জয়নুলের সৃষ্টি : মগ্নপাঠ

zainul_abedin_at_akua_madrasha_quarter_kolkata

কলিকাতার আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টারে জয়নুল আবেদিন, ছবি: মইনুল আবেদিনের (শিল্পাচার্যের ছেলে) ফেসবুক থেকে নেওয়া

 

।।মইনুদ্দীন খালেদ।।

পটে কী আছে তা নিয়ে আগে ভাবা যাক। পটে আছে নদী। নদীর নাম ব্রহ্মপুত্র। আর আছে নদীপাড়ের উর্বর পলিমাটিতে ফসলের ক্ষেত, প্রফুল্ল বনানী আর চাষি ও মাঝি-মাল্লাদের জীবন। ব্রহ্মপুত্রকে সাধারণ অর্থে নদী বলা হয়; আসলে সে নদ। জলের লিঙ্গ-নির্ধারণ কবে কোন মানুষ করেছে, তা আমরা সঠিক বলতে পারি না। এ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি বেশি দূর প্রসারিত করার ক্ষমতা নাই। পুরাণ তো মানুষই কল্পনা করে রচনা করেছে। ব্রক্ষ বা ব্রহ্মের পুত্র, দুই-ই মানুষের ভাবনা মাত্র। কিন্তু উপসংহারে আমাদের মনে এই প্রতীতি জন্মে যে, ওই জলধারা বয়সে ঈশ্বরের চেয়ে প্রবীণ। হয়তো ওই জলধারার বয়স পরিমেয় নয়, অনুমেয়। ব্রহ্মপুত্র নদ অনাদি। কিন্তু তার পাড়ের মানুষের জীবনপ্রণালি অনাদি নয়। তার আদি, মধ্য ও বর্তমান জানা সম্ভব। অনাদি আর বর্তমান যেন সাদা ও কালো সুতোয় একই মালা গেঁথেছে; তাই দুই ইশারাকে আলাদা করে সময়কে আর শনাক্ত করা যায় না। সেই জল জয়নুলকে অনাদি-লোকে নিয়ে যেতে চেয়েছে। জল বড় কুহক। বর্তমানকে ভুলিয়ে রাখে। তরুণ মন মন্ত্রচালিতের মতো সেই কালের পাড়হীন শাশ্বত মায়ালোকে বিচরণ করে শিল্পী হওয়ার মন্ত্রণা পায়। বাংলার আকাশ, জল, মাটি, নিসর্গ সবই বড় চঞ্চল। এই নীল জলের গ্রহ সূর্যবন্দনায় সচল থাকতে চায়। আলো কমে গেলে তার ভালো লাগে না। তার ভালো লাগে দিনভর আলোর বিচিত্র প্রক্ষেপণ। সূর্যালোকিত ও মেঘাচ্ছন্ন- ব্রহ্মপুত্রের দুই রূপই জয়নুলকে সৃজনের প্রণোদনা দিয়েছে।

তাই জয়নুলের সৃজন-সকালের কাজে আছে জল, হাওয়া, আলোয় উদ্বেল নিসর্গের কলতান। ব্রহ্মপুত্রের রূপ আঁকতে গিয়ে ছবিকে বানিয়ে ফেলেছেন তিনি রাগ-রাগিণীর সহোদরা। আসলে কোনো রূপই স্থির নয়। নদীতীরে তুলি হাতে যে চিত্ররচনায় মনোনিবেশ করেছে সে-ই বুঝেছে সেই সত্য। রূপ সত্য নয়; সত্য রূপ-অরূপের পালাবদল; আসলে সত্যকে কোনো ধ্রুবতেই স্থির রাখা যায় না। নিত্য পরিবর্তনশীল আকাশ, মাটি, জল, হাওয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশ বাংলাদেশের নদী পাড়ে দাঁড়ালে বোঝা যায় কোনো কিছুই নিত্য নয়; বস্তুত প্রতীতি মাত্র। নানা রঙের ছোপে অনিত্যের স্বরলিপি রচনার খেয়ালের মধ্যেই নিহিত থাকে শিল্পের প্রাণভোমরা। টলটলে জল, ঘন কালো জল, হালকা ছোপে মেঘের উদ্‌গিরণ, স্বচ্ছতর ছোপে বাতাসের খেলা, কিছু রেখা অনুভূমিক, কিছু রেখা আকাশে উড্ডীন;- সব মিলিয়ে পরিণামে সৃষ্টি হয় নদীমাতৃক ভূগোলের চিত্রল অর্কেস্ট্রা। জয়নুলের মন-সৃজনের সূচনা-সকাল থেকে শুরু করে আমৃত্যু মথিত ছিল স্বদেশের প্রকৃতির সেই সুরেলা আবেশে। জীবনের নানা প্রহরে ফিরে ফিরে জেনেছেন এই রং, এই রেখা সময়ের সঙ্গে হৃদয়ের সংলাপ-বিনিময়। আর ওই মিথস্ক্রিয়াই শিল্প।

তবু কালের বিষবাষ্পে উবে যায় প্রকৃতির কুহকের সেই মিহিন জাল। শিল্প হারায় তখন দিব্যতা। জীবন তখন জেনে যায়, প্রকৃতির সঙ্গে তার বিধুর খেলা আর সমীচীন নয়। কেননা মানুষের আর্তনাদের চেয়ে হৃদয়বিদারক আর তো কিছু নেই মানুষের জীবনে। জয়নুল বদলে গেলেন। মরমিতার ঊর্ণাজাল ছিঁড়ে শিল্পী বেরিয়ে এলেন। তিনি তাঁর চিত্রপটে সাদরে আবাসিত করলেন দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে। চিরায়ত নয় আর, এই জাজ্বল্যমান বর্তমান হলো তাঁর ছবির বিষয়।

১৯৪৩। হৃদয়ের রক্ত উদ্গত হলো মস্তিষ্কে। শিল্পী জানলেন, মানুষই মানুষকে মারছে। দুর্ভিক্ষ ঔপনিবেশিক শাসক ইংরেজের কারসাজি। চিত্রতলের সব রং মুছে গেল। পুরু কর্কশ রেখায় শিল্পী আঁকলেন নিরন্ন মানুষের হাড়জর্জর দেহ। জানান দিলেন তিনি বিবেকের বিদ্রোহ। দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা রাজনৈতিক শিল্প। ঔপনিবেশিক দুঃশাসকের নিষ্ঠুরতা সম্প্রচারিত হয়েছে এসব ছবিতে। এই মৃত্যুর জন্য ইংরেজ দায়ী। মন্বন্তরে যারা ক্ষুধার জ্বালায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের কেউ ইংরেজ নয়, বাঙালি বাবুও নয়। যারা ফসল ফলিয়েছে তারাই ফসলহারা হয়েছে। এই চাষা-ভূষা, জেলে-মাঝি-মাল্লাদের জীবন-যাত্রাই জয়নুলকে জন্ম-জন্মান্তরে জানিয়ে গেছে- জীবন মূলত উজানে পাড়ি দিতে চায়। ফসল ফলানো মানে জীবনকে ফলিয়ে তোলা। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার দায় যে কৃষকেরা নিয়েছে তারা আসলে সভ্যতা টিকিয়ে রাখারই দায় নিয়েছে। মানবিকভাবে বাঁচার রসদ জুগিয়েছে। ফসল ফলানো যতই কষ্টকর হোক না কেন, তবু সে কাজ করতে করতে চাষা জীবন-সুখের গান গায়। আসলে জীবন ও শিল্প পরস্পরিত।

জয়নুল কখনো শহুরে নাগরিক হতে পারেননি। নগরের প্রসাধিত জীবন তাঁকে আকর্ষণ করেনি। যেসব চিত্রসৃষ্টি তাঁর রয়েছে, তার শতকরা পাঁচ ভাগও নাগরিক জীবনের ছবি নয়। প্রধানত চাষি, জেলে ও মাঝিমাল্লারা তাঁর ছবির নায়ক। এই নায়কেরাই সভ্যতার চাকা চালায়; মাছে-ভাতে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। এদের সঙ্গে আজন্ম জীবন বাঁধা ছিল বলে তাদের মৃত্যুতে তার মতো আর কোনো শিল্পীর তুলি এতটা মর্মবিদারী আর্তনাদ করতে পারেনি। দুর্ভিক্ষকবলিত শ্রমজীবীর আর্তনাদই যেন তাঁর ছবির বিষয়।

জয়নুলের ছবি মানে শিল্পী-চোখের অন্তর্ভেদী নিরীক্ষণ। মানুষের ও প্রাণিকুলের দেহপাঠ শিল্পীজীবনের অবশ্যপাঠ্য বিষয়। কেউ তা পাঠ করে পুঙ্খানুপুঙ্খ বৃত্তান্তে, কেউবা পরিমিত রেখার চালে সেই দেহকে শিল্পায়িত করে ফেলে। জয়নুল পরিমিত রেখায় মজবুত ড্রয়িংয়ে নির্ভরতা খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর ছবিতে আমরা পুরু রেখার গতিশীলতায় চোখের মণি ভর করে শিল্পসুখ পাই। তিনি বিশদ বয়ান দেন না। তবে যে দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা তাঁর ইতিহাসের দুর্ঘটনা জানান দেয়ার স্বার্থে সবচেয়ে স্বচ্ছ, সেখানেই তিনি রেখার কাটাকুটিতে মুখর রেখেছেন মানুষের মুখ। জঠরের জ্বালা তো আগ্নেয়গিরি মুখের মতোই বিদীর্ণ অবয়বে প্রকাশ পায়। দেহ তো পেশির শক্তি হারিয়েছে। তাই মুখে রচিত হয়েছে আর্তনাদের জ্যামিতি।

দুর্ভিক্ষের চিত্রে মানুষের পারিবারিক বন্ধনের সূত্র অকার্যকর হয়ে পড়েনি। মা-বাবা-ভাই-বোন ও আত্মীয়-পরিজন দলবদ্ধ হয়ে ডাস্টবিনে কাক ও কুকুরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে উচ্ছিষ্ট দখল করতে চাচ্ছে। তার বুকে-কাঁধে শিশুকে রেখে ধনীর গৃহের দরজায় মেলে ধরেছে ভিক্ষাপাত্র। ভিক্টোরীয় দালানের স্থাপত্যের আভাস, ডাস্টবিন- এসব উপাদান বলে দেয় কৃষিজীবী সভ্যতার সেই মানুষেরা আজ নিরন্ন, অনিকেত, পথবাসী এবং পথের কুকুরের কাছেও তারা পরাজিত। আর ক্ষমতাধর শাসক ও শাসককুলের পরিজন-বন্ধুরা সেই দালানে যাপন করছে নিশ্চিত জীবন।

জয়নুল অনাবিল জীবনছন্দের রূপকার। সহজিয়া রাগ শোনার জন্য তিনি সাঁওতালদের পাড়ায় গিয়েছেন। সেখানে গিয়ে দেখেছেন কী সুন্দর বন্ধন নর ও নারীতে। কর্মের সংস্কৃতিতে মুখরিত তাদের জীবন। শুধু সাঁওতাল নয়, গারো, হাজং, চাকমাসহ অনেক মানুষকে এঁকেছেন জয়নুল। বিভিন্ন জাতির মানুষকে আঁকতে গিয়ে শিল্পীকে বারবার সম্মুখীন হতে হয়েছে মানবদেহের অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তি রূপায়ণের পরীক্ষায়। বাঙালি ও বাঙালির প্রতিবেশী অন্য নৃগোষ্ঠীর মানুষ ও তাদের জীবন চিত্রায়িত করার মধ্যে নিজেকে তৃপ্ত মনে হয়নি তাঁর। মানুষ যে তাঁর কত প্রিয়, তা তাঁর আঁকা পৃথিবীর নানা দেশের মানুষের ছবির দিকে তাকালে বোঝা যায়। আরব, জাপানি, মেক্সিকান, ইংরেজ, আমেরিকান, মিসরীয়, পাঞ্জাবি- এসব মানুষকে আঁকতে গিয়ে শিল্পী জাতিগত স্বতন্ত্র দেহজ বৈশিষ্ট্য প্রণয়নে অভূতপূর্ব পারমিতার পরিচয় দিয়েছেন। আমাদের জানা মতে, অন্য কোনো শিল্পী পৃথিবীর এত মানুষের দেহের সৌষ্ঠব পাঠ করেনি। জয়নুল যেভাবে মানুষের প্রেমে পড়েছেন তাতে আমাদের এই বিশ্বাস জন্মে যে তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখেছেন। কোনো রাজনৈতিক আদর্শে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন বলে আমাদের জানা নেই। এই প্রাকৃত পৃথিবী আর তার মধ্যে কর্মিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতি তাঁর মধ্যে উজিয়ে রেখেছিল সৌন্দর্যবোধ ও বিশুদ্ধ বিবেক। জয়নুলের ছবির মানুষের পাঠ নিতে হলে জাতিতাত্ত্বিক বিদ্যা বা অ্যাথনোগ্রাফির শরণাপন্ন হতে হবে।

প্রতিষ্ঠানের বিদ্যা-শিক্ষা নিজেকে পূর্ণভাবে বিকাশের সুযোগ দেয় না। জয়নুল বুঝেছিলেন, কলকাতার চেয়ে বড় তাঁর কাছে আঁতুড় আবাস ব্রহ্মপুত্র পাড়ের প্রকৃতি ও জনজীবন। তাই তিনি আমৃত্যু এঁকে গেলেন নদী, নৌকা আর মানুষ। ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, ‘মনপুরা ৭০’ আর ’৭১-এর ছবিগুলো ছাড়া জয়নুলের প্রধান শিল্পে যে শ্রমজীবী মানুষ চিত্রায়িত হয়েছে, তাতে জীবনের কষ্ট মুদ্রিত হয়নি। জয়নুল জল ও জমিনে কর্মিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। কিন্তু শিল্পী মাত্রই কল্পনার ডানার পালক স্পর্শ অনুভব করেন। তাঁর কাজে আমরা খুঁজে পাব একই সঙ্গে রোম্যান্টিসিজম ও রিয়ালিজম। এই দুই আদর্শের যৌথায়নে শিল্পে তার বেজে উঠেছে কর্মমুখর জীবনের জয়গান। তাই ‘মই-দেয়া’ ছবিতে অবলোকন মাত্র। আমরা মইয়ে বসে থাকা চাষি ও চাষি-শিশুর মতো পুলক অনুভব করি। সে পুলক দানাদার মাটির জমিনে অজস্র বৃত্তচাপের মতো রেখার সংকেতে আরও হর্ষিত হয়ে পড়ে। শ্রমের কষ্ট নয়, বরং মইয়ে চড়ার আনন্দ দোলাই এ ছবির বিষয়।

‘মই-দেয়া’র চেয়েও কাব্যময় জয়নুলের ‘গুনটানা’। নদী বয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে বয়ে যাচ্ছে আনত-মুখ দুই মাল্লা। মাল্লারা গুন টানছে। খুবই কষ্টের কাজ। বাতাসের বিপরীতে কাদামাখা তীর ধরে নৌকাকে টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু এবারও কষ্ট নয়, আনন্দ। বহমান নদীতে সোনালি-রুপালি ঢেউ। রঙিন নদীর ঢেউয়ে বিলীন দুই মাল্লা। তাদের মালকোঁচা দেওয়া লুঙ্গিও রঙিন। তাদের দেহ স্থাপিত নদীর জলে। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। মুখগুলো পুতুলের মতো। কিন্তু তাদের দেহ নদীর মতো প্রবহমান। প্রলম্বিত দেহের শক্তির ভরকেন্দ্র তাদের কাঁধে আটকানো কাঠের টুকরায়। এই কাঁধে দড়ি বেঁধে তারা নৌকা টানছে। দড়ি, দড়ির টানের ইশারাময় রেখা, অনুভূমিকভাবে প্রবহমান মানুষের দেহ আর নদী- সবই আনন্দময় জীবনের সঙ্গীতের উপাদান। যেন মুর্শিদী, মারফতি বা বাউলের গান গেয়ে গুন টানছে মাল্লারা। আর তাদেরই গানের ব্যঞ্জনা যেন রঙিন ঢেউ তুলেছে নদীতে।

তবে কাদায় দেবে যাওয়া গরুর গাড়িকে যখন একজন মানুষ চালাতে গিয়ে শক্তি প্রয়োগ করে, সেখানে আর রোম্যান্টিসিজম খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষের শক্তির পরীক্ষা এই ছবি। মানুষের দেহজ শক্তি, মানুষ-উদ্ভাবিত চাকার প্রকৌশল আর দুটি গুরুর শক্তির সমন্বয়ে কাদায় ডুবে যাওয়া গাড়ি আবার গতি পাবে- এই ইঙ্গিতে সরসতা পেয়েছে এই ছবি। এখানে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে মানুষটি যেভাবে গাড়ির চাকাকে ঘোরাতে চাচ্ছে, তাতে মনে হয় মানুষটি যেন একটি গরুর গাড়ির চাকাকে ঘোরাতে চাচ্ছে না, বরং সভ্যতার চাকাকেই সচল রাখার দায়িত্ব নিয়েছে।

জয়নুলের প্রধান চিত্রগুলো মানুষের জীবনযাত্রার মুদ্রা। প্রধানত তাতে বাঙালির জীবনের সংগ্রাম ও বিশ্রামের অভিব্যক্তি পরিস্ফুট হয়েছে। যৌবনবতী নারীর হৃষ্ট দেহভঙ্গি আঁকলেও তাতে শিল্পী কামবাসনার রক্তিম ছাপ দেননি। কামবাসনা না থাকায় অনেকেই মনে করেন, তাতে পুরুষালি দৃষ্টি (male gaze) নেই। পুরুষ-দৃষ্টিপাত তো অবশ্যই আছে। কিন্তু তা কামবাসনার সাংকেতিক নয়। ওই নারী দেহের হৃষ্ট অভিব্যক্তি ও পুরুষ-দৃষ্টিরই আবিষ্কার। আর কামবাসনা যদি শিল্পোত্তীর্ণ হয়, তা-ও তো পৃথিবীর শিল্পেরই পরম পাওয়া। তা পিকাসোতে সুপ্রচুর পরিমাণে আছে। আছে কামরুল হাসানেও। তবে জয়নুলের নারীরা সাধারণত কামনায় থরো থরো নয়। কলসি কাঁখে নারী, স্নানরতা কয়েকজন নারী, প্রসাধনরত নারী- এমন বিষয় তিনি চিত্রিত করেছেন লোককলার ভাষা পুনর্বিন্যাস করে এবং বাস্তববাদী একাডেমিক নিয়মেও। একটি ছবিতে দেখা যায় সুকেশী এক নারী তার কেশরাশি আঙুলে চেপে দুভাগ করে মাথায় তেল দিচ্ছে। তার দেহে স্তনের উদ্ভিন্ন প্রকাশ পুরুষালি মনকে অধীর করে নাকি? তাই আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারি না যে জয়নুলের ছবির নারীদের দেহে পুরুষের কামবাসনার দৃষ্টিবাণের কোনো চিহ্ন নেই। তবে জয়নুলের এক প্রধান শিল্প-অভিসন্দর্ভ মা ও শিশুর মানবিক সম্পর্ক। মাতৃমূর্তি জননীকে তিনি নানাভাবে চিত্রিত করেছেন। স্তনদায়িনী মাতৃরূপ বাংলার লোককলা ও পশ্চিমের কিউবিজমের যুগলবন্দি ভাষায় এমন নান্দনিকভাবে আর কেউ আঁকতে পেরেছেন বলে আমার জানা নেই। আর মায়ের আঁচলের আড়ালে শিশুর লুকোচুরি-খেলার মতো দৃশ্য আমাদের অভিভূত করে রাখে। ১৯৫৩ সালেই শুধু ‘মা ও শিশু’ এবং ‘মা-বাবা-শিশু’ এই মানববন্ধন বহুবার এঁকেছেন জয়নুল। স্তনদাত্রী জননীই তো মানুষের সভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রতিমা। জয়নুলের নারী-প্রতিমার স্বরূপ উন্মোচনে আমরা যদি সংবেদী মন নিয়ে মেধাবী গবেষণা করতে পারি, তাহলে বিশ্বদরবারে প্রমাণ করা সম্ভব হবে কেন এই বাঙালি শিল্পী পৃথিবীর যেকোনো শিল্পীর পাশে স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

ময়মনসিংহের লম্বাগলা পুতুলের গড়ন থেকে প্রত্যক্ষ অনুদান নিয়ে জয়নুল এঁকেছেন তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘পাইন্যার মা’। দীঘল গলা আর দুহাতের তালুতে ধরা ঊর্ধ্বমুখী অবয়বে পরিস্ফুট রয়েছে ভাস্কর্য-সুলভতা। বেহুলাপ্রতিম এই ধৈর্যশীলা নারী অভিব্যক্তির প্রতিমায়নে জয়নুল প্রমাণ করেছেন বাঙালি নারীর আর্কিটাইপ। প্রত্নপ্রতিমার নবায়নে জয়নুল আমাদের চিনিয়ে দিয়ে গেছেন এ দেশের সভ্যতার শিকড়।

(বি.দ্র. : স্লাইডারে দেওয়া ফটোগ্রাফগুলো ইন্টারনেট থেকে নেওয়া। সুনির্দিষ্ট তথ্যসূত্র আমাদের কাছে নেই। এজন্য আমরা আন্তরিকভাবে দু:খিত। যদি কারো সূত্র জানা থাকে তবে দয়া করে আমাদের জানাবেন। – সম্পাদক)

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »