কালিদাস কর্মকারের দুটি একক চিত্র প্রদর্শনী

ক্যানভাসে জীবনের পাললিক গল্প

kalidas_karmakar

। সুমিমা ইয়াসমিন ।

শিল্পী কালিদাস কর্মকার প্রথাগত ধারার বাইরে কাজ করতে পছন্দ করেন। শিল্পকর্মে তিনি চিরাচরিত ধারা পেরিয়ে ভিন্ন ধারায় স্থাপন করেন মনোযোগ। প্রতিনিয়ত সীমাবব্ধ গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে চান। একেকটি শিল্পকর্মে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও আছে তাঁর। আর প্রতিভা তো গণ্ডিবদ্ধ কোনো বিষয় নয়, নতুন কিছু সৃষ্টির প্রয়াসই প্রতিভা। কালিদাসের শিল্পকর্মে পরিচয় মেলে ধারাবাহিক পরিবর্তনের, সেটা একই সঙ্গে সময় ও মননকে প্রতিফলিত করে। সাধুসন্তের ত্রিশূল, রুদ্রাক্ষের মালা, তাবিজ কিংবা কড়ির মতো নানা প্রতীক ব্যবহার করে তিনি গভীর এক ব্যঞ্জনা তৈরি করেন শিল্পকর্মে।

সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত হলো শিল্পী কালিদাস কর্মকারের দুটি একক প্রদর্শনী। শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় চিত্রশালায় অনুষ্ঠিত হলো শিল্পীর ৭০তম একক চিত্র প্রদর্শনী ‘পাললিক প্রত্যাবর্তন’। আর আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকার লা গ্যালারিতে ৭১তম প্রদর্শনী ‘পাললিক তাল’।

গত ৪ জানুয়ারি শুরু হওয়া পাললিক প্রত্যাবর্তন শীর্ষক প্রদর্শনীতে  ছিল বিভিন্ন মাধ্যমে করা শিল্পীর প্রায় ১৫১টি চিত্রকর্ম। আর ৫ জানুয়ারি উদ্বোধন হওয়া ‘পাললিক তাল’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে ৩৫টি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়, যার অধিকাংশ ছিল ছাপচিত্র। অ্যাক্রিলিক, মিশ্রমাধ্যম, ডিজিটাল লিথোগ্রাফ, ড্রয়িং, মেটাল কোলাজসহ বিভিন্ন মাধ্যমে করা চিত্রকর্মসহ স্থাপনা শিল্পও প্রদর্শনীতে স্থান পায়।

কালিদাস কর্মকারের কাজে মাটি ও মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও চেতনার নানা অনুষঙ্গ ফুটে ওঠে। এই ধারাবাহিকতা তিনি ধরে রেখেছেন তুলি আঁচড়ে, রঙে ও রেখায়। বাঙালির সব মহান অর্জন ও সংগ্রামী সত্তাকে তিনি তুলে ধরেন গভীর এক নিমগ্নতায়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতাসংগ্রাম যেমন মূর্ত হয় তাঁর চিত্রকর্মে, তেমনি দুর্যোগ বা মানবিক বিপর্যয়ের ব্যথার চিত্রায়ণও বাদ পড়ে না। ঢাকার শাহবাগে তারুণ্যের নবজাগরণও তাঁর তুলির আঁচড়ে মূর্ত হয়। তিনি সমাজের বিবিধ রূপ ও সমকালীন ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন স্বকীয় কাজের ধারায়। স্থাপনাশিল্প, মাল্টিমিডিয়া, ডিজিটাল আর্ট নিয়ে কাজের ধারায় তিনি নতুনত্বের ছাপ যুক্ত করে যান প্রতিনিয়ত। প্রাচ্যের মিথের সঙ্গে পাশ্চাত্যের আধুনিকতা মিশিয়ে দেন। এত বৈচিত্র্যধারায় কাজ করেও তিনি নিজস্ব একটি স্টাইল তৈরি করতে সমর্থ হন। মূর্ত, বিমূর্ত, অর্ধবিমূর্ত, যা কিছু ছবি আঁকেন তিনি, আলাদা একটা স্বকীয়তা লক্ষ করা যায় তাতে। নির্দিষ্ট মোটিফ থাকে তাঁর শিল্পকর্মে। একটা সিগনেচার স্টাইল আছে তাঁর কাজে।

‘পাললিক প্রত্যাবর্তন’-এর উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত নি-ইউন-ইয়ং, দৈনিক ইত্তেফাক-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী পরিচালক তারিন হোসেন, ফ্যাশন ডিজাইনার মাহিন খান।

১৩ দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহান। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

ড. গওহর রিজভী বলেন, ‘কালিদাস কর্মকার শিল্পযাত্রা করে চলেছেন পাঁচ দশক ধরে। তাঁর শিল্পযাত্রা আসলে বাংলাদেশেরই শিল্পযাত্রা। তিনি নিবিড়ভাবে প্রতিদিনের প্রার্থনার মতো করে তাঁর এ শিল্পযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর এই শিল্পের প্রতি আনুগত্য দেশের শিল্পধারাকে যেমন সমৃদ্ধ করে চলেছে, তেমনি তাঁর কাজ আমাদের ব্যক্তিগত চেতনাকেও সমৃদ্ধ করছে।’

ফারুক সোবহান বলেন, ‘আমি চারটি দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু কালিদাস কর্মকার বিশ্বের ৫০টি দেশে তাঁর ছবির প্রদর্শনী করেছেন। যার মাধ্যমে আসলে তিনি বাংলাদেশকেই চিনিয়েছেন। সত্যিকার অর্থে তিনিই বাংলাদেশের শিল্পের দূত; যা বহির্বিশ্বে আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তুলে ধরে।’

কালিদাস কর্মকার বললেন, ‘বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে পলি জমে জমে। এই অঞ্চলে মানুষের মনও তাই পলির মতোই নরম। এই সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার লড়াই ও বঞ্চনার শিকার হয়ে মানুষের মন মরে যাচ্ছে। কিন্তু এত অস্থিরতার পরেও শেষ পর্যন্ত সেই মানুষ জেগে উঠছে তার স্বকীয়তায়। তার আদি চরিত্রে। জীবনের এই কথাই তুলে আনতে চেয়েছি আমার এত দিনের প্রদর্শনীগুলোতে। ‘পাললিক প্রত্যাবর্তন’ প্রদর্শনীতে সেই দীর্ঘ যাত্রাকেই ফিরে দেখার প্রয়াস।’

প্রদর্শনীতে শিল্পীর এযাবৎ যত নিরীক্ষাধর্মী কাজ রয়েছে, তা থেকে বাছাই করা কাজ ঠাঁই পেয়েছে।। শিল্পী বললেন, ‘আমার বাবা হীরালাল কর্মকার। ছবি আঁকা বিষয়ে তিনি পড়াশোনা করেননি। কিন্তু তাঁর আগ্রহ ছিল শিল্প নিয়ে। ছবিও আঁকতেন। কিন্তু আমাদেরও পৈতৃক ব্যবসা ছিল সোনার গয়না গড়ানোর। সেই প্রভাবটা আমার মধ্যে রয়েছে। সে জন্য ক্যানভাসে নানা ধরনের উপকরণ ব্যবহার করি। বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষা করতে আমার ভালো লাগে।’

গত ১০ জানুয়ারি ছিল শিল্পী কালিদাস কর্মকারের ৭১তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী পাললিক রেখা নামে যুগলবন্দী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে একাডেমীর জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে। দেশি বাদ্যযন্ত্রের সুরের সঙ্গে শিল্পী কালীদাস কর্মকার ৭১ মিনিটে ৭১টি রেখাচিত্র অঙ্কন করেন। মিলনায়তনের মঞ্চে সাজিয়ে রাখা হয় চারটি ইজেল। তাতে রাখা সাদা কাগজ, সামনে রং, তুলি, চারকোল, পেনসিলসহ আঁকার সরঞ্জাম। মঞ্চের সামনে বাঁশি, দোতারা, ডুগি-তবলাসহ দেশি বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বাদনশিল্পীরা। সুরের মূর্ছনায় শিল্পীর হাতে সৃষ্টি হতে থাকে একের পর এক রেখাচিত্র।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বরেণ্য শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী, দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, ফরাসি রাষ্ট্রদূত সোফি ওবের, লেখক হাসনাত আবদুল হাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন শিল্পী নিসার হোসেন ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহান। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন একাডেমীর চারুকলা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন।

শিল্পী কালিদাস কর্মকারের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১০ জানুয়ারি। তিনি ১৯৬২-৬৪তে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব আর্ট থেকে ২ বছরের কোর্স শেষ করে ১৯৬৯ সালে কলকাতায় গভর্নমেন্ট কলেজ অব ফাইন আর্টস এবং ক্রাফট থেকে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান নিয়ে চারুকলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী। শিল্পকর্মের মিশ্র মিডিয়া কৌশলে তিনি সুনিপুণ গ্রাফিক শিল্পী। বাংলাদেশে ছাপচিত্রশিল্পের প্রচার ও প্রসার আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন তিনি।

এ পর্যন্ত দেশে-বিদেশে তাঁর চিত্র প্রদর্শনীর সংখ্যা ৭১। তিনি বহু আন্তর্জাতিক ও দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। ভূষিত হয়েছেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মানে।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »