ঊনবিংশতিতম জাতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলন

উচ্চাঙ্গ সংগীতের সুরমূর্ছনা

lipu-das_chitram।আরিকা মাইশা। মাঘ মাসের শুরুতে জেঁকে বসেছে শীত। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া আর রাত বাড়ার সাথে সাথে নেমে আসে প্রচন্ড শীতের আমেজ। এরমধ্যেও দর্শকে গমগম করছে নগরের জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তন। ১৪ জানুয়ারি রাত বারোটা ছুঁই ছুঁই তবুও মিলনায়তনে দর্শকের কোন কমতি নেই। এসময়ে দর্শকশ্রোতাদের তবলার তিতালের ছন্দে মাতিয়ে রাখেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সুভেন্দু দাশ ও শ্রুতি পাঠক দাশ। তাঁদের পরিবেশনার পরেও রাতব্যাপী ধ্রুপদ সংগীত, বেহালা ও সেতারে সুরের মুর্ছূনা ছড়ায় শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তন। সদারঙ্গ উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিষদের আয়োজনে জাতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলনের মাঝ রাতের দৃশ্য এটি। এই দৃশ্য দেখে বুঝাই গেল শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে সাধারণ দর্শকদের। বেড়েছে সংগীতের এই শুদ্ধ ধারার প্রতি ভালোবাসাও।

১৩ জানুয়ারি সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মরণে দুই দিনব্যাপী ঊনবিংশতিতম জাতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলনের আয়োজন করে সদারঙ্গ উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিষদ। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের লিটু। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি, অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল জলিল মন্ডল। সভাপতিত্ব করেন সদারঙ্গের সভাপতি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। সম্মেলনের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সদারঙ্গের সাধারণ সম্পাদক স্বর্ণময় চক্রবর্তী।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কথামালার পরই প্রথম দিন রাগ বসন্ত দিয়েই উচ্চাঙ্গ সংগীত শুরু করেন সদারঙ্গের শিক্ষার্থীবৃন্দ। এরপরই লিপু দাশ পরিবেশন করেন রাগ ভূপালির খেয়াল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছেন রাজরূপা চৌধূরী তিনি পরিবেশন করেন সরোদ, তাঁর সরোদের সুরে দর্শকদের মোহিত করেন। এরপরেই বাংলাদেশের মালবিকা দাশ পরিবেশন করে খেয়াল। খেয়াল পরিবেশনের পরে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের তিনভাই সবুজ আহমেদ, কামরুল আহমেদ ও শান্ত আহমেদ তবলা, বাঁশি এবং বেহেলার মিশ্রণে করেন সুর সংগীত। শুদ্ধ সংগীতের মাদকতায় দর্শকদের ভাসালেন সুরের বন্যায়। এভাবে শেষ হয় প্রথমদিনের আয়োজন।

দ্বিতীয় দিনের শুরুতে হয় আলোচনাসভা। বিকেল চারটায় ‘শিল্প ও নৈতিকতা’ শিরোনামে আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক তপনজ্যোতি বড়ুয়া। এতে আলোচনা করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের অধ্যাপক ড. অসিত রায়, সঙ্গীতগুরু সঞ্জীব দে এবং কলকাতা থেকে আসা ওস্তাদ ইন্দ্রদীপ ঘোষ। আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন স্বর্ণময় চক্রবর্তী।

এরপর রাত সাড়ে দশটায় সদারঙ্গের শিক্ষার্থীবৃন্দ সমবেত কন্ঠে গাইলেন কেদার রাগ। সমবেত কন্ঠে উচ্চাঙ্গ সংগীত শেষ হওয়ার পরই মঞ্চে এলেন পনেরো বছর বয়সী শিল্পী মৌমিতা হক সেঁজুতি। যিনি এই সম্মেলনে​র সবচেয়ে কণিষ্ঠতম শিল্পী। তিনি শুনালেন ইমন রাগের খেয়াল। কেড়ে নেন দর্শকশ্রোতার হৃদয়। এবার সবার আগ্রহ এরপরে কে আসবেন মঞ্চে। মঞ্চে এলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা দম্পতি সুভেন্দু দাশ ও শ্রুতি পাঠক দাশ। তঁরা প্রায় এক ঘন্টা বাজালেন তবলা। তাঁদের বাদন মুগ্ধ হয়ে শুনলেন চট্টগ্রামের দর্শকেরা। এরপর মঞ্চে আসেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী শুচিশ্রী রায়। তিনি পরিবেশন করেন খেয়াল। শুচিশ্রী রায়ের পরিবেশনার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের অধ্যাপক ড. অসিত রায় পরিবেশন করলেন ধ্রুপদ সংগীত। মাঝ রাতে সেতার নিয়ে মঞ্চে আসেন সত্যজিৎ​ চক্রবর্তী। তাঁর সেতার সুরে ছড়িয়ে দিলেন মিলনায়তন ভর্তি শ্রোতাদের। এরপর খেয়াল পরিবেশন করে বাংলাদেশের পিয়াংকা গোপ, বেহালায় আহের–লেহেরী পরিবেশন করে ভারতের ইন্দ্রদীপ ঘোষ। সবশেষে ভারতের প্রদীপ ব্যানার্জী সকাল সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত খেয়াল পরিবেশন করেন। এই রাগের সবটুকু আলাপ মনকে শান্ত করে দেয়। আর চট্টগ্রামের নিশাচর শ্রোতাদের নিয়ে শেষ হলো দুই দিনব্যাপী উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলন।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »