আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র উৎসব, ছবিমেলা ৮

আলোকচিত্রের বিশ্বমেলা

chobimeela

।ফরিদা ইয়াসমীন রত্না । গত ২৩ জানুয়ারি ২০১৫ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালায় ছবিমেলা ৮-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। এর উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মাননীয় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, লেন্স ব্লগের সম্পাদক এবং নিউইয়র্ক টাইমসের সিনিয়র আলোকচিত্রী জেমস এস্ট্রিন এবং গিও ম্যাগাজিনের আলোকচিত্র পরিচালক রুথ ইখর্ন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে বেলা ৩টায় প্রেসক্লাব থেকে শিল্পকলা একাডেমী পর্যন্ত একটি র‌্যালির আয়োজন করা হয়। দৃক, পাঠশালা ও ছবিমেলার সদস্যরা, আলোকচিত্রীরা এবং নানা পেশা ও শ্রেণির মানুষ এই উৎসবমুখর র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করেন।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন উৎসব পরিচালক শহিদুল আলম। তিনি বলেন, ‘আলোকচিত্র একটি শক্তিশালী অস্ত্র, যুদ্ধ কেবল অস্ত্র দিয়েই জেতা যায় না, যুদ্ধ জেতার জন্য লোকবলও সমানভাবে জরুরি। তাই বহু আগে আমি আমার দুজন বন্ধুকে ফ্রান্সের আর্লস শহরের উৎসবে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার আরেক বন্ধু আব্বাস, যে কিনা তখন ছিল ম্যাগনামের চেয়ারম্যান, তাদের দুজনকে সেসব জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে কোনো এক সময় কিংবদন্তিরা হেঁটে গিয়েছিলেন। সেদিন আমি আমার সেই দুই তরুণ আলোকচিত্রী বন্ধুর চোখে স্বপ্ন দেখেছিলাম; একটা ছোট বাস্তব থেকেই একটা বড় স্বপ্ন তৈরি হয়! আমি বুঝেছিলাম, দর্শক যদি উৎসবের কাছে যেতে না পারে, উৎসবকে পৌঁছে দিতে হবে দর্শকের কাছে। আমার সেদিনের সেই উপলব্ধি থেকেই ছবিমেলার জন্ম। আজকে বাংলাদেশ বিশ্ব আলোকচিত্র শিল্পে যতটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার অনেকটাই অবদান ছবিমেলার বলে আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি।’ উৎসব পরিচালক ছবিমেলার সব সহকারী ও সদস্যের সব ধরনের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান।

মাননীয় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আন্তর্জাতিক মানের এমন একটি আয়োজনের জন্য দৃক ও পাঠশালার সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি আরও বলেন, ‘এটি কেবল শুরু, আমি নিশ্চিত কয়েক বছর পর যখন ছবিমেলা আরও সফল হবে, তখন আমরা এই দিনটাকে স্মরণ করব এবং এই ভেবে আনন্দিত হব যে আমরা এই অসাধারণ দিনটার সাক্ষী ছিলাম। এবং আমাদের সন্তানেরা এবং তাদের সন্তানেরা আমাদের এই ভূমিকার জন্য আমাদের মনে রাখবে। আমি ছবিমেলার আয়োজকদের অভিনন্দন জানাচ্ছি বাংলাদেশি সমাজ তথা বিশ্ব সমাজকে এমন একটি আসাধারণ আয়োজন উপহার দেওয়ার জন্য এবং আমি এই আয়োজনের অংশ হতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি।’ বক্তব্যের শেষে রাষ্ট্রপতি উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

লেন্স ব্লগের সম্পাদক এবং নিউইয়র্ক টাইমসের সিনিয়র স্টাফ আলোকচিত্রী জেমস এস্ট্রিন বাংলাদেশের আলোকচিত্রী এবং তাদের কাজের প্রশংসা করেন। এবং তরুণ আলোকচিত্রীদের সঠিক পথ দেখানোর জন্য দৃক এবং পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটকে কৃতিত্ব দেন।

মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর দৃকের ২৫ বছরের প্রশংসাসূচক অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী ছবিমেলার নান্দনিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা ছবিমেলার মাধ্যমে আগামী দুই সপ্তাহ শিল্পকলার গ্যালারির দেয়ালগুলোতে এবং ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় যে বিশ্বমানের উপস্থাপনাগুলো দেখবেন, সেগুলো যেমন নান্দনিক, তেমনি মানসম্পন্ন আর্টিস্ট টক আর কর্মশালাগুলোও। গ্যালারির বাইরের প্রদর্শনীগুলোর মূল উদ্দেশ্য কেবল একটি শ্রেণির জন্য নয়, বরং জনসাধারণের জন্য শিল্পকলা একাডেমী এমন একটি আয়োজনের সঙ্গে থাকতে পেরে গর্বিত।’

গিও ম্যাগাজিনের আলোকচিত্র পরিচালক রুথ ইখর্ন বাংলাদেশে আলোকচিত্রশিল্পের অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘কেউ যদি আমাকে মধ্যরাতে ঘুম থেকে জাগিয়ে বাংলাদেশের সেরা পাঁচ আলোকচিত্রীর নাম জানতে চায়, আমি চোখ বন্ধ করে নিমেষেই বলে দিতে পারব। তবে অন্যান্য অনেক বড় ও উন্নত দেশের ক্ষেত্রে হয়তো আমি এতটা নিশ্চিত থাকব না এবং উত্তর না দিয়েই আবার ঘুমিয়ে যাব!’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মিতা চৌধুরী। উদ্বোধনের পর বিশেষ অতিথিরা গ্যালারি ঘুরে দেখেন। শিল্পকলা একাডেমীর গ্যালারিতে যাদের কাজ ছিল তারা হলেন আন্তোয়ান ব্রুই, আর্থার বন্ডার, দিনেশ অবিরাম, হাদী উদ্দীন, যানা রোমানোভা, জান্নাতুল মাওয়া, কেভিন বুব্রিস্কি, ল্যারি টাওয়েল, লরা এল-তানতাউই, ম্যালকম হাচেসন, মারিয়া কাপায়েভা, মিশেল লে বেলহোম, পাওলো পাত্রিজি, রতিমি ফ্যানি-কায়োদে, তুশিকুর রহমান ও শিরিন নিশাত।

১১টি ভেন্যুজুড়ে এই উৎসব চলে গত ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এবারের ছবিমেলার বিষয় হচ্ছে ‘অন্তরঙ্গ’। ২২টি দেশ থেকে ৩০-এর অধিক শিল্পীর কাজ এবারের উৎসবে প্রদর্শিত হয়। ৬টি গ্যালারি মিলিয়ে এবার ছিল ৩২টি প্রিন্ট প্রদর্শনী এবং একটি ভিডিও প্রজেকশন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, দৃকের দুটি গ্যালারি, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ এবং নতুন হওয়া ডেইলি স্টার-বেঙ্গল আর্টস প্রিসিঙ্কট, জাতীয় জাদুঘর, বকুলতলা, বৃত্ত আর্টস ট্রাস্ট, বিউটি বোর্ডিং, নর্থব্রুক হল, বুলবুল ললিতকলা একাডেমীতে এবারের প্রদর্শনীগুলো হয়। আর রিকশা ভ্যানে করে প্রদর্শনীর ছোট ভার্সনগুলো তো বরাবরের মতো শহরময় ঘুরেছেই, গ্যালারি থেকে প্রদর্শনী ঘুরে বেড়ায় পথে পথে, মানুষের কাছে। এ বছর চারুকলার বকুলতলা, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কিংবা বিউটি বোর্ডিয়ের মতো জায়গাগুলোতে প্রদর্শনীর মাধ্যমে আলোকচিত্রকে সর্বগামী করে তোলা হয়েছে এবং স্থাননির্বিশেষে ছবিমেলাও আরও বিস্তৃত হয়েছে। প্রদর্শনী ছাড়াও আরও আয়োজনের মধ্যে ছিল লেকচার, প্যানেল ডিসকাশন, আর্টিস্ট টক, গ্যালারি ওয়াক, ওয়ার্কশপ আর পোর্টফোলিও রিভিউ। এসব আয়োজনের বেশির ভাগই বিশ্বব্যাপী দর্শকদের জন্য সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে। শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানও ছিল এই আয়োজনে।

ছবিমেলা ৮-এর সহযোগিতায় ছিল সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অ্যাম্বাসি অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ঢাকা, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এবং গ্যেটে ইনস্টিটিউট। ছবিমেলা ৮-এর অ্যাসোসিয়েট পার্টনার ছিল মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, বার্জার পেইন্ট ও স্কয়ার গ্রুপ। ফ্যাসিলিটেটিং পার্টনার হিসেবে ছিল মোহাম্মদী গ্রুপ, নভো এয়ার, বাংলা ট্র্যাক কমিউনিকেশন্স, বেক্সিমকো গ্রুপ, স্প্যানিশ অ্যাম্বাসি এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ। মেলার ভেন্যু পার্টনার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, দ্য ইএমকে সেন্টার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। হেড অফিস কমিউনিকেশন, আতেলিয়ার রবিন আর্কিটেক্টস এবং বৃত্ত আর্টস ট্রাস্ট সৃষ্টিশীল সহযোগী হিসেবে সহায়তা করেছে। এবারের ছবিমেলা ছিল ইন্টার ক্লাউড প্রযুক্তি সহযোগী। ছবিমেলা ৮-এর ক্যাটালগটি এবারের অন্যতম আকর্ষণ, যেটি করতে সহায়তা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। ফ্লোরা, দ্য এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, ইস্টার্ন ব্যাংক এবং টাইগার মিডিয়া আতিথেয়তায় সহযোগিতা প্রদান করেছে। দুই সপ্তাহব্যাপী এই উৎসবের আয়োজন করেছে দৃক ও পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট।

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ছবিমেলা ৮-এর অংশ হিসেবে আনোয়ার হোসেনের আলোকচিত্র নিয়ে হয়েছে প্রদর্শনী। ২৪ জানুয়ারি ২০১৫তে বিকেল সাড়ে ৪টায় গ্যালারি ভিজিটে যান আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেন স্বয়ং, সঙ্গে ছিলেন ছবিমেলার সদস্যরা। আনোয়ার হোসেন ছবিমেলাতে প্রদর্শিত তার কাজ নিয়ে অতিথিদের সঙ্গে কথা বলেন। এ বছর ছবিমেলা বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য এই কিংবদন্তি আলোকচিত্রশিল্পীকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করে। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এই পুরস্কার আনোয়ার হোসেনের হাতে তুলে দেন। আনোয়ার হোসেন একাধারে একজন আলোকচিত্রী, সিনেমাটোগ্রাফার এবং স্থপতি। তিনি ১৯৬৭ সাল থেকে আলেকচিত্রশিল্পের সঙ্গে জড়িত এবং তার কাজগুলোর মূল বিষয় শহুরে এবং ফোক সংস্কৃতি। ৬০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার, আলোকচিত্রের ওপর বই, একক প্রদর্শনী এবং তার দুর্দান্ত আলোকচিত্রের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের আলোকচিত্র এবং সমসাময়িক আলোকচিত্রকে একটি নতুন ইতিবাচক স্থানে তুলে ধরেছেন। এবারের মেলার উৎসব পরিচালক শহিদুল আলম বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্পে আনোয়ার হোসেনের অবদানকে ‘সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মেলার অংশ হিসেবে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে প্রদর্শিত আনোয়ার হোসেনের ছবিগুলো তার কাজের রেট্রোস্পেকটিভ।

একই দিনে গ্যেটে ইনস্টিটিউটে বিশ্বখ্যাত ম্যাগনাম আলোকচিত্রী ল্যারি টাওয়েলের সঙ্গে আর্টিস্ট টক অনুষ্ঠিত হয়। ল্যারি টাওয়েলের বিজনেস কার্ডে তার পরিচয় লেখা ‘হিউম্যান বিং’! একজন কবি এবং ফোক সঙ্গীতে অভিজ্ঞতা তার আলোকচিত্র ক্যারিয়ারে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। ছবিমেলার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে প্রদর্শিত হয়েছে ল্যারি টাওয়েলের ‘দ্য মেনোনাইটস’ সিরিজটি।

ছবিমেলার সামগ্রিক আয়োজন, আলোকচিত্রশিল্প নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের ভাবনা, আলোকচিত্র নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ ভাবনা এবং আজীবন সম্মাননা পুরস্কারপ্রাপ্তি- এসব নানা বিষয় নিয়ে কিংবদন্তি আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন তার বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যেকোনো পুরস্কারপ্রাপ্তিই আনন্দের। যেমন শরতের মেঘ দেখার মতো, শীতের কুয়াশার মতো। আজীবন সম্মাননা পুরস্কার আমার আরও আগেই পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেরি করে হলেও শেষ পর্যন্ত আমি তা পেয়েছি, যা আনন্দের। যদিও ছবিমেলার দেওয়া অ্যাচিভমেন্ট এটি। আলোকচিত্রশিল্পে অবদানের জন্য ছবিমেলা আমাকে এ পুরস্কার দিয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে আমি কোনো স্বীকৃতি এখনো পাইনি। যদিও রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছি। দেশের লোক যখন আমার আলোকচিত্রশিল্পকে ভালোবাসবে, দেশ যখন ভালোবেসে আমাকে কোনো পুরস্কার দেবে, সেটাই আমার জন্য বড় পুরস্কার। তবে এবারের ছবিমেলার পুরস্কার জাতীয় পুরস্কারের ভাবধারায় আমার কাছে আসল। এটা আমাকে আনন্দিত করেছে, কিন্তু সুখী করেনি।

ছবিমেলার আয়োজন আমার অসাধারণ লেগেছে। এটি একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ। পুরো আয়োজন খুব সাকসেসফুল মনে হয়েছে। আমাদের দেশে সরকারি বিপুল বাজেটে, অনুদানে অনেক ইভেন্ট হয়। কিন্তু অনেকাংশে তা সাকসেসফুল হয় না। বাংলার সংস্কৃতিকে তুলে ধরে- এমন কিছুকে তুলে ধরতে পারলেই তা সফলভাবে হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রাইভেট অর্গানাইজেশনগুলোই এগিয়ে আসে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগ দরকার এসব ক্ষেত্রে। ছবিমেলার মাধ্যমে আলোকচিত্রশিল্প ত্বরান্বিত হচ্ছে। মানুষে-মানুষে, ধর্মে-ধর্মে, ভাষায়-ভাষায়, জেলায়-জেলায় বন্ধন তৈরি হচ্ছে।

ইরানের আলোকচিত্রশিল্পী শিরিন নিশাতের কাজের বিষয়বস্তু ‘টার্বুলেন্ট’ (অবাধ্য)। ইরানের ইসলাম রীতি এবং সামাজিক প্রথা অনুযায়ী পুরুষেরা জনসম্মুখে পারফর্ম করতে পারে এবং নারীরা তা পারে না। টার্বুলেন্টের মাধ্যমে নিশাত এই লিঙ্গবৈষম্যের কথাই তুলে ধরেছেন। দুটি বিপরীতমুখী দেয়ালের মাধ্যমে নিশাত তার উপস্থাপনার দুটি ভাগকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন এবং পুরো উপস্থাপনাটিই সাদা-কালো।

মিসরের আলোকচিত্রী লরা এল-তানতাউইর কাজের বিষয়বস্তু- আই উইল ডাই ফর ইউ: এক্সপ্লোরিং দি ইন্টিমেট বন্ড বিটুইন ম্যানও অ্যান্ড লর্ড (আমি তোমার জন্য জীবন দেব: মানুষ ও জমির অন্তরঙ্গ বন্ধনের খোঁজে)

ভারতে গত ১৫ বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। কেউ কেউ সরকারি ঋণসূচির মাধ্যমে ধার করেছেন। কেউ ব্যক্তিগতভাবে ধার নিয়েছেন আরও ভালোভাবে ফসল ফলানোর জন্য। কিন্তু তাদের কেউই সেই ঋণ শোধ করতে পারেননি। গ্রাম থেকে শিল্প শহুরে অর্থনীতি থেকে মুক্ত অর্থনীতি যেভাবে দ্রুতবেগে ভারতের অর্থনৈতিক চিত্র পরিবর্তন হয়েছে, তাতে সেখানকার কৃষকেরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে পড়ছেন। আলোকচিত্র, ভিডিও এবং আর্কাইভ করা তথ্যের সমন্বয়ে এ কাজটি সাজানো হয়েছে। যেখানে অনুসন্ধান করার চেষ্টা হয়েছে কৃষকদের গণ-আত্মহত্যার বিষয়টি। মানুষ আর জমির অদ্ভুত বন্ধনকে এই কাজের মূল সঞ্চালক ধরে নেওয়া হয়েছে। এ এক অনন্য সম্পর্ক, যেখানে কৃষক নির্ভরতা দেন জমিকে, আর জমি নির্ভরতা দেয় কৃষককে। আর এই অনুভূতি কেবল একজন কৃষক বুঝতে পারেন।

বাংলাদেশের আলোকচিত্রী জান্নাতুল মাওয়া কাজ করেছেন ক্লোজ ডিসটেন্স’ (নিকট দূরত্ব) বিষয়ের ওপর। তিনি বলেন, ‘আমি শহরের বিভিন্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণীদের কাছে যাই এবং তাদেরকে বলি যে, আমি তাদের সঙ্গে বাড়ির কাজের লোককে একই সোফায় বসিয়ে ছবি তুলতে চাই। এদের নৈকট্যের স্থায়িত্ব খুব কম সময়ের জন্য। কেবল একজন আলোকচিত্রী ঘরে ঢুকে ছবি তুলতে চাইছে দেখে পাশে বসালেই দূরত্ব বা বৈষম্য ঘুচে যাবে না। আমি আমার এই কাজের মাধ্যমে শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্মীর সঙ্গে কাজের লোকের ‘দূরত্ব’ আর ‘শ্রেণিবিভেদ’, দূর করার চেষ্টা করেছি মাত্র। আমি বিশ্বাস করি, আলোকচিত্রী পরিবর্তন সাধনে সক্ষম। আমি এটা ভাবতে পছন্দ করি যে, আমার এই কাজ সমাজে কাজের লোকদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের তাগিদ তৈরি করবে, যেটা হয়তো স্বাভাবিক নয়, কিন্তু সামাজিক এবং ঐতিহাসিক।’

বাংলাদেশের আলোকচিত্রী তুশিকুর রহমান কাজ করেছেন ‘ফ্যাটালিস্টিক টেন্ডেন্সি’ (অদৃষ্টবাদী প্রবণতা) বিষয়ের ওপর। তিনি তাঁর কাজ নিয়ে বলেন, ‘আত্মহত্যা মানেই নিজেকে খুন করে ফেলা। নিজেকে আহত করে এটি বাস্তবতা থেকে পালানোর এক স্থায়ী উপায়, প্রতি চল্লিশ সেকেন্ডে পৃথিবীতে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে, আবার আত্মহত্যা করতে চায় এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। প্রতিটা পরিপক্ব মানুষই জীবনে একবারের জন্য হলেও কখনো না কখনো আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছে। এ রকম করা বা এ রকম করতে চাওয়ার কারণও একটা-দুটি নয়। তবে সব কারণের মূলে বিষণ্নতা। নিজের জীবন নিজেই নিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত কোনো আনন্দের কিছু নয়, বরং এটা হয়তো একজন মানুষের জীবনের ভয়ংকরতম অভিজ্ঞতা। এ রকম তখনি হয় যখন মনে হয় সবকিছু আপনার ওপর প্রচন্ড ভার হয়ে চাপ দিচ্ছে, যখন মনে হয় আপনি নিঃসঙ্গ একা। এই ফ্যাটালিস্টিক টেন্ডেন্সি বা অদৃষ্টবাদী প্রবণতা আমার জীবনের ভয়াবহতম অধ্যায়।’

আমেরিকান আলোকচিত্রী কেভিন বুব্রিস্কি নেপালের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণ করেন এবং এমন একটি সময় ও জীবনধারার চিত্র ধারণ করেন, যা অপ্রতিরোধ্য গতিতে যেন অতীতের দিকেই পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে নেপালি মানুষদের ৯০টি সাদা-কালো প্রতিকৃতির এই সংগ্রহ দাঁড়ায়। ১৯৭০-এর দশকে নেপালে শান্তিবাহিনীতে কাজ করতেন বুব্রিস্কি। পরে তিনি আবারও নেপালে ফিরে আসেন এবং ৩ বছর ধরে নেপালের চারটি অঞ্চল ঘুরে ঘুরে ছবি তোলেন। তার লার্জ ফরম্যাট ক্যামেরার কারণে এক একটা ছবি তোলার গতি যেমন ধীরস্থির হয় তেমনি প্রতিকৃতি হয় ডিরেক্ট ও ফরমাল। তার তোলা প্রতিকৃতিগুলো কোনো স্বতঃস্ফূর্ত মুহূর্তকে ধরার উদ্দেশ্য বহন করে না, বরং স্বপ্রণোদিত সাক্ষাৎকেই ধারণ করে। এই কাজের বেশির ভাগই মানুষের প্রতিকৃতি, কিন্তু সেই সঙ্গে কিছু চমৎকার, প্রায় বিমূর্ত প্রাকৃতিক দৃশ্যও রয়েছে।

কানাডার আলোকচিত্রী ল্যারি টাওয়েল ‘দ্য মেনোনাইটস’ বিষয়ের ওপর কাজ করেছেন। মেনোনাইট গোষ্ঠীর সঙ্গে ল্যারি টাওয়েলের পরিচয় হয় কানাডার অন্টারিওতে তার বাড়ির কাছেই। পরে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্র ধরে তিনি তাদের গোষ্ঠীর মধ্যে প্রবেশের অনুমতিও পান। ১৬০০ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইউরোপে উৎপত্তি লাভ করা এই মেনোনাইটরা একটি ধার্মিক গোষ্ঠী, যারা অ্যামিশদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের ইচ্ছামতো জীবনযাপনের জন্য ক্রমাগতই তাদেরকে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে অভিবাসন নিতে হচ্ছে। এদের সবচেয়ে বড় অংশ এখন রয়েছে মেডিনকোতে, আর একটা অংশ কানাডার গ্রামাঞ্চলে থাকছে। কিংবা অভিবাসন-প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ১০ বছর যাবৎ কানাডা ও মেক্সিকো জুড়ে ল্যারি এই মেনোনাইটদের ছবি তুলেছেন। এবং দ্য মেনোনাইটস শীর্ষক তার এই সংগ্রহ একটা গোষ্ঠীর অনন্য ও অন্তরঙ্গ কিছু প্রতিকৃতিকে তুলে ধরে। ছবির পাশাপাশি ল্যারির বিদ্রুপাত্মক অথচ সবিস্তারিত লেখার মেনোনাইট গোষ্ঠীর সঙ্গে তার অভিজ্ঞতার গল্প উঠে আসে। এদের গ্রামীণ জীবনের কর্কশতা ও দারিদ্র্য, তাদের শৃঙ্খলা এবং ধর্মের দ্বন্দ্ব, জমি আর কাজের জন্য তাদের ক্ষুধা এবং আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার- তাদের আপ্রাণ চেষ্টার গল্প ‘দ্য মেনোনাইটস’।

ছবিমেলা ৮-এর কিউরেটর টিমের একজন ছিলেন শিল্পী মাহবুবুর রহমান। ছবিমেলার আয়োজন নিয়ে তিনি বলেন, ‘এ রকম একটি আন্তর্জাতিক উৎসবের অংশ হতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। আমার কাছে মনে হয়, ছবিমেলা একটি আর্ট মুভমেন্ট।’ তিনি আরও বলেন, ‘চারিত্রিক কিছু পরিবর্তন এসেছে ছবিমেলার। অনেক ধরনের শিল্পকর্মকে আলিঙ্গন করা হয়েছে। ছবিমেলা আকারে বড় হয়েছে, মানে বড় হয়েছে। কোনো শিল্পমেলা এ রকম মাত্রায় পৌঁছায়নি।’

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »