চেখে আসুন রাজীব দত্তের রান্না

razib_datta_chitram

শিল্পী রাজীব দত্ত

।প্রান্ত পলাশ। ‘পাখিরা কখনো রান্না করা মাছ খেয়ে দেখেনি। তাই তার পোষা পাখির জন্য রমিজ রান্না করা মাছ নিয়ে যায়। রমিজ গাছে উঠে পাখিকে পাখির মতো ডাকে- আসো খাই, মাছ খাই। পাখিদের একটা পায়ে লোম থাকে তো।’ ছবির ভেতর গল্প জুড়ে দিয়ে এক ধরনের রসিকতা ছুড়ে দেন শিল্পী রাজীব দত্ত। গোল চিহ্নে ভেতর অর্ধেক কাটা মাছটির দিকে তাকালে মনে হবে মাছটি যেন কাটার আনন্দে ব্যাকুল। না শোয়া না বসা পাখিটির এক পায়ে লোম, তাও কথাচিহ্নিত। অন্য পা একটু খাড়া হয়ে আবার ঝুঁকে টেবিল-ল্যাম্পের আকার ধারণ করেছে। এসবের মিনিং কী।

না, তরুণ এই চিত্রকরের উদ্দেশ্য মিনিং সেঁটে দেয়া নয়। তবে উদ্দেশ্য যে ছিল না তা নয়। চিত্রপাঠক ছবিটি পড়া মাত্র যেন নানা অনর্থ মনে মনে এঁকে বা লিখে বা বিড়বিড় করে বলে ফেলে এমন একটা ভাবনা তার ভেতরে ছিল বলে মনে হয়। ফিগারের অঙ্গভঙ্গিকে পাল্টিয়ে তিনি অর্থ পালটে দিতে চেষ্টা করেন। শুধু পাখির গায়ে কেন, মানুষের গায়েও তো লোম থাকে। কিন্তু চিত্রে কথানির্দেশিত ‘লোম’ শব্দটি চর্মচক্ষে আসা মাত্র একটা লোমশ অনুভূতি কাজ করে স্নায়ুতে। টেবিল-ল্যাম্পের অনির্দেশ্য আলো-আয়নায় পাখিটির মতো আয়েশভঙ্গিতে নিজের ভঙ্গি পালটানো ঠোঁট-মুখ-চোখ সর্বোপরি দেহ দেখে চিত্রপাঠকের মনোভঙ্গিও পালটে যায়। রমিজের রান্না করা মাছটি পাশে পড়ে থাকে। মাছ হাসে।

২০ নভেম্বর শুক্রবার থেকে কলাকেন্দ্র আর্ট গ্যালারিতে এমনই বিচিত্র সব চিত্র-অপকর্ম নিয়ে শুরু হয়েছে রাজীব দত্তের একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘হাও ড্যু আই রেন্ট আ প্লেন’। সন্ধ্যা ৭টায় মোহাম্মদপুর-ইকবাল রোডস্থ ওই গ্যালারিতে শিল্পী-দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়।

উদ্বোধনের পর শিল্পী রাজীব দত্তের চিত্রকর্ম নিয়ে আলোচনা করেন শিল্পী ঢালী আল মামুন এবং শিল্পী ও ‘ডেপার্ট’ সম্পাদক মোস্তফা জামান।

আলোচনায় তারা বলেন, বিভিন্ন ওপেন সোর্স থেকে ইমেজ সংগ্রহ করে ওইসব ইমেজকে নিজের কনটেক্সটে বির্নিমাণ করে রাজীব। অনেক ফেমাস পেইন্টিংকেও রাজীব আজকের সময়ের মতন করে একটা চেহারা দেয়। আর কিছু কাজে সে ইলাস্ট্রেশনের যে ধারা বা গ্রাফিক নোবেলের মতো করে টেকস্টের সাথে ইমেজকে মার্জ করে।

প্রদর্শনীতে আরো উপস্থিত ছিলেন শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য, শিল্পী নিসার হোসেন, শিল্পী দিলারা বেগম জলি এবং শিল্পী রশিদ আমিন প্রমুখ। প্রদর্শনীটি কিউরেট করেন শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান ও শিল্পী কেহকাশা সাবাহ।

প্রদর্শনীর কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমান রাজীব দত্তের কাজ প্রসঙ্গে বলেন, ‘একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, উনার দৃষ্টিভঙ্গি। উনি কিছু ইমেজ তৈরি করেন যা উনার দু’তিন রকমের সত্তার প্রকাশ। হতে পারে অর্থহীনতা, কিন্তু তারও তো একটা পৃথক ভাষা আছে।’

অন্য এক চিত্রে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথের চিরপরিচিত ছবির চোখ ঝাপসা করে দেয়া হয়েছে। দূরে ছোট ঘর। উন্মুক্ত প্রান্তরে এক নারী উবু হয়ে তার চোখের সামনের গর্তকে দেখছেন। রবীন্দ্রনাথের চোখের দিকে তাকালে চিত্রপাঠকের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। অন্যভাবে দর্শনের স্বাদ মিলছে তাতে। উবু হয়ে থাকা নারীর দিকে তাকাতেই চোখ পড়ছে গর্তের দিকে। আর সেইসঙ্গে চিত্রপাঠকও গর্তে পতিত হচ্ছেন।

রাজীবের বড় সম্পদ তার পর্যবেক্ষণক্ষমতা, দৃষ্টিভঙ্গি আর বারবার সেই ভঙ্গি পালটে নেয়ার প্রয়াস। রাজীব কিছু ইমেজ তৈরি করে যাতে বহুসত্তা খেলা করে। অর্থহীনতার যে অর্থ আছে, রাজীব চিত্রপাঠককে তা বারবার স্মরণ করিয়ে দেন। এই যে পৃথক ভাষা নির্মাণের চেষ্টা, তাতে রাজীবকে ভালবাসার ফুল না দিয়ে চিত্রপাঠক পারবেন না। বাজারি শিল্পচর্চার বাইরে এসে রাজীব প্রতিনিয়ত নিরীক্ষা করে চলেছেন। এক বক্তব্য থেকে সরে যাচ্ছেন অন্য বক্তব্যে। এক ইমেজ থেকে সরে যাচ্ছেন অন্য ইমেজে। গোলকধাঁধার এই দুনিয়ায় চিত্রপাঠকও ধাঁধা নিয়ে ঘরে ফিরছেন।

১০ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনী চলবে। ১/১১, ইকবাল রোড, মোহাম্মদপুরের কলাকেন্দ্র আর্ট গ্যালারিতে এই প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত। সেখানে রাজীব দত্ত নানা মশলা দিয়ে অনুস্বাদিত রান্না করে রেখেছেন। একবার ঘুরে আসুন। খেতে পারবেন কি না, তা আপনার ব্যাপার!

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »