প্রকৃতির উপাদানে গড়া ভাস্কর্য

ctg-sculpture2_chitram

।মুজিবুল হক। চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিল্পী রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারিতে ঢুকতেই কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়াতে হলো। সেখানে কাঠ দিয়ে পুড়িয়ে দ্বিমাত্রিক অবয়বে তৈরি করা হয়েছে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ নানা বয়সের মানুষের দেহাবয়ব। আগুনে পোড়া মানুষের এই প্রতীকী উপস্থাপন রাজনীতির নামে পেট্রলবোমা হামলার ভয়াবহ স্মৃতি উসকে দেয়। শিল্পী মাহাবুবর রহমান চৌধুরীর এই স্থাপনা শিল্পের নামও তাই ‘এটাই রাজনীতি’।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটে ২৪ জানুয়ারি শুরু হওয়া চার দিনব্যাপী ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল মাহবুবের এই শিল্পকর্ম। ‘প্রকৃতিই ভাস্কর্যের উপাদান’ শিরোনামের এই আন্তর্জাতিক ভাস্কর্য প্রদর্শনী একযোগে অনুষ্ঠিত হয় ১৮টি দেশের ৫৬টি ভেন্যুতে। জার্মানভিত্তিক স্কাল্পচার নেটওয়ার্ক গ্রুপ এই প্রদর্শনীর মূল উদ্যোক্তা। বিশ্বের বাকি ১৭টি দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে একই সময়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রামেও আয়োজন করা হলো এই প্রদর্শনীর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীসহ ২৫ জন শিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে সাজানো হয়েছিল প্রদর্শনীটি।
কেবল রাজনীতি নয়, প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া শিল্পীরা নানা বিষয় নিয়েই ভেবেছেন। কাজের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে প্রকৃতি ও পরিবেশ, লোকজ উৎসব, নাগরিক জীবন, চারপাশের মানুষ ও সমকালীন পৃথিবী। ভাস্কর্য ও স্থাপনাকর্ম নির্মাণ করতে গিয়ে অধিকাংশ শিল্পীই ব্যবহার করেছেন মাটি, বাঁশ, কাগজ, কাপড় ও কাঠের মতো জৈব উপাদান। তাই ‘প্রকৃতিই ভাস্কর্যের উপাদান’ এই শিরোনামের যথার্থতাও অনুধাবন করতে পেরেছে দর্শক।
মানুষের মুখ যেন ধানের গোলা। ইঁদুর এসে ধান খুঁটে খাচ্ছে সেই গোলা থেকে। গ্লেস সিরামিক মাধ্যমে ‘ইঁদুররা তাদের কাজ করছে’ শিরোনামে এই ভাস্কর্যটি উপস্থাপন করেছেন প্রদর্শনীর কিউরেটর ও ভাস্কর অলক রায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট ও সমকালীন পৃথিবীতে মুক্তচিন্তার ওপর আক্রমণের কথা মনে পড়ে যায় তাঁর এই শিল্পকর্ম দেখে।
‘পৃথিবীর ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে ভাস্কর্যে পৃথিবীকে মাতৃগর্ভের সঙ্গে তুলনা করেছেন শিল্পী মো. পারভেজ আলম। সেই গর্ভ যদি বিপন্ন হয়, তবে অনাগত শিশুদের আবাসভূমি কেমন হবে, তেমন ভাবনাই সঞ্চারিত হয় দর্শকদের মনে।
পাঁচটি চতুষ্কোণ ফ্রেম। ফাঁপা আর শূন্য। যেন ফ্রেমের ভেতরের মানুষটি কোনো জাদুবলে অদৃশ্য হয়েছে। কোথায় গেল তারা? ফ্রেমের ওপরেই দেখা মিলল তাদের। ঝুলন্ত দেহের দুই হাত আর পা প্রাণহীন, স্মৃতিহীন। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া হত্যা ও গুমের কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই মনে পড়ে যায়। ‘শিরোনামহীন’ শিরোনামের এই স্থাপনা শিল্পটির নির্মাতা চারুকলার ছয়জন নবীন শিক্ষার্থী। তাঁরা হলেন আফসানা ফেরদৌস, অভিমন্যু দাশ, ইমরান মাহামুদ, কনজ তরফদার, নাজমুল হোসেন ও সুকেশী চাকমা।
গ্যালারির দ্বিতীয় কক্ষের একটু ভেতরে আয়তাকার দুটি দেয়ালজুড়ে অসংখ্য নারকেল। নারকেলের খোসা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চোখের আকৃতি। সারি সারি চোখ যেন দেয়ালজুড়ে অদ্ভুত এক ছন্দও তৈরি করে। ‘চোখ’ শিরোনামে নান্দনিক এই স্থাপনাকর্ম করেছেন শিল্পী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ। ভালো লেগেছে ‘যুগল’ শিরোনামের ভাস্কর্যটি। এটি রচনা করেছেন বাবলু দাশ, নেনসন চাকমা, আনোয়ারুল হক, রাজীব সেনগুপ্ত ও শাপলা বড়ুয়া।
প্রদর্শনীতে প্রণব মিত্র চৌধুরীর ‘অনুপ্রবেশকারী’, সামিনা এম. করিমের ‘শৈবাল’, মো. আতিকুল ইসলামের ‘কাদামাটির উৎসব’, অনিকেত ভট্টাচার্যের ‘নির্মাণাধীন’, মুজাহিদ মুসার ‘বিষণ্ন শহুরে জঙ্গল’, অবিনাশ চাকমার ‘অনুসন্ধান’ ও অলক কুমার সরকারের ‘ভ্রূণ’ শিরোনামের ভাস্কর্য নজর কেড়েছে দর্শকের।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »