ছবির হাটে পারফরম্যান্স আর্ট ফেস্টিভ্যাল

keshkasha_saba
। রহমান সিদ্দিক ।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নানা শ্রেণির লোকের হই-হট্টগোল। বাইরে রাস্তায় গাড়ির হর্ন, রিকশার টুংটাং শব্দ। এ রকমই এক পরিবেশে গত ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার থেকে চারুকলার উল্টো দিকের ছবির হাটে হয়ে গেল সপ্তাহব্যাপী পারফরম্যান্স আর্ট ফেস্টিভ্যাল। খোলা মঞ্চে এবারই প্রথম এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সাত দিনব্যাপী এ উৎসবে দেশি-বিদেশি ৩০ জন সম্ভাবনাময় তরুণ শিল্পী সমাজ-রাজনীতি-ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েনসহ বিচিত্র বিষয়ে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তাঁদের বার্তা পৌঁছে দেন। প্রদর্শনীর আয়োজকেরা জানান, প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত স্থানে এ উৎসবের মধ্য দিয়ে পারফরম্যান্স আর্টের মূল চরিত্রকেই ধারণ করা হয়েছে। আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য নিলয় হোসেন জানান, এখানে পারফর্ম করা শিল্পীদের অধিকাংশই নবীন। অনেকের পারফরম্যান্সে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও তাঁরা তাঁদের প্রতিভার পুরোটাই ঢেলে দিয়েছেন। আগামীতে হয়তো তাঁরা নতুন নতুন ভাব-ভাবনা নিয়ে এ শিল্পমাধ্যমকে আরও সম্ভাবনার জায়গায় নিয়ে যেতে পারবেন। তিনি আরও জানান, ছবির হাটের এ ফেস্টিভ্যালের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পারফরম্যান্স আর্ট আন্দোলনে একটি নতুন দিকের সূচনা করেছে।

উৎসবে অনেকেই তাঁদের পারফরম্যান্স দিয়ে দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছেন। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের বিষয়ে আলোচনা করা হলো-
মাহবীর মুরাদ: শিল্পী মুরাদের ৪০ মিনিটের এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে পণ্যবাদী সমাজের একটি চিত্র উঠে এসেছে। যেখানে সবকিছুই বিক্রয়যোগ্য। বিক্রি হয়ে যায় মানুষের আত্মাও। তিনজনের এ প্রদর্শনীতে দেখা যায়- একজন দাঁড়িয়ে আছে কাচের পেছনে; ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোতে থাকা পুতুলের মতো। দ্বিতীয়জন করপোরেট বিশ্বের প্রতীক হিসেবে পুতুলটির কাপড় বদলে দেওয়া; আলোর দিকে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। তৃতীয়জন গ্রাম থেকে আসা কৌতূহলী এক লোক। পুতুলটিকে বিভিন্ন কোণ থেকে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় দেখছে, খোঁচা দিচ্ছে। অপর কৌতূহল ও গ্রাম্য সরলতায় মেশানো তার দৃষ্টি; ভাবছে এটা কি মানুষ? করপোরেট বিশ্বের এ খেলা, এ নিয়ন্ত্রণ বুঝে উঠতে পারছে না ওই সরল মানুষটি। শুধু গ্রামের ওই মানুষটি কেন, নাগরিক মানুষেরাও যে করপোরেট বিশ্বের খেলার পুতুল, নিজেরাও যে পণ্য, তা তারা বুঝতে পারছে না।

শুভ সাহা: দৈনন্দিন জীবনে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের কত কাজ, কত ভাবনা, কত ব্যস্ততা। মানুষ হাঁটছে নানা পথে। কিন্তু তার আসল পথটা চিনে নিতে পারছে কি? এ প্রশ্ন থেকেই শুভ সাহা তাঁর প্রদর্শনীকে সাজিয়েছেন। শুভ একটি বড় ক্যানভাসে অনেকগুলো বিষয়ের সমবায়ে কালো কালির চিত্র এঁকেছেন। একই সঙ্গে তাঁর শরীরটাকেও ভরে দিয়েছেন বিচিত্র চিত্রে। তিনি ছুটছেন স্থান থেকে স্থানে। আঁকছেন নানা পথ। ক্যানভাস ভরিয়ে দিচ্ছেন নানা রেখায়। এভাবে রেখায় রেখায় একটি পথ তৈরি হয়ে গেল, যা মানুষের প্রকৃত পথ।

কেহকাশা সাবা: মানব শরীর এমনই একটি শক্তিশালী যন্ত্র, যা যেকোনো বিষয়কেই ধারণ ও ভারসাম্য রাখতে সচেষ্ট। কিন্তু কখনো কখনো এমন কিছু অর্থহীন ও অযাচিত বিষয় এসে শরীর-মনে ভর করে, যা মানুষকে উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত করে তোলে। চারপাশ থেকে আসা নানা জঞ্জালের আক্রমণ থেকে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করা যায়- এ বিষয়টিই ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী সাবা তাঁর প্রদর্শনীর মাধ্যমে।
চন্দন রায়: চন্দন রায় কাজ করেছেন উদ্বাস্তু মানুষের আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন নিয়ে। একদিকে শহরে বাস্তুহারা মানুষের সীমাহীন সংগ্রাম নিয়ে বেঁচে থাকা; অন্যদিকে বড় বড় অট্টালিকা। এই যে শহুরে জীবন, জৌলুশ, ভোগ, লালসা- তার আয়ুষ্কাল কতটুকু? শিল্পী চন্দন রায় দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে একটি শহরের ডামি তৈরি করেছেন। পরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন একটি কাঠিতে। যা হওয়ার তাই হয়েছে। আস্তে আস্তে ধ্বংস হয়ে গেছে পুরো শহর। শহুরে মানুষ যেন দাঁড়িয়ে আছে একটি মাইনের ওপর। যেকোনো সময় বিস্ফোরণ হতে পারে। এ ধ্বংস অনিবার্য।

অর্পিতা সিং লোপা: ঝলমলে পোশাক, অলংকার, সাজগোজে অনেক নারী ঢেকে রাখে তার প্রকৃত মানুষ সত্তাকে। নারীর পরিচয় কি তাহলে ওই মেয়েলিপনাতেই? এই প্রশ্ন সামনে নিয়ে অর্পিতা সিং সাহা দেখাতে চেয়েছেন, অলংকার আচ্ছাদিত সৌন্দর্যচেতনাই নারীর সব নয়; তাকে মানুষ হয়ে উঠতে হবে। মানুষ সত্তা নিয়েই তাকে দাঁড়াতে হবে; নারীত্বে নয়।

আজমাইন আজাদ কথা: আজমাইন আজাদ কথার এ প্রদর্শনে দেখা যায় একটি উৎসব। যেখানে শত শত মানুষের ভিড়। ওই ভিড়ের চাপে আটকে পড়ে আছে একটি মেয়ে। মেয়েটি পিষ্ট হচ্ছে কিছু পুরুষের দ্বারা। তার চিৎকারে এগিয়ে আসছে না কেউ। অথচ সেখানে প্রচুর লোক। কিন্তু এত লোকের মধ্যে কি কেউ মানুষ ছিল না?

একটা সমাজ যখন অবক্ষয়ের দিকে চলে যায়, সেখানে মানুষের অনুভূতি বলে কিছু থাকে না। মানুষকে জন্তু থেকে আলাদা করেছে যে সত্তা; সে সত্তার নাম মন। মনের উদয় না হলে কেউ মানুষ হতে পারে না। অথচ মানুষ হিসেবে দাবি করছি সে মানুষ। আজমাইন আজাদের প্রদর্শন সত্যিকার অর্থে কিছু জন্তুকেই দেখা যায়, যাদের মানুষের মতো দেখায়।

সুমনা আক্তার: সুমনা আক্তার তাঁর পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে একটি দেয়াল ভাঙতে চেয়েছেন। এ দেয়াল সমাজের আরোপিত দেয়াল। এ দেয়াল মনুষ্য সত্তা থেকে নারী-পুরুষের বিভেদ রেখা তৈরি করেছে। সুমনা আহ্বান জানাচ্ছেন অপরিচিত পুরুষকে তাঁর সঙ্গে আলিঙ্গনে। তাঁর উদ্দেশ্য নারী-পুরুষের মধ্যকার অদৃশ্য দেয়াল মুছে দেওয়া। অনেকেই তাঁর আহ্বানে সাড়া দেননি। সাড়া যে দেননি- এটা ডিফেন্সিফ মেকানিজম থেকে। ডিফেন্সিফ মেকানিজম নামক এই দেয়াল সমাজই তৈরি করে দিয়েছে। এটা উপড়ে ফেলার মতো শক্তি সর্বসাধারণের নেই; অথচ তা জরুরি ছিল। সুমনার আহ্বানে কেউ যে একেবারে আসেননি, তা নয়। বয়স্ক এক লোক তাঁকে আলিঙ্গন করলেন কন্যাস্নেহে। সেটাও আরেকটি ডিফেন্সিফ মেকানিজম। কন্যা আর পিতার সম্পর্ক তো নারী-পুরুষের সম্পর্কই; সেখানে মানুষ হিসেবে আলাদা সত্তাটা রইল কোথায়? সুমনা সংগ্রাম করে যাচ্ছেন- এ দেয়াল ভাঙতেই হবে। হয়তো একদিন ভাঙবেও।

উত্তম: অসংখ্য নেতিবাচক শব্দ শরীরে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেউ। এর মধ্যেও দুটি ইতিবাচক শব্দ রয়েছে। কপালে ‘স্বদেশ’। বুকে ‘স্বাধীনতা’। প্রদর্শনীতে আসা দর্শক একে একে মুছে দিচ্ছে তার শরীরের নেতিবাচক শব্দগুলো। কেউ কিন্তু মুচছে না ‘স্বদেশ’ ও ‘স্বাধীনতা’- শব্দ দুটো। এ দুটো জিনিস সবাই চায়। কিন্তু পায় কি?

ডিম্পেল বিশ্বাস: ভারতের বেঙ্গালুরু থেকে আসা ডিম্পেল বিশ্বাস তাঁর রিচ্যুয়াল পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে যা কিছু কুৎসিত, যা কিছু ভ্রষ্ট- এসব নিজের শরীরে ধারণ করেছেন। ডিম্পেলের প্রদর্শনীর আয়োজনটি ছিল মুগ্ধকর। একজন উদোম দাঁড়িয়ে আছে, যিনি শিল্পীর বন্ধু। শিল্পী দর্শকসারি থেকে কাগজে মানুষের নেতিবাচক চিন্তাগুলো লিখিয়ে নিচ্ছেন। তার উদোম বন্ধুর শরীরেও একই ধারায় দর্শকেরা লিখে যাচ্ছে তাদের নেতিবাচক কথা। শিল্পী একটি রিকশায় বসে আগুনের শিখায় সেঁকে নিচ্ছেন কিছু পাউরুটির টুকরো। পাউরুটির টুকরোগুলো যখন গাঢ় কালো রং ধারণ করেছে, সেগুলো আস্তে আস্তে তিনি খেয়ে নিলেন। কাগজে লেখা নেতিবাচক শব্দগুলো আগুনে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিলেন। ওই পুড়ে যাওয়া নেতিবাচক শব্দগুলো থেকে ভেসে আসছে সুগন্ধি ধূপ। তিনি বিশ্বের সমস্ত নেতিবাচক নিজের শরীরে ধারণ করলেন, কিছু পুড়িয়ে দিলেন আর কিছু দিয়ে দিলেন তাঁর প্রিয় একজন বন্ধুকে। এভাবে পৃথিবীতে সুন্দরের আবাসভূমি রচনা করতে চাইলেন ডিম্পেল।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »