শিল্পের মহাযজ্ঞ ঢাকা আর্ট সামিট

(বাম থেকে) ঢাকা আর্ট সামিটের চেয়ারম্যান ফারুক সোবহান, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও সামদানি আর্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি নাদিয়া সামদানি

মঞ্চে উপবিষ্ট (বাম থেকে) ঢাকা আর্ট সামিটের চেয়ারম্যান ফারুক সোবহান, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও সামদানি আর্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি নাদিয়া সামদানি। ছবিটি জনাব রাজীব সামদানীর ফেসবুক থেকে নেওয়া

।চিত্রম প্রতিবেদক। প্রকৃতি বিলীন হয়ে যাচ্ছে।কিন্তু কেউই সচেতন হচ্ছে না। মানুষকে সে কথাই বলছেন মিয়ানমারের শিল্পী তুন উইন আডং ও ওয়াহ নু। তার বলবার ভাষা সবাইকে চমকে দেবে সন্দেহ নেই। মনে করিয়ে দেবে বনাঞ্চলের স্মৃতি। ভাবিয়ে তুলবে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার শঙ্কা। ছয়টি দৃশ্যপট ও সাতটি ভিডিওর মাধ্যমে মিয়ানমারের এই শিল্পী ফুটিয়ে তুলেছেন তার শিল্পকর্ম। এমনই অসাধারণ সব কাজ নিয়ে রাজধানীতে চলছে ঢাকা আর্ট সামিট।

বাংলাদেশের শিল্পী সুমন আহমেদ গুয়ানতামো বে কারাগারে আটক একজন বাংলাদেশিকে নিয়ে কাজ করেছেন। মুবারক হুসাইন বিন আবুল হাশেম নামের সেই ব্যক্তিকে নিয়ে ভিডিও চিত্র সাউন্ড অ্যাফেক্ট দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন কারাগারের নির্যাতনের ভয়াবহতা। শিল্পী তিনি বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন তার ভাবনায় থাকে মানুষ, প্রকৃতি ও জীবন। এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে তাদের সকল ভাবনা যেন প্রতিফলিত হয় ক্যানভাসে, বিভিন্ন মাধ্যমের কাজে।

দক্ষিণ এশীয় চিত্রকলার অন্যতম বড় আয়োজন ঢাকা আর্ট সামিট এমনি নানামাত্রার কাজ দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। গত দু’বারের আয়োজনে এশীয় চিত্রকলার বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীর শিল্পকর্ম দেখার যেমন সুযোগ হয়েছে তেমনি শিল্পীর সঙ্গে শিল্পবোদ্ধা কিংবা শিল্প-রসিকের সঙ্গে শিল্পীর সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

শুক্রবার পর্দা ওঠে ঢাকা আর্ট সামিটের তৃতীয় সংস্করণের। চারদিনের এ সামিটে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৬০০ আর্টিস্ট, কিউরেটর, লেখক, আর্ট প্রফেশনাল ও কালেক্টর। এর মধ্যে শতাধিক বাংলাদেশি শিল্পী রয়েছেন।

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা জুড়ে বসেছে শিল্পকলার বৃহত্তম আসরটি। জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যদিয়ে প্রধান অতিথি হিসাবে আর্ট সামিটের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বিশেষ অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এর আগে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সামদানি আর্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি নাদিয়া সামদানি। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সামিটের চেয়ারম্যান ফারুক সোবহান। সভাপতিত্ব করেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চেতনায় উন্নয়ন একান্ত প্রয়োজন। একইসাথে দেশের সাংস্কৃতিক ধারাকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বে বিস্তৃত করাটাও জরুরি। এই সামিট বিশ্বের সঙ্গে সেই যোগাযোগ করে তুলছে সন্দেহ নেই। এই আয়োজন এশীয় চারুকলার মধ্যে সবচেয়ে বড় হওয়ায় তা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি’।

রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘দেশের চিত্রকলার ইতিহাস বহু পুরনো। শিল্পমনা জাতি হিসেবে বাংলাদেশের সুনাম রয়েছে। ঢাকা আর্ট সামিট শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন। এই সামিটকে নিয়ে আমরা গর্ব বোধ করতে পারি’।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘রাজনৈতিভাবে সব সময় অশুভ শক্তি মোকাবেলা করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ধারা এই অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করতে পারে। সে কারণেই এ ধরনের আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া জরুরি’।

ফারুক সোবহান বলেন, ‘দেশের শিল্পবোদ্ধাদের কাছে শিল্পকলার এই সামিট বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। দেশের মানুষের কাছে যেমন আগ্রহ বেড়েছে, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। গত দুই বারের তুলনায় এবারের আয়োজন আরও বর্ণাঢ্য ও তাত্পর্যপূর্ণ।’

নাদিয়া সামদানি জানান, ‘দুই বছর ধরে এ সামিট আয়োজন করা হয়েছে। ওই দুই বছরের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ঢাকা আর্ট সামিটের তৃতীয় সংস্করণের আয়োজন করা হয়েছে। তবে সময়ের দাবি পূরণে বেশ কিছু নতুনত্ব আছে এবারকার সামিটে। নতুন মাত্রা পাওয়া সেসব আয়োজন শিল্পবোদ্ধাদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষিত হবে।

এশীয় চিত্রকলার বেশ কয়েকজন নামি-দামি শিল্পী ও গ্যালারি কিউরেটরের পাশাপাশি বাংলাদেশের ১৩ জন শিল্পীর কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে। শিল্পীরা হলেন– অসিত মিত্র, অতিশ সাহা, ফারজানা আহমেদ ঊর্মি, গাজী নাফিস আহমেদ, পলাশ ভট্টাচার্য, রফিকুল শুভ, রাসেল চৌধুরী, রূপম রায়, সালমা আবেদীন পৃথ্বী, শামসুল আলম হেলাল, শিমুল সাহা, সুমন আহমেদ ও জিহান করিম। তাদের মধ্য থেকে একজনকে সামদানি আর্ট অ্যাওয়ার্ড তুলে দেয়া হবে। এবারের সামদানি এওয়ার্ড পেতে যাচ্ছেন শিল্পী রাসেল চৌধুরী। বাংলাদেশি স্থপতিদের বিশ্বের দরবারে পরিচিত করতে তাদের নিয়ে একটি প্রদর্শনী থাকছে সামিটের আলাদা একটি কর্নারে। যেখানে বাংলাদেশের ১৭ স্থপতির করা বিভিন্ন ডিজাইন প্রদর্শন করা হচ্ছে।

বেঙ্গল গ্যালারি, গ্যালারি কসমস, গ্যালারি কায়া, গ্যালারি চিত্রকসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য গ্যালারি অংশ নিচ্ছে এই আয়োজনে। একাডেমির ৬ নং গ্যালারি সাজানো হয়েছে এ সব গ্যালারির বাছাই করা বাংলাদেশি শিল্পীদের শিল্পকর্ম দিয়ে। ২ নং গ্যালারিটি সাজানো হয়েছে সামদানি আর্ট অ্যাওয়ার্ড শিল্পীদের জন্য। বাংলাদেশের উদীয়মান শিল্পীদের চিত্রকলা জগতে নানা কাজ প্রদর্শন করা।

এবারের সামিটে ‘রিওয়াইন্ড’ বিভাগে ১৯৮০ সালের আগের দক্ষিণ এশীয় শিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হবে। আরেকটি বিভাগে (ক্রিটিক্যাল রাইটিং) প্রায় ২৫ জন শিল্পবিষয়ক লেখক দক্ষিণ এশীয় শিল্পবিষয়ক পরীক্ষামূলক লেখা নিয়ে গবেষণা করবেন।

সামিটের আরেকটি আকর্ষণ হলো, স্পিকার প্যানেলে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ১৫টি দেশের মোট ৫০ জন স্পিকার তাদের অভিজ্ঞতা সামিটে আসা দর্শকদের কাছে ব্যক্ত করবেন। অন্যবারের মতো এবারও সামদানি আর্ট অ্যাওয়ার্ড দেয়া হবে। পুরস্কার হিসেবে একজন উদীয়মান বাংলাদেশি শিল্পী পাবেন লন্ডনের ডেলফিনা ফাউন্ডেশনে তিন মাসের আবাসিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার সুযোগ। আর্ট সামিটে আরও থাকছে বাংলাদেশি শিল্পীদের নিয়ে একটি প্রদর্শনী।

এই প্রদর্শনীর কিউরেটর হিসেবে আছেন বাংলাদেশের চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান। দেশ-বিদেশের ৬ শতাধিক নবীন-প্রবীণ শিল্পীর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হবে। থাকছে ১৭টি একক প্রদর্শনী। পাশাপাশি থাকছে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য আর্ট গ্যালারির অংশগ্রহণ।

এই বছর ঢাকা আর্ট সামিটকে বিশ্বের নামকরা প্রায় ৮৩টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, সেন্টার পম্পিদৌ ফ্রান্স, রকফেলার ফাউন্ডেশন, নরওয়েজিয়ান মিনিস্ট্রি অফ ফরেন অ্যাফেয়ার্স, সুইস আর্টস কাউন্সিল অন্যতম।

এর পাশাপাশি বিভিন্ন খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক জাদুঘর যেমন টেট মডার্ন, মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্ট নিউইয়র্ক, সলোমন আর গুগ্যেনহাইম, রুবিন মিউজিয়াম এবং কুন্সস্থালে জুরিখ তাদের কিউরেটরদের ঢাকা আর্ট সামিট ২০১৬ এর একটি আর্ট প্রোগ্রাম ডিজাইনে সহযোগিতার জন্য পাঠিয়েছেন। সবার জন্য উন্মুক্ত প্রদর্শনীটি। সকাল ৯টা থেকে চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। আগামীকাল ৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হবে এ মহাযজ্ঞ।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »