শিল্পকলায় কাহাল আর্ট ফেয়ার শুরু

kahal_opening_15

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় ‘কাহাল আন্তর্জাতিক আর্ট ফেয়ার ২০১৫’-এর প্রদর্শনী দেখছেন দর্শকরা

।প্রান্ত পলাশ। ডান হাতের ওপর মাথা রেখে বিষণ্ন মুখে তাকিয়ে আছেন বুদ্ধ। দুই চোখ সামান্য খোলা। তার পায়ের পাশেই এক কিশোর শ্রামণ প্রার্থনার ভঙ্গিতে উপবিষ্ট। এর আশপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভগ্ন বুদ্ধমূর্তি। কোনোটা হেলে পড়া, কোনোটা স্থির। সবগুলোরই মস্তক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ক্যানভাসের উপরের দিকে ইংরেজিতে ‘রামু’ শব্দটি লেখা থাকায় সহজেই বোঝা যাচ্ছে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের রামু উপজেলায় বৌদ্ধমন্দিরে মৌলবাদিদের রুদ্ররোষের বর্ণনা এটি। এসব দৃশ্যের শোকাবহতা ফুটিয়ে তুলতে ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করা হয়েছে কালো রং। তার ওপরই এই হিংসাত্মক ক্রিয়াকর্মের প্রতি প্রতিবাদ জানিয়ে হালকাভাবে স্লোগান লেখা হয়েছে- ‘স্টপ রেসিজম, নট রিলিজিয়ন’। আহ্বান জানানো হয়েছে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা আর একত্রবাসের। এ চিত্র স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, উগ্রতা কখনওই শান্তি আনতে পারে না।

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার তৃতীয় তলায় চারটি গ্যালারিতে শুরু হলো কাহাল আর্ট গ্রুপের ‘৭ম কাহাল আন্তর্জাতিক আর্ট ফেয়ার ২০১৫’। শুক্রবার বিকেলে গ্যালারিতে ধ্বংসযজ্ঞের মাঝখানে থেকেও বুদ্ধের প্রশান্ত অনুদ্ধতপূর্ণ ভঙ্গিমা দেখে চোখ আটকে গেল। বর্তমান বিশ্বের নৈরাজ্যকর যুদ্ধলিপ্সা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় যে একত্ব ও ভ্রাতৃত্ব, তা রং-তুলির নিপুণ ছোঁয়ায় ফুটিয়ে ‍তুলেছেন শিল্পী।

প্রদর্শনীতে এশিয়া মহাদেশের মোট ৮টি দেশের শিল্পীরা অংশগ্রহণ করছে। দেশগুলো হলো, বাংলাদেশ, জাপান, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর কোরিয়া ও শ্রীলংকা। জাতীয় চিত্রশালার ৩য় তলার গ্যালারিতে ৪৫০ জন শিল্পীর প্রায় ৭০০টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে। এ বৃহৎ কর্মযজ্ঞে শিল্পরসিককে সুস্বাগতম।

দুপুর ৩টায় সংস্কৃতি বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান সিমিন হোসেন রিমি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ আয়োজনের উদ্বোধন করেন।

জাতীয় চিত্রশালায় অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে বিশেষ অতিথি ছিলেন অধ্যাপক সমরজিৎ রায় চৌধুরী ও ঢাকায় নিযুক্ত জাপান দূতাবাসের কাউন্সিলর মিৎশুতাকা নুমাহাতা। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা ক্যানভাসে শুধুমাত্র তার নিজ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যিক দৃশ্যই তুলে ধরেননি, সেইসাথে তুলে ধরেছেন বর্তমান বৈশ্বিক নৈরাজ্য, ব্যক্তিদহন আর সামষ্টিক চিন্তার অর্থবহ আখ্যান। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর বঞ্চনাগাথাও বর্ণনা করা হয়েছে বেশ কয়েকটি চিত্রকর্মে।

প্রদর্শনী ঘুরলেই চোখে পড়বে ঢাকা শহরের বিভিন্ন দেয়ালে সাঁটানো ‘রুমমেট আবশ্যক’ বা ‘ভাড়া দেয়া হবে’ এমন বিজ্ঞাপন সম্বলিত কাগজ আর বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে একটি স্থাপনাশিল্প। দেয়াল ও মেঝের অনেকখানি জায়গাজুড়ে সাঁটানো এসব বিজ্ঞাপনে উঠে এসেছে ভাষাবিভ্রাট, সাম্প্রদায়িকতা আর মানুষের সংকীর্ণতার চিত্র। একটি ঘর ভাড়া দেয়া হবে, তবু সেখানেও হিন্দু-মুসলিম বা জেলাভিত্তিক আঞ্চলিকতা দেখে ভাড়াটে আহ্বান করা হচ্ছে। আর এইসব দেশীয় সংকীর্ণতা ছাপিয়ে সেসবের মাঝখানে স্থির হয়ে আছে বৈশ্বিক বেদনাবোধও। ঘরভাড়ার বিজ্ঞাপনী কাগজের মাঝখানে পড়ে থাকা সিরীয় শিশু আয়লানের নিথর দেহচিত্র আমাদের বেদনার্ত করে। আমাদের জানিয়ে দেয়, এই ঘরভাড়ার বিজ্ঞাপনের মাঝে ঘরহারাদের নিত্যহাহাকার। সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের শিকার হয়ে উদ্বাস্তু হওয়া লাখো মানুষের ক্রন্দন।

আরেকটি শিল্পকর্মের কথা না বললেই নয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক ভিন্নধর্মী শিল্পকর্ম, যেখানে তর্জনি উঁচিয়ে আছেন পিতা। এ দৃশ্য সচরাচর আমাদের দেখা হলেও ব্যতিক্রম শিল্পীর মাধ্যমে। ক্যানভাসে অসংখ্য স্ক্রু গেঁথে শিল্পী নির্মাণ করেছেন এই শিল্পকর্ম। ক্যানভাসের ব্যাকগ্রাউন্ডের কালো রং পঁচাত্তরের ভয়াল ১৫ আগস্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আর কালো রঙের ওপর আবছা ভেসে ওঠা সে সময়ের সংবাদের কাটপিস আমাদের জানিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথাও।

‘৭ম কাহাল আন্তর্জাতিক আর্টফেয়ার ২০১৫’-এ প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো থেকে মোট ১০ জন শিল্পীর শিল্পকর্মকে ‘কাহাল’ পুরস্কার প্রদান করা হয়। তার মধ্যে ৩টি গ্র্যান্ড পুরস্কার ও ৭টি সম্মাননা পুরস্কার। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্র্যান্ড পুরস্কার লাভ করেন যথাক্রমে শিল্পী সৈয়দ জাহিদ ইকবাল, শিল্পী মো. তানভীর জালাল ও শিল্পী মো. পারভেজ হাসান। সম্মাননা পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পীরা হলেন- সৈয়দ হাসান মাহমুদ, বিকাশ আনন্দ সেতু, উপমা দাস, নারগিস পলি, সীমান্ত পাল, হারোকো কাওয়াশিমু (জাপান), পাক জাইওংমো (দক্ষিণ কোরিয়া)। ‘কাহাল আর্ট গ্রুপের পক্ষ থেকে প্রথম গ্র্যান্ড পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পীর জন্য ২০১৬ সালে জাপান ভ্রমণ ও টোকিওর নামকরা গ্যালারিতে শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে।

প্রদর্শনীটি চলবে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত। শনি থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১১টা থেকে রাত ৮টা এবং শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

প্রসঙ্গত, ‘কাহাল’ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ও জাপানের চিত্রশিল্পীদের সমন্বয়ে ২০০৮ সালে গঠিত হয়। প্রথম প্রদর্শনীও হয় সেবছরই। এরপর থেকে প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে জাপান ও বাংলাদেশে কাহাল আর্টফেয়ার অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। শিল্পকলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালনের জন্য ‘কাহাল’ প্রতি বছর একজন শিল্পীকে সম্মননা প্রদান করে থাকে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মাননা প্রদান করা হয় জাপানের বিখ্যাত মৃৎশিল্পী কোওইচি তাকিতাকে। উল্লেখ্য, এই মহান মৃৎশিল্পীর হাত ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এবারের প্রদর্শনীতে কোওইচি তাকিতারও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »