অবজেক্টগুলো একটা মেয়ের জীবনের সংগে বেশি সর্ম্পকিত : শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপি

lipi_chitram

নিজের শিল্পকর্মের সঙ্গে শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপি

নব্বই দশকের পর থেকে বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে গতানুগতিক শিল্পের দৃশ্যপট পাল্টে ভিন্ন একটা মাত্রা দিতে সক্ষম হন যে গুটিকয়েক তরুন শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপি তাদের মধ্যে অন্যতম। নব্যধারার শিল্প চর্চা ও এর যথাযথ উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের একজন হয়ে বহির্বিশ্বে আধুনিক শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করেন এই গুনি শিল্পী। ড্রয়িং, পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি বর্তমানে নিউ মিডিয়া আর্ট তথা ভিডিও আর্ট, পারফর্মেন্স আর্ট, ইনস্টলেশন আর্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলার চিত্রপট তুলে ধরার ক্ষেত্রে তৈয়বা বেগম লিপি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ইংল্যান্ড, তুরস্ক, জাপান, ফিনল্যান্ড, ইতালি, আমেরিকা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিনিয়ত তাঁর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হচ্ছে নিয়মিত। ব্যক্তি জীবনের নানা গল্প শিল্পরূপ হয়ে ফুটে ওঠে তাঁর শিল্পকর্মে। জীবনের নানা সঙ্গতি-অসঙ্গতি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে এই শিল্পীর সৃষ্টিতে। শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতায় ২০০৪ এ এশিয়ান আর্ট বিয়েনালে “গ্র্যান্ড প্রাইজ” অর্জন করেন তিনি। দেশের অন্যান্য পুরষ্কারের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও শিল্পকর্মের জন্য সম্মানিত হন তিনি। ২০১৪ তে “অনন্যা শীর্ষ দশ” পুরষ্কার লাভ করেন। এছাড়াও আমেরিকার নিউইয়র্কের গগেনহেইম মিউজিয়াম তাঁর “লাভ বেড” শিরোনামের একটি শিল্পকর্মটি সংগ্রহ করেছে যা বাংলাদেশের কোন শিল্পীর জন্য এক বিরল সম্মানের বিষয়।

শিল্প সৃষ্টির পাশাপাশি দেশে ও দেশের বাইরে নানা আর্ট প্রজেক্ট কিউরেট করেন তিনি। নতুন শিল্পীদের কাজের ক্ষেত্র তৈরিতে তাঁর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপি ও শিল্পী মাহবুবুর রহমানের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে “বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট”।

৫ ডিসেম্বর ২০১৫ গুলশানের বেঙ্গল লাউঞ্জে শুরু হয়েছে শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপির একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। প্রদর্শনী নিয়ে চিত্রমের পক্ষ থেকে শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেন শিবানী কর্মকার শিলু।

 

শিলু: অনেকদিন পর একক প্রদর্শনী করছেন দেশে।

তৈয়বা বেগম লিপিঃ হ্যাঁ, প্রায় আট বছর পর। ২০০৭-এ বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টে করি তারপর দেশে প্রর্দশনী করবো ভেবেছি অনেকবার। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আর হয়ে ওঠেনি।

শিলুঃ দেশের বাইরেতো এর মাঝে বেশ কিছু প্রদর্শনী হয়ে গেছে আপনার।

তৈয়বা বেগম লিপিঃ হ্যাঁ।

শিলুঃ এবারের প্রদর্শনী বিষয়ে কিছু বলেন।

তৈয়বা বেগম লিপিঃ এবারের প্রদর্শনী নিয়ে বেঙ্গলের সাথে যখন কথা হয় তখন ওরা আমাকে বলে এর মাঝে বেশ কিছু কাজ আমি করেছি যা হয়তো বাইরের বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হয়েছে বা বিভিন্ন পত্র পত্রিকা অথবা ভার্চুয়্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই দেশের মানুষ জেনেছে, দেখেছে কিন্তু বাস্তবে হয়তো দেখা হয়নি। তো সেই ধরণের কিছু কাজ আছে এবারের প্রদর্শনীতে যা বাংলাদেশে আগে কখনও প্রদর্শিত হয়নি এবারই প্রথম হচ্ছে।

শিলুঃ এবারের প্রদর্শনীর নাম “নো ওয়ান হোম” এ প্রসঙ্গে কিছু বলেন।

তৈয়বা বেগম লিপিঃ “নো ওয়ান হোম” যার মানে ঘরে কেউ নাই। আবার এর অর্থ এমনও হতে পারে ঘরে আমি একা আর কেউ নাই। আমি যখন ঘরে প্রবেশ করছি ওই জিনিস গুলো আমার। ওটার সাথে আমার একটা যোগসূত্র আছে। অথবা কেউ আমার ঘরে প্রবেশ করেছে কিন্তু আমি ঘরে নাই। শূণ্য ঘরে সে ঘুরে বেরাচ্ছে আমার নিজস্ব এলিমেন্টের সাথে।। ঘরের সেন্স থেকেই বিষয়টা ভাবা। প্রকৃত অর্থে ঘরের অবজেক্টগুলো একটা মেয়ের জীবনের সংগে বেশি সর্ম্পকিত। বলা যায় মানুষের জীবনের বিভিন্ন গৃহকোণ থাকে সেগুলোকে চিন্তা করেই করা।

এখানে যে ভিডিও গুলো আছে এটার নামই “নো ওয়ান হোম”। এটাকে কেন্দ্র করেই প্রদর্শনীর নাম দেওয়া। এটা আমার পূর্ব পুরুষের কবরস্থান। যেটায় আমি কবর স্থানটা পরিস্কার করছি। আর একটা হচ্ছে একশ বছরেরও পুরানো একটা কুয়া। ১৩৩০ সালে আমার দাদার বাবা করেছিল। এটা আমাদের গ্রামের বাড়িতে এখনও আছে। সেটার সাথেই এই ড্রয়িং গুলো থাকছে। মানুষের যে লাইফ সাইকেল, যে বডি চেঞ্জ। ছোট থেকে বড় হচ্ছি বড় থেকে বৃদ্ধ হচ্ছি। হেয়ার ফল, এই যে আমার চুল পরছে বা আমার স্কিনের ডিটেলটা দেখে আমি ভয় পাই এটা আমার নাকি। আমি দশ বছর আগেও হয়তো ভাবিনি এরকম হবে। কিন্তু এটাই সত্য। এগুলোরই ডিটেল ডয়িং। এর সাথে থাকছে “লিটল লার্নার” এই ভিডিওটা। একটা শিশু খেলার ছলে কবিতা, ছড়া পড়তে পড়তে বড় হয় এবং আনন্দ নিয়েই পড়ে । কিন্তু একটা মুসলিম পরিবারে ছোটো বেলা থেকে কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। এটা একরকম চাপিয়ে দেওয়া হয়। জোড় করে অর্থ না জেনেই এটা মুখস্থ করতে হয়। তো ছোটো বেলা থেকেই হিন্দু হোক মুসলিম হোক এক ধরণের জোর করে প্র্যাকটিসটা তৈরি করে। এই প্র্যাকটিসের মধ্য দিয়েই কিন্তু সে বেড়ে ওঠে।

সবটা মিলিয়েই এই রুমের কাজ। এটাই আমার আসল এক্সিবিশন বলা যায়। আমি যখন কবরস্থানে গেলাম ওখানে কেউ নেই। আমাদের এই যে কুয়াটা আমার বংশের একটা প্রাইড, ওখানে কেউ নাই। আমার যে স্কিন সেটা যেন আমার না, কিন্তু এটা আমার। তো সব মিলিয়ে সত্য, সত্যের আড়ালে সত্য।

শিলুঃ শুরুতেই যে কাজটা আছে “রি কলিং” তো সেলাই মেসিনের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক কি আছে বা কোনো স্মৃতি?

তৈয়বা বেগম লিপিঃ ভাবনাটা হঠাৎই আসে। এমন নয় যে আগে থেকেই অনেক ভেবে করেছি। এমনিতে সেলাই মেশিনের সাথে আমার সর্ম্পক খুব ছোটবেলা থেকে। আমি অনেক ছোটো বয়স থেকেই সেলাই করি। নিজের জামা নিজে সেলাই করে পরতাম। যখন আমি প্রাইমারি সেকশনে পড়ি প্রায় তখন থেকে। এত ছোটো যে হ্যান্ড মেশিন ঠিকঠাক ধরতে‌ও পারতাম না। পেটের সাথে লাগিয়ে চেপে ধরে সেলাই করতাম। ব্যাপারটা এসেছে আসলে পরিবার থেকেই। বাসায় দেখতাম সবাই যার যার জামা সেলাই করে পরতো। তখন নিজের জামা নিজে সেলাই করে পরাটা এক ধরণের ট্র্যাডিশন ছিল। তখন কেনা জামা কেউ পরতোই না। সেই সময়ের ভাবনা এরকম ছিল, কেনা জামা কেউ পরে নাকি। কেনা জামা তারাই পরে যাদের সেলাই মেশিন নাই। তখন প্রায় ঘরেই সেলাই মেশিন থাকতো। সেলাই মেশিন থাকাটা তখন একধরণের আভিজাত্য ছিল। এখন সময়ের অভাবে কেনা জামা পরি কিন্তু তখন এটা ধারণা করা যেতো না।

সেলাই মেশিনের ভাবনা কিভাবে এসেছে সেটা বলি। রানা প্লাজার শোকের চিত্রপট নিয়ে এক বছর পর একটা এক্সিবিশন করে পাঠশালা। বৃত্ত মোর‍্যাল সাপোর্ট দেয়। মাহবুব(শিল্পী মাহবুবুর রহমান) আর মোনেম ওয়াসিফ দুজন মিলে এটা কিউরেট করে। এক বছরের শোকটাকে কিভাবে রিপ্রেজেন্ট করা যায় এরকম একটা ভাবনা থেকে করা। বেসিক্যালি পাঠশালা ওই ঘটনার সাথে পার্সোনালি ইনভলভ ছিল। ওরা প্রথমে গিয়েছিল ফটোগ্রাফি করতে, পরে কিন্তু ওরা রেসকিউ টিমে চলে যায়। তো ওই রেসকিউ করার সময় ধংসস্তুপে পরে থাকা অনেক অবজেক্ট ওরা ওখান থেকে নিয়ে আসে। ওই সময়টা আমি ওখানে প্রায়ই যেতাম, ওদের কাজ দেখতাম। পার্সোনালি ইনভলব ছিলাম না, কিন্তু যেতাম। পরে থাকা অবজেক্ট গুলো দেখতাম। হঠাৎই গার্মেন্টের একটা মেশিন চোখে পরে। আমি ওটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। অনেক অবজেক্ট ছিল কিন্তু ওটার দিকে চোখ যায়। তো জানলাম ওটা ফটোগ্রাফার তাসলিমা লিমা আপার কালেকশন। আমি তখন লিমা আপাকে বললাম আমি মেশিনটা নিতে চাই। একটা কাজ করবো। উনি সানন্দেই রাজি হয়ে যান। কিন্তু পরে মনে হলো কোথায় যেন কি একটা মিসিং। কি যেন একটা নাই। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎই মনে হলো এটা তো আসলে আমার মেশিন না আমার মেশিন বলতে আমি চিরকাল যে মিশিন চিনে এসেছি, দেখে এসেছি এটা তো আসলে তা না। তখন আমার মনে হলো আমি কেন আমার মেশিনেই ফিরে যাচ্ছিনা। তো ভাবনাটা আসলে ওখান থেকেই। পাশাপাশি কিছু ড্রয়িং আছে এখানে। মেশিনটার সাথে এই ড্রয়িং গুলো রিলেটেড।

শিলুঃ এই সুই, সুতা, বুনন কেন্দ্রিক ড্রয়িং গুলো?

তৈয়বা বেগম লিপিঃ হ্যাঁ মেশিনের সাথে রিলেটেড পাঁচটা ড্রয়িং। লোম, সুতা, বোতাম, আর এটা একটা ডিজাইনের মত। বলা যায় মেসিনের সাথে সম্পর্কযুক্ত আনুসাঙ্গিক বিষয়গুলো। যদি মেশিন নিয়ে স্টোরি করতে চাও তো ধারাবাহিক ভাবে এই বিষয়গুলোই কিন্তু চলে আসে।

শিলুঃ তা ঠিক সুই-সুতা ছাড়া মেশিনের গল্প আসলে অসমাপ্ত। আপু ডান দিকের এই কাজটা, “ওমেনহুড টু” সর্ম্পকে আপনার বক্তব্য কি বা কাজটির দুদিকেই স্তন, এই ভাবনার পিছনের গল্পটা কি?

তৈয়বা বেগম লিপিঃ এটা অনেক পুরোনো কাজের একটা ট্রান্সফরমেশন। প্রথম কাজটা বেঙ্গলের গত শোতে ছিল। ওটা ছিল “ওমেনহুড”। তখন এটা উল্টো করে অনেকগুলা বডি ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম। ওটাতে মাথা ছিল, আমার ফেইস ছিল। নিচে দেয়াসলাইয়ের কাঠি ছিল। ওই কাজটাকেই মোল্ড করে নতুন করে এটা করা। একটু চেন্জ আছে, ড্রয়িঙেও চেঞ্জ আছে। ইন্সটল করার প্রক্রিয়াটাও চেঞ্জ হয়ে গেছে। ওটা ছিল “ওমেনহুড ওয়ান” এটা হলো “ওমেনহুড টু”। ওমেনহুড বা বাংলায় যদি বলি মহিলাবেলা। তুমি যখন কিশোর বয়স থেকে আস্তে আস্তে মহিলা হয়ে ওঠো তখন কিন্তু পৃথিবীটাকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করো। মানুষের যেমন বলে না চাইল্ড হুড, বয়হুড আমার তেমন ওমেনহুড। আচ্ছা কেনো দুদিকেই বডি। আমরা মেয়েরা সাধারণত ভিড়ের মধ্যে এক ধরণের অসহায় বোধ করি। ভয়ে ভিড়ের মধ্যে যেতাম না। ‌এই বুঝি হঠাৎই একটা হাত ছুঁয়ে দেয়। উদাহরণ, এই যে পহেলা বৈশাখের ঘটনা এমনটা অহরহ কম বেশি মেয়েদের জীবনে ঘটে। আমার জীবনে ঘটেছে, তোমার জীবনেও ঘটেছে।

শিলুঃ হ্যাঁ ঘটেছে।

তৈয়বা বেগম লিপিঃ হ্যাঁ, যে বলে ঘটে নাই, সে আসলে ভুল বলে। সবার জীবনেই ঘটে। কাদের জীবনে ঘটেনি! হয়তো খুব কম, একটি মেয়ে বাইরে গিয়ে কাজ করছে বা ভিড়ের মধ্যে হাঁটছে কিন্তু এমন বাজে ঘটনার সম্মুখীন হয়নি। সবারই এধরনের বিশ্রী অভিজ্ঞতা রযেছে। তুমি যখন ভিড়ের মধ্যে যাবে, একটা ধাক্কা খাবে, খোঁচা খাবে, সহ্য করতে না পেরে চলে আসবে। ইচ্ছে হলো তোমাকে অন্য একটা হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে। যে জায়গায় অন্য একটা পুরুষের হাত আসা উচিৎ না সেখানে অন্য একজনের হাত চলে আসছে। এটা অনেক সভ্য লোকেরাও করে। হোয়াই? তাদের এই বোধ নাই যে, এখানে তোমার কোনো জায়গা নাই। আমি তোমাকে ওয়েলকাম করছিনা। এটা একান্ত আমার নিজস্ব প্রপার্টি। এখানেতো তোমার হাত আসা উচিৎ না। আমার যেন পিঠ নাই পুরোটাই যেন বুক। তুমি কেনো আমার বুকে হাত দিবা। এটা একধরনের এ্যাবিউস করা। তোমার রাইট নাই আমাকে এ্যাবিউস করার। আমার “ওমেনহুড” মানে আগের কাজটায় এ চিন্তা থেকেই দেয়াশলাই কাঠি দিয়েছিলাম যে আমার মধ্যেও বারুদ জ্বলতে পারে। আমারটা হয়তো ঠান্ডা হয়ে আছে। তুমি আমার সাথে যা করলা সে মূহূর্তে আমার হয়তো প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নাই বা সুযোগ নাই কিন্তু আমার যখন সুযোগ ঘটবে আমি শুধু প্রতিরোধ না অনেক বড় ধরণের শিক্ষা দেওয়ার কথা ভাববো। তো সোসাইটির এই যে এ ধরণের অধপতনগুলোকে নিয়ে আমরা ঘুরি, সেটার জন্যই আমি বলছি যে ওমেনহুড।

শিলুঃ এই আচরণগুলোই আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় এই সমাজে আমরা মেয়ে বা মহিলা। আমাদের পরিধি সীমিত।

তৈয়বা বেগম লিপিঃ সে-ই, একটা পুরুষের কোনো ধারণাই নাই, সে জানে এটা একটা মেয়ের কেমন লাগে, তার বডি বা মন কি রিয়েক্ট করতে পারে। সে কারনেই কাজটার নাম “ওমেনহুড” দেওয়া। বলেছিতো যে ওটারই একটা ট্রান্সফরমেশন “ওমেনহুড ২”। আমার দেখা যায় কি বেশির ভাগ কাজই একটা জায়গা থেকে শুরু করে অনেকদিন ধরে সেটারই একটা কন্টিনিউশন চলতে থাকে। কোথাও কোথাও টুকটাক টুকটাক করে আগাতে আগাতে ঐটাকে নিয়ে আমি আরেকভাবে চিন্তা করি। একবার কাজ করলাম কাজ হয়ে গেল ব্যাপারটা আসলে তা না। একটা জায়গা থেকে শুরু করে ওটার যে ট্রান্সফর্মেশন ওটার যে ওয়েটা, প্রসেসটা আমি খুব এনজয় করি।

শিলুঃ “ওমেনহুড-২” এর আগে কোথায় শো হয়েছিল?

তৈয়বা বেগম লিপিঃ এটা ইন্ডিয়া আর্ট ফেয়ারে একটা শো হয়েছিল এছাড়া আর কোনো গ্যালারিতে শো হয়নি।

শিলুঃ বিকিনি কাজটার প্রসঙ্গে কিছু বলেন।

তৈয়বা বেগম লিপিঃ বিকিনি ইংল্যান্ড আর ইস্তানবুলে সলো শোতে ছিল। দু জায়গাতেই হয় শুধু একটু কাজের হেরফের হয়। পরবর্তীতে এটা নিয়ে আর কোথাও শো করিনি। ওই শোয়ের নাম ছিল “নেভার বিন ইন্টিমেট”। এটার সাথে আমার কোনো ইন্টিমেসি ঘটেনি। এটা বলা যায় নিজেকে নিয়ে রসিকতা করা। আমার নিজের বিকিনি কেনা আছে। কিন্তু আমি বিকিনি কখনও পরিনি। আমি জানিনা এগুরো পরে সি বিচে হাঁটতে কেমন লাগে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা ভাবাটাও অসম্ভব। আমাদের এখানে এত বড় সি-বীচ অথচ এখানে এটা এ্যালাও না। এখানে অন্যরা ঠিক করে দেয় তুমি তোমার শরীর কতটুকু দেখাবে। এরা মনে করে এটা দেখানো। এটা যে দেখানোর জন্য না, বিচেরই একটা পোশাক, কমফোর্টের জন্যই বানানো। যেন তুমি বিচটাকে ভালো করে উপভোগ করতে পার। এটা রিলাক্সের একটা পোশাক। মানুষ কি চায় সে যখন রিরাক্স করবে যতটা কম পোশাক পরা যায়। একটা ছেলে যেমন শর্টস পরে রিলাক্স করে একটা মেয়েও কিন্তু রিলাক্স করতে চায়। কিন্তু এখানে এ কালচারটা তৈরি হযনি। তো এগুলো নেয়েই ভাবনাটা।

শিলুঃ বাথটাব আর “লেটস টেক এ ব্রেক” এ দুটোর যোগসূত্র কি?

তৈয়বা বেগম লিপিঃ “লেটস টেক এ ব্রেক” চলো বিশ্রাম করি। বাথটাবটা প্রথমে বানিয়েছিলাম ব্রাজিলের একটা প্রজেক্টের জন্য। পরে ব্রাজিলের গভমের্ন্ট চেঞ্জ হওয়াতে প্রজেক্টা আর হয়নি। বাট ব্রাজিলের তিনটা সিটিতে এটার শো হয়। এটা আসলে ব্রাজিলের একটা রাস্তার মোড়ে করার কথা ছিল। ইন্সটলেশনের একটা অংশ ছিল। তো ওই রাস্তাটায় ওরা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো। রাস্তায় গিয়ে আমার মনে হলো এটা কি! সবাই শুধু হাঁটছে আর হাঁটছে। কেউ দাঁড়ায় না সবাই শুধু হাঁটে হাঁটে হাঁটে হাঁটে। এত বিজি একটা মোড়। এমন বিজি মোড় অনেক শহরেই আছে তেমনি একটি বিজি মোড়। আমাদের হয় না সবাই শুধু ব্যাস্ত আর ব্যাস্ত। কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নাই। নিজের দিকেও যেন দেখার সময় নাই কারো। আজ এটা কাল সেটা। এটা করতে হবে সেটা করতে হবে, আজ অমুক কাল তমুক সবাই যেন কিসের পিছনে দৌড়াচ্ছে। কন্টিনিউ একটা ব্যাস্ততার মধ্যে যাচ্ছে মানুষের জীবন। মানুষের লাইফ আসলে সময়ের ক্ষেত্র থেকে খুব শর্ট হয়ে আসছে। খুব দ্রুত লাইফটা চলে যাচ্ছে। আগে বছর যেতই না, এখন কমিউনিকেশন এত ডেভেলপ হয়েছে যে আগে যেটা হতো ছয় মাসে এখন সেটা হয় দুমাসে। তো ব্যস্ত লাইফে কখনও মনে হয় না ধুর এত কিছুর দরকার নাই- যাই রিলাক্স করি, বিশ্রাম নেই। কিন্তু আসলেই কি কোনোদিন হয় এটা, আমরা বিশ্রাম নেই। এটা আসলে ঘটেনা।

শিলুঃ বেশ অস্থির একটা সময়।

তৈয়বা বেগম লিপিঃ অস্থির সময়। তোমার হয়তো সুন্দর একটা বাথটাব আছে, তুমি হয়তো ভাবছো যাই ওখানে শরীর এলিয়ে দিয়ে দুদন্ড বিশ্রাম নেই। কিন্তু সেই সময় কই। দেখা যাবে তুমি হয়তো বাথটাবের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলে। তো বাথটাবটা কেনো রেজার ব্লেড দিয়ে বানালাম, ওটার সাথে আমার যে ডিস্টেন্স সেই ডিস্টেন্সটাই আমাকে এটা বানাতে হেলপ করেছে। এমন একটা বাথটাব বানালাম যেটাতে ইচ্ছে করলেও কখনও বিশ্রাম নিতে পারবো না, এই।

শিলুঃ এখানে সেল্ফে কিছু অবজেক্ট দেখা যাচ্ছে।

তৈয়বা বেগম লিপিঃ সেলফে যে অবজেক্টগুলো আছে, জুতা ব্যাগ বা আরও যা কিছু ওগুলো, ওই প্রডাক্টগুলো ব্র্যান্ডের জিনিসের যে ক্রেজ ওটাকে মাথায় রেখে করা। শোরুমে যেমন থাকে, সেরকম। ছোটো ইমেজ গুলোকে মাথায় রেখে ড্রয়িংগুলো করা। এই তো, এই হচ্ছে আমার প্রদর্শনীর কাজ।

শিলুঃ ধন্যবাদ আপু এতোটা সময় নিয়ে সহযোগিতা করার জন্য।

তৈয়বা বেগম লিপিঃ ধন্যবাদ তোমাকেও।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »