জীবনের স্বাদ অর্থপূর্ণ বেঁচে থাকায়- সৈয়দ শামসুল হক

haque_chitram।চিত্রম প্রতিবেদক। ‘কতটুকু গেলে স্বর্গ মেলে, আর কতটুকু যেতে হবে? জীবনের স্বাদ বেঁচে থাকায়, অর্থপূর্ণ বেঁচে থাকায়। লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা।’ নিজের আশিতম জন্মদিনে এভাবেই জীবনোপলব্ধি প্রকাশ করলেন বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দ শামসুল হক।

২৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল হল। প্রবেশমুখের চত্বর ফুল আর আলোকোজ্জ্বল প্রদীপে সাজানো। সাদা পাঞ্জাবি, জিন্স প্যান্ট আর লাল চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে মঞ্চে বসেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। তার আশিতম জন্মবার্ষিকী। পাশেই বসেছিলেন তার সহধর্মিণী কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক। সূচনাসঙ্গীত পরিবেশন করলেন শিমুল ইউসুফ। সঙ্গীত পরিবেশনের আগে কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বললেন, ‘আজ এক বিশাল বটবৃক্ষের জন্মদিন। আমরা অনুজরা বেঁচে থাকতে চাই তার ছায়াতলে।’ এরপর দরদমাখা কণ্ঠে গেয়ে শোনালেন ঠাকুরের গান ‘নির্মল করো, মঙ্গল করো মলিন মর্ম মুছায়ে’… এরপর আশিটি প্রদীপ জ্বালিয়ে জন্মদিনের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিশিষ্টজনেরা। মোমের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণ।

শুধু তাই-ই নয়, জন্মদিনে কবি-সব্যসাচীকে জানানো হয় একইসঙ্গে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। তার পরিচয়টি যেমন বহুমাত্রিক তেমনি আয়োজনেও ছিল বহুমাত্রিকতা। জন্মদিন উদযাপনে কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে কথা বলেছেন বিশিষ্টজনরা। তাকে নিবেদন করে গাওয়া হয়েছে গান, পঠিত হয়েছে কবিতা, পরিবেশিত হয়েছে নৃত্য। জানানো হয় ফুলেল শুভেচ্ছা।

সৈয়দ শামসুল হকের জীবন ও কর্ম নিয়ে সজ্জিত অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে সৈয়দ হক জয়ন্তী উদযাপন পরিষদ। সৈয়দ হকের গুণমুগ্ধদের আগমনে মিলনায়তন হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে সৈয়দ হককে নিবেদিত আলোচনায় অংশ নেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, নাট্যনির্দেশক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ, বরেণ্য অভিনয়শিল্পী আলী যাকের, কবি মুহাম্মদ সামাদ, সাংস্কৃতিক সংগঠক গোলাম কুদ্দুছসহ শিল্প-সংস্কৃতি ভুবনের বিশিষ্টজনেরা। স্বাগত বক্তব্য দেন পরিষদের সদস্য সচিব আকতারুজ্জামান। একইসঙ্গে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন পরিষদের আহ্বায়ক নাট্যজন আতাউর রহমান।

সুরের আশ্রয়ে সৈয়দ হককে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিমুল ইউসুফ ও অদিতি মহসিন। অদিতি মহসিন পরিবেশন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ’ ও ‘স্বার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’। মুদ্রার সঙ্গে অভিব্যক্তির অনবদ্য সম্মিলনে নৃত্য পরিবেশন করেন ওয়ার্দা রিহাব। কবিতার দোলায়িত ছন্দে শিল্পিত উচ্চারণে আবৃত্তি পরিবেশন করেন বাকশিল্পী হাসান আরিফ ও মোহাম্মদ আহ্কামউল্লাহ। হাসান আরিফের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সৈয়দ হকের কবিতা ‘আমার পরিচয়’। আহ্কামউল্লাহ্ পাঠ করেন নূরলদীনের সারা জীবন কাব্যনাট্যের অংশবিশেষ।

নাসিরউদ্দীন ইউসুফ রচিত প্রশংসাবচন পাঠ করেন রামেন্দু মজমুদার। চমৎকার বর্ণনায় কবিকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘সে এক কবি জন্মেছিল এই বাংলায়/ হেমন্তের সোনালি রোদ গায়ে মেখে/ তারপর কত গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত/ শীত বসন্ত পার হয়ে সেই কবি/ দু’হাতে সৃষ্টি করেছে অবিরল/ অমর সব কাব্য/ সেই কবি আর কেউ নন, আমাদেরই সৈয়দ শামসুল হক।’

কবির হাতে শিল্পী কিরীটি রঞ্জন বিশ্বাসের আঁকা প্রতিকৃতি তুলে দেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। কবি ও কবিপত্নীকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন অভিনয়শিল্পী ফেরদৌসী মজুমদার।

বরেণ্য এ লেখকের দীর্ঘায়ু কামনা করে আতাউর রহমান বলেন, ‘শেক্সপিয়রের সবচেয়ে সন্দর অনুবাদটি করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। তার অনূদিত ম্যাকবেদ নাটকটি এ দেশের মঞ্চনাটকের একটি মাইলফলক। অনুবাদ ছাড়াও মৌলিক নাটকের মধ্য দিয়ে তিনি এ দেশের নাট্যসাহিত্যকে করেছেন উজ্জ্বল। আমার সৌভাগ্য হয়েছে তার নাটক নিদের্শনা দেয়ার। তিনি বহন করে চলেছেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও চেতনা। আশা করি, আমৃত্যু বহমান থাকবে তার সোনালি কলমটি।’

রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘তার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্যটি মুক্তিযুদ্ধের নাটকের মধ্যে সর্বোত্তম। কথা সামান্যই বইটি পড়লে বোঝা যায়, কতটা শব্দের গভীরে যেতে পারেন তিনি। মার্জিনে মন্তব্য গ্রন্থটিও একইভাবে পাঠককে টেনে নিয়ে যায় নদীর স্রোতের মতো। তার সঙ্গ আমার কাছে খুব উপভোগ্য ও শিক্ষনীয়। যতবারই তার কাছে গিয়েছি, নতুন কিছু শিখেছি। রসবোধেও তিনি তীক্ষ্ণ।’

সৈয়দ হকের নূরলদীনের সারা জীবন কাব্যনাট্যের নিদের্শক আলী যাকের বলেন, ‘তিনি যেন ১০০ বছর আয়ু পান এবং তার সঙ্গে থাকতে চাই। এই মঞ্চে পাঠ করতে পারি তার নাটক। তার তিনটি মঞ্চনাটকে অভিনয়ের সুযোগ হয়েছে আমার। তার চরিত্রগুলো এতটা শক্তিশালী যে, সহজাতভাবেই তা করোটির ভেতর ঢুকে যায়। আচ্ছন্ন করে শরীর ও মন। তখন আর অভিনেতা থাকি না, ঢুকে যাই চরিত্রের গহীনে।’

অভিনয়শিল্পী ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, ‘আমি আজ যে অবস্থানে আছি সেখানে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকটির কথা আসবেই। এখানে আমি মাতবরের মেয়ের ভূমিকা অভিনয় করেছি। এটাই আমার প্রথম কাব্যনাটকে অভিনয়। আপনি আরো দীর্ঘজীবী হোন এবং আমাকেও বাঁচিয়ে রাখুন নাটকের মাঝে।’
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘কতটুকু গেলে স্বর্গ মেলে, আর কতটুকু যেতে হবে? ইতিহাসের নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে আমার জীবন গেছে।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, কার্যকর হওয়া থেকে প্রতিটি ঘটনাবহুল অধ্যায়ের বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘জীবন নিয়ে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, জীবন সবার ওপরে। জীবনের স্বাদ হচ্ছে বেঁচে থাকা। অর্থপূর্ণ বেঁচে থাকা। লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন এমন সময়ের মধ্যে আছি যে, মূর্খতা হচ্ছে অহংকার, বেয়াদবি হচ্ছে শক্তি। মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান ও অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। শহীদ জননী জাহানার ইমামের নেতৃত্বে গোলাম আযমের বিচারের জন্য খালেদা জিয়া আমাদের ২৪ জনকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দিয়েছিলেন। আমাদের ধরতে পারলে ফাঁসিও দিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু এই শহরেই আমরা আত্মগোপন করে থেকেছি। এই পাকিস্তানিদের সঠিক জবাব দেয়ার সময় এসেছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে শনাক্ত সেই ১৯৫ জনকে অবিলম্বে বাংলার মাটিতে বিচার করতে হবে। এটা আমার জন্মদিনের আবেদন।’

নিজের সাহিত্যকৃতি সম্পর্কে সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘আমার সাহিত্যের সংসার, শিল্পের সংসার ৬৫ বছর হয়ে গেল। আমি যা কিছু করেছি, মানুষের কথা ভেবে করেছি, দেশের কথা ভেবে করেছি। আপনাদের জন্যই আমার যা কিছু কাজ। আমি সেই জীবনের অন্বেষণ করছি যেজন্য হাসতে হাসতে চলে যেতে পারব, যেদিন এদেশকে সুখ ও সমৃদ্ধির দেশ হিসেবে দেখে যেতে পারব।’

তরুণ লেখকদের উদ্দেশ্যে সৈয়দ হক বলেন, ‘বেশি বেশি চর্চা করো। নিজস্বতা তৈরি করো। সত্য অন্বেষণ করো। কারণ, সত্য তোমাকে আলো দেবে। খাদ্য দেবে। বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগাবে।’

কবির সহধর্মিণী আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, ‘এত ফুল দিয়েছে মানুষ, এতে আমি আপ্লুত। জীবন বড় সংকট, অনিশ্চয়তা, যুদ্ধের মধ্য দিয়ে কেটেছে। জেনারেলদের রক্তচক্ষুর মধ্য দিয়ে কেটেছে। সংকট যখন ছিল, তখন মনে হয়েছে জীবন বড় বাস্তব। যখন সুখের সময় এসেছে, তখন মনে হয়েছে এ যেন স্বপ্ন। তবে সৈয়দ হক যা কিছু লিখেছেন নিজের ধৈর্য, স্থৈর্য, নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে লিখেছেন। তিনি কথা ও শব্দের জাদুকর। সেখানে আমার সামান্যতম অবদান নেই।’

জন্মদিনে কবিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান, পথনাটক পরিষদ, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ, চারুনীড়ক, স্বপ্নদলসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »