মোমের আলোয় করুণ সুরে গণহত্যা স্মরণ

gonohotta_dibos_chitram

।চিত্রম প্রতিবেদক। কবিতা আবৃত্তি, কবিতা পাঠ, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন ও নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবস উদযাপন করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।

গতকাল বিকেলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় গণহত্যার শিকারদের স্মরণের এই আয়োজন। এ সময় মোমবাতির আলোয় যেন ভেসে ওঠে বর্বরোচিত হামলার শিকার শহিদদের বীরত্বমাখা মুখ। আর উপস্থিত সবাই তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে মাথা আনত করেন।

১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের দ্বারা সংঘটিত এদেশের মানুষকে নির্মম গণহত্যা চালায় পাকিস্তানিরা। এ ছাড়া সারা বিশে^ ঘটে যাওয়া গণহত্যার প্রতি ঘৃণা জানান উপস্থিত সবাই। আগতরা গভীর মমতা আর আবেগে প্রদীপ জ্বালিয়ে স্মরণ করে পৃথিবীর বীর সন্তানদের।

দিবসটির তাৎপর্যতা তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। সেই কনভেশন অনুযায়ী, বাংলাদেশ একাত্তরের নৃশংসতাকে জেনোসাইড ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিচার শুরু করে। নিজস্ব শক্তিতে এ বিচার শুরু হয়। যা বাংলাদেশের জন্য গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এরপর নানা কারণে বিচারহীনতায় কেটে গেছে চার দশক। গণহত্যার স্মৃতিকে জাগ্রত রেখে, শিক্ষা নিয়ে বিশ্ববাসীর তেমন একটা সাহায্য না নিয়ে চার দশক পরে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গণহত্যার খুনিদের বিচার করার জন্য জাতিসংঘ সর্বসম্মতক্রমে উদ্যোগ নিয়েছিল। পাকিস্তানও এর অংশীদার, স্বাক্ষরদাতা। পাকিস্তানের দায়িত্ব সেই ১৯৫ জন চিহ্নিত ও অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ার দাঁড় করানো। সেইসঙ্গে সে সময়কার সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।’

অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ প্রদত্ত বাণী পাঠ করেন মাহমুদা আখতার।

শহিদ কবি মেহেরুন্নেসার ‘আজকের শপথ’ ও ‘রাজপথে আজ রক্তের প্রস্তুতি’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন তামান্না সারোয়ার নীপা, মন্টু খান রচিত ‘হায়নার খাঁচায় অদম্য জীবন’ থেকে পাঠ করেন সৈয়দ শহীদুল ইসলাম নাজু, শহিদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীনের ‘একটি চিৎকার : বিধাতার’ কবিতাটি পাঠ করেন নায়লা তারান্নুম চৌধুরী কাকলী।

রশীদ হায়দার সম্পাদিত ‘ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ১৯৭১’ গ্রন্থ থেকে পাঠ করেন মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল। তিনি ওই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘কুষ্টিয়ার গণহত্যা’ থেকে পাঠ করেন। পদাতিক নাট্য সংসদের ‘পোড়ামাটি’ নাটকটি মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।

এদিকে, দিবসটি উপলক্ষে আলোক প্রজ্জ্বলন, আলোচনা ও তথ্যচিত্র প্রদর্শন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। বুধবার সন্ধ্যায় একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের নন্দন মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় এই আয়োজন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব আক্তারী মমতাজ।

একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সদস্য মফিদুল হক। আরও উপস্থিত ছিলেন ১৯৭১ সালে ২০ মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে সংঘটিত গণহত্যার একমাত্র জীবিত সাক্ষী তখককার সময়ের শিশু সুন্দরী বালা।

চুকনগরের গণহত্যায় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। সেই গণহত্যা স্মরণে অনুষ্ঠানে বাঁশিযোগে একটি করুণ সংগীত পরিবেশন করা হয়। এ সময় অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণের দর্শক-শ্রোতারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। অশ্রু সংবরণ করতে গিয়ে অনেকেই রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে দেখা গেছে।

পরে প্রদর্শন করা হয় জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘টিয়ারস অব ফায়ার’ নামক দুটি তথ্যচিত্র। শিল্পকলা একাডেমির এই আয়োজনের সাথে একযোগে সন্ধ্যা ৬টায় সারাদেশের জেলা ও উপজেলার বধ্যভূমিগুলোতে আলোক প্রজ্জ্বলন করা হয়।

প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী ৯ ডিসেম্বর ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবস।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »