অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট ছিল সিআইএর অস্ত্র!

 

hot-stuff-pollok_chitram

শিল্পী জেকসন পোলক / হট স্টাফ / ১৯৬১

।নূসরাত জাহান। শিল্পও অস্ত্র হতে পারে, তবে সেটা নির্ভর করে শত্রু কে হবে তার ওপর। খোলা মনে বা বলতে গেলে আপনি যদি পাখির চোখে তাকান, তবে বুঝতে পারবেন শিল্পের শত্রু হলো অ-শিল্প। যা শিল্প নয়, সেটাই যন্ত্রণাদায়ক। সেটাকেই জয় করতে চায় শিল্প। যেমন যুদ্ধ, যেমন খরা- সংস্কৃতির খরা। আর এমন চিন্তা থেকেই শিল্পকে রীতিমতো উয়েপনাইজ তথা অস্ত্র-সমৃদ্ধ করে ফেলেছিল সিআইএ। সময়টা ছিল স্নায়ুযুদ্ধের!

আর্ট সার্কেলে ঘটনাটা অতটা অজানা ছিল না। কেউ বলতো গুজব, কেউ বা কৌতুক। কিন্তু এখন এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। জ্যাকসন পোলক, রবার্ট মাদারওয়েল, উইলেম ডি কুনিং ও মার্ক রথকোর মতো মারকুটে অ্যাবসট্রাক্ট শিল্পীদের ছবিকে এক ধরনের যুদ্ধাস্ত্র হিসেবেই ব্যবহার করেছে সিআইএ। প্রতিপক্ষ ছিল রাশিয়া।

ঘটনাকাল ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ ও পরের এক দশক। পোলকদের ছবি তখনকার আমেরিকানরা বুঝতো না। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান তো জ্যাকসনের একটা ছবি দেখে বলেই বসেছিলেন, এটা যদি শিল্প হয় তবে আমি একটা হটেনটট। পরে অবশ্য প্রেসিডেন্টকে হটেনটটে পরিণত করেছিল খোদ সিআইএ। পোলকদের মতো শিল্পীদের ছবিকে সংস্থাটি যতভাবে পেরেছে লাইমলাইটে আনার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোল আর গোয়েন্দাদের ত্রস্ত চলাফেলার মধ্যিখানে হঠাৎ অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট ঢুকলো কেন? সাবেক অফিসার ডোনাল্ড জ্যামিসন ঝেড়ে কাশতেই বেরিয়ে এলো থলের বেড়াল, ইঁদুর আর শজারুরা। একটু পেছন থেকেই শুরু করা যাক। ১৯৪৭, সবে যুদ্ধ শেষ। আমেরিকা আর রাশিয়ার মধ্যে টান টান উত্তেজনা। এই বুঝি বোমা ফাটলো। এমন সময় বিশ্বের কাছে নিজেদের ইতবাচক ভাবমূর্তি তৈরির একটা চরম ঝোঁকও ভর করলো দুই সরকারের মাথায়। আর এ কাজের জন্য তৎকালীন মার্কিন সরকারের পররাষ্ট্র দফতরের মাথায় সবার আগে শিল্পকর্মের চিন্তাটাই আসে। ওই সময় আবার শিল্পী বলতে পোলক, রথকোদেরকেই চেনে সবাই। সঙ্গে আছে বিভিন্ন এনিমেশন নির্মাতা ও পারফরমেন্স আর্টিস্ট। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টাকায় তড়িঘড়ি করে তাদের ছবি নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান তো শিল্পে অজ্ঞান। নিজেকে কল্পকাহিনীর হটেনটট ভাবতে রাজি হয়ে গেলেন তিনি। অগত্যা সেই প্রদর্শনী আর হলো না। শুরু হলো দেশজুড়ে ছি ছি। সেই ছি ছির চড়া মূল্যও দিতে হলো নিউইয়র্ককে। প্যারিসও সুযোগে অক্ষত রাখলো তার শিল্প-সমঝদারের মুকুটটা। আর তখন শেষ রক্ষা হিসেবে এগিয়ে এলো সিআইএ।

সিআইএর সঙ্গে শিল্পের যোগাযোগটা কানে বিচিত্র ঠেকলেও কাজের কাজটা এভাবেই হয়েছে। মার্কিন শিল্পীদের অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজমকে জাতে তুলে ধরে সিআইএ গোটা দুনিয়াকে দেখিয়ে দিল রাশিয়ায় শিল্পীদের কী করুণ দশা চলছে। বুঝিয়ে দিল, মুক্তমনা গণতন্ত্রের ছবি হবে এমন, আর সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদিদের ছবি হবে অনেক বেশি একঘেয়ে আর গৎবাঁধা।

তবে আসল ব্যাপারটা হলো, সিআইএ আড়ালে আবডালে যতই ছবি ও শিল্পীদের সঙ্গ দিক না কেন, সংস্থাটি কখনই চায়নি তাদের ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে যাক। কারণ তাতে শিল্পের কদর শেয়ার বাজারের মতোই পড়ে যেতে পারতো (যদিও এরা এখনও স্বনামেই খ্যাত)।

তবে সিআইএ শিল্পের মর্যাদা ঠিক কতটুকু দিতে পেরেছিল, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। কারণ ওই অবস্থায় মার্কিন অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টিস্টদের সামনে নিয়ে আসতে দেদার পয়সা উড়িয়েছে সংস্থাটি। কখনও পকেট ছিল, কখনও হাত ঢুকিয়েছে অন্যের পকেটে। তেমনি একটি জাঁদরেল পকেটের নাম নেলসন রকফেলার। তার মা ছিলেন নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ওই মিউজিয়ামের প্রেসিডেন্ট রকফেলার ছিলেন অ্যাবস্ট্রাক্টের অন্যতম পৃষ্ঠপোশক। কংগ্রেসের সঙ্গে শিল্প প্রদর্শনীর চুক্তিগুলো হতো তার সঙ্গেই। আরও অনেক সেতুর মাধ্যমে মিউজিয়ামটির সঙ্গে যুক্ত ছিল সিআইএ। সিআইএ’র একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম প্যালে ছিলেন এর বোর্ড সদস্য। বড় কর্মকর্তার পদে থাকা জন হে হুইটনি ছিলেন মিউজিয়ামটির চেয়ারম্যান এবং ১৯৪৯ সালে জাদুঘরটির নির্বাহী সচিবের পদে বসেন সিআইএর আন্তর্জাতিক ডিভিশনের প্রধান টম বারডেন।

অশীতিপর টম বারডেন এখন থাকেন ভার্জিনিয়ায়। তার ঘরটা এখনও অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টেই ভর্তি। ব্রিটেনের ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকাকে জানালেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম খুব দ্রুত লেখক, সঙ্গীতজ্ঞ ও শিল্পীদের একত্র করতে। যাতে আমরা পশ্চিমা বিশ্ব ও বাদবাকি দুনিয়াকে দেখাতে পারি যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনে আমরা কতটা এগিয়ে আছি। আমি মনে করি ওই সময় এ কাজটাই ছিল এজেন্সির জন্য সবচেয়ে বড় এবং স্নায়ু যুদ্ধে এ বিষয়টা অনেক বড় ভূমিকা রেখেছিল।’ আরও জানালেন, পুরো বিষয়টাকে মানুষ যেন সাধারণ শিল্প জাগরণ হিসেবেই দেখে এ জন্য সিআইএ নিজেদের ভূমিকাটাকে আগাগোড়া গোপন রেখেছিল। এতে করে যেকোনও শিল্পকর্ম, সিম্ফোনিকে দেশের বাইরে পাঠানো বা বিদেশে কোনও ম্যাগাজিন প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছিল বেশ সহজে।

 

গোপন মিশন

১৯৫৮ সালের কথা। প্যারিসে চলছি দ্য নিউ আমেরিকান পেইন্টিং শিরোনামের প্রদর্শনী। তাঁতে গ্যালারিও চেয়েছিল প্রদর্শনীটাকে তাদের ঘরে আনতে। কিন্তু খরচ সামলানোর টাকা ছিল না। এমন সময় আমেরিকার নামকরা মিলিয়নেয়ার জুলিয়াস ফ্লাইকমান এগিয়ে এলেন টাকার ঝুড়ি হাতে। গ্যালারিও সুযোগ পেলো পোলক, কুনিং ও মাদারওয়েলদের ছবি দেখানোর। জানা গেল ওই টানা ফ্লাইকমানের ছিল না। ছিল সিআইএ’র। পরে এই জুলিয়াসের নাম ভাঙিয়েই শিল্পজগতে মোটামুটি আরও অনেকগুলো গোপন মিশন চালায় সিআইএ।

সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »