দৃক গ্যালারিতে পাহাড়-নিসর্গের জীবনকাব্য

 

hill_art_chitram।প্রান্ত পলাশ। মোটা বাঁশের হুকোর মতো একপ্রকার ধূমপান-যন্ত্র। তার ওপর ডান হাত গোল করে ধরে মুখ সামনে এনে হুঁকো টানার ভঙ্গি করছিলেন এক আদিবাসী তরুণ। দেখে ভ্রম হবে, গ্যালারিতে বসেই ধূমপান শুরু করে দিল না কি ছেলেটা। আসলে তা নয়, ক্যানভাসে রং-তুলিতে আঁকা এই বাঁশের হুকোটি এমনই জীবন্ত যে, তার সামনে হাত-মুখ রাখলেই মনে হচ্ছে কেউ টানছে।

পাহাড়ের নিসর্গে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এমন দৃশ্যকাব্য নিয়ে রাজধানীর ধানমন্ডির দৃক গ্যালারিতে শুরু হয়েছে ৫ দিনব্যাপী চিত্রপ্রদর্শনী। ১৫ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী।

শিল্পীদের ছবিতে উঠে এসেছে পাহাড়ের বৈচিত্রময় সংস্কৃতি ও জীবনধারা। শিল্পীরা তাদের নিজ ভাবনায় তিন পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের পোশাক-আশাক, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-উল্লাস, দারিদ্র, তাদের সীমাবদ্ধতা, সংগ্রাম সর্বোপরি পাহাড়ী জীবনের রুঢ় বাস্তবতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন রং-তুলির ভাষায়।

তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির ২৭ জন শিল্পীর বিভিন্ন মাধ্যমে করা শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। এটি হিল আর্টিস্ট গ্রুপের ৫ম চিত্রপ্রদর্শনী। পর পর পাঁচ বছর তারা এ প্রদর্শনীর আয়োজন করল। প্রদর্শনীতে মোট ১২৫টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে।

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ঘর। দূর থেকে দেখে মনেই হয় না কেউ এগুলো তৈরি করেছেন। মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজেই এই আবাস তৈরি করেছে। পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছ জল আর আঁকাবাঁকা নদী দূরের সবুজে গিয়ে মিশেছে। সেখান থেকে খাবারের জল সংগ্রহ করছেন পাহাড়ি নারীরা। আবার মাথায় লাকড়িভর্তি ঝুড়ি নিয়ে ক্লান্ত হয়ে ফিরছেন ঘরে। পাহাড়ের জুমে ফসল ফলছে। সেই ফসল কাঁধে নিয়ে চলেছে নারীর সঙ্গে পুরুষেরাও। কোথাও ভেদ নেই। প্রকৃতি ও মানুষ যেন মিলেমিশে একাকার হয়েছে সেখানে। এমন দৃশ্যকাব্য চোখে পড়লেই মন ভাল হয়ে যায়। প্রদর্শনীতে যারা এসেছিলেন তাদের চোখেমুখেও ছিল সেই আনন্দরেখা।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক শিশির কুমার ভট্টাচার্য প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে গওহর রিজভী বলেন, ‘চিত্রকর্ম, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের জীবনবৈচিত্র সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে ঢাকাতে একটি স্থায়ী গ্যালারি নির্মাণ করতে হবে। যেখানে শুধু পার্বত্য অঞ্চলের শিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হবে। এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বৈচিত্রময় বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী নিয়েই একটি বাংলাদেশ। এসব জাতি-গোষ্ঠীর জীবনপ্রণালী-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বৈচিত্রময়। এসব বৈচিত্র বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে না পারলে বাংলাদেশ পরিচিত হতে পারবে না।’

‘পার্বত্য অঞ্চলের শিল্পীরা সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে না’ বলে মন্তব্য করেন নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা। কার্টুনিস্ট শিশির ভট্টাচার্য বলেন, ‘পার্বত্য শিল্পীদের কাছে আমরা ঋণী, কারণ তাদের জন্যেই আমাদের সংস্কৃতি এত বৈচিত্র্যময়।’

হিল আর্টিস্ট গ্রুপের সভাপতি ধনমনি চাকমা সরকারের কাছে প্রতিবছর একটি চিত্রপ্রদর্শনীর বাজেট বরাদ্দ এবং দেশের বাইরের প্রদর্শনীতে সরকারি খরচে পাহাড়ি শিল্পী পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

দাবির প্রেক্ষিতে গওহর রিজভী পার্বত্য অঞ্চলের শিল্পীদের সামনে এগিয়ে নেয়ার উৎসাহ দিতে পাহাড়ি শিল্পকর্মকে দেশের শিল্পকলার মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। শুধুমাত্র পার্বত্য অঞ্চলের শিল্পীদের জন্যে ঢাকায় একটি স্থায়ী গ্যালারি তৈরির আশ্বাস দেন।

জানা যায়, পাহাড়ের চিত্রকলাকে এগিয়ে নিতে পাহাড়ের চিত্রশিল্পীদের নিয়ে ১৯৯২ সালের ১৫ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় ‘হিল আর্টিস্ট গ্রুপ’। গতবছর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ঢাকা আর্ট সেন্টারে একটি গ্রুপ চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এতে ২১ জন পাহাড়ের শিল্পী অংশ নেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রদর্শিত হচ্ছে এই চিত্রপ্রদর্শনী।

চিত্রশিল্পীদের একজন তিতাস চাকমা বলেন, ‘ছবিতে পাহাড়ি মানুষের জীবনের না বলা ভাষাগুলোই উঠে এসেছে। প্রকৃতির সঙ্গে তাদের যে আত্মিক সম্পর্ক তা ফুটে উঠেছে প্রদর্শিত ছবিগুলোতে। তিতাস চাকমা আরও জানান, ছবিগুলোতে সব ধরনের রঙের ব্যবহার রয়েছে।

‘বৈচিত্র্য ও বৈচিত্র্যতায় পাহাড়ি রং’ শীর্ষক এই প্রদর্শনী চলবে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী দর্শকদের জন্যে উন্মুক্ত থাকবে।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »