ছাপচিত্রে দুই বাংলার বন্ধনের গল্প

chap citro exhibision 3. edited।প্রান্ত পলাশ। ডান পায়ের হাঁটুর ওপর দুই হাত। তার ওপর মাথা এলিয়ে চিন্তামগ্ন গৌতম বুদ্ধ। হলুদ আলোর ঝলকানি তাঁর শরীরজুড়ে। একটি আয়তক্ষেত্রের ভেতর এই দৃশ্য। তার চারপাশে ছোট ছোট দৃশ্যপটে পুরুষের প্রণামভঙ্গি, নারীর বিস্ময়াভিভূত মুখ। এর পাশেই শিংওয়ালা প্রাণীর দৌড়দৃশ্য। আয়তক্ষেত্রের ওপরের দিকে শরীরবাঁধা এক নারী। কাছেই ছড়ানো-ছিটানো বোতল। এরকম নানা অনুষঙ্গের মাঝখানে আয়তক্ষেত্রে বন্দি বুদ্ধ। যেন এ বিশ্বচরাচরের নৈরাজ্য আর কালের সংঘাত থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজছেন তিনি। ছাপচিত্রটি এঁকেছেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক উত্তম কুমার বসাক।

আরেকটি ছাপচিত্রের সামনে যেতেই চোখ আটকে গেল। মানুষের মস্তিষ্ক থেকে গজিয়ে উঠছে ফুলগাছ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টমেকিং বিভাগের শিক্ষার্থী পাপড়ি বারি রাত্রি এঁকেছেন এটি।

এরকম বিচিত্রধর্মী নানা শিল্পকর্ম নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় উদ্বোধন করা হলো ‘মৈত্রী : একটি বন্ধনের গল্প’ শীর্ষক ছাপচিত্র প্রদর্শনী।

গত ২৬ আগস্ট জাতীয় চিত্রশালার পাঁচ নম্বর গ্যালারিতে এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম, ঢাবির চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন, অধ্যাপক সৈয়দ আবুল বারক আলভী, অধ্যাপক রোকেয়া সুলতানা এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার অধ্যাপক অজিত শীল। সভাপতিত্ব করেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

কী সেই বন্ধনের গল্প? আয়োজকরা জানালেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপচিত্র বিভাগের শিক্ষাবিনিময় কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই এ আয়োজন। এর আগে দুই দেশের শিল্পী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত হয় একটি শিল্পবিষয়ক কর্মশালা। এর সূত্র ধরেই দুই বাংলার নবীন-প্রবীণ ছাপচিত্রশিল্পীদের নিয়ে ‘একটি বন্ধনের গল্প’।
ফিতা কেটে প্রদর্শনীর দ্বার উন্মুক্তের আগে চিত্রশালা মিলনায়তনে আয়োজিত হয় আলোচনাসভার। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখা থাকলেও শিল্পের কোনো সীমারেখা নেই, যেমন নেই বন্ধুত্বের সীমারেখা। দুটি দেশের ঐতিহ্যগত পার্থক্যও তেমন নেই। শিক্ষকরা হয়ত অনেক দেশ ঘুরতে পারেন, কিন্তু শিক্ষার্থীরা পারেন না। তাই শিক্ষাবিনিময় কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন শিল্পী বা সাহিত্যিক একটি দেশের সবচেয়ে বড় কূটনীতিক। কারণ, বিশ্বে তিনি বা তাঁরাই নিজের দেশকে সম্মানিত স্থানে পরিচিত করান।’

শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তৃতীয় বিশ্বে ছাপচিত্রের কাজ খুব ভাল হচ্ছে। আমি যখন দেশের বাইরে কোনো আর্ট এক্সিবিশনে যাই, সেখানে আমার দেশের ছেলেমেয়ের কাজ দেখে বুকটা ভরে যায়।’

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া চিত্রকর্মগুলোতে ফুটে উঠেছে বর্তমান সময়ের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি আর তার মাঝেও বিকশিত হতে থাকা মানবমনের শুভ অভিব্যক্তি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিম সিনথিয়ার একটি ছাপচিত্রে ফুটে উঠেছে সমকালে নারীর প্রতি পুুরুষপ্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ, যেখানে কালো কাপড়ের বন্ধনে মূক হয়ে আছে নারী। তাঁর কপালের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছে নারী প্রকাশে উন্মুখ। কিন্তু বিশ্বরাষ্ট্রব্যবস্থা তা দিতে নারাজ। গাছের শাখা-প্রশাখা-লতা তাঁকে অক্টোপাসের মতো চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে। আর সেই বন্ধন থেকে নারী বেরিয়ে আসতে চাইছে।
মোট ৭৭টি শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের শিল্পীদের আঁকা ৪২টি এবং ভারতের শিল্পীদের আঁকা ৩৫টি।  ২৮ আগস্ট শেষ হয় প্রদর্শনীটি।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »