১ম কর্ণফুলি ত্রিবার্ষিক লোকশিল্প প্রদর্শনী

লোকশিল্পের সন্ধানে

11951138_10203521413954502_2840904673242082321_n

।মুজিবুল হক। চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হলো দক্ষিণ এশীয় ত্রিবার্ষিক লোকশিল্প উৎসব। শিল্প সংগঠন সন্তরণ ও গ্যালারি চর্যার আয়োজনে প্রথম কণর্ফুলী ফোক ট্রিয়েনাল নামে তিন দিনব্যাপী উৎসব শেষ হয় ৮ সেপ্টেম্বর। উৎসবে ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের শিল্পীরা অংশ নেন।
নেপালের প্রাচীন শিল্পকলা থাংকা, পোভা ও মিথিলা, ভারতের পটচিত্র ও মধুবনী শিল্পকলা, বাংলাদেশের রিকশা অ্যাপ্লিক, আলপনা শিল্প এবং সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং প্রদর্শিত হয়েছে উৎসবে। নগরের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিল্পী রশিদ চৌধুরী গ্যালারিতে আয়োজিত প্রদর্শনীতে তিন দেশের ১৮ জন শিল্পীর ৫২টি শিল্পকর্ম স্থান পায়। প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অনুপম সেন। অতিথি ছিলেন দৈনিক পূর্বকোণের প্রকাশক জসিম উদ্দীন চৌধুরী, ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার সোমনাথ হাওলাদার, চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক নাসিমা আখতার, ভাস্কর অলক রায়, নেপালের শিল্পী দরজি গুরুং লামা ও শ্যাম সুন্দর যাদব, প্রদর্শনীর কিউরেটর মনজুর আহমেদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন তানজিল টুশি। প্রদর্শনীর পাশাপাশি ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের লোকজ শিল্পের বতর্মান অবস্থা নিয়ে বিস্তার আর্ট কমপ্লেক্সে প্রবন্ধ ও প্রোজেকশন উপস্থাপন করেন বাংলাদেশের শিল্প গবেষক শাওন আকন্দ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সঞ্জয় চক্রবর্তী।

পূর্বের শিল্পধারাই প্রাচ্যকলা হিসেবে পরিচিত হয়েছে। মানব সভ্যতার শেকড় এই প্রাচ্যেই থেকেই। প্রাচ্য সর্বদা ভেতরমুখী, অনুভূতিপ্রবণ ও আধ্যাত্মিকতায় নিমগ্ন। এখানে প্রাচ্যকলা এতকাল যেটুকু চর্চিত হয়েছে, তা প্রকারান্তরে ক্ষয়িষ্ণু ঐতিহ্যের শিল্পিত অবগাহন হয়ে পড়েছে প্রাশ্চাত্যে প্রভাবে। একে উত্তরণের খন্ডিত চেষ্টা হয়েছে বটে, তবে তা সবল হয়ে ওঠেনি আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি ও প্রাশ্চাত্যে সংস্কৃতির আগ্রাসনের কারণে। আর ঐতিহ্যবাহী শিল্পধারাকে তার পরিসর থেকে আধুনিক শিল্পধারায় সঙ্গে মিলিয়ে ফুল-পাখি-লতা-পাতা আর রমণী-অবয়বের বৃত্ত থেকে বের হয়ে ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনযাত্রা তুলে এনেছেন শিল্পীরা তাঁদের নিরীক্ষাধর্মী কাজের মাধ্যমে। শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিল্পে খুঁজেছেন ভারতবর্ষের নিজস্ব জমিন। অজন্তা-ইলোরা হয়ে মুঘল ঘরানা ঘুরে ভারতশিল্পের ষড়ঙ্গকে কেন্দ্রে রেখে তিনি নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতির সন্ধান করেছিলেন তাঁর শিল্পকর্মে। পরবর্তীতে নন্দলাল বসুর হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে এই চিত্ররীতি। আরো পরে নন্দলালের বসুর ছাত্র বিনোদবিহারী মুেখাপাধ্যায় একে আরো সহজ করে আনলেন কাজে।

এরকম ধারাবাহিক চর্চা ও সাধনার ভেতর দিয়ে আমাদের এ-অঞ্চলে প্রাচ্যকলার পূনর্জাগরণ ঘটে। আমাদের দেশের চারুশিল্পের পথিকৃৎ শিল্পী জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানের চিত্রকলায় প্রাচ্যকলার সঙ্গে লোকশিল্পের মেলবন্ধন আমরা দেখতে পাই। দুর্ভিক্ষের চিত্রমালায় সাবলীল রেখায় জয়নুলের অঙ্কনকে দেশী-বিদেশের কলা-আলোচকরা প্রাচ্যরীতির সঙ্গে পাশ্চাত্য পদ্ধতির সার্থক সমন্বয় বলেছেন। শেকড়রে টান ছিল বলে তাঁদের চিত্রকর্মে ছিল স্বদেশি স্বকীয়তার উদ্ভাস এবং তাঁদের ওই কাজগুলো জননন্দিতও হয়েছে। এবারের প্রদর্শনীতে সবাই যে প্রাচ্যকলার পুরো নিয়ম মেনে এঁকেছেন এমন নয়, কিংবা সবাই যে প্রাচ্যকলায় দীক্ষিত তাও নয়; তবে ধরন-ধারণে এর কলাসূত্র কাজে লাগিয়েছেন শিল্পীরা। সৃজন-অভিজ্ঞতায় তাঁরা নিজের প্রাচ্যচিত্রকলাকে সমৃদ্ধ করেছেন, প্রকারান্তরে আধুনিক শিল্পের সাথে লোকজ শিল্পের মিশ্রনে সমকালীন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন এবারের প্রদর্শনীর মাধ্যমে।

প্রদর্শনীতে ঢোকার পর চোখে পড়বে, এক হাতে সুতা, অন্য হাতে গোলাপ আর অন্য দুই হাত সামনে করজোড় প্রাথনারত ভঙ্গিতে পদ্মফুলের সুস্বজিত আসনে ধ্যানরত গৌতমবুদ্ধ। পিছনে সমুদ্রের জলরাশি, উপরে গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘ সারি। ক্যানভাস কাপড়ে উপরে লাল, নীল, হলুদ ও সবুজ রঙে এঁকে ঐতিহ্যবাহী কংসাম নামের সিল্কের কাপড়ে বাঁধানো ছবিটির এই রূপ ফুটিয়ে তুলেছিলেন নেপাল থেকে আসা শিল্পী দরজি গুরুং লামা। এ প্রদর্শনীতে নেপালের থাংকা লোকশিল্প উপস্থাপন করেছেন শিল্পী দর্জি গুরুং লামা। বৌদ্ধ ধর্মের দর্শন তুলে ধরার জন্য এই রীতির উদ্ভব। যুগের পর যুগ বংশ পরম্পরা একই নিয়ম ও পদ্ধতি মেনে থাংকা চিত্র এঁকে চলছেন শিল্পীরা। পরিষ্কার ক্যানভাস কাপড়ে ছবি এঁকে বাঁধাই করা হয় ঐতিহ্যবাহী কংসাম নামের সিল্কের কাপড়ে। থাংকা চিত্রকলার প্রধান শর্ত হচ্ছে এটি নিখুঁত হতে হবে। ছবি নিখুঁত না হলে এটি প্রদর্শন করা হয় না। গাছের ছাল, মাটি, পাথর ও ফুল থেকে থাংকার চিত্রের জন্য রং তৈরি করা হয়। থাংকায় রেখাকে প্রাধান্য দিয়ে পরবর্তীতে প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার করা হয়। একটি চিত্রকর্ম করতে দুই মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগে শিল্পীদের। শিল্পী দরজি গুরুং লামা তাঁর শিল্পকর্ম সম্পর্¬কে বলেন, ‘থাংকা আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প। থাংকা মূলত প্রাচীন বৌদ্ধধর্মীয় বিশেষ চিত্রকলা। প্রাচীন নেপালে বৌদ্ধধর্ম ও তাঁর দর্শন প্রচারের জন্য নেপালিরা এই চিত্রকলার ব্যবহার করতেন। সেখান থেকেই এই চিত্রকলার উদ্ভব।’

নেপালের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প হচ্ছে মিথিলা চিত্রকলা। গ্রামীণ জীবনযাপন ও বৃক্ষ এই চিত্রকলার বিষয়। মূলত নারীরা মিথিলা শিল্পকলার শিল্পী। বতর্মানে পুরুষেরাও এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এই ধারায় কাজ করে খ্যাতি অজর্ন করেছেন নেপালের শিল্পী শ্যামসুন্দর যাদব। তিনি তাঁর দাদীর কাছ থেকে মিথিলার শিক্ষা নিয়ে এখন আধুনিক ধারার সঙ্গে মিলিয়ে ছবি আঁকছেন এবং কাজ সমূহের নাম দিয়েছেন মর্ডান মিথিলা।

এ ছাড়া পটচিত্র নিয়ে কাজ করেন ভারতের শিল্পী মনিমালা চিত্রকর, রিকশা অ্যাপ্লিকে কাজ করেছেন শিল্পী মদন দে, আলপনা শিল্প নিয়ে শিল্পকর্ম করেছেন শিল্পী সাথি চক্রবর্তী, সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং নিয়ে শিল্পকর্ম করেছেন শিল্পী হানিফ পাপ্পু। চট্টগ্রামের শিল্পী শতাব্দী সোমা ‘একটি অনাকাক্সিক্ষত গল্প’ শিরোনামে স্থাপনা শিল্পকর্ম প্রদর্শন করেন। এখানে তিনি মেঝে থেকে দেয়ালের গায়ে ধান বীজ দিয়ে কোলাজ ছবি তৈরি করেছেন। বারটি ছবিতে দেখিয়েছেন মা ও মেয়ের সম্পর্কের সূত্র।

প্রদর্শনীর শিল্পকর্মসমূহ একই রীতিতে হলেও বৈচির্ত্যময় তাঁর সৃষ্টি। দেখতে একঘেয়েমি লাগে না। লোকশিল্প নিয়ে শিল্পীরা ছবি আঁকতে গিয়ে শুধু যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন তা নয়, নতুন করে অনবরত খুঁজে ফিরেছেন নিজের শেকড়কে। লোকশিল্প নিয়ে চারদিন ব্যাপী এই প্রদর্শনী ঢাকায় শুরু হবে আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় চিত্রশালায়।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »