মাহবুবা ইয়াসমিনের শিল্পকর্মে সমাজ-ধর্মে নারী নিপীড়নের বয়ান

শিল্পী মাহবুবা ইয়াসমিন দীপা

শিল্পী মাহবুবা ইয়াসমিন দীপা

ইন্দ্রনীল সরকার, শান্তিনিকেতন থেকে

Pink Myth Of Hell শিরনামে মাহবুবা ইয়াসমিনের প্রথম একক প্রদর্শনী। আয়োজন করেছে শান্তিনকেতনের রতনপল্লীতে অবস্থিত ‘ ছায়াঘর আর্ট স্পেস’। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন, অর্পন মুখার্জী – সহযোগী অধ্যাপক; ছাপচিত্র বিভাগ; বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, অদিতি গানিভ সানওয়ার; সহকারী অধ্যাপক; ছাপচিত্র বিভাগ, বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশান্ত ফিরিঙ্গী – সহকারী অধ্যাপক, ছাপচিত্র বিভাগ, বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় – লেখক, রাজ মল্লিক- সহকারী রেজিস্টার, বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ৭দিনের এই প্রদর্শনী চলবে ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে ৯টা পর্যন্ত।

প্রদর্শনীতে শিল্পী মাহবুবার দুটি সিরিজর ১৭ টি কাজ রয়েছে। কাজগুলোতে অনেকদিন ধরেই সমাজের মধ্যে চলে আসা অসংগতির প্রতি তার প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া। “কোন পুরুষ কোন নারীর মাথার চুল দেখলে মৃত্যুর পর এক একটা চুল থেকে ৭০ টা সাপ হয়ে কামড়বে”। খুব প্রচলিত একটি মিথ এটা। ধর্ম আগাগোড়াই পুরুষতন্ত্রে মোড়ানো- তাই নরকের মিথলোজিগুলো খুব গোলাপী/নারী বিরোধী হয়ে ওঠে শিল্পীর কাছে।

আধুনিক শিল্পচর্চার মূল বিষয় শিল্পীর ইচ্ছাতে শিল্পের প্রকাশ নির্ধারিত। সমাজ, রাজনীতি, কল্পনা, স্বপ্ন, আধ্যাত্মিকতা- সবকিছুই শিল্পের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে এ সময়ে। কিন্তু আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া অনেক বড় ঘটনাই সাম্প্রতিক শিল্পচর্চার বিষয়বস্তুতে অনুপস্থিত। বরং এক ধরনের বানিয়ে তোলা সংকটের প্রতিক্রিয়াই দেখি আমাদের সমসাময়িক শিল্পকলায়। তবে যে ছবি গণমাধ্যমের চোখে ধরা পড়ে নি, শিল্পী মাহবুবা ইয়াসমিনের চোখ তা ফাঁকি দিতে পারেনি। শিল্পীর সর্বদা নিরপেক্ষ বিচার তার সমাজ ও সময়ে। তিনি সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক অথবা সেসব ঘটনা তার ভেতরে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে অধিকাংশ সৃজনকর্মে।

দুই বছর পূর্বে ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী’র একটি বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘তেঁতুল দেখলে মানুষের যেমন জিভে জল আসে তেমনি নারীদের দেখলে ‘দিলের মইধ্যে লালা বাইর হয়’। তবে শুধু ধর্ম নয়, সাহিত্য ও শিল্পেও বহু পুরুষ-কবি মেয়েদের কত ফুল-ফলের সঙ্গে তুলনা করেছে, কমলা, ডালিম, আপেল, পেয়ারা, আনারস, গোলাপ, বেলি আরও কত কিছু বলে ডেকেছে মেয়েদের শরীরের নানা অংশকে। তাই শিল্পী নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়াটাকে জরুরি মনে করেছেন তার ‘থ্রু দ্য অ্যানালজি’ সিরিজে।

শিল্পীর কাজে নগ্নতার উপস্থিতি কেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কাজে নারী দেহকে নগ্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কারণ পোশাক সব সময়ই কোন না কোন দেশ/জাতি বা ধর্মের পরিচয় বহন করে। কিন্তু নারীদের এই বিড়ম্বনাগুলো সার্বজনীন এবং নগ্নতাও ঠিক তেমনই সার্বোজনীন।” মূলত: ন্যুডিটির ট্যাবোকে ভাঙ্গতে চেয়েছেন তিনি। তবে শিল্পীদের কাজে নগ্ন নারী ফর্মের মাঝে আধ্যাত্মিকতার প্রতিফলন পাওয়া যায়।

আলোকচিত্রকে সমকালীন বিশ্ব শিল্পের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগিয়ে শিল্পকর্ম নির্মাণই তার একমাত্র প্রয়াস। শিল্পী হিসেবে সর্বদাই সমাজ, ধর্ম ও সময় নিয়ে নিরপেক্ষ বিচার করতে চেষ্টা করেন তিনি। তার কাজের মধ্য দিয়ে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক,সামাজিক আচরণগত মৌলবাদের জায়গায় ঝাঁকুনি দেবে এমন বিষয়গুলোকে উপস্হাপনের চেষ্টা করে থাকেন। যৌনতা, সহিংসতার মতো বিষয়গুলোর দিক আঙ্গুল তুলতে চেষ্টা করেন। তুলে ধরতে চেষ্টা করেন মৌলবাদের সেই সকল অধ্যায়গুলো যা আমাদের মনের অনেক গভীরে গাঁথা।

মাহবুবা ইয়াসমিন ড্রইংভিত্তিক কাজ করতেই বেশি পছন্দ করেন। আবার কখনো ড্রইং-এর সাথে চিত্রপটে এক্রেলিকের জলছোপ কখনোবা তেলরং জুড়ে দেন। শিল্প নির্মানে আলোকচিত্রই তার মূল চিত্রপট।

অধিকন্তু তিনি একজন নারী। তাই জগৎকে তুলনামূলকভাবে বেশি গভীরে দেখতে পান তিনি। যেকোনো বিপর্যয়ে তিনি নারীর বিপন্নতা অন্যদের চেয়ে বেশি অনুভব করেন।

‘ছায়াঘর আর্ট স্পেস’ এর স্বত্ত্বাধিকারী পীযুষ চক্রবর্তী এবং আহ্বায়ক ইন্দ্রনীল সরকারের আহ্বানেই শান্তিনিকেতনের রতনপল্লীর ছায়াঘরে এই প্রদর্শনী করা হয়। আহ্বায়ক ইন্দ্রনীল সরকার বলেন, “প্রদর্শনীটি শান্তিনিকেতনের বহু মানুষের মন জয় করেছে। ‘পিঙ্ক মিথ অফ হেল’ এবং ‘থ্রু দ্য অ্যানালজি’ নামক দুটি সিরিজের মধ্য দিয়ে খুব শক্তিশালী কিছু বক্তব্য তুলে ধরেছেন যা নিয়ে কথা বলতে পেরেছেন খুবই কম মানুষ, এমন একজন প্রতিবাদী শিল্পীর প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পেরে আমরা গর্বিত।”

স্বত্ত্বাধিকারী পীযুষ চক্রবর্তী বলেন , “এই ধরনের কাজ ভবিষ্যতে আরও আশা করি ওনার কাছ থেকে এবং তার সাথে এ’ও আশা করি যে বাংলাদেশে মাহবুবা ইয়াসমিনের মতন আলোকচিত্রী ও তার কাজ যেন বহু প্রশংশিত হয়।”

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »