বাচিক শিল্পী সুমন্ত্র সেন গুপ্তের মুখোমুখি

sumantra-sengupta_chitram

বাচিক শিল্পী সুমন্ত্র সেন গুপ্ত

সুমন্ত্র সেন গুপ্তের জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, কলকাতার বেলঘরিয়া জেলায়। এ যাবতকালে তাঁর ১০টি একক এ্যালবাম ও ২৫টি যৌথ এ্যালবাম বেরিয়েছে। পেশায় তিনি একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শঙ্খমালা’ নামের আবৃত্তি সংগঠন। নাটক ও সংগীতের সমন্বয়ে তিনি নিরিক্ষাধর্মী বাচিক শিল্পের উপর মৌলিক কাজ করেছেন দুই দশক ধরে। গত ২৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ও ভারতের শঙ্খমালার আয়োজনে দুদিনব্যাপী ‘ভাষায় ভালোবাসায় এপার ওপার বাচিক উৎসব’ শিরোনামে এই উৎসবে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশ ও ভারতের নন্দিত আবৃত্তিশিল্পীরা। এই সময়ে আলাপচারিতায় ওঠে এসেছে শঙ্খমালার পরিচালক বাচিকশিল্পী সুমন্ত্র গুপ্তের স্বপ্ন ও জীবনের নানা দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরিকা মাইশা

কবিতার প্রতি ভালোবাসা শুরু হয় কিভাবে?

কিভাবে যে ভালোবাসা তৈরি হয় তা কি কেউ কখনো বলতে পেরেছে? না কি বলা সম্ভব? খুব ছোটবেলা থেকেই মায়ের মুখে আবৃত্তি শুনতাম। না মা একেবারেই মঞ্চে আবৃত্তি করতেন না। রান্না করতে করতে কখনো বা উনুন ধরাতে ধরাতে বলে উঠতেন ‘আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করো পৃথিবী…’ অথবা ‘চিত্ত যেথা ভয় শুন্য উচ্চ যেথা শির…’ আর বাবার হাঁক শুনতাম অফিসের সময় হয়ে গেল রান্না শেষ হলো? মা আবৃত্তি থামিয়ে চিৎকার করে বলে উঠতেন প্রতিদিন তো ঠিক সময়ে খেয়েই অফিস যাও। এই সব কথপোকথন আমাকে কখন যে কবিতার প্রতি আকৃষ্ট করেছিল কে জানে! এও জানিনা সেটাই ভালোবাসার জন্ম হওয়ার আতুরঘর কিনা? যখন বয়স বেশ অল্প আমার ছোটমামা খুব আসত আমাদের বাড়ি টিনের চাল ওয়ালা বারান্দায় বসে একটার ওর একটা কবিতা বলে যেত। শুনতে খুব ভালো লাগত। অনেকক্ষণ রেশ থাকত। সেই সময় থেকেই কি ভালোবাসা কবিতার প্রতি? জানি না তাও। যৌবন বয়সে যখন রঞ্জনার প্রেমে পড়লাম সেও তো কবিতার হাত ধরে? তার মূলেও কি কবিতাকেই ভালোবাসা জানি না তাও। আসলে কখন কিভাবে শুরু হয়েছে জানি না। কি জানি জন্ম কবচ কিনা? বা হয়তো এখনো ভালোবাসতেই পারিনি কবিতাকে। ভালোবাসা অনেক বড়ো শব্দ। এখনো কি পেরেছি বাসতে?

কিভাবে বাচিকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়লেন?

আমার স্কুল জীবন থেকে। ২৫ বৈশাখ বা ১১ জৈষ্ঠ স্কুলের অনুষ্ঠান, স্যারেরা বলতেন সুমন্ত্র কবিতা বলবে ওর ‘গলাটা ভালো’। বলতাম। দেখলাম বলতে ভালো লাগছে। কিন্তু তখনও ভাবিনি যে এটা ছাড়া মিথ্যে বেঁচে থাকা। এরপর ছোটমামা আসলে বলতাম দেখিয়ে দাও একবার বলো আমি শুনব। কবিতা পড়তে শুরু করলাম। আমাদের পাঠ্য বইয়ের বাইরের কবিতা। বুঝতে পারলাম এবার তালিম নিতে হবে নিয়মিত। অভিনেতা অঞ্জন বিশ্বাস আবৃত্তি শিল্পী পার্থ মুখোপাধ্যায় শ্রুতি নাটক শিল্পী জগন্নাথ বসুর কাছে তালিম নিলাম। এভাবেই যুক্ত হয়ে পড়া।

তখন দর্শকের সাড়া কেমন ছিল?

যখন নিয়মিত চর্চা শুরু করি সেটা আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা। এত বিপুল সংখ্যায় ছেলে মেয়ে তখন আবৃত্তি করত না। তবে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায় শ্রোতা আসতেন। খুব নিবিষ্ট শ্রোতা। তাঁরা শম্ভু মিত্র শুনতেন আর শুনতেন কাজি সব্যসাচী। পরবর্তী সময়ে পার্থ ঘোষ, গৌরী ঘোষ, প্রদীপ ঘোষ ও নীলাদ্রি শেখর বসুর আবৃত্তি শুনতেন। এদের সম্পর্কে শ্রোতাদের শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম।

নাগরিক জীবনের সাথে বাচিকশিল্পের যোগাযোগ?

আমাদের পরিবার বাংলাদেশ থেকে চলে আসা পরিবার। অনেক কষ্টে ঠাকুরদা ঠাকুমা পরবর্তী সময়ে বাবা মা পরিবারকে অনেক কষ্টে দাঁড় করিয়েছেন। সেই সময় যে নাগরিক অবস্থান ছিল আর এখন যে অবস্থানের পরিবর্তন এই দুইয়ের মধ্যেই কবিতা আর তার আবৃত্তি নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিয়েছে। আসলে কোনো শিল্পই তো মানুষকে বাদ দিয়ে নয়। আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্য তাঁর নিজস্ব নাগরিকতার সাথে, এই শিল্পকে তাঁদের মতন করে জড়িয়ে নিয়েছেন। আমার নাগরিক জীবনের সাথে আবৃত্তির অবশ্যই যোগাযোগ ছিল। ওই যে বলেছি ছোটবেলা থেকেই যে পারিবারিক জীবন যা কিনা নাগরিক জীবনের ক্ষুদ্রতম ইউনিট আমাকে আবৃত্তির প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে সাহায্য করেছে।

প্রথম কখন আবৃত্তি করেন?

প্রশ্নটা বুঝলাম না যদি মায়ের কোলে চড়ে ছড়া বলা আবৃত্তি হয় তাহলে কথা যখন ফুটেছে তখন থেকেই। আর ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে নিয়ে তাহলে বলব বিদ্যালয় জীবন থেকে। আর পেশা হিসাবে তাহলে প্রায় ২৮ বছর হলো।

স্মরণীয় মুহূর্ত?

প্রতিটি অনুষ্ঠান। তবে যে বছর প্রথমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গেলাম। ২০০৬ সালে। তিনদিক খোলা মঞ্চে প্রায় সাত হাজার মানুষ। আর যে বছর বাংলাদেশে এসেছিলাম প্রথমবার ২০০৮ সালে বিজয় উৎসবে। মঞ্চের পেছনে শেখ মুজিবর রহমানের ছবি, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করার থেকে স্মরণীয় মুহূর্ত আর কি হতে পারে?

আপনার অর্জন?

মানুষের ভালোবাসা। মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা। মানুষের আশ্রয়। মানুষের ঈর্ষা। আর আবৃত্তি করতাম বলেই স্ত্রী হিসেবে রঞ্জনাকে পাওয়া। আর পুরস্কার যা পেয়েছি এগুলোর কাছে সে নগন্য। আর আমাদের দল ‘শঙ্খমালা’ তাঁকে ঘিরে বহু মানুষ মিলে একটি পরিবার।

ভবিষ্যতে কি করতে চান?

আরও ভালো আবৃত্তি করতে চাই। আর শঙ্খমালা নিয়ে আরও ভালো ভালো প্রযোজনা করতে চাই।

পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা?

পরবর্তী যেকোনো প্রজন্ম যেন আগের প্রজন্ম থেকে ভালো আবৃত্তি করে।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ বাংলাদেশে এসে বাচিকশিল্পকে নিরিক্ষাধর্মী ও সৃজনশীলভাবে পরিবেশন করার জন্য।

তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

৮ম কাহাল আন্তর্জাতিক আর্ট ফেয়ারে নিবন্ধন করতে ক্লিক করুন http://kahalbd.com/8th-kahal-international-art-fair-2016/ এই লিংকে     Read More »