ক্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল আর্ট ক্যাম্প ২০১৫

লালনের দেশে শিল্পের পাগলামি

 শিল্পী দেলোয়ার হোসেনের পড়া ভাস্কর্য

শিল্পী দেলোয়ার হোসেনের পড়া ভাস্কর্য

ঘটনাটি ২০০৭ সালের, শিল্পী ও গবেষক শাওন আকন্দ কুস্টিয়ায় গিয়েছিলেন চারুকলা চর্চার খোজখবর করতে। তিনি নিজেও ঐ এলাকার লোক। এই কাজ যখন শেষ পর্যায়ে তখন তার সাথে পরিচয় হয় ৭০ এর দশকের শিল্পী দেলোয়ার হোসেনের সাথে। যিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে শিল্পচর্চা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। একসময় ঢাকাতেও সুপরিচিত ছিলেন স্বশিক্ষিত এ ভাস্কর। তাকে নিয়েই পরিকল্পনা করা হয় শিল্পচর্চার কিছু একটা করার- যা পাগলামির নামান্তর। অনেকটা বাউলদের সাধুসঙ্গের আদলে। যেখানে বাউলরা একসাথে ১০/১২ দিন থাকেন গান করেন; আবার চলে যান। এরকম একটা সঙ্গ শিল্পীদের নিয়ে করলে কেমন হয়? এই ছিল ভাবনা। সেই থেকেই যাত্রা শুরু ক্র্যাক আর্ট ক্যাম্পের। এ ক্যাম্পে সবাই অংশ নিতে পারবে- চলচিচ্চত্রকার, শিল্পী, কবি, দার্শনিক, লেখক সকলেই। যে শিল্পচর্চা কর্পোরেট ছোঁয়া থেকে দূরে থাকবে। গেল নয় বছরে এ বিষয়টি এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে, স্থানীয় মানুষরা যাকে বলে মেলা। এ মেলা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। এমনও বিষয় আছে যে গ্রামের মেয়েরা স্বামীর বাড়ী থেকে বাবার বাড়ী নাইওর আসে এ মেলা দেখতে। আলাপ প্রসঙ্গে এসব জানালেন শাওন আকন্দ।

স্থানীয় মানুষদের কাছে জায়গাটির নাম স্মরণ মৎস বীজ খামার। মহাসড়কের পাশে নিচু জলাজমি, দু চারটে ঘর আর ফলের গাছ। কিন্তু এসব পেরিয়ে ইটের রাস্তা ধরে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে নভেরার ভাস্কর্যের আদলে করা ভাস্কর্য। কিছুক্ষণ খামারের আঙিনা আর পুকুরের পাশে হাটলে চোখে পড়বে নানান আকৃতি ও অবয়বের বেশ কিছু ভাস্কর্য। এসব ভাস্কর্যের অধিকাংশেরই নির্মাতা অথবা উদ্যোক্তা শিল্পী দেলোয়ার হোসেন, বর্তমানে যিনি ক্র্যাক আর্ট ক্যম্পের অন্যতম ট্রাস্টি।

প্রতিবছর ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসম্বের পর্যন্ত এই খামারেই হচ্ছে ক্র্যাকের আর্ট ক্যাম্প। অংশ নিচ্ছেন দেশি বিদেশি শিল্পীরা।

ক্র্যাকের কোন আলাদা সাংগঠনিক অর্থ নেই। ক্র্যাক আর্ট ক্যাম্পের আয়োজক নাহিদ অর্কিড বললেন, ‘এর কোন আলাদা আলাদা শাব্দিক অর্থ নেই। যে অর্থ অভিধানে পাওয়া যায় অথবা আপনারা যা ধরে নেন তাই ক্র্যাক। ’ ক্র্যাক অর্থ উন্মাদ, পাগল কিংবা পাগলাটে চিন্তাধারী মানুষ। আর শিল্পচর্চার জন্য যতটুকু পরিমাণ পাগলামি করা দরকার তা কর এখানেই।

এবার শিল্পীদের জন্য কাজের বিষয় নির্ধারিত ছিল দেহতরী। বাংলার বাউল দর্শনে ‘তরী’ শব্দটি নশ্বর মানবদেহের প্রতীক । বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপাল, ভারত ও তাইওয়ান থেকে অংশগ্রহনকারীরা এই আর্ট ক্যাম্পে কাজ করেন।

উদ্বোধনী দিনে বিকেলের মধ্যেই আসতে শুরু করে বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা। স্থানটি নিয়ে কারো ছিল উদ্বেগ, আবার কারো বা ছিল আশার চাইতে বেশী কিছু। পাশেই বিশাল পুকুর, সাথে নৌকা বাঁধা। এই পুরো এলাকাই ছিল শিল্পীদের কাজের অধিক্ষেত্র।

প্রথমদিন ‘দেহতরী’ নিয়ে শিল্পীদের নিজস্ব মতামত জানতে চাওয়া হয়। নিজের দেহ নিয়ে একজন শিল্পীর উপলব্ধি কী তা নিয়ে চলে মত বিনিময়।

আর্ট ক্যাম্পের প্রচলিত ধরন থেকে কুষ্টিয়ার এই আর্ট ক্যাম্পটির প্রকৃতি ভিন্ন। জীবনযাপন প্রক্রিয়ার সঙ্গে শিল্পের সমন্বয় সাধন করার প্রচেষ্টাই ক্যাম্পের মূল কথা। সংগে ছিল পরিবেশবান্ধব উপকরণ নিয়ে কাজ করার একটা নির্দেশনা।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের উপস্থাপনা। সেখানে চলে নানারকম আলোচনা সমালোচনা। চলে মতবিনিময়।পারস্পরিক আলোচনা শিল্প-ধারনা বিকাশে সহায়ক বলে মনে করেন ক্যাম্পের কিউরেটর শিল্পী তপতী চৌধুরী।

ক্যাম্পে উপরি পাওনা ছিল নেপালের শিল্পীদের বাদ্যযন্ত্রের সাথে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা। কুষ্টিয়া যেহেতু লালনের পীঠস্থান, অবধারিতভাবেই বাউল গান ছিল নিত্য অনুসঙ্গ।

দ্বিতীয় দিন থেকে শিল্পীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন নিজেদের কাজ নিয়ে। প্রায় ২ একর এলাকা জুড়ে ছিল ফসলী জমি, মাঠ, পুকুর, নৌকা, নানারকম ফলের গাছ, আধাপাকা ঘর ও উঠান।

কোথায় কী কাজ হবে এ নিয়ে চলে আলোচনা। আবার কেউ কেউ নিজের কাজে অন্য অনেকের সহযোগিতাও নিচ্ছিলেন।

ইতিহাস নির্মাণ প্রক্রিয়ায় গুজবের ভূমিকা নিয়ে রহিমপুর ঢিবি: একটি গুজব শিরোনামে ইনস্টলেশন করেন শিল্পী রাজর্ষী দাশগুপ্ত, শ্রীময় রায় চৌধুরী, তপতী চৌধুরী ও ক্র্যাক পরিবারের সদস্যবৃন্দ। স্থান-কালের সম্পৃক্ততা, দর্শকের বিশ্বাস-কাঠামো, দৃষ্টিভঙ্গি ও লোকগল্প সৃষ্টির স্বতঃস্ফুর্ত ধারাকে এখানে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেখানে শেষাংশে গিয়ে দেখা যায় ফকির মজনু শাহ ও ভবানী পাঠক এই এলাকার একটি মানচিত্র নিয়ে যুদ্ধের পরিকল্পনা আঁটছেন। আর এভাবে লোক-বিশ্বাসকে লোকনায়কের সাথে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করা হয়েছে।

নেপালের লুনা পোয়েটস পুরো এলাকাজুড়ে যতো গাছ ছিল সবগুলো গাছেই এঁকে দিলেন সাদা বৃত্ত। তারপর নিজের শরীরেও আঁকলেন সাদা রঙের বৃত্ত। ঠান্ডা আবহাওয়ায় ঐ বৃত্ত বারবার বোঝাচ্ছিল আমাকে দেখ। একধরণের উৎসুক দৃস্টি দিয়ে শুরু হয়ে গেল ক্যাম্পের তৃতীয় দিন।

ভারতের শিল্পী রেনু বারিওয়াল শীতে ফাটল ধরা কৃষি জমিতে কাজ করেন ফিলিং দ্য গ্যাপ শিরোণামে। নিজের পরিবারের মানুষ হারানোর ক্ষত এই ফাটলধরা মাটিতে নানা উপকরণ দিয়ে পুরণ করার চেষ্টা ছিল রেনুর কাজে। খড়, মাটি, কচু, ফলের বীজ ছিল ক্ষত ঢাকার উপকরণে।

বাংলাদেশের শিল্পী রায়হান রাফি দেহতরিকা নামে খড়ের ঝুলন্ত দোলনা বানিয়েছেন। জলাশয়ের পাশে এই স্থাপনা শিল্পকর্মে দোল খেয়েছেন আগত দর্শকরাও।

বাংলাদেশের ফারাহ্ নাজ মুন রঙিন সুতো দিয়ে একটা পথ বুনেছেন তার সিনোপসিস অব মিস্ট্রি শীর্ষক ইনস্টলেশন আর্টে। মানুষে মানুষে যোগাযোগের প্রতীক এই পথের মধ্য দিয়ে জীবন যাপনের যাত্রা ও গতিপথে পারষ্পরিক আন্তঃসম্পর্কের উন্মোচনের চেষ্টা ছিল মুনের কাজে। এছাড়াও রিভার্স শিরোনামে ফারাহ নাজ মুনের একটি ভিডিও ইন্সটলেশন ছিল।

জগৎকে অনুধাবন করার আপেক্ষিকতার প্রেক্ষাপটে দেহের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন বাংলাদেশের শিল্পী মেহেদী মাসুদ তার দেহতরী শীর্ষক ইনস্টলেশন আর্টে। শ্রীলংকার ইরান্দি চান্দিমা দেহতরীর উপস্থিতিকে দৃশ্যমান করেছেন পানিতে স্থির কাগজের নৌকায়।

আলোক বৃক্ষ ইনস্টলেশন আর্টে ভারতের সুমন মজুমদার পথিকের পথ খুঁজে ফেরা ও বাতিঘরের গল্পটি উপস্থাপন করেছেন।

দাহ্য অবশেষ দিয়ে চক্রাকারে ঘুর্নায়মান জীবনের প্রতিচ্ছবি রচনা করেছিলেন বাংলাদেশের শিল্পী শক্তি নোমান। শ্রীময় রায়চৌধুরী (ভারত) ও অনন্ত দাশের (বাংলাদেশ) যৌথ ইনস্টলেশন আর্ট দোদুল্যমান জীবন নিয়ে দর্শকদের ভাবিয়েছে। ভেসে চলা জীবন ইনস্টলেশন আর্টে তপতী চৌধুরী ভেলায় ভাসমান জীবনের মোটিফ নিয়ে কাজ করেছেন।

পারফরমেন্স আর্ট করেন ছয় শিল্পী। ভেসে যাওয়া শব্দগুচ্ছ শিরোণামে ভারতের শিল্পী জ্যোতির্ময় সাহার সাথে সহযোগী ছিলেন মুনতাসিব রহমান আনান। শব্দ, কান্না, কিছু না বলতে পারা কথা বলার চেষ্টা ছিল এই কাজে।

নেপালের শিল্পী অনিল সুব্বা ও রিতেশ মহার্জন যৌথভাবে নৌকায় দেহ ও অবমুক্তি শীর্ষক দু’টি পারফর্মেন্স আর্ট করেন।

তাহমিনা হাফিজ লিসার ইনস্টলেশন ও পারফর্মেন্স আর্টে মৃত্যু ও জীবনের মাঝে টানাপোড়েনের গল্প উন্মোচিত হয়।

চিরন্তন মূখার্জী রেহাই পাক শিরোণা মে পারফরমেন্স করেন তিনদিনব্যাপী। ছকে বাঁধা জীবনের আত্ম-জিজ্ঞাসা নিয়ে নিজেকে খুঁজে দেখ শীর্ষক একটি ইনস্টলেশন ও পারফর্মেন্স আর্ট করেন শিল্পী রোকসানা আমিন । ভারতের শিল্পী সুরেশ নায়ারের ল্যান্ড আর্ট প্রকৃতির সাথে কথোপকথন-এ বৃহৎ পরিসরে দেহ তৈরী করেন। সেই দেহের ভেতর বুনে দেন ধানের চারা। এছাড়াও সুরেশ নায়ার বাউলদের গানের সাথে কিছু ড্রইং করেন।

পুরো আয়োজন দর্শকদের বলতে শোনা গেল, কুষ্টিয়ায় বছরে দুইটা মেলা বসে- একটা লালনের আর আরেকটা শিল্পীদের।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »