ফাঁকিবাজি দিয়ে শিল্পচর্চা হয় না- শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ

shahabuddin-sir3_receiption2

চারুকলার বকুলতলায় সংবর্ধনা শেষে শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ

।চিত্রম প্রতিবেদক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলা তখন সরগরম মানুষের পদভারে। বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদকে দেয়া হবে সংবর্ধনা। এ আয়োজনকে ঘিরেই শিল্পীদের মিলনমেলা। অনুষ্ঠান শুরু হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য-সুন্দর’ গানটি দিয়ে। গাইলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক তপন সরকার। এর পরই একই বিভাগের আরেক শিক্ষক দেব প্রসাদ গাইলেন ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ/ চেতনাতে নজরুল’। বকুলতলা মুখর হলো সুরেলা সঙ্গীতে।

শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি ফরাসি সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন ‘শোভালিয়ে দো লরদ দেজার্ত এ দে লেতর’ খেতাব। প্রথম বাংলাদেশি শিল্পী হিসেবে তার এই অনন্য প্রাপ্তিতে ২৭ ডিসেম্বর বেলা ১২টায় তাকে সংবর্ধনা দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ।

পরপর দুটি গান পরিবেশনা শেষে সংবর্ধিত শিল্পীকে স্নেহাশীষ জানিয়ে বক্তব্য দেন তার শিক্ষক শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী ও রফিকুন নবী। বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। মানপত্র পাঠ করেন শিল্প-সমালোচক মঈনুদ্দীন খালেদ। অভিজ্ঞানপত্র পাঠ করেন চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। এ ছাড়াও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী-পত্নী আনা ইসলাম।

সমরজিৎ রায় চৌধুরী বলেন, ‘ছাত্রাবস্থা থেকেই শাহাবুদ্দিন একজন কৃতী মানুষ। আর সেজন্যই আজ সে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি ওর শিক্ষক হয়েও ওকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করি এবং আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।’

রফিকুন নবী বলেন, ‘শাহাবুদ্দিন এখনও নিরলসভাবে কাজ করছে। এ কাজ শুধু অর্জনের জন্য নয়, শিল্পকলার ভুবনকে আলোকিত করতে। আমি গর্বিত যে, ও আমার ছাত্র। চারুকলার শিক্ষার্থীরা শাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হবে বলে তিনি আশা করেন।’

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘শিল্পী শাহাবুদ্দিন মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, দেশকে ভালোবাসেন। এ ভালোবাসাই আজ তাকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সব সময় তিনি নিজের কথায় এ বিষয়গুলোকেই তুলে ধরেন।’

নিজের প্রাপ্তি সম্পর্কে শিল্পী শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আমি জানতাম, আজ হোক, কাল হোক, ওরা (ফরাসি সরকার) আমাকে এটা (নাইট খেতাব) দেবে। এটা আমার আত্মবিশ্বাস ছিল।’

‘আমার জীবনের সোনালি পাঁচ বছর কাটিয়েছি চারুকলা প্রাঙ্গণে। তখন ছাত্র-শিক্ষক সবাই একটি পরিবারের মতো ছিলেন। আজ ৪৫ বছর পরে সেই চারুকলাতেই শিক্ষকদের হাত থেকে শুভেচ্ছা নিচ্ছি। এটা আমার জন্য বিশাল ব্যাপার। আজ আমার হৃদয় আরও বড় হয়ে গেছে, বুকটা ভরে গেছে’, চারুকলা প্রাঙ্গণের স্মৃতি ও সংবর্ধনাপ্রাপ্তির উচ্ছ্বাস এভাবেই প্রকাশ করেন তিনি।

চারুকলার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শিল্পী শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সিদ্ধান্ত হলো তৎকালীন আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ছাড়াই প্রমোশন দেয়া হবে। একটি সভায় যখন এ সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা, তখন আমিই একমাত্র বিরোধিতা করলাম। কারণ, এতে করে ফাঁকিবাজি হয়ে যায়। ফাঁকিবাজি দিয়ে আর যা হোক শিল্পচর্চা হয় না।’

শিল্পীরা দুর্বল মানুষ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বুকে এখনও বাংলাদেশকে যে দুইটি বিষয়ের জন্য সবাই চেনে, তা হলো, আমাদের তৈরি পোশাক ও চিত্রশিল্প। অনেকেই মনে করেন, রং-তুলি দিয়ে যারা ছবি আঁকেন, তারা খুব দুর্বল মানুষ। আমি মুক্তিযুদ্ধ করে সেই দুর্বলতাকে ভেঙে দিয়েছি।’

মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদীপ্ত স্লোগান ‘জয় বাংলা’-কে নিজের পাথেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধে আমার মূল অস্ত্র ছিল জয় বাংলা। জয় বাংলাই আমার হৃদয়। এই জয় বাংলা থেকে আজকে অনেকেই সরে গেছে। পাকিস্তানকে সমর্থন করছেন। তাদের ধ্বংস অনিবার্য। কিন্তু আমি একটি কথা বলতে পারি, চিত্রশিল্পীদের মধ্যে ৯৯ শতাংশই জয় বাংলার পক্ষে। যারা বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে চায়, তারা কখনও সফল হবে না।’

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিল্পী শাহাবুদ্দিনকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানায় চারুকলা অনুষদের আটটি বিভাগ, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, ছাত্রলীগ, কসমস গ্যালারিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »