বিশ্বজিৎ গোস্বামীর গতিময় রূপান্তর

316407_2340883316177_1372303642_n। ফারাহ্ নাজ মুন ।

প্রদর্শনীর শিরোনাম ইন মোশন। শাব্দিক অর্থ গতির মধ্যে; বলছি বিশ্বজিৎ গোস্বামীর একক প্রদর্শনীর কথা। বিশ্বজিৎ গোস্বামী তরুণদের মধ্যে আলোচিত একজন শিল্পী। কাজ করেন মূলত ফিগার নিয়ে। শিক্ষার্থী হিসেবে যখন তিনি কাজ শুরু করেন, তখন তিনি কাজ করতেন মানুষের ফিগার নিয়ে। প্রথম দিককার কাজের মধ্যে ছিল চারুকলার মডেলদের নিয়ে স্টাডিনির্ভর কাজ। শিল্পী চারুকলার দাদুকে নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেন। পরে কাজ করেন আত্মপ্রতিকৃতি নিয়ে। আত্মপ্রতিকৃতির সঙ্গে অনুষঙ্গ হিসেবে থাকে দেহের খন্ডাংশ। আত্মপ্রতিকৃতি থেকে আস্তে আস্তে মুখ আড়াল হতে থাকে। এ মুখের আড়ালে জায়গা করে নেয় পত্রিকা। নিজের এ রকম শিল্পীত ভ্রমণ তাঁর অর্জিত দক্ষতার সমন্বয়ে তিনি প্রকাশ করেন নানাভাবে। গোস্বামীর ক্যানভাসে শারীরবৃত্তীয় ভ্রমণ রূপান্তরের দিকে এগোয়। আর এই রূপান্তর গোস্বামীর কাজকে দেয় অনন্ত শিল্পরসের মূর্ছনা। যে মূর্ছনা শিল্পীকে এক সফল শিল্পভ্রমণের ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্বজিৎ গোস্বামীর কাজের এ রূপান্তর দেহজ থেকে আত্মার দিকে ধাবিত হওয়ার প্রবণতা দেখি আমরা শিল্পীর প্রদর্শনীতে।

প্রদর্শিত ছবিগুলো/চিত্রকর্মগুলোর রয়েছে তিনটি ভাগ। আনটাইটেলড, কোয়েস্ট ফর সোল, মেটামরফোসিস অ্যান্ড ফিজিক্যাল এক্সিসটেন্স।

শিরোনামহীন চিত্রকর্মগুলো একেবারই সফেদ/সাদা রঙে আঁকা। কাপড়ে আবৃত মানুষের শারীরিক উপস্থিতির দেখা পাওয়া যায়। দুটি চিত্রেই সাদা কাপড়ে ঢাকা মানব অবয়ব। মাথা নিচু ভঙ্গিতে দাঁড়ানো। এ রকম দৃশ্য পারফরম্যান্স আর্টিস্টদের কাজে আমরা বরাবর দেখলেও চিত্রকর্মে এ অবয়ব দেখা আমাদের দেশে প্রথম।

কোয়েস্ট ফর সোল শিরোনামের চিত্রকর্মগুলো সাদা-কালোতে করা। বিষয় পুরুষ ফিগার। ফোকাস করা হয়েছে হাতে। হাতের রেখা ও হাতের ভঙ্গি কিছুটা ইঙ্গিতবহ। একধরনের নিঃশব্দ উপস্থিতি। চিত্রকর্মটির সামনে দাঁড়ালে একধরনের নিঃসঙ্গতা কাজ করে। তার পাশেই সুঠাম নির্মেদ পুরুষের দেহাবয়ব। শিল্পে সব সময় নারীর দেহসৌষ্ঠব প্রকাশে ব্যস্ত অন্তঃপুরুষ শিল্পীদের ক্ষেত্রে নারীদেহের উপস্থিতি সহজলভ্য কিন্তু বিশ্বজিৎ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তাঁর ছবিতে দেহাবয়বের উপস্থাপন প্রবলভাবেই পুরুষপ্রধান। সমাজে ও চিন্তায় পুরুষ একই সঙ্গে দাতা ও ত্রাতা। সমাজের গতিপ্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ সব সময় পুরুষের হাতেই। গোস্বামী গতির ভেতরে সেই পুরুষকেই তুলে ধরেন। কিন্তু এ পুরুষেরা গতিকে অবলম্বন করেই স্থিত। কোলাহলের মধ্যে থেকেও একা। মানুষের অন্তর্যাত্রা একলা ভ্রমণের নাম। এ সিরিজের ছবিগুলো সেই ভ্রমণেরই রূপায়ণ। তা সত্ত্বেও গোস্বামীর পুরুষালি ছবিগুলো কারও কারও কাছে পুরুষতান্ত্রিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও।

মেটামরফোসিস শব্দটি গ্রিক। মানে হলো রূপান্তর। সনাতন ধর্ম যতগুলো স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্য জন্মান্তরবাদ অন্যতম। ধর্ম বিশ্বাস করে, জীবের মৃত্যুর পর জীবাত্মা একদেহ পরিত্যাগ করে কর্মফল ভোগ করার জন্য অন্য দেহ ধারণ করে; এ জগতেই পুনরায় জন্মগ্রহণ করে। যেমন একই ব্যক্তি পুরাতন ছিন্ন বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, সেই রূপ জীবাত্মাও জীর্ণ দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ গ্রহণ করে। বেদ, উপনিষদ এবং ভগবদগীতার মতে, এই জীবাত্মা স্বরূপত ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু জাগতিক বস্তুর প্রতি আসক্তিবশতই আত্মাকে দেহ ধারণ করতে হয়।

এ দেহ ধারণ করার প্রক্রিয়া দেখা যায় গোস্বামীর এ সিরিজে মানুষের অস্থিমজ্জার সঙ্গে পাখির রূপ ধারণ, এ জন্মান্তরবাদের তত্ত্বকেই তুলে ধরে।

‘মেটামরফোসিস অ্যান্ড ফিজিক্যাল এক্সিসটেন্স’ সিরিজের ছয়টি চিত্রের ক্যানভাস গোলাকার। অন্যদিকে তিনটি চিত্রকে শিল্পী পরিবেশন করেছেন বাংলাদেশের মানচিত্রের জলছাপ মাখা কাচের আবরণের ভেতরে। এ সিরিজের গোলাকৃতি রঙিন কাজগুলোতে রিকশা পেইন্টিংয়ের ছাপের দেখাও মেলে। আর গোলাকৃতি ক্যানভাস সরাচিত্রের আকৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়।

শিল্পী তাঁর ক্যানভাস বাঁধাইয়ে একধরনের পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর শিল্পকর্ম হঠাৎ দেখলে মনে হতে পারে, ব্যানার প্রিন্ট করে ঝুলিয়ে দিলেন কি না! প্রচলিত ফ্রেমিংয়ে যাননি তিনি। দর্শকদের সঙ্গে একধরনের মজা করেছেন গোস্বামী।

পুরো প্রদর্শনীতে নারীদেহের উপস্থিতি পাওয়া যায় তাঁর দুটি চিত্রকর্মে। প্রথমটি এই বৈশিষ্ট্যও অতিক্রম করে প্রদর্শনীর প্রথম চিত্র ‘মিসিং’। পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি বাই সাত ফুট আট ইঞ্চির বিশাল এই ক্যানভাসজুড়েই হাসতে থাকা একটি মেয়ের প্রতিকৃতি। ক্যানভাসে কাঠের পাটাতনের ওপর সুতির শাড়ি, খবরের কাগজের আস্তরে অ্যাক্রিলিকের পরত চড়িয়ে ছবিটি এঁকেছেন তিনি, যার পুরোটা জুড়ে ‘মিসিং’ শব্দটির জলছাপ। এর মধ্যেই লালচে নিয়ন বাতির বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘মিসিং’। এ উচ্ছল নারীমুখ শিল্পীর প্রচলিত কাজ থেকে একটু ভিন্ন। এখানে শিল্পী ক্যানভাসে নিরীক্ষাধর্মী কাজ করার চেষ্টা করেছেন বলেই প্রতীয়মান হয়।

আরেকটি কাজ আচ্ছাদিত নারী। ক্যানভাসের ডিসপ্লে করেছেন খাটে। আচ্ছাদিত অবস্থায় নারীর দেহাবয়ব স্পর্শ করার মতো। তবে নারীটির মাথার চুল এবং আঁকার ঢং পশ্চিমা কিংবা বিদেশি নারীর। ইনস্টলেশননির্ভর এ শিল্পকর্মটি বিশ্বজিৎ গোস্বামীর একক চিত্র প্রদর্শনীকে দিয়েছে নিঃসঙ্গ সুন্দরের মাত্রা।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

One comment on “বিশ্বজিৎ গোস্বামীর গতিময় রূপান্তর
  1. Iqbal Bahar Chy says:

    Well done Moon Apo. onek valo laglo likhata

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »