চারুকলায় বর্ণিল জয়নুল মেলা

carukola-zainulmela_chitram

।চিত্রম প্রতিবেদক। পাহাড়ে কোমরতাঁতে কাপড় বোনার দৃশ্য বিরল না হলেও রাজধানীতে এ দৃশ্য মেলা ভার। কিন্তু চারুকলা প্রাঙ্গণে দেখা গেল এ অসাধারণ দৃশ্যটি। লিচুতলার এক কোণে বসে আদিবাসী এক নারী কোমরতাঁতে বুনছিলেন সুতোর মাফলার। লাল-নীল সুতোয় গেঁথে চলেছেন পরিধেয় এই বস্ত্রটি। খটাং খটাং আওয়াজ। ছন্দ খেলে যাচ্ছিল চারপাশ। প্রান্তিক এই নারীর ছন্দময় বুননকাজ খুব কাছ থেকে দেখছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ারা। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, যারা এসেছিলেন এ উৎসবে তারাও দেখছিলেন এই বুননকর্ম।

২৯ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে তিন দিনের জয়নুল মেলা ও উৎসব। সেখানেই দেখা মিলল দেশের ঐতিহ্যবাহী এই কোমরতাঁতের বুনন।

চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ শিল্পীর সংগ্রহ করা পুতুল প্রদর্শনীর পাশে দেয়ালে জয়নুল আবেদিনের এই লেখাটি কারো চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। সেখানে লেখা ‘আজ আমরা গ্রামীণ শিল্পীদের ভুলে যাচ্ছি। আমরা শিল্পীর জাত এই গৌরবময় পরিচয় হােিয়য়ে ফেলেছি। ভুলে যাচ্ছি নিজেদের ইতিহাসকে। অথচ বিদেশিরা লুটে নিয়ে গেছে আমাদের অতীতের স্মৃতি বারবার। আজও নিয়ে যাচ্ছে। নবাবগঞ্জের কাঁথার যে প্রতীকধর্মী নকশা ও মাছ-পাশি-হাতি, ফুল লতাপাতার সমাবেশ রয়েছে, ফ্রান্সের মিউজিয়ামে তা নিয়ে গবেষণা হয়। অথচ প্রকৃতির শিল্পী নিপুণ কারিগরদের আমরা বাঁচাতে পারছি না। এজন্য নগর ও গ্রামীণ সভ্যতার প্রাচীর ভেঙে দিতে হবে।’

মঙ্গলবার ছিল শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিনের ১০২তম জন্মজয়ন্তী। এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ঘটা করেই আয়োজন করেছে ‘জয়নুল মেলা ও উৎসব’। চারুকলার বকুলতলায় সকালে শীতের পরশ গায়ে মেখে উদ্বোধনী আয়োজনে অংশ নেন জয়নুল ভক্তানুরাগীরা। ঢাক-ঢোলের বাদ্যসহযোগে তিন দিনের  এই মেলা ও উৎসবের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

এ সময় ছিলেন জয়নুলের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন, সন্তান প্রকৌশলী মঈনুল আবেদিন ও শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী। উদ্বোধনী আয়োজনে ‘এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার’, ‘আজি শুভ দিনে পিতারও ভবনে’ ও ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে সত্য-সুন্দর’ গানগুলো পরিবেশন করেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ঢাবি উপাচার্য বলেন, ‘শিল্পচার্য আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিকে ভালবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি বাংলার মানুষের বৈচিত্র বিদেশে তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি লাভে যারা ভূমিকা রেখেছেন শিল্পচার্য তাদের অন্যতম।’

এবার জয়নুল সম্মাননা দেয়া হয়েছে শিল্পকলা ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল মতিন সরকার ও অধ্যাপক বুলবুল ওসমানকে। তাদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও অন্যান্য উপহারসামগ্রী তুলে দেন উদ্বোধক আরেফিন সিদ্দিক ও জয়নুল আবেদিনের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন। এ সময় চারুকলা অনুষদের ডিন চিত্রশিল্পী অধ্যাপক নিসার হোসেন উপস্থিত ছিলেন। সুশান্ত ঘোষকে দেয়া হয় বিশেষ সম্মাননা। জয়নুল আবেদিনের পরিবারের উদ্যোগে এই পুরস্কারটি তুলে দেন জয়নুল আবেদিনের সন্তান মঈনুল অবেদিন।

অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্বে চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের অধ্যাপক মামুন কায়সার সম্পাদিত ‘শিল্পাচার্য জয়নুল অবেদিন জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বার্ষিক শিল্পকলা প্রদর্শনীর-২০১৪’ গ্রন্থের  মোড়ক উন্মোচন করা হয়। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ জয়নুল আবেদিনের সংগৃহীত মাটির পুতুলের প্রদর্শনী। ৮ দিনের এ প্রদর্শনী চলবে জয়নুল গ্যালারিতে।

উৎসবে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ১৭টি স্টল অংশ নিয়েছে।  এগুলোর মধ্য রাজশাহীর পৃৃথক পৃথক দুইটি স্টলে রয়েছে টেপাপুতুল ও শখের হাড়ি। মৌলভীবাজার থেকে আসা দুটি স্টল সাজিয়েছে ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি দিয়ে। সোনারগাঁও থেকে আসা তিনটি স্টলে রয়েছে হাতপাখা, নকশিকাঁথা ও তামা-কাঁসায় নির্মিত নানা অলংকার। ঝিনাইদহ, মাগুরা, নওগাঁ, ঢাকা মহাখালী, নারিন্দা থেকে আগতরা তাদের নিজস্ব শিল্পকর্মের পসরা সাজিয়েছেন।

চারুকলার মূল ফটক থেকে শুরু নান্দনিক সব শিল্পদৃশ্য। বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে উৎসবের গেইট। চারুকলার বারান্দাজুড়ে লাল-নীল, সবুজ-হলুদের সমাহার। বর্ণিল কাগজ ও কাপড় কেটে শিক্ষার্থীরা বানিয়েছেন নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ড, দেয়ালিকা, দিনপঞ্জি, ডায়েরি। রঙিন কাগজগুলোর কোনোটাতে ফড়িং, কোনোটার প্রতিমা-আদল। অঙ্কন, ছাপচিত্র ও প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরাও সাজিয়েছেন এসব। ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছেন ছোট-বড় নানা আকৃতির ভাস্কর্য ও মুখোশ। মৃৎশিল্প বিভাগের শিক্ষার্থীরা কাদামাটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন লোক-ঐতিহ্য।

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় জয়নুল আবেদিনের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে জয়নুল আবেদিনের পরিবার, চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগ, জাতীয় জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমি, নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

জয়নুল উৎসব চলবে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ জয়নুল গ্যালারিতে মাটির পুতুল প্রদর্শনী চলবে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »