জয়নুল জন্মশতবার্ষিকীতে সেমিনার

 

zainul_abedin_। দীপক রায় ।

বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলার জনক শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। তাঁর চোখে দেখা ব্রহ্মপুত্রের পাড়, কলকাতার উচুঁতলার মানুষের চলাচল, কলকাতা আর্ট কলেজের শিল্পের বারান্দা, তেতাল্লিশের দূর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অখন্ড ভারত ও নব্য বাংলাদেশের নানা রাজনৈতিক টানাপোড়ন, একে একে বদলে দিয়েছে তাঁর শিল্পচর্চা, ছবি আঁকার নিজস্ব ধারা। জয়নুল আজন্ম আগাগোড়া বাঙ্গালী হয়ে বারবার ফিরে গেছেন তাঁর শৈশব, কৈশোরের চিরচেনা ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। অতএব তাঁর রক্তে মিশে থাকা বাঙ্গালিত্ব তাঁকে গড়ে তুলেছে প্রান্তিক মানুষের জীবন শিল্পী, একজন অনুভূতিশীল মানুষ বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত আর নব্য বাংলাদেশে একজন প্রকৃত শিল্পগুরু হিসেবে।

২০১৪ ছিল জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবার্ষিকী। ২৯ ডিসেম্বর ১৯১৪সাল বৃহত্তর ময়মনসিংহের বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে জয়নুলের জন্ম। তাঁর সকল শিল্পের মধ্যে বাংলাদেশের সুপ্রতিষ্ঠিত চারুকলা অনুষদ অন্যতম। এই স্মৃতিবিজরিত স্থানেই চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন শিল্পাচার্যের জন্মশতবার্ষিকীকে ঘিরে। এর মধ্যে প্রধান আকর্ষণ ছিল “শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিন জন্মশতবর্ষ ২০১৪” উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত সেমিনার কার্যক্রম। জানুয়ারি মাসে এটি দুই পর্বে ৪ দিনব্যাপী ৮টি অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয়। ১ম পর্বে ৫ ও ৬ জানুয়ারি ২০১৫ সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের লেকচার থিয়েটারে। জয়নুল বিষয়ক এই মুক্ত আলোচনায় প্রাবন্ধিক দুলালচন্দ্র গাইন, শেখ মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান, ফারজানা আহমেদ, গোপাল চন্দ্র ত্রিবেদী, ড. আজাহারুল ইসলাম শেখ ও নাসিমুল খবির চার অধিবেশনে একে একে তাদের প্রবন্ধগুলো পাঠ করেন। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. ফরিদা জামান, ড. রশীদ আমিন, অধ্যাপক এফ.এম. কায়সার, ড. মলয় বালা, নাসিমা হক মিতু ও অধ্যাপক লালারুখ সেলিম। চার অধিবেশনে যথাক্রমে সৈয়দ আবুল বারক আলভী, অধ্যাপক সমরজিৎ রায় চৌধুরী, অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান এবং অধ্যাপক আব্দুস শাকুর শাহ দুই দিনব্যাপী প্রথম পর্বের সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন। সকল আলোচক ও প্রাবন্ধিকগণ তাদের প্রবন্ধে জয়নুল আবেদিনের চারুকলা অনুষদের সৃষ্টি ধারণা, তাঁর কাজের ধরণ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। জয়নুল আবেদিন চেয়েছিলেন কলকাতার মত বাংলাদেশেও একটি শিক্ষিত শিল্পীসমাজ গড়ে উঠুক; যারা এদেশের নিষ্পেষিত, অত্যাচারিত মানুষ তথা কুমোর, কামার, তাঁতী, মজুর, শ্রমিজ, জেলেসহ বাংলার প্রাণ কৃষকসমাজের কথা বিশ্বের দ্বারে তুলে ধরবে। তিনি তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কলকাতার চকচকে সমাজ, শিল্পের তথাকথিত ধ্যান-ধারণা, উচ্চ মানসিকতার ফ্যাশন ছেড়ে ফিরে এসেছেন পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিতে। ব্রম্মপুত্রের সেই সবুজ পাড়ে। এমন কি তিনি দীর্ঘদিন কলকাতায় থাকাসত্ত্বেও কথা বলতে কখনো নাগরিক বাংলা ভাষা ব্যবহার করেননি, ব্যবহার করেছেন তাঁর ময়মনসিংহের আঞ্চলিক মাতৃভাষা।

১১ ও ১২ জানুয়ারি সেমিনারের ২য় পর্বের অধিবেশনগুলোয় জয়নুলের ধ্যান-ধারণা, বাঙ্গালীচেতনা, শিল্পের সবুজ মাঠে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা, তাঁর আদর্শ, কেন্দ্রশক্তির বিপরীতে প্রান্তিকতার যুদ্ধের প্রবাদ পুরুষ, তাঁর আধুনিকতার পুনর্মূল্যায়ন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকশিল্পের পিছনে তাঁর পরিশ্রমসহ তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অনেক দিক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়। এটি অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বেগম সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে। এইপর্বে ১ম অধিবেশনে প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আজিজুল হক “শতবর্ষের আলোকে জয়নুল ও প্রাসঙ্গিক শিল্প ভাবনা” বিষয়ক তাঁর প্রবন্ধটি পাঠ করেন। আলোচক হিসেবে ছিলেন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনঞ্জুরুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাষ্টিজের সভাপতি জনাব এম আজিজুর রহমান। দুপুর ২টায় ২য় অধিবেশনে প্রাবন্ধিক জনাব সঞ্জয় চক্রবর্তী তাঁর প্রবন্ধ “জয়নুলের শিল্প শিক্ষার আদর্শ” পাঠ করেন। প্রবন্ধটি নিয়ে আলোচনা করেন জনাব মঈনুদ্দীন খালেদ। প্রাবন্ধিক সুমন ওয়াহিদ “বিশ শতকের আধুনিক শিল্পকলার সমাজ ব্যবস্থায় জয়নুলের আধুনিকতার পুনর্মূল্যায়ন” বিষয়টি তাঁর প্রবন্ধে তুলে ধরেন। অধ্যাপক বুলবন ওসমান অধিবেশনটির সভাপতিত্ব করেন। ১২ জানুয়ারি ১ম অধিবেশনে অধ্যাপক আবুল মনসুর “জয়নুল আবেদিনঃ কেন্দ্রশক্তির বিপরীতে প্রান্তিকতার শিল্পী” বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। আর নির্ধারিত আলোচক হিসেবে ছিলেন জনাব সাজ্জাদ শরীফ। সভাপতিত্ব করেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী অধ্যাপক রফিকুন নবী। দুপুর ২টায় ২য় অধিবেশনে প্রাবন্ধিক হিসেবে ছিলেন ওপার বাংলার গুরু সদয় সংগ্রহশালার কিউরেটর ড. বিজন কুমার মন্ডল। তাঁর আলোচনার বিষয় ছিল “অবিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চলের সংগ্রহ” এবং নির্ধারিত আলোচক হিসেবে ছিলেন চারুকলা অনুষদের ডীন অধ্যাপক নিসার হোসেন। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহা পরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান। পরে সেমিনারের সমাপ্তি ঘোষণা করেন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

জয়নুল আবেদিনের সংগ্রামী কার্যকলাপ, জীবনে ঘুটঘুটে অন্ধকারের ঝড়ের রাত পেরোনোর কথা প্রাবন্ধিকগণ বারবার সেমিনারের মুখ্য বিষয় হিসেবে তুলে এনেছেন। এপার বাংলা থেকে মুসলিম সমাজের চিরাচরিত নিয়ম ভেঙ্গে কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে যাওয়া প্রথম ছাত্র ছিলেন জয়নুল আবেদিন। গুরু হিসেবে পেয়েছিলেন নন্দনাল বসু ও মুকুল দে’র মতো সুপরিচিত শিল্পীদেরকে। কলকাতার পাঠ চুকিয়ে গলায় স্বর্ণপদক ঝুলিয়ে আর পকেটভর্তি সুনাম কুড়িয়ে যখন তিনি ব্রহ্মপুত্রের কোলে আবার ফিরে এলেন তখন সারাজীবন এদেশের কৃষিজীবি, শিক্ষার আলোক-বঞ্চিত, কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদ চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন মানুষের কথা ভেবেছেন। খুব সাধারণ কিন্তু প্রচন্ড শক্তিশালী রেখায় একের পর এক দূর্ভিক্ষের, দেশের রাজনৈতিক সংকটের ছবি এঁকেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ঘেঁষা উপলব্ধি জয়নুলকে ভীষণভাবে নাড়িয়েছিল; যা ওপার বাংলার শিল্পী সমাজ তখনো তেমনভাবে সারা জাগাতে পারেনি। জয়নুলের বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে দূর্ভিক্ষ চিত্রমালা (১৯৪৩), নবান্ন (১৯৭০) ও মনপুরা ৭০ (১৯৭৩) অন্যতম। তাঁর সবচেয়ে বড় শিল্পকর্ম হল ১৯৪৮ সালে ঢাকায় চিত্রশিল্পের প্রতিষ্ঠান যা আজ প্রসারিত হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে যারা বিশ্বে। এখন যেটি চারুকলা নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এর পিছনে জয়নুল আবেদিন এখনো বিমূর্ত যাকে শুধু পৃথিবীর মানুষ নয় এ দেশের মানুষ পর্যন্ত জন্মবার্ষিকী অথবা মৃত্যুবার্ষিকীতে ছাড়া খুঁজে পায়না। জয়নুল বুঝেছিলেন লোক শিল্পের মর্ম, একটি জাতির পরিচয়,অনেক গভীরের শিকড়। তাই তিনি সোনারগাঁও-এ বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তাঁর নিজের সংগ্রহ করা লোকশিল্পের উপকরণ দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন লোকশিল্প জাদুঘর। যা এখন সঠিক পরিচর্যার অভাবে ধূলোপড়ে, ঘুনপোকা ধরে নষ্টের পথে।

এই জন্মশত বার্ষিকীতে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়তো সারা বছরই হবে। তারপর ভুলে যাবো। আবার এই কথাগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরার জন্য আরো একশো বছর অপেক্ষা করতে হবে। সেমিনারের সমাপ্তি ঘোষণায় বিখ্যাত চিত্রশিল্পী অধ্যাপক রফিকুন নবী একটা কথা বলেছিলেন “আমি ভাবি যদি জয়নুল না জন্মাতো, যদি মায়ের দেয়া গয়না বিক্রি করে কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে না যেত, যদি এ বাংলায় ফিরে এসে চারুকলা অনুষদ প্রতিষ্ঠা না করত, তাহলে কী হত?”

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »