ছাপচিত্রে জীবনের দিনলিপি

nittananda।মুজিবুল হক।  স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছে কিছু মানুষ। একজন পুরুষের বিপরীত দিকে মুখ করে বসে আছে সাদা শাড়ি পরিহিত এক নারী। পাশে আরেকজন বসে বসে ঝিমুচ্ছে। কেউ কেউ তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। ওপরে সংবাদপত্রে লেখা রেল অবরোধ। স্টেশনের এমনি রূপ সংবাদপত্রের ওপরে ছাপচিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী নিত্যানন্দ গাইন। ‘ওয়েটিং ফর জার্নি-২’ শিরোনামে প্লেনো গ্রাফিক অন পলিস্টার (লিথোগ্রাফ) মাধ্যমে করা ছাপচিত্রটি স্থান পেয়েছে শিল্পী রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারিতে।

১৮ ফেব্রুয়ারি চারুকলা অনুষদের শিল্পী রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারিতে ৩০টি ছাপচিত্র নিয়ে শুরু হয় শিল্পী নিত্যানন্দ গাইনের দ্বিতীয় একক ছাপচিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন শিল্পী মনসুর উল করিম। অতিথি ছিলেন চারুকলা অনুষদের পরিচালক নাসিমা আখতার, শিল্পী জসিম উদ্দীন ও শিল্পী শায়লা শারমিন।

প্রদর্শনীতে ঢোকার পর চোখে পড়বে একটি ট্রেনের টিকিট, তার ওপরে সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে একজন নারীসহ সাতজন পুরুষ। দেখলেই বোঝা যায়, ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য তারা সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়ানো। টিকিটের ওপরে এক পাশে লেখা হ্যাপি জার্নি আর অন্য পাশে লেখা আছে শুভযাত্রা। গাঢ় ম্যাজেন্টা ও কালো রঙের ব্যবহারে এচিং মাধ্যমে করা ছাপচিত্রটির নাম ‘ওয়েটিং ফর জার্নি’।

শিল্পীর কাজে আমাদের চারপাশের ঘটে যাওয়া প্রতিনিয়ত ঘটনাপ্রবাহকে তাঁর ছাপচিত্রের মাধ্যমে নিজস্ব ঢঙে হাজির করেছেন এবারের প্রদর্শনীতে। প্রায় ছবিতে তিনি পিরামিডিক্যাল কম্পোজিশন তৈরি করেছেন। সূক্ষ্ম আড়াআড়ি রেখা, বিন্দু ও মোটা ব্রাশের ব্যবহার ছবির জমিনে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। তাঁর চিত্রপটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সংবাদপত্র ও ছাপা অক্ষরকে কাজের ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার। এতে রেখা ও রঙের সংবেদনশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তার কাজে। তাঁর চিত্রপটগুলো ভরাট করেছেন সূক্ষ্ম রেখা, বিন্দু, এ্যাকুয়ান্টিং ও অক্ষরের টেক্সচারের মাধ্যমে। কিছু কাজে মোটা ব্রাশের ব্যবহার করেন লিথোগ্রাফে টুস পদ্ধতির মাধ্যমে। আবেগের মাধুর্যের চেয়ে টেকনিক ও এক্সপেরিমেন্টালি মুখ্য সৃষ্টির ফুল হয়ে ফুটেছে। তাঁর সব কাজই সাদাকালো। তবে সারফেসের প্রয়োজনে তিনি ব্যবহার করেছেন লাল, সবুজ, ম্যাজেন্টা, কমলা ও হলুদ। তাঁর কাজে পলিয়েস্টার, লিথোগ্রাফ, ব্লক, ফটো এবং উডকাটের ছাপ নিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করেছেন কিছু কিছু ছবিতে আর লাইনের বহুমাত্রিকতার ভিন্নতা বর্ণিল করেছে প্রদর্শনীর কাজগুলোকে।

গ্যালারির দেয়ালে উঠে এসেছে গ্রামের বাড়ির আঙিনায় কর্মরত নারী, লাঠি হাতে বসে থাকা মাঝ বয়সী মানুষ, হুইলচেয়ারে বসা মানুষ সেখানে লিখা উই আর অলসো উই আর রাইট, হাঁটু ভেঙে যুবককে বসিয়ে তার পেছনে হাত বাঁধা হয়েছে দড়ি দিয়ে, সারা দিনের কাজ সেরে বিশ্রাম নেওয়া মানুষ, এক তারা হাতে বাউল, চাবির রিং, নিসর্গ, প্রতিকৃতি, গতিশীল মানুষ মালপত্র নিয়ে হেঁটে চলছে, কথা ছিল একটি পতাকা পেলে, টানা রিকশা, হতাশ ও অবসন্ন হয়ে বসে থাকা মানুষ, ঠেলাগাড়ির ওপর ঘুমিয়ে পড়া মানুষ। এই কাজগুলো দেখে দর্শক যেন অনুভব করতে পারেন নিত্যানন্দ গাইনের শিল্পরচনার পুরো বিষয়।

এবারের প্রদর্শনী নিয়ে শিল্পী নিত্যানন্দ গাইন বলেন, ‘আমাদের দেখা প্রতিদিনকার ঘটনা, রাস্তা ও স্টেশনের আশপাশের মানুষগুলো যেভাবে জীবন যাপন করছে, তা তুলে ধরতে চেয়েছি আমার ছাপচিত্রে যা কিছুটা হলেও আমাদের মানবিকতাকে নাড়া দেবে।’

শিল্পীর তাঁর দেখা ও সুচিন্তিত নানা পর্যায়কে নিজের অনুভবে তুলে ধরেছেন এই প্রদর্শনীতে। ২০১৩ সালে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ‘ফ্রম দ্য স্ট্রেশন’ নামে তাঁর একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া শিল্পী নিত্যানন্দ গাইনের প্রদর্শনী চলে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ পর্যন্ত।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »