ভাস্কর নভেরার অদেখা রত্নভাণ্ডার

novera_ahmed_3

।প্রান্ত পলাশ। মাতৃকোল সন্তানের জন্য পরম আশ্রয়। নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে ঢুকতেই দেখা গেল, দুই শিশুসন্তানকে সেই পরম আশ্রয়ে রাখা এক ভাস্কর্য। সিমেন্টে তৈরি খসখসে মাতৃদেহেও পরম কোমলতা ফুটে উঠেছে। যদিও দীর্ঘদিন সংস্কারহীন পড়ে থাকায় সেই দেহের কোমলতা হারিয়েছে অনেকখানি, সন্তানের মাথা থেকে খসে গেছে সিমেন্ট, তবু শিল্পরসিককে বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না এই ভাস্কর্যের প্রথম দিককার পেলবতার শিল্পচিত্র।

আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল উপবিষ্ট এক নারীর ভাস্কর্য। এরপরই দণ্ডায়মান নারী। সিমেন্টে তৈরি এ নারীদেহে রয়েছে রঙের পেলব। লাল শাড়ি, কালো চুল আর গলায় হলুদ রঙের আভা। সেই আভার দীপ্তিও হারিয়েছে অনেকখানি। তবু এ অন্যরকম এক আবিষ্কারের ইতিহাস। দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে পড়ে ছিল যে রত্নভাণ্ডার, তা উন্মোচিত হলো দর্শনার্থীদের সামনে। আর এ রত্নভাণ্ডারের জননী বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদ। গত ৭ অক্টোবর থেকে জাতীয় জাদুঘরে  এই কিংবদন্তি শিল্পীর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী চলছে।

বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পের যাত্রা নভেরা আহমেদের হাত ধরেই। তিনি এর পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশে (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত) জন্ম নেওয়া এই নারী ভারতীয় উপমহাদেশের ভাস্কর্যশিল্পে আধুনিকতম নারী। বাংলাদেশের জাতীয় শহিদমিনারের নকশা প্রণয়নে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। গত ৪৫ বছর ধরে তিনি প্যারিসে কাটান। এ সময়ের মধ্যে তিনি একবারও দেশে আসেননি। আসেননি শিল্পকর্মের স্বীকৃতি চাইতেও। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক প্রদান করলেও তিনি সেই সম্মান নিতে আসেননি। বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়েও দেশে আনা যায়নি তাঁকে। লোকচক্ষুর অন্তরালেই কাটিয়েছেন জীবন। আশ্চর্যজনক আড়াল তৈরি করেছিলেন নিজের চারপাশে। দেশের শিল্পীদের সঙ্গেও যোগ ছিল না তাঁর। অবশেষে সেই আড়াল থেকে চির আড়ালে চলে যান এ বছরেরই ৬ মে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই আয়োজন করা হয়েছে এ প্রদর্শনীর।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখা গেল ‘পরিবার’ নামে আরেকটি অনবদ্য কাজ। এটা সিমেন্টের তৈরি, সাদা রঙ। একটি নারী শরীরের আদল, কিছুটা নৌকার ভঙ্গিতে বাঁকানো, মাঝখানে স্পেস, সেখানে তিনটি মানবশরীর। শিল্পকর্মে মা ও সন্তানের আদিরূপ অঙ্কিত হলেও উপস্থাপনায় তা আধুনিক ও স্বতন্ত্র। নারী শরীরের মাঝখানে একটু স্পেস, হাত যদিও অস্পষ্ট, তবু স্পষ্ট বোঝা যায় মা যেন তার সন্তানদের নিজের শরীরে, পৃথিবীতে বাড়তে দিয়েছেন, উন্মুক্ত করে দিয়েছেন সন্তানদের। স্মৃতিস্তম্ভের আদলে তৈরি ‘শান্তি’ নামের কাজটি সিমেন্টে তৈরি। এটি কালো রঙের। আসনের ভঙ্গি যা উপমহাদেশের পরিচিত স্টাইল এবং আসনটি ঊর্ধ্বে ক্রমশ সরু হয়ে উঠে গেছে। এ ধরনের ভঙ্গি কোনো প্রার্থনা বা একান্ত ধ্যানের কথা মনে করিয়ে দেয়।

শিল্পকর্মের অধিকাংশই নারী। আর প্রত্যেক নারীই এখানে স্বতন্ত্র অথচ ভারতীয় নারীর সামগ্রিক রূপ তুলে ধরে। রয়েছে হেলান অবস্থায় নারীর শিল্পকর্ম, নারীর মাথা। মা ও শিশুর পরম মমতার চিত্র ফুটে উঠেছে সেসব ভাস্কর্যে। এছাড়া রয়েছে গরুর পেটে দুজন মানুষের হেলান দেওয়ার আঙ্গিক, উপবিষ্ট বুদ্ধ, প্লাস্টার অব প্যারিস মাধ্যমে করা বুদ্ধের মস্তক। রয়েছে শুধুই মানুষের ফিগার সম্বলিত শিল্পকর্ম।

শুধু ভাস্কর্যই নয়, প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে শিল্পীর আঁকা বেশ কয়েকটি চিত্রের অনুকৃতি। এর মধ্যে মুনলিট-১৯৭৮, দ্য বার্ডস সারপেন্ট-১৯৮৪, সোল অব দ্য ফ্যানটম-১৯৭৩, স্পিরিট রিভার-১৯৭৩, স্পেস-১৯৭০ উল্লেখযোগ্য। প্রদর্শনীতে এই কিংবদন্তি শিল্পীর ব্যক্তিগত ছবিও রয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে শিল্পী গভীর মনযোগে শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে চলেছেন।

নভেরা আহমেদের চিন্তা, কাজের ফর্ম, উপস্থাপনা সবকিছুতেই স্বাতন্ত্র্যের ছাপ লক্ষণীয়। দেশীয় উপকরণ, বিষয়বস্তুকে আধার করে পশ্চিমা আধুনিকতার কিছুটা প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি প্রত্যেক কাজকে করে তুলেছিলেন অনন্য।

গত ৭ অক্টোবর নভেরার ৩৪টি শিল্পকর্ম নিয়ে সাজানো এ প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবি কামাল চৌধুরী। জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি এম আজিজুর রহমানের সভাপতিত্বে এতে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক লালারুখ সেলিম প্রমুখ। জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আয়োজিত হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এতে নভেরা আহমেদের শিল্পকর্ম ও জীবন নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন অধ্যাপক লালারুখ সেলিম।

প্রদর্শনী ১৯ অক্টোবর শেষ হবার কথা থাকলেও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রদর্শনীর সময় বাড়ানোর ঘোষণা দেন। কিন্তু পরে ২৮ নভেম্বর প্রদর্শনীর সমাপ্তি টানে কর্তৃপক্ষ।

[ছবিটি গবেষক রেজাউল করিম সুমনের সৌজন্যে প্রাপ্ত]

 

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »