বিষাদ, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের গল্প বলে

ম্যাক্সিকোর স্ট্রিট আর্ট

mexico

।ধ্রুব নীল। যখনই সন্ত্রাস, নৈতিকতার অবক্ষয় ও অপরাধ বেড়েছে, তখন কথা বলেছে শিল্প। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শিল্প ও শিল্পীদের অবদান ছিল অনেক। কখনো গানে কখনো কবিতায় কখনো বা চিত্রে তাঁরা প্রাণের সঞ্চার করেছেন বিপ্লবীদের। এটি শুধু বাংলাদেশের আন্দোলনের ক্ষেত্রে নয়। পৃথিবীর সর্বত্রই বিপ্লবে, সংগ্রামে শিল্পীরা রেখেছেন অনেক বড় অবদান। তেমনি ৯ বছর আগে ম্যাক্সিকো যখন নেশা, অপহরণ, রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত তখন কথা বলতে শুরু করে দেয়াল।

দুই তরুণ গ্রাফিক ডিজাইনার রোজারিও মার্টিনেজ ও রবার্তো ভেগা ওয়াক্সাকা শহরের দেয়ালে আঁকতে শুরু করেন প্রতিবাদের চিত্র। তাঁদের ওই চিত্রগুলোকে বলা হয় লা-পিস্তোলা স্প্যানিশ। এই শব্দটি পেন্সিলের পিস্তলকে বুঝায়।

তাঁদের প্রথম চিত্রকর্ম একটি অসাড় হাত সর্বশক্তিতে একটি পেন্সিলকে ধরে আছে, হুডি দিয়ে মাথা ও মুখ ঢাকা এক ব্যক্তি একটি পেট্রলবোমা ছুড়ে মারছে। যাকে প্রতীকী হিসেবে একটি বইও ধরা যেতে পারে। এই চিত্র তখন ওয়াক্সাকা রাজ্যের গভর্নরের বিরুদ্ধে বিশাল আন্দোলনের জন্ম দেয়। শিক্ষকেরা নতুন বেতন ও শর্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়।

এসব চিত্রকর্মকে বলা হয় স্টেনসিলড কমেন্ট্রি। ছবি আঁকাতে স্টেনসিলের ব্যবহার সম্পর্কে মার্টিনেজ বলেন, ‘স্টেনসিল মুছে ফেলা কঠিন। দেয়ালজুড়ে আঁকা চিত্র নিশ্চই একটি ছোট পোস্টারের চেয়ে বেশি কথা বলে। এটি দেয়ালজুড়ে আঁকা একটি প্রতিবাদের মতো।’

ওই সময়ের লা পিস্তোলা চিত্রকর্মগুলো খুব দ্রুত ওয়াক্সাকা রাজ্য থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চিত্রকর্মগুলো নেশাদ্রব্য বিক্রেতা, অপহৃত সন্তানের জন্য মায়ের অপেক্ষা ও আরও নানান ধরনের অপরাধ সম্পর্কে সবকিছু চিত্রায়িত করেছে।

ম্যাক্সিকোর দেয়ালের কিছু লা পিস্তোলার তুলে ধরা হলো

একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি মস্তকহীন দেহ, একজন গুলিবিদ্ধ মানুষ ও পাশে একজন চিৎকার করছে। কারণ ওপর থেকে অনেকগুলো অক্টোপাসের কর্ষিকা তার দিকে এগিয়ে আসছে, যা প্রতীকী হিসেবে মাদক কারবারিদের বুঝিয়েছে।

এল-পাস্তেল বা কেক নামের অপর একটি ছবিতে দেখা যায়, বিদ্রোহী মাদক কারবারিরা দেশকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছে।

আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, একটি শিশু একটি বদ্ধ ঘরে বসে আছে। যা জিটাস গ্যাংয়ের বীমার টাকা না দেওয়ায় মানুষদের খুন করার সময়কে নির্দেশ করে। ওই সময়ে মানুষ খুন হওয়ার ভয়ে ঘর থেকে বের হতো না। লা পিস্তোলা ছবিটি এমনভাবে চিত্রায়িত করে যে অনেকগুলো পাখি বদ্ধ ঘরে জানালা দিয়ে মুক্ত আকাশে চলে যাচ্ছে আর একটি শিশু ওই দিকে তাকিয়ে আছে।

আরেকটি ছবিতে দেখা যায় তখনকার সঙ্গীতশিল্পীদের যারা টাকার বিনিময়ে তখন মাদকেকে মহান করে নানান গাঁথা রচনা করে গাইত।

‘প্ল্যান ডি ভুইলো’ বা ওড়ার পরিকল্পনা নামক একটি দেয়ালচিত্রে হাজার হাজার দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকানের উত্তরের পথে গমনের ইতিহাস চিত্রায়িত হয়েছে। ছবিতে দেখা যায় মুখোশ পরিহিত একজন বিশাল এক পাখির ওপর চড়ে উড়ে যাচ্ছে।

দোকানের শাটারে আঁকা একটি ছবিতে দেখা যায় একটি গাধার গায়ে জেব্রার মতো সাদাকালো ডোরাকাটা। যার নাম ডনকি ও জেব্রা মিলিয়ে জঙ্কি রাখা হয়। একজন পাশ থেকে ওই গাধার গায়ের ডোরাকাটাগুলো পরিষ্কার করছে। এই ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে তাইজুয়ানার ইতিহাস। যেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষরা আমোদ-ফুর্তির জন্য আসত। এবং একপর্যায়ে ওখানকার নিজস্বতা এমনভাবেই ডোরাকাটার নিচে হারিয়ে যায়। ডোরাকাটাগুলো পরিষ্কারের বিষয়ে ছবি নির্মাতা ভেগা ব্যাখ্যা দিলেন, ‘তুমি একটি গাধা, জেব্রা নও।’

‘এল আমব্রাজো অসেন্তে’ বা অস্তিত্বহীন আলিঙ্গন ছবিতে ষাট-সত্তর দশকের সহিংসতায় হারিয়ে যাওয়া সন্তানের মায়েদের অপেক্ষার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

ভেগা বলেন, এই ছবিতে এখনো অপেক্ষমাণ একজন মায়ের অবস্থা চিত্রায়িত করা হয়েছে। চার দশক পরেও এখনো অনেক মা আছেন, যারা এখনো দিশাহীন হয়ে আছেন যে তার সন্তানটির কী হয়েছে।

তারা হয়তো মৃত, তবে দেহ না পাওয়া যাওয়ায় তাদের জন্য মৃত্যুশোকও প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এমনও তো হতে পারে তারা এখনো জীবিত।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »