বরিশালের লাখোটিয়া জমিদার বাড়িতে শিল্প বিনিময়

001। অদিতি গুপ্তা ।

‘উড়ন্ত’ আবাসিক শিল্প বিনিময় প্রকল্প’ একটি সাধারণ ধারণা ও স্বকীয়তা নিয়ে বিভিন্ন শিল্পের সমন্বয় সাধনে সৃজনশীল ব্যক্তিদের জন্য একটি বিকল্প শিল্প মঞ্চ। ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করে ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে এটি তার ৪র্থ সেশন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। লেখক, সঙ্গীতজ্ঞ, ফটোগ্রাফারসহ বিভিন্ন শিল্পীদের নিয়ে আবারও পরিস্ফুটিত হয়েছিল এ অনুষ্ঠানটি বরিশালের জমিদার বাড়িতে। একটি পরিত্যক্ত ঐতিহাসিক বাড়িতে একই ছাদের নিচে সকল শিল্পীদের একত্রিত করেছিল এ অনুষ্ঠান। ‘উড়ন্তর প্রতিষ্ঠাতা ও তত্ত্বাবধায়ক সাদিয়া মিজান বলেন, ‘সৃজনশীল প্রতিভায় উদ্ভাসিত শিল্পীদের আরও বেশি অনুপ্রেরণা দেওয়া-ই এ অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য।’ শিল্পীর ছোঁয়াতে সুনিপুন পরিবেশ সৃষ্টি ও সমন্বিত উপস্থাপনায় পরবর্তী শিল্পীদের অণুপ্রেরণা দেওয়াও প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল।

শিল্প বিনিময়ের এই সেশনের উদ্দেশ্য ছিল জমিদার বাড়ির হারানো স্মৃতির পূনঃনির্মান। বাংলাদেশের বরিশাল জেলার গ্রামে জমিদার বাড়ির অবস্থান যা স্থানীয়ভাবে ‘বাবুর বাড়ি’ নামে পরিচিত। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহ ও এর নান্দনিক বৈশিষ্টকে তুলে আনার চেষ্টা করা হয়।

শিল্প বিনিময়ের ৪র্থ পর্বে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের শিল্পী এই জমিদার বাড়িতে একত্রিত হয়েছিলেন জমিদার বাড়ির অতীতকে খুঁজতে। এদের মধ্যে চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, স্থপতি, টেক্সটাইল ডিজাইনার, ফটোগ্রাফার, লেখক ও ইতিহাসবিদ উপস্থিত ছিলেন।

প্রত্যেক শিল্পীই তাদের নিজ নিজ প্রতিভায় ঐতিহাসিক মনুমেন্টে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন যা আশেপাশের জণগনের ও সে জমিদার পরিবারের অনেক স্মৃতির সমন্বয়ে ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আছে। এই স্মৃতির মধ্যে ভালবাসা, আবেগ, আনন্দ-বেদনা, শোক, প্রতিশোধ ও সহিংসতাও জড়িয়ে আছে।

এবারের ৪র্থ পর্বে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের শিল্পীরা একই ছাদের নিচে জমিদার বাড়ির স্মৃতির পূণনির্মান, পূণসৃষ্টি ও পূণকল্পনায় ফুটিয়ে তোলেন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে অদিতি কুমার গুপ্ত (ভারত), শিশির থাপা (ভারত), হামিদা খাত্রি (পাকিস্তান), তাসমিন চৌধুরী (বাংলাদেশ), ফরহাদ রহমান (বাংলাদেশ), ফাহাদ আল-আমিন (বাংলাদেশ), আলী আসগর (বাংলাদেশ), চন্দ্র সুখেন (বাংলাদেশ), শাহরিয়ার শিহাব (বাংলাদেশ) এবং নিজাম উদ্দীন খান (বাংলাদেশ)সহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। সার্বিকভাবে শিল্পীরা জমিদার বাড়ির স্মৃতির মধ্যে স্থান ও কাল বিবেচনা করে বিভিন্ন আঙ্গিকে সে সময়টিকে তুলে এনেছেন যদিও এই ভবনের চারিপাশে হাজারো ঘটনার ঘনঘটা রয়েছে। এ অনুষ্ঠানটি একটি মৌলিক শিল্প বিনিময় প্রকল্প যা একটি দেশের গন্ডির বাইরে গিয়ে বর্তমান স্থাপত্যকলার সঙ্গে ইতিহাসের মিলন ঘটিয়েছে। এভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির মিলন ঘটেছে সবার সঙ্গে।

গত ৮ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে ‘ওপেন স্টুডিও ডে’র উদ্বোধনীতে বরিশালের পুলিশ কমিশনার শৈবাল কান্তি চৌধুরীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জমিদার বাড়ির শেষ সদস্য মন্দিরা রায়চৌধুরী মুখার্জী। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, এনজিও’র নারী প্রতিনিধি, লেখক, সাংবাদিক, বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিলেন গ্রামবাসী ও ভবিষ্যতের নেতৃত্ব ছোট ছোট বাচ্চারা যেখানে হামিদা খাত্রি ও অদিতি কুমার গুপ্ত থিয়েটার বিষয়ক কর্মশালা পরিচালনা করেন।

লাখোটিয়ার জমিদার বাড়ির স্থাপত্য নিদর্শণের কলা মূলত দুটি ভিত্তির মাধ্যমে সংকলিত হয় যার প্রথমটি ছিল সেখানকার ঐতিহাসিক পুস্তক ও দ্বিতীয়টি ছিল মন্দিরা রায় চৌধুরীর সাক্ষাৎকার। লিখিত বইগুলো ছিল মূলত ১৯৫০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ের ওপর এবং মুখার্জীও সাক্ষাৎকার ছিল লাখোটিয়ার অস্তিত্বের বিষয়ে আলোকপাত। এভাবে শিল্পীরা লাখোটিয়ার ইতিহাসকে সমন্বয় করে জমিদার বাড়ীকে উপস্থাপন করেন শৈল্পিক দৃষ্টিকোন থেকে।

মুখার্জীর মুখের বর্ণনায় ফটোগ্রাফার রহমান তার লেন্সে অতীত ঘটনাকে রাঙিয়ে তোলেন ঠিক যেমনটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জমিদার বাড়ীর বেলকোনিতে তার দুষ্টামী ও ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি। ফটোগ্রাফার সেই মলিন হয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে রং লাগিয়ে রাঙিয়ে দেন তার ক্যামেরার মাধ্যমে।

মন্দিরা মুখার্জী যখনই তার এই পুরান বসতি পরির্দশন করেন তখন আর রাতে ঘুম হয় না, শৈশবের মৃত্যু হওয়ার পরের সব স্মৃতি তাঁর কাছে দূঃস্বপ্নের মত ধরা দেয়। মন্দিরার মরে যায়া সেই স্মৃতিগুলোকে পূণর্জীবিত করতে টেক্সটাইল ডিজাইনার চৌধুরী তাঁর শিল্পের ছোঁয়া দেন এবং আশা করেন আবারও নেই হারানো স্মৃতি রঙিন স্বপ্ন হয়ে ধরা দেবে।

শিল্পী ফাহাদ আলম নিঃশব্দতা দিয়ে লাখোটিয়ার ইতিহাস আঁকেন। বাড়ির লনে একাকি হাঁটা, পুকুরে ¯স্বান করা, পুরোনো গাছের ফিসফিস শব্দ এবং পূর্নিমার চাঁদ যেন তাঁর সাথে চুপিচপি কথা বলে। সেখানকার প্রকৃতি ও ইতিহাসের গাঁথুনি তার জড়তা কাটিয়ে নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। শিল্পীর সঙ্গে ইতিহাসের কথোপতন এই গাঁথুনিগুলোই প্রমান হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।

আমাদের জীবনের বিভিন্ন স্তরে আমরা সবাই এক একজন নির্ভরশীল পুতুল। আর এই ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলতে শিল্পী খাত্রি পাট, খড় ও দড়ি দিয়ে নারীর অবয়বে একটি পুতুল তৈরী করেন। সেই পুতুলের প্রদর্শনী হয় উদ্বোধনী মঞ্চে যেন মনে হয় হাজারো বছরের ভুতের পুতুলগুলো নিঃশব্দে কুঁচকাওয়াজ করতে করতে অতিক্রম করছে কালের পালাবদলে।

ভারতের স্থাপত্য শিল্পী থাপা এখানে কিন্তু আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করেননি তাঁর শিল্পের ছোঁয়ায়। লাখোটিয়ার জমিদার বাড়ীর আশেপাশের প্রাকৃতিক উপকরণই ছিল এ শিল্পের মূল উপাদান। জড়াজীর্ণ বাড়ির ফাটা দেওয়ালে লাগল গোবরের আস্তর এবং কুড়িয়ে পাওয়া খড়কুটো। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বর্ণনানুযায়ী সেই গোবরের আস্তরণে চিত্রিত হলো ইতিহাসের ঘটনা এবং পরিশেষে এভাবেই সেখানকার মরে যাওয়া ও হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো ভেসে উঠল।

 

তৎকালীন ও আধুনিক শিল্পের নিদর্শনের ভিত্তিতে চিত্রশিল্পী সুখেন বাড়ির একটি ধ্রুপদি চিত্র আঁকেন। এখানে শিল্পী শুধুমাত্র সেখানকার নির্দিষ্ট স্থানের চিত্রই নয় বরং সেই চিত্রে নতুন শিল্পের ছোঁয়া দেন যা শিল্পীর নিজের জীবনেও এক নতুন অভিজ্ঞতা ছিল।

ইতিহাসের শিল্পী হিসেবে লেখক গুপ্তা জমিদার বাড়ির ফিঁকে হওয়া ইট-সুড়কির শূন্যস্থান পূরণে পুরোনো তথ্যগুলোকে সংলাপের ছকে বেঁধেছেন। তিনি স্থান ও কালের বিবর্তনের সাক্ষী হিসেবে সেখানকার ইট-সুরকির উপস্থাপনায় কিছু ছোট গল্প উপহার দেন অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে।

অন্যদিকে কবি ও গল্পকার শিহাব সেশন চলাকালীন সমস্ত অংশগ্রহণকারীদের কার্যক্রম, সাক্ষাৎকার ও সংলাপের মত নৈমিত্তিক ঘটনা অবলম্বনে রচনা করেন নিত্য-ডায়েরি যার মধ্যে সেই আমলের স্থাপত্য কাঠামোর স্মৃতি ভেসে উঠেছে। একজন বন্যবৈচিত্র বিষয়ক ফটোগ্রাফার হিসেবে তিনি লাখোটিয়ার প্রকৃতি বা বনাঞ্চলের যে ছবি লেন্সবন্দী করেছেন সেখানে লাখ লাখ টিয়া পাখির মাধ্যমে নিজেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘’ নামটি আসলে হয়েছে এই টিয়া পাখিকে ভিত্তি করেই। ‘লাখো’ অর্থ ‘কয়েক লাখ বা লক্ষ’ আর ‘টিয়া’ হচ্ছে টিয়া-পাখি- এ দু’টি শব্দ যোগ করে হয় ‘’।

সার্বিক তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি প্রকল্প প্রধান সাদিয়া মিজান কিছু উপস্থাপন থেকে স্বয়ং নিজেকেই দূরে রাখতে পারেন না। বাইরে থেকে আসা অনেক শিল্পীর উপস্থাপনায় ছোট-খাটো কোন কমতি থাকলে সে স্থান পূরন করে দিচ্ছেন সাদিয়া নিজেই। মাঝেমধ্যেই তিনি রায় পরিবারের সদস্যদের তালিকা নিয়ে কাজ করছেন আবার তার-ই সঙ্গে ১৯৫০-এর দাঙ্গায় এবং ১৯৭১ সালের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের জীবিত ও মৃত মানুষদের একটি মিলবন্ধণ রচনা করার চেষ্টা করেছেন। তবে সাদিয়া সবচেয়ে বড় কাজটি করেছেন সেখানে অংশগ্রহণকারী সকল শিল্পীদের উপস্থাপনা সংগ্রহ করে।

এ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী সকল শিল্পীদের সহায়তায় সাদিয়া হারানো স্মৃতিকে পুনঃর্জীবিত করার বীজবপন করতে পেরেছেন। এটি আসলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদেরই ঐতিহাসিক অতীত, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের পুনঃসংযোগ ঘটানোর একটি উদ্যোগ এবং সুপ্ত সৃষ্টিশীলতার জন্য একটি বিকল্প মঞ্চ।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »