শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগরের শিল্পভাষ্য

কেন চিত্ররূপ রচি

mostafiz_karigor

খুব বেশি মনে পড়ে- আমার শৈশব, প্রায় বিশ বছর আগের কথা। তখন জাতীয় নির্বাচনের সময় পাড়ার দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন প্রতীকের ছবি এঁকে বেড়ানোর কথা। নৌকা, গরুর গাড়ি- এসব আঁকার কথা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্লাকবোর্ডে মাস্টার মশাইয়ের ব্যবহৃত উচ্ছিষ্ট চক দিয়ে একে চলার কথা। শৈশবের বান্ধবীর বাড়ির দেয়ালে তার নামের সঙ্গে নিজের নাম যোগচিহ্ন দিয়ে লেখা, পাশে তার পোর্ট্রেট আঁকা…এভাবেই হয়তো ধীরে ধীরে মনের ভেতরে অগোচরে থিতু হয় আঁক কষে কষে, রঙ মেখে-মাখিয়ে একটার পর একটা দৃশ্য নির্মাণ করে চলার আনন্দ। না জানতাম তখন শিল্পী কাকে বলে, শিল্পের গূঢ়ার্থ, শিল্পশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা, প্রদর্শনীর কথা, পদকপ্রাপ্তির কথা, স্কলারশিপের কথা, বিদেশ ভ্রমণের কথা, টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারের কথাÑ কেবল ভেতর থেকে উৎসারিত হয়ে আসা রং ও রেখায় ছিল আমার একমাত্র রাস্তা, যে রাস্তা ধরে কেবল হেঁটে যাওয়ার কথাই ভেবেছি, রাস্তায় থাকার প্রার্থনাই করে চলেছি এই অব্দি।

পড়ে অবশ্য প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পেলাম, মাজায় জোর বেঁধে সেখানে ঢুকে গেলাম হুড়মুড় করে, যতটা গিললাম উগরে দিলাম তার চেয়েও বেশি- তবু একাডেমির কিছু আশ পেটের মধ্যে রয়ে গেল। তা যতœ করেই রেখেছি। একাডেমির মেয়াদকে অনেকটা নিজেই উত্তীর্ণ করে আবার ফিরে এলাম শৈশবের দিনগুলোর কাছে। শৈশবের রঙের কাছে, রেখার কাছে। যখন যা মনে হয় আঁকি। কোনো শাসন নেই কারও, কাউকে খুশি করবারও তাগাদা নেই, কারও ঘরের দেয়ালের সঙ্গে মিলিয়ে রং লেপার তাড়না নেই। কেবল এঁকে চলা…

কেন আঁকি? এই কথাটির সত্যি সব শিল্পীরই সঠিকভাবে উপলব্ধি ও বিশ্বাস করাটা খুব দরকার। অন্তত নিজের কাছে নিজের উত্তরটা সৎভাবে তৈরি থাকাটাই ভালো। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার শৈশবের রং-পেন্সিলের কাছেই থেকে যেতে চাই। ভেতর থেকে হয়ে আসা চিত্রকেই আঁকতে চাই সর্বদা। ছবি আঁকাটা আমার জীবনের ভাড়াটে ব্যাপার নয়, প্রতিদিনের জীবনযাপনের নিবিড়তা নিয়েই কাজ করে যাওয়া। খাবার খাওয়া, পোশাক পরা, ঘুমের মতো…। ওস্তাদ আকবর আলী খাঁ-এর একটা সাক্ষাৎকার পড়ে জেনেছিলামÑ তারা ভাইবোনেরা সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়েই সেতার নিয়ে বসে পড়ত, পাশের ঘর থেকে বাবা আলাউদ্দীন খাঁ বিভিন্ন রাগ বাতলে দিতেন। এভাবেই উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের মহীরুহ হয়ে উঠেছিলেন তাঁরা। পল ক্লির জীবনী পড়তে গিয়েও পেলাম- তাঁর মা একজন গানের শিক্ষিকা ছিলেন। মায়ের গান তাঁর শিশুমনে যে দৃশ্য তৈরি করত, তাই-ই আঁকতেন তিনি- এভাবেই পল ক্লির ছবিতে সঙ্গীত আর রং একাকার হয়ে যায়। মিশেল বাসকিয়ার জীবনটাই ছিল সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে নিজের প্রতিটি স্পন্দনকে দেয়ালে, ক্যানভাসে, বান্ধবীর ঘুমন্ত শরীরে এঁকে যাওয়ার। আমার মাথার কাছে এসব মহাজনকে আমি রেখে দিয়েছি।

আমি ব্যক্তি মানুষ হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের উপাসনাতে আনন্দ পাই না; কিন্তু এই মহাজগতের প্রাণশক্তিকে পুজো করবার প্রেম আমি ধরে রাখি। আর তা আমি আমার ছবি আঁকা বা লেখায় নিমজ্জিত হলেই করতে পারি। হ্যাঁ, আমার উত্তম প্রার্থনা হলো আমার এঁকে চলা- কেননা, আঁকার সময় রঙের সঙ্গে নিজের প্রাণের একটা যোগ হয়ে যায়, তখন মহাবিশ্বের সৃষ্টিরূপের সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমার এই রং প্রকৃতিতে আছে, অন্তরীক্ষে আছে- আর তা অনিবার্যভাবেই মিশে আছে সৃষ্টিজগতের প্রাণশক্তির সঙ্গে। তখন সেই মহাশক্তির কাছে নিজেকে একজন সামান্য পূজারী রূপে নত করে দেওয়াই হলো আমার ছবি আঁকার আসল প্রাপ্তি।

বস্তুমান জগতের যাবতীয় ঘটনা হয়তো আমাকে ছুঁয়ে যায়, তা স্বাভাবিকভাবেই। তার প্রভাব আমার চিত্রকর্মে বিকশিত হোক তা আমি চাই না। পৃথিবীতে যুদ্ধ হলো, মানবতা লঙ্ঘিত হলো, রাজনৈতিক অস্থিরতা এলো- একজন মানুষ হিসেবে এসব নিয়ে আমি ভাবব; কিন্তু একজন শিল্পী হিসেবে আমি আমার শিল্পের সঙ্গে এগুলো এক করে দেখতে চাই না। আমি ছবি এঁকে সমাজ পরিবর্তন করতে চাই না, আমার ছবি মানুষের শিক্ষণের উপকরণ হবে না, বিপ্লবের হাতিয়ার হবে না। এ কেবল আমার, একান্ত আমার ব্রহ্মভ্রমণের আনন্দ; আমার ভেতরের জারিত সৃষ্টিরূপকে আমি প্রকাশ করে যেতে চাই।

অনেকেই অনেক অনেক ফর্ম, পদ্ধতি, ইজমের চর্চাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এসবে আমার আগ্রহ নেই। একই ধরনের ছবি আমি সারা জীবন এঁকে যাব- এটা অসম্ভব। কেননা, প্রতিনিয়তই তো বদলে যাচ্ছি, আমার বোধ বদলে যাচ্ছে, আমার অবস্থান বদলে যাচ্ছে, আমার প্রকাশের ধরনও প্রতিনিয়তই বদলাবে। যেহেতু আমার চিত্র কোনো ভোক্তাকে উদ্দেশ করে পেটেন্ট মেরে ছেড়ে দেওয়া পণ্য নয়, সে কারণেই আমি আমার শিল্পে স্বেচ্ছাচারী। সকালে যদি সুখ আঁকি, দুপুরে বিরহ, রাতে উৎসব। সকালে কালো, বিকেলে লাল, রাতে সাদা। আমার মনে হয় শিল্পীর এই স্বেচ্ছাচারিতায় শিল্পীর স্বকীয়তা নির্মাণের প্রাকৃতিকতাকে প্রাণবন্ত রাখে।

যেহেতু বিদ্যমান মানবসমাজে সমালোচক শ্রেণি রয়েছে। সেই সূত্রে আমার ছবিরও কিছু সমালোচনার সম্ভাবনা তৈরি হবে। আমি সকল সমালোচনাকে গ্রাহ্য করার সংযম নিয়ে আঁকতে চাই। শিল্পের ব্যাখ্যা বা পন্ডিতদের নিয়মশৃঙ্খলার দিকে আমার আগ্রহ কম। পর্তুগিজ ভাষার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক পাওলো কোয়েল বলেছেন- অন্যের সমালোচনা সইবার শক্তি অর্জন করো। আমি এই পথে নেমেছি…অপার আনন্দের পথে; কল্পলোক থেকে সৃষ্টিলোক হয়ে বিশ্বরূপের ভেতরে অবগাহন করতে। এই পরমানন্দ ধরে রাখতে কেবল।

FacebookTwitterGoogle+Google GmailPinterestLinkedIn

3 comments on “কেন চিত্ররূপ রচি
  1. শিল্পীকে অভিনন্দন।

  2. zahid sohag says:

    ভালো লাগলো তবে ‘‘ভেতর থেকে হয়ে আসা চিত্রকেই আঁকতে চাই সর্বদা’’ এই কথার অর্থ বুঝতে পারলাম না।

  3. নাসিমা আনিস says:

    তোমার আঁকা আর লেখা দুই অনবদ্য, কবিই তো তুমি, তো তোমার কোন দিক থেকেই ভাবনা নেই, আনন্দে আঁকছ, এঁকে যাও ভালো থাক, নিজের যত্ন নাও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

ফেসবুকে চিত্রম

সর্বশেষ সংবাদ

মাসিক আর্কাইভ

নিউজলেটার পেতে সাবসক্রাইব করুন

     Read More »