টি প্রতিকৃতি।

বঙ্গবন্ধুর ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবসের আগের দিন ১৪ আগস্ট শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার গ্যালারি-১ ও গ্যালারি-৪-এ উদ্বোধন করা হয় ‘শিল্পের আলোয় বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। শিল্পকলা একডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। মোট ২২৩টি শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে।

‘পিতা-পুত্র’ শিরোনামের ছবিটিতে দেখা যায়, পিতার কোলে তার প্রিয় সন্তান শেখ রাসেল। ‘বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক একটি কোলাজে দেখা যাচ্ছে নানা ভঙ্গির বঙ্গবন্ধু। ‘লাইট টু ডার্ক’ ছবির পুরোটাতেই শোকের আবহ। যেন আলোর ভেতর থেকে ধীরে ধীরে অন্ধকারে আচ্ছাদিত হচ্ছেন জাতির জনক। এক কোনায় একটি স্থাপনাশিল্পে কাচের আলাদা আলাদা বক্সের ভেতর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সবার ছবি। কাচের ভেতর দিয়ে সেখানে আসা-যাওয়া করছে নীল রং। নীল রঙের বেদনাসিক্ত আলোয় ঝলমল করছে জাতির পিতার পরিবারের শহীদদের মুখ।

গ্যালারি-১ সাজানো হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ১০টি প্রতিকৃতি, বিশিষ্ট শিল্পীদের শিল্পকর্ম, শিল্পকলা একাডেমি সংগৃহীত ৫০টি চিত্রকর্মে। প্রবেশপথেই রয়েছে ব্রোঞ্জ মাধ্যমে নির্মিত বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য। পুরো গ্যালারিটিই যেন বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত শিল্পসাম্রাজ্য। আর গ্যালারি-৪ সাজানো হয়েছে চিত্রকলা ও আলোকচিত্রের ৬০টি ছবি নিয়ে।
প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেন : সমরজিৎ রায় চৌধুরী, রেজাউল করিম, নাসিম আহমেদ নাদভী, নাসরিন বেগম, আতিয়া ইসলাম এ্যানি, সৈয়দ হাসান মাহমুদ, অলকেশ ঘোষ, আব্দুল মান্নান, আহমেদ শামসুদ্দোহা, শেখ আফজাল, দেওয়ান মিজান, নাসিমা খানম কুইনি, গুলশান হোসেন, কামালুদ্দিন, রাসেল কান্তি দাস, শাহজাহান আহমেদ, মোহাম্মদ আলপ্তগীন, কিরীটি রঞ্জন বিশ্বাস, নার্গিস পলি প্রমুখ।

প্রদর্শনীস্থলে একটি ছবি যে কারো মন কাড়বেই। লাল ও হালকা সাদার বিন্যাসে বিশেষভাবে অাঁকা ছবিটি। জানা যায়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা যাতে স্পর্শেই বুঝে নিতে পারেন, তেমন করেই এ চিত্রটি অাঁকা। চোখ নেই বলে কি শিল্পরস হৃদয়গ্রাহী হবে না? স্বাধীনতার স্থপতিকে রংস্পর্শে বুঝতে অসুবিধে হবে না তাদের! নার্গিস পলির অাঁকা এ বিমূর্ত ছবিটির প্রতি তাই দেখা গেছে শিল্পপিপাসুদের ভিড়।

চিত্রপটে বঙ্গবন্ধু

শিল্পীর ক্যানভাসে, কবির শিল্পিত কথামালায়, রাজনীতিকের বক্তৃতায়, ঐতিহাসিকের চুলচেরা বিশ্লেষণে আর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে চর্চিত ও উচ্চারিত মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শিল্পী কিরীটি রঞ্জন বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিকৃতি অাঁকছেন। তার রং তুলির ছোঁয়ায় নানা মোটিফে উদ্ভাসিত হয়েছে প্রতিকৃতি। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিও তার হাতের নিপুণ দক্ষতায় আলোকোজ্জ্বল হয়েছে। বক্তৃতারত বঙ্গবন্ধু, স্মিত হাসির বঙ্গবন্ধু, গভীর চিন্তামগ্ন, চশমা হাতে ভ্রু কুঁচকে নির্নিমেষ দৃষ্টির বঙ্গবন্ধু_ এমন নানা ভঙ্গি ও অভিব্যক্তির বঙ্গবন্ধুকে তিনি চিত্রপটে এনেছেন সাবলীলভাবে। চিত্রপটে নানা অভিব্যক্তির বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এই শিল্পীর অাঁকা একক প্রদর্শনী ‘চিত্রপটে বঙ্গবন্ধু’ উদ্বোধন হলো গত ২৩ আগস্ট। এটি তার তৃতীয় একক প্রদর্শনী।
আয়োজন ছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে ‘শিল্পের আলোয় বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবেই এ আয়োজন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
শিল্পকলা একডেমির মহাপরিচালক নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্পী রফিকুন্নবী, আবুল বারক আলভী, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিল্পকলা একাডেমির সচিব জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী।

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে মোট ৪৪টি প্রতিকৃতি। কিরীটি বিশ্বাস প্রতিকৃতিগুলো এঁকেছেন প্রধানত তেলরঙে। কিছু কাজ তিনি করেছেন নম্র চকরঙে। অ্যাক্রেলিকের কাজও রয়েছে।  প্রতিকৃতি অঙ্কনের সব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেই তিনি বঙ্গবন্ধুর অতলস্পর্শী ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কোথাও বঙ্গবন্ধু গায়ে সাদা চাদর জড়িয়ে হাসছেন, কোথাও ডানহাত প্রসারিত করে স্বাগত জানাচ্ছেন, কোথাও বা আয়েশি ভঙ্গিতে পাইপ টানছেন। সব প্রতিকৃতিতেই ফুটে উঠেছে জাতির জনকের দৃঢ় ব্যক্তিত্ব আর অবয়বের মাধুর্য। ক্যানভাসেই ফুটে উঠেছে এক মহানায়কের গৌরব।

প্রদর্শনী দুটো চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা এবং শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে প্রদর্শনীকক্ষ।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »