ষোল শিল্পীর ‘ষোলকলা’

sholokala-invitation-card_chitram2

।দীপ্তি দত্ত। গত ৩০শে এপ্রিল শেষ হলো জয়নুল গ্যালারিতে ১৬জন শিল্পীর অংশগ্রহণে ‘ষোলকলা’ শীর্ষক সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনীটি। এই প্রদর্শনীর বেশিরভাগ শিল্পীই ছিলেন চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বরত শিক্ষক। যে কোন শিল্পী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এই দুই শ্রেণিই মূলত অগ্রসর হন নিজের পঠিত বা কাঙ্খিত ক্ষেত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিল্পী সত্তার ধারক আয়োজক শিল্পীদের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন মাধ্যম থেকে এসে সম্মিলিত উদ্যোগে একটি নিদির্ষ্ট মাধ্যমকে নিয়ে তারা নিরীক্ষাধর্মী কাজ করার চেষ্টা করেছেন। এবং তা প্রদর্শনীর মাধ্যমে সকলের সামনে উন্মোচন করেছেন। নিরীক্ষাধর্মী এই প্রবনতা শিল্পের মাধ্যমগত বিভেদকে অস্বীকারের এই যুগে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও উৎসাহের কারণ হতে পারে।

কারুশিল্প বিভাগের শিক্ষক আব্দুল মোমেন মিল্টন নানা প্রতীক ও চিহ্নের সমাবেশে চিত্র নির্মাণ করেছেন। তাতে কারুশিল্পের কাঠ খোদাইয়ের অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। গাণিতিক অভিব্যক্তিতে তৈরি হয়েছে ধনাত্মক ও ঋনাত্মক স্পেস ধারনা। কাঠ খোদাইয়ের কাজে অগভীর ও গভীর স্পেসের দ্বৈরথের ফলে তৈরি হয় আলো-ছায়ার বৈপরীত্য। এই বৈপরীত্যকে কাজে লাগিয়ে সাদা-কালোর প্রাধান্যে মিল্টন তার চিত্রতল নির্মাণ করেছেন।

স্পেস ও ফর্মের একটি পরিচিত চিহ্ন ক্যানভাসে রেখে, আধুনিক শিল্পের সমতলীয় স্পেসের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ত্রিমাত্রিক স্পেসের শিক্ষার দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা যায় এই প্রদশর্নীর শিল্পীদের কাজে। রবিউল ইসলাম, শাবিন শাহরিয়ারের কাজে এই প্রবনতা লক্ষ্যণীয়। বুনটের একমুখী আধিপত্য দেখা যায় শিল্পীদের কাজে। প্রায় সবার কাজেই চিত্রতল নিমার্ণের মূল প্রবণতা হিসেবে হাজির হয় বুনট। আজহারুল ইসলাম চঞ্চলের কাজে বুনট ও রঙের মাধ্যমে স্থানের মাত্রাগত ভিন্নতা ধরার চেষ্টা রয়েছে।

ফারজানা আহমেদও বুনটের প্রাধান্যে একটি জ্যামিতিক কম্পোজিশন তৈরি করেন। ফারুক আহমেদ মোল্লা বাস্তবতাকে স্ব-নির্দেশক ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করেন।  জি সি ত্রিবেদী ফুল ও নারীর চিত্রকল্প নির্মাণে চিরায়ত পুরুষ নন্দনতত্ত্বের অনুগামী। যা বোধহয় সহজাতভাবেই কালিদাসের শকুন্তলার সূত্র ধরে অগ্রসর হয়।

কান্তিদেব অধিকারী প্রাচ্যশিল্পের ওয়াশ পদ্ধতির শিক্ষাকে এক্রেলিক মাধ্যমেও প্রয়োগ করেন।  বা এক্রেলিক মাধ্যমেও জলরংয়ের ধোয়া প্রভাব এড়াতে পারেন না। দ্বিমাত্রিক স্যাতঁস্যাতে দেয়ালের তল শিল্পীর কাজে চীনা দৃশ্যশিল্পের অসীম স্পেস ধারনার বিভ্রমও তৈরি করে।

মাসুদুর রহমান অ্যাক্রেলিক রংকে যান্ত্রিক মাধ্যমের ভাষায় রূপান্তরিত করেন। মুকুল কুমার বাড়ই তার কাজে মাতিসীয় পদ্ধতিতে রং ব্যবহার করেন। ভাঙ্গা ভাঙ্গা রঙের রেখার বুনট একই সঙ্গে ইমেজ ও চিত্রতল নিয়ন্ত্রণ করে। মোহাম্মদ সাব্বির আল রাজি, মোরজিয়া সুমি, রেজা আসাদ আল হুদা অনুপম, উম্মে হাবিবার (সূচি) কাজে প্রকৃত ও কৃত্রিম এই দুই ধরনের বুনট নানা মাত্রায় প্রধান শিল্প উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।  প্রকৃতিবাদী রূপ অনুশীলনের সাথে বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদী আধুনিক শিল্প শৈলীর দ্বন্দ্ব, যেখানে বুনটের মতই নিয়ত উপস্থিত।

এই দ্বন্দ্বের সাথে একই মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর পেছনে কি আর কোন দ্বন্দ্ব ক্রিয়াশীল?

বর্তমান চারুকলা অনুষদ যাত্রা শুরু করেছিল চারু ও কারুকলা ধারনার সমন্বয়ে। পুরো প্রতিষ্ঠান এককভাবে এই সমন্বিত ধারনার প্রতিনিধিত্ব করলেও শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে বিভাজন সুস্পষ্ট থাকে। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মূলত বিভিন্ন মাধ্যমকে প্রাধান্য দিয়ে এবং অন্য জাতিসত্ত্বা নির্ধারিত না-বোধক তত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে। ফলে মিশ্রিত চারু-কারু ধারনা ক্রমে এককভাবে চারুকলা হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু মাধ্যম বা পদ্ধতিকেন্দ্রিক বিভাগ ধারনা বহাল থাকে। যা পরবর্তীতে সময়ের নানা পরিবর্তনের সাথে সাথে একটি মিশ্র চরিত্রের দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে হাজির হয়। তাই কারুশিল্প বিভাগ যেমন জাতীয় প্রদর্শনীতে প্রতিযোগিতার তালিকায় স্থান পায় না, তেমনি পায় না মৃৎশিল্প বিভাগের নামও। আবার এই বিভাগগুলি অংশগ্রহন করে রেঁনেসাযুগীয় অভিজাত চিত্রকলা বা ভাস্কর্য কলার মত চারুশিল্পের  অনুগামী হয়ে। যা তত্ত্বীয়ভাবে নিজেদের সংযুক্ত করে স্থাপনা শিল্পের ধারনার সঙ্গে। গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগ নাগরিক কাঠামোর কারুশিল্প। যার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি একই কিন্তু চলমান বাজার শিল্পে ক্রমবর্ধমান প্রতিনিধিত্বের কারণে তার স্থান পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনা আছে।

স্থানিক আর্থ-সামাজিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে উঠা এইসব শিল্পভাবনার পাশাপাশি আছে বৈশ্বিক অভিজাত শিল্পকাঠামোর চলমান ধারনা। যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধারনায় নিয়ত আরোপ করা হয়। এরই ফলাফল হিসেবে হাজির হয় প্রাচ্যকলা বিভাগের শিল্পকলা। প্রাচ্যে উঁচু-নিচু শিল্পের নিজস্ব শ্রেণি কাঠামো থাকলেও তা গুরুত্বহীন হয়ে যায় আর্য-অনার্য বা ইংলিশ-নেটিভ ধারনায়। যার প্রভাবে নির্মিত হয় আমাদের শিল্পের একাডেমি।

ফলে চিত্রকলা ও ভাস্কর্য বিশেষ মর্যাদা পায়। যা থেকে দেশজ নব্য সংস্কৃতির ধারনায় ভাস্কর্য আবার দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত হয়ে পড়ে। তাই টিকে থাকে চিত্রকলা। এই সময়ে ক্যানভাস নির্ভর চারুকলা ভাবনা, প্রতিষ্ঠানের বাইরে ও ভেতরে কতখানি এবং কেন সক্রিয় তা বিবেচনার বিষয়। আর ‘ষোলকলা’ শীর্ষক প্রদর্শনীর শিল্পীগণ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে চিত্রকলার এক্রেলিক মাধ্যমটিকে কেবল নিরীক্ষার খাতিরেই বেছে নিয়েছেন নাকি উচ্চ চারুকলা ভাবনার মুখাপেক্ষী হয়েছেন তাও বিবেচ্য বিষয় হতে পারে। এই প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শিল্পীরা শুধু মাধ্যমের নিরীক্ষার প্রশ্নটিই বোধহয় হাজির করেননি, শিক্ষক হিসেবে মাধ্যম কেন্দ্রিক শিল্পের শ্রেণিকাঠামোকেও প্রশ্ন করেছেন।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »